আপনার সন্তানদের ইবাদাত প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করুন

4
Print Friendly

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লিখেছেন: রেহনুমা বিনত আনিস

 

ছোটবেলায় একবার কয়েকমাস গ্রামে থাকার সুযোগ হয়েছিল। অনেক সুন্দর সুন্দর অভিজ্ঞতার মাঝে একটি অভিজ্ঞতা ছিল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মায়েরা তাদের ঘর্মক্লান্ত কর্দমাক্ত সব পিচ্চি ছেলেমেয়েদের হাতমুখ ধুইয়ে বা এক বদনা পানি দিয়েই একখানা মিনি গোসল দিয়ে ভাল কাপড়চোপড় পরিয়ে বারান্দায় বসিয়ে দিতেন। মাগরিব হতেই সব বাড়ীর বারান্দা থেকে শোনা যেত বাচ্চারা উচ্চস্বরে সমবেত কন্ঠে যতপ্রকার দুয়া জানা আছে গড়গড় করে বলতে থাকত- বাবা মায়ের জন্য, দাদা দাদীর জন্য, নানা নানীর জন্য, আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী কেউ বাদ যেত না। শহুরে আমি এতে খুব মজা পেতাম। কিন্তু এখন মনে হয় এটা এমন এক ট্রেডিশন ছিল যার মাধ্যমে আর কিছু হোক বা না হোক, যেসব বাচ্চা এখনো নামাজ পড়তে শেখেনি তাদের পরিবারের ইবাদাত প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার একটা সুন্দর প্রয়াস ছিল।

আজকাল এমনটা শহরে গ্রামে কোথাও আর তেমন দেখা যায়না। সন্ধ্যা হলে কিছু ছেলেমেয়ে পড়তে বসে, আর কিছু বসে পড়ে ‘ইডিয়ট বক্স’এর সামনে। কিন্তু পারিবারিক প্রক্রিয়া হিসেবে ইবাদাত অনেকাংশে হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেবল মুরুব্বীশ্রেণীর লোকজনের করণীয় অথবা ব্যাক্তিগত পছন্দ অপছন্দের ভিত্তিতে অপশনাল বিষয়। সামষ্টিকভাবে ইবাদাত এখন প্রায় অদৃশ্য হতে চলেছে। এর মাধ্যমে দু’টি ব্যাপার প্রতিভাত হচ্ছে- এক, ধর্মীয় বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা; দুই, ধর্মচর্চার প্রতি আমাদের অনীহা।

প্রথমত, আমরা চিন্তা করছিনা যে শেষবয়সে গিয়ে কুর’আন পড়ে যদি আমি জানতে পারি যে সারাজীবন যা ভেবে এসেছি করে এসেছি তা ভুল ছিল, আমি কি আমার জীবনটাকে রেকর্ডের মত রিওইয়ান্ড করে পুরো জীবনটাকে সংশোধন করার সুযোগ পাব? উত্তর স্পষ্ট। তাহলে কেন আমি আমার প্রাণপ্রিয় শিশুটিকে ছোটবেলা থেকেই কুর’আন পড়ার, জানার, বোঝার, সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেবনা? আমি শিশুদের নিজের মতামত ইসলাম বলে গিলিয়ে দেয়ার পক্ষপাতি নই, কিন্তু সে কুর’আন হাদীস যদি জানার সুযোগ না পায় তাহলে সে ধর্ম কতটুকু প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় তা সিদ্ধান্ত নেবে কিসের ভিত্তিতে? ধর্ম পালনের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করবে কি করে?

দ্বিতীয়ত, চর্চা। ইবাদাত মূলত কন্ডিশনিং-এর বিষয়। আমার স্বল্পজ্ঞানে বিশ্লেষণ করে যতটুকু বুঝি, ইবাদাতের জন্য দু’ধরণের কন্ডিশনিং প্রয়োজন হয়- মানসিক এবং শারিরীক। মানসিক কন্ডিশনিং মূখ্য। কেননা আপনি যদি মনে করেন ধর্ম একটা ভুয়া বিষয় তাহলে আপনি ইবাদাত করার ইন্সপিরেশন পাবেন কি করে? কিন্তু আপনি যদি নিজে পড়ে, জেনে, বুঝে চর্চা করার সিদ্ধান্ত নেন তাহলে পাহাড়সম বাঁধাও আপনাকে আটকে রাখতে পারবেনা। এজন্যই একজন আব্দুর রহীম গ্রীণ পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে তৃপ্তি পান অথচ একজন জন্মসূত্রে মুসলিম নামধারী নামাজ পড়ার টান অনুভব করেন না; এ’কারণেই যে মেয়েটি গতকালও বিকিনি পরত সে একঝটকায় বোরকা পরে ফেলতে পারে অথচ অনেকেই মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেও মাথায় ওড়না দিতে পারেনা; এজন্যই একজন ইউসুফ এস্তেস ইসলাম গ্রহণ করেই বাড়ী বিক্রি করে ভাড়া বাড়ীতে ওঠেন অথচ একজন জন্মগত মুসলিম সুদভিত্তিক পদ্ধতিতে বাড়ী কেনেন। পাশাপাশি প্রয়োজন শারীরিক কন্ডিশনিং। আপনার চৌদ্দ বছর বয়সী গাবলু গুবলু ছেলেটিকে আপনি আদর করে কোনদিন রোজা রাখতে দেননি অথবা শুধুমাত্র ছুটি বা বিশেষ দিনগুলোতে সারাদিন শুয়ে বসে কাটানোর শর্তে রোজা রাখতে দিয়েছেন। সে চল্লিশ বছর বয়সেও শারীরিকভাবে সব রোজা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারবেনা কারণ তার শরীর এই প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়নি। রোজার সমস্ত উপকারীতার কথা ছেড়ে দিলাম, কেবল এটুকু যদি আমরা চিন্তা করি যে আমার সন্তানকে আমি জন্ম দেয়ার নিমিত্ত ছিলাম বটে কিন্তু তার সৃষ্টিকর্তা আমি নই। সুতরাং, তার প্রতি আমার যতটুকু ভালোবাসা, অবশ্যই তার সৃষ্টিকর্তা তাকে এর চেয়ে কো্টিগুণ বেশী ভালোবাসেন, তার শরীরের প্রতিটি অণু পরমাণু তিনি আমার চেয়ে ভালো জানেন। সেক্ষেত্রে তিনি যদি তাকে নামাজ পড়তে আদেশ করেন, আমি তাকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে রেখে কি তার উপকার করছি? তিনি যদি তাকে রোজা পালন করতে বলেন, আমি তাকে খাইয়ে দাইয়ে ফার্মের মুরগী বানিয়ে তার কি উপকার করছি? তিনি যদি তাকে পর্দা করতে বলেন, আমি তার গরম লাগবে বলে তাকে ফ্রিলি চলতে দিয়ে তার কি উপকার করছি? আমি যদি আমার সন্তানটি একটু কাঁদবে বলে বা একবেলা অভিমান করে না খেয়ে থাকবে বলে জেনেশুনে তাকে হারাম খাবার খেতে দেই, আমি আসলে তাকে কতটুকু ভালোবাসি?

নিজেকে এই প্রশ্ন করি। জবাবটা নিজের কাছেই স্পষ্ট হয়ে যায়। কি করছি আর কি করনীয় সে ব্যাপারে আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ থাকেনা।

আমাদের সন্তানেরা এখন ঈদ বলতে বোঝে টিভিতে ভাল ভাল প্রোগ্রাম আর কে ক’খানা জামাজুতো কিনল তার হিসেব। কিন্তু এত চমৎকার অনুষ্ঠানমালা, এত এত জামাজুতো কিছুই তাদের মন ভরাতে পারেনা। কারন আমাদের ক্রিয়াকর্মে কোনভাবেই ঈদের মূল স্পিরিটটা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়না। তারা দেখে সংযমের মাসে অসংযমের জোয়ারে গা ভাসানো, ঈদের দিনে তার হাজার টাকা দামের জামার দিকে বস্তির ছেলেটির করুণ চাহনী, তার টেবিলে খাদ্যসম্ভারে সে খাবার প্রস্তুতকারী কাজের লোকের ভাগ না পাওয়া। তাহলে সে কি করে বুঝবে যে ঈদ হোল এমন একটি দিন যেদিন আমরা আমাদের যা আছে তা তাদের সাথে শেয়ার করব যাদের সাথে আমাদের পথে ঘাটে দেখা হয় অথচ আমরা তাদের দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাবার উপযুক্ত মনে করিনা? ঈদ হোল নিজের জন্য জামা না কিনে সেই পাতাকুড়ানী শিশুটির জন্য জামা কেনার দিন যে অভাবের তাড়নায় ভরদুপুরে রোদবৃষ্টি উপেক্ষা করে বস্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে; ঈদ সেই ছেলেটির জন্য বই কেনার দিন যে স্কুলে যাবার পরিবর্তে ওয়ার্কশপে গাড়ী ঠিক করে; ঈদ সেই বুয়ার বাচ্চার জন্য খেলনা কেনার দিন যে বাড়ীতে তার ছোট্ট শিশুটিকে ভুলে ঈদের দিনটি পর্যন্ত আমার পরিবারের সাথে কাটায়। এই প্রক্রিয়ায় আমি আমার সন্তানকে অন্তর্ভুক্ত করব। সে মাসের পর মাস প্ল্যান করবে কিভাবে ওয়ার্কশপে তার সমবয়সী ছেলেটিকে বুক অফ নলেজ উপহার দিয়ে চমকে দেয়া যায়, পাতাকুড়ানী মেয়েটির বাসায় জামা নিয়ে উপস্থিত হলে সে কেমন সারপ্রাইজড হবে, বুয়ার ছেলের জন্য কি খেলনা দিলে বুয়া আনন্দে তাকে জড়িয়ে ধরবেন। সে নিজ হাতে প্রত্যেকটি উপহার তুলে দেবে চারপাশের মানুষগুলোর হাতে, নিজ চোখে দেখবে তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখ, নিজ কানে শুনবে তাদের উচ্ছাস। দেয়ার আনন্দে ভরপুর ঈদ তখন তার কাছে হয়ে উঠবে সত্যিকার অর্থে মহিমান্বিত।

চলুন আমরা আমাদের প্রত্যেকটি ইবাদাতে আমাদের সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করি। আপনি যখন কুর’আন পড়তে বসেন আপনার সন্তানকে পাশে ডেকে বসান, নামাজ পড়ার সময় আপনার ছেলেমেয়েকে সাথে ডেকে নিন, সেহরীতে তাকে ডেকে তুলুন, রোজা রাখতে তাকে উৎসাহিত করুন, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা শিক্ষা দিন, চারপাশের মানুষের জন্য করতে উদ্বুদ্ধ করুন, সর্বোপরি তার জীবনকে নিশ্চিন্ত ও পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার উপায়টি শিখিয়ে দিন। আপনার সন্তানকে বাবা বা মা হিসেবে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার হতে বঞ্চিত করবেন না।

এই কাজটি কি আমরা এই পবিত্র মাস থেকে শুরু করতে পারিনা?


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

4 মন্তব্য

  1. dear রেহনুমা , আপনার লেখাটা পড়ে অনেক ভালো লাগল ! আপনি পুরুষ না মহিলা না জেনেই লেখাটা পড়তে পড়তে দোয়া করেছি এটি অল্প পরিসরে, সবকিছু, সময়পোযোগী লেখাটি লেখার জন্য ! মহিলা জেনে আরও বেশি খুশি হলাম! মজার ব্যাপার হল, এই কথাগুলো ঠিক ভাবি, করার চেষ্টা করি আমি, যদিও আপনার মত লেখার সৌভাগ্য এবং ক্ষমতা কোনটাই হয়নি ! তই আরও উজ্জীবিত হলাম ! ধন্যবাদ সুন্দর লেখার জন্য ! আরও সুন্দর লিখুন, আরও অনেক মানুষ উজ্জীবিত হোক..দোআ করি ! আল্লাহ হাফিজ ||

  2. Dear Rehnuma apa,
    Take my salam.I and my son have gone through your writing.Hope more articles in the coming days . May Allaah reward you in both the world.

  3. Dear Madam,
    i have a different opinion for your article. prayer is a part of any religious an/women. Religion is a part of our life too. But how many thinks about that belief, trust, submission on god. We modernised our thoughts about religious.

  4. Dear Kazi Mahbubur Rahman

    Salam, You have different opinion, Oh that’s cool. Every person now and then try to be different mostly in his/her opinion. When it is come to religion, it is very general come that sort of opinion.

    Yes prayer is part of every single religion, But man religion is not part of our life, our life is what part of it. Wait when you will ever going to say “How many ?” It is well known that those believer who submitted their trust will be very few in count. So stop counting, better count on yourself.

    You modernized people don’t even know what to say when have to say what is modern. Mr Kazi, your religion like some other brings by Allah (not your god). So better be careful to modernize Allah and caught on the judgement day.

    You may not even realize what i’m said. But i would like to mention something Allah said in Quran ~ “Only believers will get the meaning of message (Al Quran) from Allah properly and rest of others will be confuse, live in a dark even reading message of Allah.”

    Allah and the messenger know about this more. Where every woman going to be modernize and letting herself to get nothing but pleasure, this sister doing exactly so Allah says. So stop spreading this sort of opinion thorough internet as you have the the freedom to say.

    May Allah give proper hedayet to feel something before you die.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here