QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট » আল্লাহ্ সম্পর্কে http://www.quraneralo.com ইসলামিক রিসোর্সেস - আকিদা, কুরআন, হাদিস, ইসলামী প্রবন্ধ, ইসলামী বই, ইসলামী ওয়াজ | Bangla/Bengali Islamic Website | Bangla Islamic Articles, Bangla Islamic Books, Bangla Islamic Waz Fri, 17 May 2013 05:32:05 +0000 en-US hourly 1 http://wordpress.org/?v=3.5.1 আল্লাহকে সম্মান দেওয়া ও তাকে গালমন্দকারীর বিধান http://www.quraneralo.com/rulings-on-praising-and-insulting-allah/ http://www.quraneralo.com/rulings-on-praising-and-insulting-allah/#comments Sun, 14 Apr 2013 06:03:46 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=4072 allah

মূল ঃ শায়খ আব্দুল আজিজ তারিফি | অনুবাদঃ সানাউল্লাহ নজির আহমদ | সম্পাদকঃ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

আল্লাহ তা'আলার জন্য সকল প্রশংসা, যেরূপ তার সম্মানের সঙ্গে প্রযোজ্য। আমি তার নির্দেশ মোতাবেক শোকর আদায় করছি, আরো স্বীকার করছি যে, বান্দা তার যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে অক্ষম, কারণ তারা তাকে জ্ঞান দ্বারা পূর্ণরূপে বেষ্টন করতে পারেনি, যাকে জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করা যায় না, তার পরিপূর্ণ কৃতজ্ঞতা আদায় করা সম্ভব নয়।

আল্লাহ তা'আলার নিয়ামত অগণিত, যার যথাযথ শোকর আদায় করা কখনো সম্ভব নয়। তিনি ইহকাল ও পরকালের মালিক এবং তার নিকট সবার প্রত্যাবর্তন। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক তার কোনো শরীক নেই, একমাত্র তিনিই সত্যিকার মাবুদ নেই। সালাত ও সালাম পাঠ করছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর।

অতঃপর:

যুক্তি ও বিবেক উভয়ের দাবী সৃষ্টিকর্তার মর্যাদা ও সম্মানের জ্ঞান হাসিল করা ওয়াজিব, যার তাওহীদের ঘোষণা দেয় গোটা জগত। সকল সৃষ্টিজীবে সৃষ্টিকর্তার বড়ত্ব, মহান সৃষ্টির কারুকার্য ও নিখুঁত পরিকল্পনার স্বাক্ষর বিদ্যমান। যদি তারা সকলে নিজের দিকে মনোনিবেশ করে, নিজ সত্তার প্রতি ভাবনার দৃষ্টি দেয় ও গভীর চিন্তা করে, তাহলে অবশ্যই তারা সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্ব নিজেদের মাঝে দেখতে পাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَفِيٓ أَنفُسِكُمۡۚ أَفَلَا تُبۡصِرُونَ ٢١ ﴾ [الذاريات: ٢١]

“আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও [নিদর্শন রয়েছে]। তোমরা কি চক্ষুষ্মান হবে না?[1]

নূহ আলাইহিস সালাম তার কওমকে বলেন:

﴿ مَّا لَكُمۡ لَا تَرۡجُونَ لِلَّهِ وَقَارٗا ١٣ وَقَدۡ خَلَقَكُمۡ أَطۡوَارًا ١٤ ﴾ [نوح: ١٣،  ١٤]

“তোমাদের কি হল, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছ না? অথচ তিনি তোমাদেরকে নানাস্তরে সৃষ্টি করেছেন”।[2]

এ আয়াতের অর্থ ইব্‌ন আব্বাস ও মুজাহিদ বলেন: “তোমরা আল্লাহর মর্যাদার পরোয়া করো না”।[3] ইব্‌ন আব্বাস আরো বলেন: “তোমাদের কি হল, তোমরা আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দিচ্ছ না?”[4]

নবী নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে স্বীয় নফস ও সৃষ্টির স্তরসমূহে চিন্তার আহ্বান করেছেন, যেন তারা নিজেদের উপর সৃষ্টিকর্তার হক অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। এ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, আল্লাহকে সম্মান দেওয়া ও তার অধিকার জানার জন্য নিজের নফস ও সৃষ্টির স্তরসমূহ দেখাই যথেষ্ট। আর যে ব্যক্তি আসমান ও জমিনে বিদ্যমান সকল সৃষ্টিজীবের উপর চিন্তা করবে তার অবস্থা কেমন হবে, বলার অপেক্ষা রাখে না। মানুষ আল্লাহর মর্যাদা বুঝে না, কারণ তারা তার নিদর্শনসমূহ ভাবনার দৃষ্টিতে দেখে না; দেখে না চিন্তা, গবেষণা ও উপদেশ গ্রহণের গভীর আগ্রহে, তারা দেখে শুধু উপভোগ ও অবহেলার দৃষ্টিতে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَكَأَيِّن مِّنۡ ءَايَةٖ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ يَمُرُّونَ عَلَيۡهَا وَهُمۡ عَنۡهَا مُعۡرِضُونَ ١٠٥﴾ [يوسف: ١٠٤]

“আর আসমানসমূহ ও জমিনে কত নিদর্শন রয়েছে, যা তারা অতিক্রম করে চলে যায়, অথচ সেগুলো থেকে তারা বিমুখ”।[5]

বিমুখ অন্তর ও গাফেল হৃদয়কে এসব নিদর্শন আকৃষ্ট করে না, মুজিযাসমূহ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। একমাত্র তারাই আল্লাহকে মর্যাদায় দেয়, যারা তাকে দেখে, অথবা তার নিদর্শন দেখে ও তার গুণগান জানে। গাফেল ও বিমুখ অন্তরে আল্লাহর মর্যাদা মূল্যহীন, ফলশ্রুতিতে তার সাথে কুফরি ও তার নাফরমানি করা হয়, কখনো তাকে গালি দেওয়া হয়, তার সাথে উপহাস করা হয়। মহানের মহত্ব সম্পর্কে অজ্ঞতা পরিমাণ তার নাফরমানি করা হয়, অন্তর থেকে যে পরিমাণ তার মর্যাদা ও বড়ত্ব হ্রাস পায়, সে পরিমাণ তার কুফরি করা হয় ও তার হক অস্বীকার করা হয়। পক্ষান্তরে দুর্বলের দুর্বলতা সম্পর্কে অজ্ঞতা পরিমাণ আনুগত্য করা হয়, অন্তরে যে পরিমাণ তার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, সে পরিমাণ তার ইবাদত করা হয় ও তাকে সম্মান দেওয়া হয়।

মুশরিকরা এ জন্য আল্লাহর সাথে কুফরি করে, যিনি পুনরায় জীবিত করবেন, মূর্তির ইবাদত করেছে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের ত্রুটির বর্ণনা দিয়ে বলেন:

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٞ فَٱسۡتَمِعُواْ لَهُۥٓۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ لَن يَخۡلُقُواْ ذُبَابٗا وَلَوِ ٱجۡتَمَعُواْ لَهُۥۖ وَإِن يَسۡلُبۡهُمُ ٱلذُّبَابُ شَيۡ‍ٔٗا لَّا يَسۡتَنقِذُوهُ مِنۡهُۚ ضَعُفَ ٱلطَّالِبُ وَٱلۡمَطۡلُوبُ ٧٣ مَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدۡرِهِۦٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٧٤﴾ [الحج : ٧٣،  ٧٤]

“হে মানুষ, একটি উপমা পেশ করা হল, মনোযোগ দিয়ে তা শোন, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না। যদিও তারা এ উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। আর যদি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয়, তারা তার কাছ থেকে তাও উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও যার কাছে অন্বেষণ করা হয় উভয়েই দুর্বল। তারা আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দেয় না। নিশ্চয় আল্লাহ মহাক্ষমতাবান, মহাপরাক্রমশালী।[6]

*     আল্লাহ তা'আলাকে সম্মান দেওয়া: তার সিফত ও গুণগানের জ্ঞান হাসিল করা, তার নিদর্শনসমূহ চিন্তা করা, তার নিয়ামত ও অনুগ্রহসমূহ নিয়ে ভাবা। অতীত জাতিগুলোর অবস্থা, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী, মুমিন ও কাফিরদের পরিণতি জানা ও সেগুলো থেকে উপদেশ গ্রহণ করা।

*     আল্লাহ তা'আলাকে সম্মান দেওয়া: তার শরীয়ত, আদেশ-নিষেধগুলো জানা ও সম্পাদন করা, তার বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও সাধ্যানুসারে তার উপর আমল করা। এগুলো ঈমানরে তেজস্বী বৃদ্ধি করবে, কারণ ঈমানেরও জ্যোতি ও উত্তাপ আছে। আপনি যার উপর ঈমান রাখেন, সে নির্দেশ করে, কিন্তু তার নির্দেশ পালন করা হয় না, সে নিষেধ করে, কিন্তু তার নিষেধ থেকে বিরত থাকা হয় না, তাহলে তার প্রতি আপনার ঈমানের উত্তাপ হ্রাস পাবে ও তার জ্যোতি নিষ্প্রভ হবে। এ আল্লাহ জন্য হাদি[7] ও হজের নিদর্শন প্রসঙ্গে বলেন:

﴿ ذَٰلِكَۖ وَمَن يُعَظِّمۡ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقۡوَى ٱلۡقُلُوبِ ٣٢ ﴾ [الحج : ٣٢]

“এটাই হল আল্লাহর বিধান, যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই”।[8]

আদেশ ও নিষেধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন মানে হুকুমদাতাকে সম্মান করা। তাই নাস্তিকতা, আল্লাহকে অস্বীকার করা ও তার সাথে কুফরি করার পূর্বে, তার আদেশ ও নিষেধের প্রতি উপেক্ষা ও তার সাথে তাচ্ছিল্যের আচরণ প্রকাশ পায়।

আল্লাহ ও তার মর্যাদা সম্পর্কে কতক অজ্ঞ বিমুখ লোকের নিকট, যারা ইতোপূর্বে তার আদেশ ও নিষেধ অবজ্ঞা করেছে, আল্লাহকে গালমন্দ করা, তাকে কতক শব্দ দ্বারা বিশেষায়িত ও সম্বোধন করা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে শাম,[9] ইরাক ও আফ্রিকার কতক দেশে, যা মুমিনদের মুখে উচ্চারণ করা, কিংবা তাদের কানে শ্রবণ করা কঠিন ঠেকে। এ জাতীয় বাক্য উচ্চারণকারী কতক লোক আবার নিজেদের মুসলিম দাবি করে, যেহেতু তারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে বিশ্বাস করে। হয়তো কতক মুসল্লি থেকেও এরূপ কথা প্রকাশ পায়, কারণ শয়তান তাদের মুখের উপর এসব চালু করেছে, এবং সে তাদেরকে প্ররোচনা দেয় যে, এ কথার প্রকৃত অর্থ ও সৃষ্টিকর্তাকে হেয় করা উদ্দেশ্য নয়। তাদেরকে সে বুঝায় এ জাতীয় কথা অর্থহীন, এ জন্য জবাবদিহি করা হয় না! তাই তারা অবহেলায় বলে।

অতএব সবার সামনে প্রকাশ করা জরুরি যে, সুস্থ বিবেক ও সকল আসমানি ধর্ম মতে এসব কথা ভ্রান্ত ও জঘন্য। এভাবে শয়তানের প্রবঞ্চনা বন্ধ হবে, মানুষ আল্লাহকে যথাযথ মর্যাদা দিবে ও সকল অশোভন বাক্য থেকে তার পবিত্রতা ঘোষণা করবে, যে নিয়তে হোক ও যেভাবে হোক এসব কথা উচ্চারণ থেকে বিরত থাকবে।

সারসংক্ষেপ:

যেসব কথা বা কর্ম দ্বারা আল্লাহকে খাটো ও হেয় করা হয় তাই গালমন্দ, তাই কুফরি। এতে কোনো মুসলিমের দ্বিমত নেই, ইচ্ছায় হোক, অথবা খেল-তামাশায় হোক, উপহাস করে হোক, অথবা অবহেলা ও মূর্খতায় হোক। বাহ্যিক দেখে ফয়সালা করা হবে, নিয়তে কোনো তফাৎ নেই।

গালমন্দ ও গালমন্দের অর্থ:

মানুষ তাদের পরিভাষায় যেসব শব্দকে গালি বলে, অথবা উপহাস বলে, অথবা তাচ্ছিল্য বলে, শরীয়তের দৃষ্টিতেও তাই গালি, উপহাস ও তাচ্ছিল্য বলা হয়। এ ক্ষেত্রে মানুষের পরিভাষা বিচারক, যেমন লানত, অপমান, অশ্লীল বাক্য এবং হাত দ্বারা খারাপ ও অশালীন ইঙ্গিত। নির্দিষ্ট কোনো দেশে যা গালি ও উপহাস হিসেবে পরিচিত, শরীয়তের দৃষ্টিতে সেখানে তাই গালি ও উপহাস হিসেবে গণ্য, যদিও অন্য দেশে তা গালি নয়।

আল্লাহকে গালমন্দ করার বিধান:

আল্লাহকে গালি দেওয়া কুফরি, গালিদাতাকে হত্যা করা ওয়াজিব। এতে কোনো মুসলিমের দ্বিমত নেই। দ্বিমত শুধু তার তওবার ক্ষেত্রে, তওবা তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি দিবে কি দিবে না, যদি সে তওবা করে? এ সম্পর্কে দু’টি মত প্রসিদ্ধ।

আল্লাহকে গালি দেওয়া ও তার সাথে উপহাস করা মূলত তাকে কষ্ট দেওয়া। কষ্ট দেওয়ার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يُؤۡذُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمۡ عَذَابٗا مُّهِينٗا ٥٧ وَٱلَّذِينَ يُؤۡذُونَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِ بِغَيۡرِ مَا ٱكۡتَسَبُواْ فَقَدِ ٱحۡتَمَلُواْ بُهۡتَٰنٗا وَإِثۡمٗا مُّبِينٗا ٥٨ ﴾ [الاحزاب : ٥٧،  ٥٨]

“নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে লানত করেন, এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন অপমানজনক আযাব। আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে তাদের কৃত কোনো অন্যায় ছাড়াই কষ্ট দেয়, নিশ্চয় তারা বহন করবে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপ”।[10]

আল্লাহকে কষ্ট দেয়ার অর্থ তার ক্ষতি করা নয়, কারণ কষ্ট দু’প্রকার: এক প্রকার ক্ষতি করে, অপর প্রকার ক্ষতি করে না। আল্লাহ তা‘আলাকে কোনো বস্তু ক্ষতি করতে পারে না। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

«يَا عِبَادِي: إِنَّكُمْ لَنْ تَبْلُغُوا ضَرِّي، فَتَضُرُّونِي»

“হে আমার বান্দাগণ, তোমরা নিশ্চয় আমার ক্ষতি পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না যে, আমাকে ক্ষতি করবে”।[11]

*             যে আল্লাহকে কষ্ট দেয় আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে লানত করেছেন। লানত অর্থ বান্দাকে রহমত থেকে বিতাড়িত করা। এ আয়াত প্রমাণ করে কষ্টদাতা দু’টি রহমত থেকে বঞ্চিত: ইহকালীন রহমত ও পরকালীন রহমত। কাফির ব্যতীত কাউকে এ দু’টি রহমত থেকে বঞ্চিত করা হয় না। এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় যে, তারপরে আল্লাহ মুমিন নারী ও পুরুষদের কষ্ট দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের কষ্টদাতাকে তিনি উভয় জগতে লানত করেননি, কারণ গালমন্দ, লানত ও অপবাদ দ্বারা কেউ কাউকে কষ্ট দিলে কাফির বলা হয় না, তবে এসব বাক্য বলা স্পষ্ট পাপ ও অপবাদ, যেহেতু তার পক্ষে কোনো দলিল নেই।

দ্বিতীয়ত তাকে কষ্টদাতার জন্য তিনি ‘আযাবে মুহিন’ তথা মর্মন্তুদ শাস্তির কথা উল্লেখ বলেছেন, কুরআনুল কারীমে তিনি কাফেরদের ব্যতীত কারো জন্য এ শাস্তি উল্লেখ করেছেন।

*             আল্লাহ তা‘আলাকে গালমন্দ করা সকল কুফরি অপেক্ষা বড় কুফরি, মূর্তিপূজকদের কুফরি অপেক্ষাও বড়, কারণ তারা আল্লাহর প্রতি তাদের সম্মান থেকে পাথরকে সম্মান করে। তারা আল্লাহর মর্তবা হ্রাস করে পাথরের সমকক্ষ আল্লাহকে করেনি, বরং পাথরের সম্মান বৃদ্ধি করে তারা পাথরকে আল্লাহর সমকক্ষ করেছে। তাই মুশরিকরা জাহান্নামে প্রবেশ করে বলবে:

﴿تَٱللَّهِ إِن كُنَّا لَفِي ضَلَٰلٖ مُّبِينٍ ٩٧ إِذۡ نُسَوِّيكُم بِرَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٩٨﴾ [الشعراء : ٩٧،  ٩٨]

“আল্লাহর কসম! আমরা তো সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিলাম। যখন আমরা তোমাদেরকে সকল সৃষ্টির রবের সমকক্ষ বানাতাম”।[12]

মুশরিকরা পাথরকে আল্লাহর সমকক্ষ করার জন্য উচ্চে তুলেছে, কিন্তু আল্লাহকে পাথরের সমকক্ষ করার জন্য নিচে নামায়নি। তারা তাদের ধারণা মতে আল্লাহর সম্মানের অংশ হিসেবে পাথরকে সম্মান করে, পক্ষান্তরে আল্লাহকে গালমন্দকারী তাকে নিচে নামায়, যেন তিনি তার গালির কারণে পাথরের চেয়ে মূল্যহীন হন। মুশরিকরা তাদের প্রভুকে খেলার ছলেও গালি দেয় না, কারণ তারা প্রভুকে সম্মান করে। তাই যারা তাদের প্রভুকে গালি দেয়, তাদেরকে তারা গালি দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَلَا تَسُبُّواْ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ مِن دُونِ ٱللَّهِ فَيَسُبُّواْ ٱللَّهَ عَدۡوَۢا بِغَيۡرِ عِلۡمٖۗ ١٠٨ ﴾ [الانعام: ١٠٨]

“আর তোমরা তাদেরকে গালমন্দ করো না, আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তারা ডাকে, ফলে তারা গালমন্দ করবে আল্লাহকে, শত্রুতা পোষণ করে অজ্ঞতাবশত”।[13]

মুশরিকরা যদিও কাফির, তবু আল্লাহ তার নবীকে তাদের মূর্তিদের গালমন্দ করতে নিষেধ করেছেন, যেন তারা এরচেয়ে বড় কুফরিতে লিপ্ত না হয়, অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাবুদকে গালি দেওয়া।

*             আল্লাহকে গালমন্দ করার কতক শব্দ নাস্তিকতার চেয়েও বড় কুফরি, কারণ নাস্তিক তো সৃষ্টিকর্তা ও রবের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, অর্থাৎ তার অবস্থা বলে: ‘আমি যদি আল্লাহকে মানতাম, তাহলে অবশ্যই তাকে সম্মান করতাম’।

আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমানের দাবী করে আল্লাহকে গালমন্দ করে, সে তার রবকে স্বীকার করেও তাকে গালি দেয়। এটা প্রকাশ্য অবাধ্যতা ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া।

কোনো শহরের অলিতে-গলিতে, রাস্তায়, বাজারে ও মজলিসে আল্লাহর গালমন্দ প্রচার করা অপেক্ষা তাতে মূর্তি স্থাপন করা, তার চারপাশে তওয়াফ করা, তাকে সেজদা দেওয়া ও তার থেকে বরকত হাসিল করা আল্লাহর নিকট অতি সহজ, কারণ আল্লাহকে গালমন্দ করার স্পর্ধা শিরকের চেয়েও মারাত্মক, যদিও উভয় কাজ কুফরি, তবে মুশরিক আল্লাহকে সম্মান করে, গালমন্দকারী আল্লাহকে অসম্মান করে। আল্লাহ তাদের অসম্মান থেকে পবিত্র।

*             অনুরূপ কোনো শহরে জিনার বৈধতা দেওয়া ও তার প্রসার করা অপেক্ষা অধিক জঘন্য তাতে আল্লাহকে গালমন্দ করা ও তার প্রচার করা, বরং কওমে লুতের অশ্লীলতা ও তার অনুমোদন থেকেও জঘন্য। অশ্লীলতাকে হালাল মনে করা কুফরি, কারণ তাতে আল্লাহর শরীয়তকে অস্বীকার ও তার বিধানকে হেয় করা হয়। আবার গালমন্দও কুফরি, তবে গালমন্দের লক্ষ্য খোদ আল্লাহ তা‘আলা, যিনি শরীয়ত প্রদান করেন, তাই গালমন্দ করে শরীয়তদাতাকে হেয় করা হয়। শরীয়তদাতার সাথে কুফরি, মূলত তার সকল দীন ও বিধানের সাথে কুফরি ও তার প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা। এটা সবচেয়ে বড় পাপ, যদিও উভয় কর্ম কুফরি, কুফরির অনেক স্তর আছে, যেমন ঈমানের অনেক স্তর আছে।

*             আল্লাহ তা‘আলা নাসারাদের কুফরি ও আল্লাহর সন্তান সাব্যস্ত করে তাদের গালমন্দ করা উল্লেখ শেষে, তাদের অপরাধ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, মূর্তি ও নক্ষত্র পূজকদের শিরকের চেয়েও সন্তান সাব্যস্ত করে তাকে গালমন্দ করার পাপ অনেক বড়। তিনি বলেন:

﴿وَقَالُواْ ٱتَّخَذَ ٱلرَّحۡمَٰنُ وَلَدٗا ٨٨ لَّقَدۡ جِئۡتُمۡ شَيۡ‍ًٔا إِدّٗا ٨٩ تَكَادُ ٱلسَّمَٰوَٰتُ يَتَفَطَّرۡنَ مِنۡهُ وَتَنشَقُّ ٱلۡأَرۡضُ وَتَخِرُّ ٱلۡجِبَالُ هَدًّا ٩٠ أَن دَعَوۡاْ لِلرَّحۡمَٰنِ وَلَدٗا ٩١ وَمَا يَنۢبَغِي لِلرَّحۡمَٰنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا ٩٢ إِن كُلُّ مَن فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ إِلَّآ ءَاتِي ٱلرَّحۡمَٰنِ عَبۡدٗا ٩٣ لَّقَدۡ أَحۡصَىٰهُمۡ وَعَدَّهُمۡ عَدّٗا ٩٤ وَكُلُّهُمۡ ءَاتِيهِ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ فَرۡدًا ٩٥ ﴾ [مريم: ٨٨،  ٩٥]

“আর তারা বলে, ‘পরম করুণাময় সন্তান গ্রহণ করেছেন’। অবশ্যই তোমরা এক জঘন্য বিষয়ের অবতারণা করেছ। এতে আসমানসমূহ ফেটে পড়ার, জমিন বিদীর্ণ হওয়ার এবং পাহাড়সমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। কারণ তারা পরম করুণাময়ের সন্তান আছে বলে দাবী করে। অথচ সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময়ের জন্য শোভনীয় নয়। আসমান ও জমিনে এমন কেউ নেই, যে বান্দা হিসেবে পরম করুণাময়ের কাছে হাযির হবে না। তিনি তাদের সংখ্যা জানেন এবং তাদেরকে যথাযথভাবে গণনা করে রেখেছেন। আর কিয়ামতের দিন তাদের সকলেই তার কাছে আসবে একাকী।[14]

কারণ আল্লাহর সন্তান দাবি করে তাকে হেয় ও গালমন্দ করা হয়। আল্লাহকে গালমন্দ করা অপেক্ষা তার সাথে শিরক করা গৌণ অপরাধ। মুশরিকরা মখলুককে উপরে তুলে আল্লাহর পর্যায়ে নিয়ে যায়, খৃস্টানরা সন্তান সাব্যস্ত করে আল্লাহকে মখলুকের স্থানে  নিয়ে আসে, যেন সেও মখলুক। মূর্তিপূজায় মখলুককে উপরে তুলে সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ করা হয়, তাই মখলুকের মর্যাদা বৃদ্ধি করা অপেক্ষা আল্লাহর সম্মান হ্রাস করা বড় কুফরি।

আল্লাহকে গালমন্দ করা বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ঈমান পরিপন্থী এবং অন্তরের স্বীকৃতিরও বিপরীত, অর্থাৎ আল্লাহকে বিশ্বাস করা, তার অস্তিত্বের উপর ঈমান আনা ও একমাত্র তিনি ইবাদতের হকদার আকিদা পরিপন্থী। অনুরূপ গালমন্দ করা আভ্যন্তরীণ কর্মেরও বিপরীত, অর্থাৎ আল্লাহকে মহব্বত করা, তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর বিপরীত। আপনি যাকে গালমন্দ করেন, তার প্রতি আপনার সম্মানের ধারণা কখনো ঠিক নয়। উদাহরণত আল্লাহ ও পিতা-মাতার সম্মান, যে পিতা-মাতার মহব্বতের দাবি করে তাদের গালমন্দ ও উপহাস করে, সে কপট ও মিথ্যাবাদী। অনুরূপ আল্লাহকে গালমন্দ করা বাহ্যিক ঈমান, তথা কালিমার সাক্ষী ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল পরিপন্থী।

আল্লাহকে গালমন্দকারীর কুফরি প্রসঙ্গে সবাই একমত:

প্রত্যেক মাজহাবের আলেম, যারা বলেন কালিমার সাক্ষী ও আমল উভয় মিলে ঈমান, তাদের নিকট আল্লাহকে গালি দেওয়া কুফরি। গালিদাতার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।

ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: “যে আল্লাহকে কিংবা কোনো নবীকে গালমন্দ করল, তাকে হত্যা কর”।[15]

ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মুজাহিদ রহ. বর্ণনা করেন: “যে কোনো মুসলিম আল্লাহকে কিংবা কোনো নবীকে গালমন্দ করল, সে আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যারোপ করল, এটা তার ধর্ম ত্যাগ। তার নিকট তওবা তলব করা হবে, যদি সে ফিরে আসে ভাল, অন্যথায় তাকে হত্যা করা হবে। আর যে চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তি[16] অবাধ্য হল ও আল্লাহকে গালমন্দ করল, কিংবা কোনো নবীকে গালমন্দ করল, অথবা গালমন্দ প্রকাশ করল, সে চুক্তি ভঙ্গ করল, অতএব তাকে হত্যা কর”।[17]

আল্লাহকে গালমন্দকারী সম্পর্কে ইমাম আহমদকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন: “আল্লাহকে গালমন্দকারী মুরতাদ, তাকে হত্যা করা হবে”।[18] তার ছেলে আব্দুল্লাহ এরূপই বর্ণনা করেছেন।

একাধিক আলেম গালমন্দকারীর কুফরি ও  তাকে হত্যা প্রসঙ্গে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন:

ইব্‌ন রাহাওয়ায়হে রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “সকল মুসলিম একমত যে, আল্লাহকে যে গালি দিল, অথবা তার রাসূলকে গালি দিল, অথবা আল্লাহর নাযিলকৃত কোন বস্তু প্রত্যাখ্যান করল, অথবা তার কোনো নবীকে হত্যা করল, সে কাফের; যদিও সে আল্লাহর নাযিলকৃত অহি বিশ্বাস করে”।[19]

কাদি ইয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “এ প্রসঙ্গে কোনো দ্বিমত নেই যে, কোনো মুসলিম আল্লাহকে গালমন্দ করলে কাফির পরিণত হবে, তার রক্ত হালাল”।[20]

আরো অনেক আলেম আল্লাহকে গালমন্দকারীর কুফরির উপর ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন, যেমন ইব্‌ন হাযম প্রমুখ। অনেক ইমাম গালমন্দকারীকে কাফির বলেছেন, যেমন ইব্‌ন আবি জায়েদাহ ও ইব্‌ন কুদামাহ প্রমুখ।[21]

সকল আলেম আল্লাহকে গালমন্দকারীর কুফরির উপর একমত। তারা গালমন্দকারীর কোনো অজুহাত গ্রহণ করেননি, কারণ সামান্য জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিও কোন্‌টি গালি ও কোন্‌টি গালি নয় পার্থক্য করতে সক্ষম, কোন্‌টি প্রশংসা ও কোন্‌টি কুৎসা ভালো করে জানে, তবু ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে গালমন্দ করে।

ইব্‌ন আবি জায়েদ মালিকিকে জনৈক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যে কোনো ব্যক্তিকে লানত করার সাথে আল্লাহকেও লানত করে অজুহাত পেশ করেছে যে, আমার ইচ্ছা ছিল শয়তানকে লানত করা, কিন্তু আমার মুখ ফসকে গেছে।

ইব্‌ন আবি জায়েদ উত্তর দিলেন: “স্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হবে, তার কোনো অজুহাত গ্রহণ করা যাবে না, মশকরা করে বলুক, অথবা ইচ্ছা করে বলুক”।[22]

অনুরূপ জাহিরিয়াহ ও চার মাজহাবের আলেম ও বিচারকগণ তাদের মাজহাব মোতাবেক বাহ্যিক দেখে ফতোয়া দেন ও ফয়সালা করেন, তারা আভ্যন্তরীণ অবস্থা আমলে নেন না, যদিও গালমন্দকারী বলে তার গালমন্দ করার ইচ্ছা ছিল না।

আলেমগণ যদি বাহ্যিক বিষয়গুলো অন্তরের দাবির কারণে ত্যাগ করেন, যা বাহ্যিকের বিপরীত, তাহলে শরয়ী আহকামের নাম, বিধান, শাস্তি ও হদগুলো বাতিল পরিণত হবে, মানুষের কোনো সম্মান ও অধিকার থাকবে না। কোনো মুসলিমকে কাফের থেকে, কোনো মুনাফিককে মুমিন থেকে পৃথক করা যাবে না। কপট ও অন্তরের ব্যাধিতে আক্রান্ত লোকের মুখে দীন ও দুনিয়া খেলনায় পরিণত হবে।

গালমন্দ অনিচ্ছায়ও কুফরি:

আল্লাহকে গালমন্দ করা কুফরি, এতে কোনো দ্বিমত নেই। অনিচ্ছা অবহেলায় প্রকাশ পেয়েছে, আল্লাহর সম্মানে খারাপ ইচ্ছা ছিল না, সাধারণ লোকের এরূপ অজুহাতের কোনো মূল্য নেই।

এরূপ অজুহাত মূর্খতার প্রমাণ, জাহাম ইব্‌ন সাফওয়ান ও কট্টর মুরজিয়া ব্যতীত কেউ তা গ্রহণ করার পক্ষে নয়, যারা বলে: বিশ্বাস ও অন্তরের জ্ঞানই ঈমান। এটাও ঈমান সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতার প্রমাণ, তারা জানে না: ‘কথা ও কর্মের সমন্বয়ে ঈমান’, অর্থাৎ মুখ ও অন্তর দ্বারা কালিমা শাহাদাতের স্বীকৃতি এবং অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা আমল করাকে ঈমান বলা হয়।

কট্টর মুরজিয়াদের দৃষ্টিতে বাহ্যিক আমল ঈমানের দলিল নয়, তাই তারা অন্তর না দেখে ঈমান অস্বীকার করে না, বাহ্যিক কথার বিপরীত হলেও তারা অন্তরের দাবি বিশ্বাস করে।

বস্তুত ঈমানের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দু’টি অংশ। উভয়ের নাম ঈমান। একটির অনুপস্থিতিতে অপরটিকে ঈমান বলা হয় না।

কাফের যেরূপ কুফরির ইচ্ছা ও নিয়তের কারণে কাফির হয়, যদিও সে মুখে উচ্চারণ না করে, কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কাজে পরিণত না করে; সেরূপ কথার কারণে ব্যক্তি কাফির হবে, যদিও সে কুফরির নিয়ত না করে, কিংবা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কাজে পরিণত না করে। তাই যে কুফরি কাজ করে, সেও কাফির, যদিও সে কুফরির ইচ্ছা না করে, কিংবা মুখে না বলে।

শরীরের কোনো অঙ্গ হারাম কাজে লিপ্ত হলে তার বিচার হবে, তবে অন্তরের বিষয়টি আল্লাহর উপর সোপর্দ। কুফরি প্রকাশ পাওয়ার কারণে যাকে কাফির ফতোয়া দেওয়া হয়, সে আল্লাহর নিকটও কাফের হবে এরূপ জরুরি নয়, আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো আল্লাহর উপর সোপর্দ, তবে দুনিয়ায় বাহ্যিক দেখে বান্দার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

যে আল্লাহর সাথে, তার কিতাবের সাথে ও তার রাসূলের সাথে উপহাস করে, আল্লাহ তাকে কাফির বলেছেন, অনিচ্ছার অজুহাত তিনি গ্রহণ করেননি, তিনি ইরশাদ করেন:

﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُمۡ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلۡعَبُۚ قُلۡ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُونَ ٦٥ لَا تَعۡتَذِرُواْ قَدۡ كَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡۚ إِن نَّعۡفُ عَن طَآئِفَةٖ مِّنكُمۡ نُعَذِّبۡ طَآئِفَةَۢ بِأَنَّهُمۡ كَانُواْ مُجۡرِمِينَ ٦٦﴾ [التوبة: 65،  95]

“আর যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর, অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা আলাপচারিতা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বল, ‘আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসূলের সাথে তোমরা বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওযর পেশ করো না। তোমরা তোমাদের ঈমানের পর অবশ্যই কুফরি করেছ। যদি আমি তোমাদের থেকে একটি দলকে ক্ষমা করে দেই, তবে অপর দলকে আযাব দেব। কারণ, তারা হচ্ছে অপরাধী”।[23]

বিবেকও বলে মানুষকে তার কথার কারণে পাকড়াও করা হোক। আল্লাহ তা‘আলা বিনা দলিলে জিনার অপবাদদাতাকে আশি বেত্রাঘাত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও সে বলে অপবাদ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না, অনুরূপ তার ঠাট্টা ও মশকরার নিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়।

কোনো শাসক যদি তার ইজ্জত নিয়ে উপহাস ও ঠাট্টাকারীকে বিনা শাস্তিতে ছেড়ে দেয়, তাহলে তার ভয় মানুষের অন্তর থেকে বিদায় নিবে। তাই আপনি দেখবেন এ জাতীয় অপরাধের কারণে তিনি মানুষকে শাস্তি দিচ্ছেন: তারা ইচ্ছায় বলুক বা অনিচ্ছায় বলুক।

মানুষকে তার অপরাধ ও জুলমের কারণে পাকড়াও করার বিষয়টি কুরআন ও সুন্নার একাধিক জায়গায় এসেছে। বিবেক এবং কুরআন ও সুন্নায় স্বীকৃত যে, আল্লাহর মর্যাদা ও সম্মানের ক্ষেত্রে অবহেলা কারীর কোনো অজুহাত গ্রহণ করা হবে না। সহি গ্রন্থে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا، يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ»

“নিশ্চয় বান্দা আল্লাহর অপছন্দনীয় এমন বাক্য উচ্চারণ করে, যার পরোয়া সে করে না, তার কারণে সে জাহান্নামের নিক্ষিপ্ত হয়”।[24]

এখানে দেখছি, বান্দা তার কথার কোনো পরোয়া করেনি, এ জন্য আল্লাহ তাকে ছাড় দেননি, বরং তার জন্য তিনি শাস্তি অবধারিত করেছেন। বান্দা তার কথার মূল্য ও তিক্ততা চিন্তা করেনি, অর্থ বুঝতে অবহেলা করেছে। সে যদি তার কথা চিন্তা করত ও সামান্য ভেবে দেখত, তাহলে তার কথার খারাপি সে বুঝত।

বেলাল ইব্‌ন হারেস নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:

«وَإِنَّ أَحَدَكُمْ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سُخْطِ اللَّهِ، مَا يَظُنُّ أَنْ تَبْلُغَ مَا بَلَغَتْ، فَيَكْتُبُ اللَّهُ تعالى عَلَيْهِ بِهَا سُخْطَهُ إِلَى يَوْمِ يَلْقَاهُ»

“নিশ্চয় তোমাদের কেউ আল্লাহর গোস্বার এমন বাক্য উচ্চারণ করে, সে চিন্তাও করে না বাক্যটি যেখানে পৌঁছেছে সেখানে পৌঁছবে, ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তার উপর তার সাক্ষাতের দিন পর্যন্ত স্বীয় গোস্বা অবধারিত করে দেন”।[25]

অতএব মানুষের বলা যে, আল্লাহ তা‘আলাকে গালমন্দ করা, লানত করা, হেয় করা অথবা অপমান করার ইচ্ছা ব্যতীত মুখের উপর চলে এসেছে, এ জাতীয় অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়, এটাও তার এক ধরণের বাহানা, যা ইবলিস তার অন্তরে সৃষ্টি করে। ইবলিস এভাবে তাকে কুফরির উপর অটল রাখে, আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতায় তাকে সান্তনা দেয়। বস্তুত শয়তান মানুষকে যখন কুফরির প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, সে তার সামনে অসার অযৌক্তিক কতক অজুহাত ও শরয়ী অপব্যাখ্যা তৈরি করে দেয়, যা প্রবৃত্তি মুক্ত সুস্থ বিবেকের সামনে টিকে না।

ইবলিসের প্ররোচনা ও সন্দেহ সৃষ্টি:

মানুষ যখন কোনো অপরাধ করে, ইবলিস তার সামনে তার কৃত ইবাদতগুলো পেশ করে, যা তার পাপের আফসোস ও গুনাহের কারণে সৃষ্ট দুঃখ তার অন্তর থেকে দূর করে দেয়। উদাহরণত আল্লাহকে গালমন্দকারীকে সে বলে: ‘তুমি শাহাদাতের কালিমাহ উচ্চারণ কর, পিতা-মাতার আনুগত্য কর ও সালাত আদায় কর, তোমার এতে সমস্যা হবে না’।

শয়তানের এরূপ প্ররোচনার কারণে মক্কার মুশরিকরা গোমরাহ হয়েছে। তারা আল্লাহর সাথে শরীক করেছে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে মূর্তির ইবাদত করেছে, আর শয়তান তাদের সামনে হাজিদের পানি পান করানো, মসজিদে হারাম আবাদ করা ও কাবায় পোশাক পড়ানোর ন্যায় ভালো কাজগুলো পেশ করেছে, অথচ শিরকের মোকাবিলায় এগুলো আল্লাহর নিকট তাদের কোনো উপকারে আসেনি। কারণ আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা তার সম্মান পরিপন্থী, তারা বায়তুল্লাহকে সম্মান করে তার রবের সাথে কুফরি করেছে। অথচ রবের কারণে বায়তুল্লাহ সম্মানিত হয়েছে, বায়তুল্লাহর কারণে রব সম্মানিত হয়নি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿أَجَعَلۡتُمۡ سِقَايَةَ ٱلۡحَآجِّ وَعِمَارَةَ ٱلۡمَسۡجِدِ ٱلۡحَرَامِ كَمَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَجَٰهَدَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِۚ لَا يَسۡتَوُۥنَ عِندَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ لَا يَهۡدِي ٱلۡقَوۡمَ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٩﴾ [التوبة: 19]

“তোমরা কি হাজীদের পানি পান করানো ও মসজিদুল হারাম আবাদ করাকে ঐ ব্যক্তির মত বিবেচনা কর, যে আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তরা আল্লাহর কাছে বরাবর নয়। আর আল্লাহ যালিম কওমকে হিদায়েত দেন না”।[26]

কতক মানুষের ঈমানের দাবী‌ই সর্বস্ব, তাদের মধ্যে ঈমানের কোনো আলামত নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَقُولُ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَبِٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَمَا هُم بِمُؤۡمِنِينَ ٨﴾ [البقرة: ٨]

“আর মানুষের মধ্যে কিছু এমন আছে, যারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিনের প্রতি, অথচ তারা মুমিন নয়”।[27]

অতএব আল্লাহকে গালমন্দ ও উপহাস করে, কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ ও তাকে সম্মান দেখানোর কোনো অর্থ হয় না।

আল্লাহকে গালমন্দকারীর শাস্তি:

সকল আলেম একমত যে, আল্লাহকে যে গালমন্দ করবে, তাকে কুফরির কারণে হত্যা করা হবে, হত্যার পর মুসলিমদের হুকুম তার জন্য প্রযোজ্য হবে না, যেমন তার উপর সালাত পড়া, তাকে গোসল ও কাফন-দাফন দেওয়া, তার জন্য দোয়া করা ইত্যাদি। সে মুসলিম নয়, তাই তার উপর সালাত পড়া হবে না, তাকে গোসল ও মুসলিমদের কবর স্থানে দাফন করা হবে না এবং তার জন্য দোয়া করা বৈধ নয়।

আল্লাহকে গালমন্দকারী যদি জঘন্য কথা ও কর্ম থেকে তওবা করে, তার তওবা কুবল করা হবে কিনা এ ব্যাপারে আলেমগণ দ্বিমত পোষণ করেছেন। মৃত্যুদণ্ডের পূর্বে তার থেকে তওবা তলব করা হবে, না দুনিয়ায় তার তওবার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে, আখিরাতে তার আভ্যন্তরীণ অবস্থা আল্লাহর উপর সোপর্দ করে, তাকে হত্যা করা হবে? এ ব্যাপারে দু’টি মত প্রসিদ্ধ:

প্রথম মত: তার তওবার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হবে না, তওবা তলব করা ব্যতীত তাকে হত্যা করা ওয়াজিব, তার তওবা আখিরাতে আল্লাহর উপর সোপর্দ। ইহা হাম্বলি মাজহাব ও অন্যান্য ফকিহদের প্রসিদ্ধ অভিমত। ওমর, ইব্‌ন আব্বাস ও অন্যান্যদের বাহ্যিক অভিমত তাই, এটা ইমাম আহমদের প্রসিদ্ধ মত।

কারণ: তওবা বাহ্যিক অপরাধ রহিত করে না, মানুষের সামনে আল্লাহকে গালমন্দ ও তাকে উপহাস করার কু-প্রভাব অপনোদন করে না। তওবা কবুল করা হলে এ জাতীয় অপরাধ মানুষ শিথিল মনে করবে। তাদেরকে যখন সরকার ও বিচারের সম্মুখীন করা হবে, তারা তওবা প্রকাশ করবে, অতঃপর তওবা ত্যাগ করবে। তাই এ সুযোগ তাদেরকে কুফরির উপর উদ্বুদ্ধ করে গালমন্দ করার অপরাধবোধ গৌণ করে দেয়। অপরাধীকে আদব শিক্ষা দেওয়া ও অপরাধ থেকে পবিত্র করা এবং যে তার কথার ন্যায় কথা বলে, কিংবা তার কর্মের ন্যায় কর্ম করে, তাকে বিরত রাখা ইত্যাদি উদ্দেশ্যগুল তওবা কবুল করা হলে ব্যাহত হয়।

দ্বিতীয় মত: যদি সে সত্য তওবা করে এবং কখনো তাতে লিপ্ত না হয়, তাহলে গ্রহণ করা হবে, জমহুর ফকিহগণ এ কথা বলেন।

কারণ: গালমন্দ করা কুফরি, কুফরি থেকে প্রত্যেক কাফিরের তওবা গ্রহণযোগ্য, যেমন মুশরিক, মূর্তিপূজক ও নাস্তিকরা তওবা করে ইসলামে দাখিল হয়। তাদের ইসলাম পূর্বেকার সকল কুফরি মিটিয়ে দেয়। আল্লাহ তওবাকারীর তওবা কবুল করেন ও তাকে ক্ষমা করেন। আল্লাহকে গালমন্দকারী তার অধিকারে ত্রুটি করে, আল্লাহ মুশরিক ও তাকে গালমন্দকারীর তওবা কবুল করেন, অতএব তার তওবাও কবুল করবেন স্বাভাবিক।

তবে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালমন্দ করার বিষয় আলাদা, এটা তার অধিকার, তাই এ জন্য তাকে পাকড়াও করা হবে, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করেননি, তার মৃত্যু হয়ে গেছে।

মূলনীতি:

রাসূলকে গালমন্দ করা কুফরি, তার হক উসুল করে গালিদাতাকে হত্যা করা ওয়াজিব। দ্বিতীয়ত নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালমন্দকারী মানুষের অন্তরে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে ও তাকে হেয় করে, পক্ষান্তরে আল্লাহকে গালমন্দকারী নিজের ক্ষতি করে।

মুদ্দাকথা: যে আল্লাহকে গালমন্দ করে তাকে হত্যা করা ওয়াজিব, তার তওবা গ্রহণ করা হবে না, তার তওবা আল্লাহর নিকট সোপর্দ, সে তার নিয়তের সাথে আল্লাহর সাক্ষাত করবে, অতঃপর আল্লাহ তার সাথে ইনসাফ কিংবা ক্ষমার ব্যবহার করবেন।

আল্লাহকে গালমন্দকারী যদি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ও পাকড়াও করার পূর্বে তওবা করে প্রকাশ করে দেয়, তাহলে গ্রহণযোগ্য, কারণ তার তওবার সত্যতা প্রকাশ পেয়েছে। তার হুকুম স্বেচ্ছায় ইসলামে প্রবেশকারী কাফিরদের ন্যায়, তারা মুসলিম হয়ে ইসলাম-পূর্বে গালমন্দ করার কথা স্বীকার করত।

গালমন্দ দু’প্রকার:

১. প্রত্যক্ষ গালমন্দ: যেমন তাকে লানত করা, তার কুৎসা রটনা করা, তার সাথে উপহাস করা ও তাকে হেয় করা। এর হুকুম পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহকে গালমন্দ করা দ্বারা এ প্রকার উদ্দেশ্য।

২. পরোক্ষ গালমন্দ: যেমন আল্লাহ সরাসরি যেসব নিদর্শন ও মখলুক পরিচালনা করেন, মানুষের ইচ্ছা ও অর্জনের ন্যায় যাদের কোন ইচ্ছা ও অর্জন নেই, যেমন যুগ, দিন, সময়, মুহূর্ত, মাস, বছর এবং তারকা ও তাদের সন্তরণকে গালমন্দ করা। এ প্রকার গালমন্দের হুকুম পূর্বের ন্যায় নয়, যেমন গালমন্দকারীর কুফরি ও তাকে হত্যা করা ওয়াজিব নয়, তবে যদি এসবের পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী, তথা আল্লাহকে স্পষ্ট বলে, তাহলে ভিন্ন কথা।

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«قَالَ اللَّهُ تعالى: يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ، وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِي الْأَمْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ»

 “আল্লাহ বলেন: ইব্‌ন আদম আমাকে কষ্ট দেয়, সে যুগকে গালি দেয়, অথচ আমিই যুগ, আমার হাতে কর্তৃত্ব, আমি রাত-দিনকে পরিবর্তন করি”।[28]

অপর বর্ণনা আছে:

«يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ، يَقُولُ: يَا خَيْبَةَ الدَّهْرِ، فَلَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ: يَا خَيْبَةَ الدَّهْرِ، فَإِنِّي أَنَا الدَّهْرُ، أُقَلِّبُ لَيْلَهُ وَنَهَارَهُ، فَإِذَا شِئْتُ قَبَضْتُهُمَا»

“ইব্‌ন আদম আমাকে কষ্ট দেয়, সে বলে: হে যুগের অনিষ্ট। অতএব তোমাদের কেউ যেন না বলে: হে যুগের অনিষ্ট, কারণ আমিই যুগ, আমি তার রাত ও দিন পরিবর্তন করি। আমি যখন ইচ্ছা করব ঘুটিয়ে নিব”।[29]

নক্ষন্ত্রসমূহ যেমন চাঁদ-সূর্য এবং তাদের নিদর্শনসমূহ যেমন রাত-দিন ও যুগসমূহ স্বাধীন নয়, এগুলো আল্লাহর ইচ্ছাধীন, তাদের কোনো ইচ্ছা ও উপার্জন নেই। তাদেরকে পার্থিব বিষয় ব্যতীত কোনো নির্দেশ দেওয়া হয় না, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বের হওয়ার সুযোগ তাদের নেই।

অতএব এগুলোকে গালমন্দ করা মূলত তাদের পরিচালক ও নির্দেশদাতাকে গালমন্দ করা এবং আল্লাহর হিকমত ও তার ইচ্ছায় আপত্তি করা। এ জন্য যুগকে গালমন্দ করা আল্লাহ নিজেকে গালমন্দ করা গণ্য করেন।

মানুষকে গালমন্দ করা আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে গালমন্দ করা গণ্য করেন না, কারণ মানুষের ইচ্ছা ও স্বাধীনতা রয়েছে, যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

 ﴿ وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٩ ﴾ [التكوير: ٢٩]

“আর তোমরা ইচ্ছা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা করেন”।[30]

পক্ষান্তরে নক্ষত্রসমূহ যেমন চাঁদ ও সূর্য, আল্লাহ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে বলেছেন:

﴿لَا ٱلشَّمۡسُ يَنۢبَغِي لَهَآ أَن تُدۡرِكَ ٱلۡقَمَرَ وَلَا ٱلَّيۡلُ سَابِقُ ٱلنَّهَارِۚ وَكُلّٞ فِي فَلَكٖ يَسۡبَحُونَ ٤٠﴾ [يس: ٤٠]

“সূর্যের জন্য সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া, আর রাতের জন্য সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রম করা, আর প্রত্যেকেই কক্ষপথে ভেসে বেড়ায়”।[31]

আল্লাহ ও তার গুণগানকে সম্মান করা ওয়াজিব:

*     আল্লাহর সম্মান যেমন: তার পরিকল্পনা, আদেশ ও নিষেধকে সম্মান করা ও বাস্তবায়ন করা, তার নির্দেশ অতিক্রম না করা, যার জ্ঞান মানুষের নেই, সে বিষয়ে তাদের ঘাটাঘাটি না করা।

*     আল্লাহর সম্মান যেমন: তাকে স্মরণ করা, তার নিকট প্রার্থনা করা এবং দুনিয়ার যাবতীয় কর্মকাণ্ড তার সাথে সংশ্লিষ্ট করা। তিনি এ জগতের স্রষ্টা ও পরিচালক, তার কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَا قَدَرُواْ ٱللَّهَ حَقَّ قَدۡرِهِۦ وَٱلۡأَرۡضُ جَمِيعٗا قَبۡضَتُهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَٱلسَّمَٰوَٰتُ مَطۡوِيَّٰتُۢ بِيَمِينِهِۦۚ سُبۡحَٰنَهُۥ وَتَعَٰلَىٰ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٦٧﴾ [الزمر: ٦٦]

“আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তার মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তার ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে।[32]

এখানেই আমরা সংক্ষিপ্ত এ পুস্তিকার সমাপ্তি করছি। একমাত্র তিনিই সাহায্যকারী ও সঠিক পথে পরিচালনাকারী, তার কোন শরীক নেই, তার নিকট ইখলাস ও ব্যাপক প্রসারতা আশা করছি।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করুন, তার পরিবার ও তার সাথীদের উপর এবং যারা ইহসানের সাথে কিয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসরণ করবে, সবার উপর।

সমাপ্ত


[1] সূরা যারিয়াত: (২১)

[2] সূরা নূহ: (১৪-১৫)

[3] আদ-দুররুল মানসুর: (৮/২৯০-২৯১)

[4] জামেউল বায়ান’ লিত তাবারি: (২৩/২৯৬), মা‘আলিমুত তানযিল লিল বগভি: (৫/১৫৬)

[5] সূরা ইউসুফ: (১০৪)

[6] সূরা হজ: (৭৩-৭৪)

[7]  হজকারীর কুরবানির পশুকে আরবিতে হাদি বলা হয়।

[8] সূরা হজ: (৩২)

[9] বর্তমান নাম সিরিয়া, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন ও লেবাননকে শাম বলা হত।

[10] সূরা আহযাব: (৫৭-৫৮)

[11] মুসলিম: (২৫৭৭)

[12] সূরা আশ-শু‘আরা: (৯৭-৯৮)

[13] সূরা আন‘আম: (১০৮)

[14] সূরা মারইয়াম: (৮৮-৯৫)

[15] আস-সারেমুল মাসলুল: (পৃ.১০২)

[16] মুসলিম দেশে জিযইয়াহ প্রদানের শর্তে বসবাসকারী অমুসলিম ব্যক্তি মু‘আহিদ, তাকে জিম্মিও বলা হয়।

[17]  আস-সারেমুল মাসলুল: (পৃ.১০২)

[18]  আস-সারেমুল মাসলুল: (পৃ.৪৩১)

[19] আত-তামহিদ লি-ইব্‌ন আব্দুল বারর: (৪/২২৬), আল-ইসতেজকার লি-ইব্‌ন আব্দুল বারর: (২/১৫০)

[20] আশ-শিফা: (২/২৭০)

[21] আল-মুহাল্লা লি-ইব্‌ন হাযম: (১১/৪১১), আল-মুগনি লি-ইব্‌ন কুদামাহ: (৯/৩৩), আস-সারেমুল মাসলুল লি ইব্‌ন তাইমিয়াহ: (পৃ.৫১২), আল-ফুরু লি-ইব্‌ন মুফলিহ: (৬/১৬২), আল-ইনসাফ লিল-মুরাদাওয়ি: (১০/৩২৬), আত-তাজ ওয়াল ইকলিল লিল-মাওওয়াক: (৬/২৮৮)

[22] আশ-শিফা লি-ইয়াদ: (২/২৭১)

[23] সূরা তওবা: (৬৫-৬৬)

[24] সহি বুখারি: (৬৪৭৮), সহি মুসলিম: (২৯৮৮), সংক্ষিপ্ত।

[25] মুসনাদে আহমদ: (৩/৪৬৯), হাদিস নং: (১৫৮৫২), সহি ইব্‌ন হিব্বান: (২৮০)

[26] সূরা তওবা: (১৯)

[27] সূরা বাকারা: (৮)

[28] বুখারি: (৪৮২৬), (৭৪৯১), মুসলিম: (২২৪৬)

[29] সহি মুসলিম: (২২৪৬)

[30] সূরা তাকবীর: (২৯)

[31] সূরা ইয়াসীন: (৪০)

[32] সূরা যুমার: (৬৭)

]]>
http://www.quraneralo.com/rulings-on-praising-and-insulting-allah/feed/ 2
সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী আল্লাহ্‌ http://www.quraneralo.com/best-of-planner-is-allah/ http://www.quraneralo.com/best-of-planner-is-allah/#comments Sat, 06 Apr 2013 09:56:09 +0000 Mohammad Gaffer http://www.quraneralo.com/?p=3911 ভাষান্তর : মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
সম্পাদনা : আব্‌দ আল-আহাদ
ওয়েব সম্পাদনা : মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার

Pics 2

কোরআন আল-কারীমে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন :

“বস্তুত তোমরা এমন বিষয়কে অপছন্দ করছো যা তোমাদের পক্ষে বাস্তবিকই মঙ্গলজনক। পক্ষান্তরে, তোমরা এমন বিষয়কে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য বাস্তবিকই অনিষ্টকর এবং আল্লাহ্‌ই অবগত আছেন আর তোমরা অবগত নও।” [সূরা বাকারাহ্‌; ২ : ২১৬]

 

আমরা উল্লিখিত আয়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করব যা আমাদের সকলেরই উপকারে আসবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

 

আপনি আল্লাহ্‌র পরিকল্পনার বাইরে নন :

“অবস্থা দৃষ্টে ঘটনা একরকম মনে হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটে তার উল্টোটা। মুসাকে (আ) নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্যে তাঁর মাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল; ইউসুফকে (আ) মেরে ফেলার জন্যে কূপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল; ঈসার (আ) মা মারইয়াম কোন পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই অলৌকিকভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন; আয়েশাকে (রা) মিথ্যা কলঙ্কে অভিযুক্ত করা হয়েছিল; ইউনুসকে (আ) তিমি মাছ গিলে ফেলেছিল; ইব্রাহীমকে (আ) আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল; মুহাম্মাদ (সা) এর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজার (রা)মৃত্যু বরণ করা; সালামাহ্‌ (রা) ভেবেছিলেন যে, আবু সালামাহ্‌ (রা) থেকে উত্তম আর কেউ হতে পারবে না; একবার ভেবে দেখুন তো, এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় লোকেরা কী ভেবেছিল আর পরবর্তীতে ঘটনাগুলো কোন দিকে মোড় নিয়েছিল!!

 

অতএব, দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার জন্যও রয়েছে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের পরিকল্পনা। [উৎস : অজ্ঞাত]

 

আমরা তা-ই  চাই, যা আমরা  পছন্দ করি। কিন্তু আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন তা-ই ঘটান যা তিনি ইচ্ছা করেন।

 

অনেকদিন আগের এক ঘটনা। ইসরাইলের এক সাবেক রাজার বেশ কয়েকজন ছেলে ছিল। ছেলেদের কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথেই নিজেকে মোটা কাপড়ের তৈরি পোশাকে জড়িয়ে চলে যেত পাহাড়ের গুহায় ইবাদতে মগ্ন লোকদের দলে যোগ দেয়ার জন্য। যতদিন বেঁচে থাকত এভাবেই ইবাদত বন্দেগী করতে থাকত তারা। রাজা তার ছেলেদেরকে কখনোই এভাবে পাহাড়ে যেতে বাঁধা দেননি। কারন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, আল্লাহ্‌ই তার ছেলেদের সত্যের পথে পরিচালিত করছেন। তাদের হৃদয়কে বদলানোর ক্ষমতা তার নেই।

কিন্তু বৃদ্ধবয়সে উপনীত রাজা তার সর্বশেষ ছেলের পাহাড়ে যাওয়ার ব্যাপারে মত পরিবর্তন করলেন। তিনি সকল মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরী বৈঠক ডাকলেন এবং বললেন, “আমি আমার এই ছেলেকে অন্য ছেলেদের থেকে অনেক বেশী ভালোবাসি। আমার মনে হচ্ছে আমি আর বেশীদিন বাঁচব না। আমার ভয় হচ্ছে, সে যদি তার ভাইদের সাথে গিয়ে যোগ দেয়, তাহলে আমার পরিবারের বাইরের লোকে আমার এই রাজত্ব দখল করার চেষ্টা করবে। কাজেই বয়স অল্প থাকতেই তাকে নিয়ে যাও। তার মনে দুনিয়ার ভালোবাসা, সুখ, আহ্লাদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করো। এতে করে সে হয়তো আমার মৃত্যুর পর তোমাদের রাজা হতে চাইবে।”

রাজার উপদেষ্টামণ্ডলী সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা করলেন কী করা যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বিশাল একটি এলাকা খুঁজে বের করলেন এবং তার পুরোটাই প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেয়া হলো। অতঃপর সেই শিশু রাজকুমারকে তারা প্রাচীর ঘেরা এলাকায় রেখে তার সবরকম বিনোদন আর বিলাসিতার ব্যবস্থা করলেন। রাজকুমার সাবালক না হওয়া পর্যন্ত চার দেয়ালের ভিতরেই জীবন কাটাতে লাগল। একদিন সে চারিদিকে একনজর তাকিয়ে বলল: “আমার ধারণা এই চার দেয়ালের বাইরেও একটি পৃথিবী আছে। আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। আমি জ্ঞান অর্জন  করতে চাই।” 

তত্ত্বাবধায়কেরা বলল, “বাইরের জগতের সাথে এখানকার কোন পার্থক্য নেই।” রাজকুমার তর্ক না করে আরেক বছর পার করলো। এতোদিন সে চার দেয়ালের ভিতরেই ঘোড়ায় চড়ে সময় কাটিয়েছে। একবছর পরে স্বাভাবিকভাবেই সে আবার তার তত্ত্বাবধায়কদের একই অনুরোধ করল। আর তারাও গত বছরের ন্যয় একই উত্তর দিলো।

কিন্তু এবার রাজকুমার জোরালো কণ্ঠে বলল : “আমাকে যেতেই হবে।” তত্ত্বাবধায়কেরা তাকে থামিয়ে রাখতেও পারে না আবার ছেড়ে দিতেও পারে না। ফলে বিষয়টি তাড়াতাড়ি করে রাজাকে জানানো হলো। রাজা ছেলেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে বললেন, “আমরা তা-ই চাই যা আমাদের ভালো লাগে। কিন্তু আল্লাহ্‌ তা-ই ঘটান যা তিনি ইচ্ছা করেন।”

এবার লোকেরা রাজকুমারের নিকট ফিরে আসলো এবং তার জন্য নির্মিত সেই প্রাচীর বেষ্টিত অভয়ারণ্যের দরজা খুলে দিলো। রাজকুমার জীবনে প্রথমবার বাইরের জগতে পা রেখে অবাক বিস্ময়ে চারপাশে তাকাতে থাকলো। তাকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলেও তার দেখাশোনা করার জন্য সাথে ছিল তত্ত্বাবধায়ক বাহিনী। শিশুকাল থেকে চার দেয়ালের ভিতর বিলাসীতায় জীবন কেটেছে তার। এখন বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। কাজেই রাজার উপদেষ্টারা রাজকুমারের সাথে নিরাপত্তা রক্ষীদের থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন। সাথের লোকজনের সকলেই তার নতুন পৃথিবী দেখার প্রতিক্রিয়াকে খেয়াল করতে থাকলো। লোকেরা তখনও আশাবাদী এই রাজকুমারই একদিন তাদের রাজা হবেন।

 

কিছুদূর হাটার পর তারা ভীষণ রোগাক্রান্ত এক ব্যক্তিকে দেখতে পেল। রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে তার?”

উপদেষ্টারা জবাবে বলল : “সে ভীষণ অসুস্থ।”

দুনিয়াদারীর জ্ঞানশুন্য, অনভিজ্ঞ রাজপুত্র জানতে চাইলো, “এই লোকের রোগ কি সব মানুষেরই হয় নাকি হাতে গোনা কিছুলোক রোগাক্রান্ত হয়?”

লোকেরা জবাব দিলো, “আল্লাহ্‌ যার ভাগ্যে লিখে রেখেছেন তারই রোগ হয়।”

রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা! ঐসব লোকেরা তাহলে আগে থেকেই জানতে পারে এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তা-ই না? নাকি এ ব্যাপারে কোনো সতর্কবাণী আসে না। ফলে সবাই রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে?”

তারা বলল, “আসলে সবাই রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে।”

“এতো ক্ষমতাধর রাজকুমার হওয়ার পরও আমিও কি অন্যসব মানুষের মতোই?”

তারা বলল, “জী, তা সত্ত্বেও আপনিও তাদের মতোই।”

রাজপুত্র বলল, “তাহলে তো তোমাদের এই জীবনও নিরাপত্তাহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ!”

 

তারা হাঁটতে থাকলো। কিছুদূর যেতেই এক জরাগ্রস্ত দুর্বল বৃদ্ধের দেখা মিললো। শক্তিহীন সেই বৃদ্ধ বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছে। মুখের লালা ঝরে বুকে গড়িয়ে পড়ছে। এতো বৃদ্ধ মানুষ রাজপুত্র এর আগে আর কখনো দেখেনি। অবাক বিস্ময়ে সে জিজ্ঞেস করল, “তার কেন এই অবস্থা?”

তারা বলল, “বার্ধক্যের কারণে মানুষ এমন হয়ে যায়।”

রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “সব মানুষেরই কি এমন অবস্থা হয় নাকি অল্পকিছু মানুষের এমন হয়ে থাকে?”

তারা বলল, “আসলে সব মানুষই এই পরিণতির ভয়ে আতঙ্কিত থাকে।”

রাজপুত্র বলল, “তাহলে তোমাদের জীবন তো নিরাপত্তাহীন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।”

 

তারা আবার হাটা শুরু করল। কিছু দূর যেতেই দেখল বেশকিছু লোক একটি লাশ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যু সম্পর্কে রাজপুত্রের কোনো জ্ঞান না থাকায় সে অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইলো, “কি হয়েছে তার?”

জবাবে তারা বলল, “লোকটি মারা গেছে।”

রাজপুত্র বলল, “তাকে উঠে বসতে বলো, কথা বলতে বলো।”

তারা বলল, “তার জন্য উঠে বসা বা কথা বলা আর সম্ভব নয়।”

রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল, “সব মানুষই কি মারা যায় নাকি অল্পকিছু লোক এভাবে মারা যায়?”

তারা বলল, “কেউ ভয় করুক আর না করুক, প্রত্যেকেরই শেষ পরিনতি মৃত্যু।”

রাজপুত্র বলল, “তোমরা কি তাহলে এ সবকিছুই এতোদিন যাবৎ আমার কাছে লুকাচ্ছিলে?”

“কেউ যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন, এই শেষ পরিণতি থেকে রক্ষা পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”

 

মর্মাহত রাজপুত্র বলল, “তোমরা এতোদিন আমার সাথে প্রতারণা করেছ। আজ যদি আমি সেই চার দেয়ালের বাইরে না আসতাম তাহলে হঠাৎ কবে মারা যেতাম। অথচ বুঝতেও পারতাম না যে, আমি মারা যাচ্ছি। আজ আমি তোমাদের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত।”

সে তাদের সঙ্গ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হলো। সাথের লোকেরা সংখ্যায় অধিক হওয়ায় সবাই তাকে ঘিরে ধরলো।

তারা বলল, “আপনার পিতার নিকট ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা আপনার সাথেই থাকছি। অবশেষে, সবাই প্রাসাদে ফিরে আসলো এবং লোকেরা রাজার কাছে সবকিছু খুলে বলল।”

নিরাশ হয়ে রাজা বললেন, “আমি কি তোমাদের বলিনি, আমরা তা-ই চাই যা আমরা পছন্দ করি কিন্তু আল্লাহ্‌ তা-ই ঘটান যা তিনি ইচ্ছা করেন। তাকে যেতে দাও। আজ থেকে তার ওপর তোমাদের আর কোন নিয়ন্ত্রন নেই।”

 

_________________

 

 

]]>
http://www.quraneralo.com/best-of-planner-is-allah/feed/ 0
আমরা যেভাবে আল্লাহ্‌র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করব http://www.quraneralo.com/how-we-should-thank-allah/ http://www.quraneralo.com/how-we-should-thank-allah/#comments Sat, 16 Mar 2013 04:00:02 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=4005 লেখক :  শায়েখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ | ভাষান্তর ও সম্পাদনা : ‘আব্‌দ আল-আহাদ

প্রকাশনায় : কুরআনের আলো ওয়েবসাইট

7

প্রশ্ন : আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদেরকে অসংখ্য নেয়ামত দিয়ে ধন্য করেছেন। আমাদের প্রতি তাঁর এই সকল নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের সর্বোত্তম উপায় কী?

 প্রথমত :

ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্য হলো কারও উপকার এবং সদয় আচরণের প্রতিদান স্বরূপ তার প্রশংসা করা এবং তার প্রতিও সদয় আচরণ করা। মানুষের ধন্যবাদ এবং প্রশংসা পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য সত্ত্বা হলেন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয় তা‘আলা। কারণ জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রেই তিনি আমাদেরকে অসংখ্য অনুগ্রহের মাধ্যমে ধন্য করছেন। এইসব নেয়ামতের জন্য তিনি আমাদেরকে তার প্রশংসা করার এবং সেগুলোকে অস্বীকার না করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

অতএব, তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর আমার শোকর আদায় করো, আমার সাথে কুফরী কোরো না।[আল-বাকারা; ২ : ১৫২]

 দ্বিতীয়ত :

যারা আল্লাহ্‌র এই নির্দেশের আনুগত্য করেছেন এবং তাঁর যোগ্য শোকরকারী বান্দা বলে বিবেচিত হওয়া পর্যন্ত তাঁর প্রশংসা করেছেন গেছেন, তারা হলেন নবী এবং রাসূলগণ (‘আলাইহিমুস সালাম)।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

 নিশ্চয়, ইবরাহীম ছিলেন (একাই) এক উম্মত (একটি জাতির জীবন্ত প্রতীক), আল্লাহ্‌র একান্ত অনুগত, ও একনিষ্ঠ। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না তিনি ছিলেন তার রবের নেয়ামতের শোকরকারী। তিনি তাকে বাছাই করেছেন এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছিলেন[সূরা নাহল; ১৬ : ১২০-১২১]

সে তাদের বংশধর, যাদেরকে আমি নূহের সাথে আরোহণ করিয়েছিলাম, নিশ্চয় তিনি ছিলেন কৃতজ্ঞ বান্দা।[ সূরা বনী ইসরাইল; ১৭ : ৩]

 তৃতীয়ত :

আল্লাহ্‌ তা‘আলা কুরআনে আমাদের প্রতি তাঁর কিছু নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সেসব জন্য আমাদেরকে শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, খুব অল্প কিছু মানুষই তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে থাকে।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

১। “হে মু’মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযিক দিয়েছি তা থেকে আহার করো এবং আল্লাহ্‌র জন্য শোকর করো যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত করো।[সূরা বাকারা; ২ : ১৭২]

২। “আর অবশ্যই আমি তো তোমাদেরকে যমীনে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তাতে তোমাদের জন্য রেখেছি জীবনোপকরণ। তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকো।[সূরা আরাফ; ৭ : ১০]

৩।আর তাঁর নির্দেশনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি [বৃষ্টির] সুসংবাদ বহনকারী হিসেবে বাতাস প্রেরণ করেন এবং যাতে তিনি তোমাদেরকে তাঁর রহমত আস্বাদন করাতে পারেন এবং যাতে তাঁর নির্দেশে নৌযানগুলো চলাচল করে, আর যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ থেকে কিছু সন্ধান করতে পারো। আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। [সূরা রুম; ৩০ : ৪৬]

। আল্লাহ্‌ তা‘আলা কুরআনে যেসব আধ্যাত্মিক নেয়ামতের উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো (অর্থের ব্যাখ্যা) :

হে মু’মিনগণ! যখন তোমরা সালাতে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা (ধৌত করো)আর যদি তোমরা অপবিত্র থাকো, তবে ভালোভাবে পবিত্র হওআর যদি অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাকো অথবা যদি তোমাদের কেউ পায়খানা থেকে আসে অথবা তোমরা যদি স্ত্রী সহবাস করো অতঃপর পানি না পাও, তবে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করো। সুতরাং তোমাদের মুখ ও হাত তা দ্বারা মাসেহ করো। আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর কোন সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না। বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের উপর তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো[সূরা মায়েদা; ৫ : ৬]

 

রয়েছে আরও অনেক অফুরন্ত নেয়ামত। আমরা এখানে সেগুলো থেকে মাত্র কয়েকটা উল্লেখ করলাম। বলাই বাহুল্য যে, আল্লাহ্‌র সমস্ত নেয়ামতের তালিকা করা অসম্ভব। এই মর্মে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

আর তোমরা যা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকে তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন এবং যদি তোমরা আল্লাহ্‌র নেয়ামতের গণনা করো, তবে তার সংখ্যা নিরূপণ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অতিমাত্রায় যালিম, ও অকৃতজ্ঞ [সূরা ইবরাহীম; ১৪ : ৩৪]

আমরা আল্লাহ্‌র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে তিনি আমাদের ত্রুটিবিচ্যুতিকে ক্ষমা করে দেবেন এবং আমাদের প্রতি করুনা করবেন। এই মর্মে তিনি বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

“আর যদি তোমরা আল্লাহ্‌র নেয়মত গণনা করো, তবে তার ইয়ত্তা পাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[সূরা নাহল; ১৬ : ১৮]

 

আল্লাহ্‌ না চাইলে, কেউ তাঁর প্রশংসা করতে পারে না। তাই মুসলিমরা সর্বদাই আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য চেয়ে প্রার্থনা করে, যেন তিনি তাদেরকে তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া করার সামর্থ্য দান করেন। একারণেই বিশুদ্ধ হাদীসে আল্লাহ্‌র প্রশংসা করার জন্য তাঁর সাহায্য চেয়ে দো‘আ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মু‘আয ইবনু জাবাল (রা) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্‌র রাসুল (সা) তার হাত ধরে বললেন :

 হে মু‘আয! আল্লাহ্‌র কসম, তোমাকে আমি ভালবাসি, আল্লাহ্‌র কসম, আমি তোমাকে ভালোবাসি” তারপর তিনি বললেন, “হে মু‘আয! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি  যে, প্রত্যেক সালাতের শেষে তুমি বলতে ভুলে যাবে না : হে আল্লাহ্‌! তোমাকে উত্তমরূপে স্মরণ করার, তোমার শুকরিয়া করার এবং তোমার ইবাদত করার জন্য আমাকে সাহায্য করো” [আবু দাউদ (১৫২২) এবং নাসা‘ঈ কর্তৃক সংকলিত; সহীহ আবি দাউদে আল-আলবানি হাদীসটি সহীহ বলে মত দিয়েছেন]

 

আল্লাহ্‌র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে, আমরা তাঁর পক্ষ থেকে আরও বেশী নেয়ামত প্রাপ্ত হবো। এই মর্মে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেবো, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন [ইবরাহীম; ১৪ : ৭]

চতুর্থত :

মানুষ কীভাবে তার প্রতিপালকের দেওয়া নেয়ামতরাজির শুকরিয়া আদায় করবে? আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায়ের ক্ষেত্রে সবগুলো নির্ধারিত শর্তসমূহ পূর্ণ করা অপরিহার্য। যেমন : অন্তরের শুকরিয়া, জিহ্বার শুকরিয়া এবং অন্য সকল শারীরিক ক্ষমতার শুকরিয়া।

ইবনুল কাইয়্যিম (র) বলেন :

অন্তরের শুকরিয়া হলো আত্মসমর্পণ এবং বিনম্রতায়; জিহ্বার শুকরিয়া হলো প্রশংসা এবং স্বীকারোক্তিতে; আর শারীরিক ক্ষমতার শুকরিয়া হলো আনুগত্য এবং বশ্যতায় [মাদারিজ আল-সালিকীন (২/২৪৬)]

উল্লিখিত বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ :

১. অন্তরের শুকরিয়া : এর অর্থ হলো, আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, অন্তর সেই অনুগ্রহসমূহকে পূর্ণ গুরুত্বের সাথে উপলব্ধি করে এবং দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করে যে, কেবল আল্লাহ্‌ই তাকে এইসব অনুগ্রহ দান করেছেন যার কোনো শরীক বা অংশীদার নেই। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

 আর তোমাদের কাছে যেসব নেয়ামত আছে তা আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে” [আন-নাহল; ১৬ : ৫৩]

 আমরা সমস্ত নেয়ামত যে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে পাই, তা স্বীকার করা কেবল মুস্তাহাব (উৎসাহিত) নয়; বরং তা ফরয (বাধ্যতামূলক)। এইসব নেয়ামত আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে এসেছে বলে বিশ্বাস করলে তা হবে কুফরী।

শায়েখ আব্দুর রাহ্‌মান আস-সা‘দি (র) বলেছেন :

মানুষকে পরিপূর্ণভাবে স্বীকার করতে হবে যে, সমস্ত নেয়ামতরাজি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে। তবেই সে পরিপূর্ণভাবে তাওহীদ-কে অর্জন করবে। যে কেউ মুখে বা অন্তরে আল্লাহ্‌র নেয়ামতসমূহকে অস্বীকার করবে, সে একজন কাফির এবং ইসলামের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

 যে দৃঢ়ভাবে অন্তরে বিশ্বাস করে যে, সকল নেয়ামত শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে, আবার কখনও কখনও সেগুলোকে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে, কখনও নিজের কর্ম বা অন্যের প্রচেষ্টার ফসল মনে করে – যেমনটি অনেক মানুষের মুখে শোনা যায় – তাহলে তাকে তাওবা করতে হবে এবং সমস্ত নেয়ামতসমূহ তার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে বলে মনে করবে না এবং সে অবশ্যই নিজেকে দিয়ে তা (তাওবা) করাবে কারণ আল্লাহ্‌র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় না করে, ঈমান এবং তাওহীদ অর্জন করা যায় না।

ঈমানের মূলকথাই হলো আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করা যা তিনটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত : বান্দার প্রতি আল্লাহ্‌র সমস্ত নেয়ামতকে অন্তরে স্বীকার করা এবং সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা; আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করা; এবং এই শুকরিয়াকে কাজে লাগিয়ে একমাত্র আল্লাহ্‌র ইবাদত এবং আনুগত্য করা যিনি সমস্ত নেয়ামতের যোগানদাতা।” [আল-কাওল আস্‌-সাদীদ ফী মাকাসিদুত তাওহীদ (পৃষ্ঠা ১৪০)]

যারা তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, তারা কোন ধরণের মানুষ, সে সম্পর্কে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

“তারা আল্লাহ্‌র নেয়ামত চেনে, তারপরও তা অস্বীকার করে, আর তাদের অধিকাংশই কাফির।” [সূরা নাহল; ১৬ : ৮৩]

ইবনু কাসির (র) বলেছেন :  তারা তো নিজেরাই জানে যে, একমাত্র আল্লাহ্‌ তা‘আলাই হচ্ছেন নিয়ামতরাজি দানকারী। কিন্তু এটা জানা সত্ত্বেও তারা এগুলো অস্বীকার করছে এবং তারা অন্যদের ইবাদত করছে। এমনকি তারা মনে করছে যে, সাহায্যকারী অমুক, আহার্যদাতা অমুক। [তাফসীর ইবনু কাসির (৪/৫৯২)]

২. মুখের শুকরিয়া : এর অর্থ হলো, সমস্ত নেয়ামত রাজি শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে – একথা অন্তরে বিশ্বাস করার পর, তা মৌখিকভাবে স্বীকার করা এবং নিজের জিহ্বাকে সর্বদায় আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র প্রশংসায় নিয়োজিত রাখা।

তাঁর বান্দা মুহাম্মাদের (সা) প্রতি তাঁর নেয়ামতের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন :

তিনি তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্বঅতঃপর তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। [সূরা আদ-দুহা; ৯৩ : ৮]

 

আল্লাহ্‌র এই নেয়ামতের জন্য রাসূলকে কী করতে হবে, তা আল্লাহ্‌ তা‘আলা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন :

আর তোমার রবের অনুগ্রহ তুমি বর্ণনা করো।[সূরা আদ-দুহা; ৯৩ : ১১]

উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা ইবনু কাসির (র) বলেছেন :  যখন আপনি নিঃস্ব এবং অভাবগ্রস্থ ছিলেন, আল্লাহ্‌ তখন আপনাকে সমৃদ্ধ এবং অভাবমুক্ত করেছেন করেছেন : তাই আপনার প্রতি অনুগ্রহের কথা ঘোষণা করুন। [তাফসীর ইবনু কাসির (৮/৪২৭)]

 

আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত। আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) বলেছেন : “আল্লাহ্‌ সেই ব্যক্তির প্রতি খুশি হন, যে কোনো খাবার খাওয়ার পরে তাঁর প্রশংসা করে অথবা যে কোনো পান করার পরে তাঁর প্রশংসা করে।” [সহীহ্‌ মুসলিম (২৭৩৪)]

আবুল ‘আব্বাস আল-কুরতুবি (র) বলেছেন :

উল্লিখিত হাসীসে প্রশংসা বলতে শুকরিয়া আদায় করাকে বোঝানো হয়েছে। আমরা দেখেছি যে, প্রশংসার মাধ্যমে শুকরিয়া হতে পারে কিন্তু শুকরিয়ার মাধ্যমে প্রশংসা নাও হতে পারে। নেয়ামত সংখ্যায় যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তার জন্য শুকরিয়া আদায় করাই হলো আল্লাহ্‌ তা‘আলা’র সন্তুষ্টি অর্জনের সর্বোত্তম উপায় যা জান্নাতের অধিবাসীদের সবচেয়ে মহান বৈশিষ্ট্য। যখন জান্নাতীরা বলবে, “আপনি আমাদেরকে এমন কিছু দিয়েছেন যা সৃষ্টির মধ্যে অন্য কাউকে দেননি,” তখন আল্লাহ্‌ তাদের উদ্দেশে বলবেন : “আমি কি তোমাদেরকে তার চেয়েও অধিক উত্তম কিছু দেবো না?”  তারা বলবে “সেটা কী? আপনি কি আমাদের মুখমণ্ডলগুলোকে উজ্জ্বল করেননি এবং আমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি রক্ষা করেননি? তিনি বলবেন, তোমাদের প্রতি আমি সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম এবং এরপর আর কখনোও তোমাদের প্রতি রাগান্বিত হবো না।

 এই বিরাট সম্মান অর্জনের উপায় হলো শুররিয়া আদায় করাকারণ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কেই ওই নেয়ামতের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করা হয় যিনি নেয়ামতসমূহকে সম্মান ও অনুগ্রহস্বরূপ তাঁর বান্দার নিকট পৌঁছে দেন যে বান্দা নিঃস্ব এবং অসহায় এবং যে অনুগ্রহ ছাড়া চলতে পারে না। কাজেই শুকরিয়া আদায় করাটা আল্লাহ্‌র হক্ব এবং আমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহের স্বীকৃতিএই স্বীকৃতি দেওয়া বান্দার অত্যাবশ্যক কর্তব্য। একারণেই আল্লাহ্‌ তাঁর শুকরিয়া আদায়ের পুরস্কারকে এত সম্মানজনক করেছেন।” [আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখীস কিতাব মুসলিম (৭/৬০,৬১)]

 

এ কারনে সালাদের কেউ কেউ বলেছেন : কেউ কোনো নেয়ামতের কথা গোপন করলে সে ওই নেয়ামতকে অস্বীকার করল, আর কোনো নেয়ামতের কথা প্রকাশ করলে সে ওই ওটার জন্য শুকরিয়া আদায় করলো।

এ কথার মন্তব্যে ইবনুল কায়্যিম (র) বলেছেন :

আল্লাহ্‌ যখন কোনো ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করেন, তিনি ওই বান্দার উপর সেই অনুগ্রহের প্রভাব দেখতে ভালোবাসেন।” [মাদারিজি আল সালেকিন (২/২৪৬)]

উমার ইবনু আব্দুল আযীয (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : (আল্লাহ্‌র) নেয়ামতের কথা পরস্পরকে স্মরণ করিয়ে দাও। কারণ সেগুলো আলোচনা করাও হলো শুকরিয়া আদায় করা।

 

৩. শারীরিক ক্ষমতার শুকরিয়া : এর অর্থ হলো শারীরিক ক্ষমতাকে আল্লাহ্‌র আনুগত্যের জন্য ব্যবহার করা এবং সেগুলোকে সবধরণের পাপাচার এবং আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা যেসব কাজ আল্লাহ্‌ নিষিদ্ধ করেছেন।

আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন (অর্থের ব্যাখ্যা) :

হে দাউদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ‘আমল করে যাও। [সূরা সাবা; ৩৪ : ১৩]

‘আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত : “আল্লাহ্‌র রাসুল (সা) যখন সালাত আদায় করতেন, তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর পা দুটো ফুলে যেতো। ‘আয়েশা (রা) বললেন : হে আল্লাহ্‌র রাসুল! আপনি এমনটি করছেন যখন আল্লাহ্‌ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিয়েছেন? তিনি বললেন : “হে আয়েশা! আমি কি শোকর গুজারি বান্দা হবো না? [আল-বুখারি (৪৫৫৭) এবং মুসলিম (২৮২০)]

ইবনু বাত্তল (রা) বলেছেন :

আত-তাবারি বলেছেন : এব্যাপারে বিশুদ্ধ মত হলো, শুকরিয়ার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, ওই নেয়ামত আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে নয় এবং কাজের (শুকরিয়ার) মধ্য দিয়েই তার প্রমাণ এবং যেহেতু শুকরিয়া আদায় করা হয়েছে তাই সেটা প্রমাণিত। তবে প্রমাণিত হওয়ার পর ব্যক্তির কাজকর্ম যদি ভিন্নরূপ দেখা যায়, তাহলে সে নিজেকে শোকরকারী বলার যোগ্য নয়। একে মৌখিক শুকরিয়া বলা যেতে পারে। একথা যে সত্য, তার প্রমাণ হলো আল্লাহ্‌ তা‘আলা’র বাণী (অর্থের ব্যাখ্যা) : “হে দাউদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ‘আমল করে যাও।” [সূরা সাবা; ৩৪ : ১৩]। এটি জানা কথা যে, আল্লাহ্‌ যখন তাদের প্রতি তাঁর নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করতে বলেছিলেন, তখন তিনি তাদেরকে শুধু মুখেই ওকথা স্বীকার করার জন্য আদেশ করেননি। কারণ তাদের প্রতি নেয়ামতসমূহ আল্লাহ্‌র দেওয়া একথা তারা অস্বীকার করেনি। বরং তিনি তাদেরকে আনুগত্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে তাঁর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার হুকুম দিয়েছিলেন। ঠিক এ কারণেই, রাতে সালাত আদায় করার সময় যখন রাসূলের (সা) পা দুটো ফুলে যেতো, তখন তিনি বলতেন : আমি কি শোকর গুজারি বান্দা হবো না? [শাহ্‌র সহীহ্‌ আল-বুখারি (১০/১৮৩,১৮৪)]

আবু হারুন বলেন : হঠাৎ আবু হাজিমের সাথে আমার দেখা হলো। আমি বললাম : আল্লাহ্‌ আপনার উপর দয়া করুন, চোখের শুকরিয়া কী? তিনি বললেন : আপনি তাদের (দু’চোখ) মাধ্যমে ভালো কিছু দেখলে তা প্রকাশ করুন। আর তাদের মাধ্যমে মন্দ কিছু দেখলে তা গোপন করুন। আমি বললাম : কানের শুকরিয়া কী? তিনি বললেন : আপনি তাদের (দুই কান) মাধ্যমে ভালো কিছু শুনলে তা মনে রাখুন। আর তাদের মাধ্যমে মন্দ কিছু শুনলে তা ভুলে যান।

ইবনু রাজাব আল হানবালি (র) বলেন :

শুকরিয়া দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো ফরয (বাধ্যতামূলক)। অর্থাৎ ফরয কাজগুলো সম্পাদন করা এবং নিষিদ্ধ কাজগুলো বর্জন করা। এমনটি করা অত্যাবশ্যক এবং শুকরিয়া আদায়ের জন্য এমনটি করাই যথেষ্ট।

একারণেই একজন সালাফের মতে :

 শুকরিয়া হলো পাপ কাজ ত্যাগ করা    

সালাফদের আরেকজন বলেছেন :

শুকরিয়া হলো কোনো নিয়ামত ব্যবহার করে তাঁর (আল্লাহ্‌র) বিরুদ্ধাচরণ না করা।

 আবু হাজিম আল-যাহিদ সবধরনের শারীরিক ক্ষমতার শুকরিয়া সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন : এগুলোকে (শারীরিক ক্ষমতাগুলোকে) পাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং এগুলোর ব্যবহার করে আল্লাহ্‌র প্রতি আনুগত্য করতে কাউকে সাহায্য করা। অতঃপর তিনি বলেন : যে ব্যক্তি তার জিহ্বা দিয়ে শুকরিয়া করে কিন্তু বাকি শারীরিক ক্ষমতা দিয়ে করে না, তার অবস্থা ওই লোকের মতো, যার একটা আলখাল্লা আছে কিন্তু সে তা গায়ে না দিয়ে, হাতে ধরে নিয়ে বেড়ায়। ফলে শীতে, গরমে , তুষারে বা বৃষ্টিতে ওই আলখাল্লা তার কোনো উপকারেই আসে না।

দ্বিতীয় প্রকার শুকরিয়া হলো মুস্তাহাব। কোনো ব্যক্তি এই কাজগুলো ফরজ ইবাদত করার পর এবং নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করার পর, অতিরিক্ত বা নফল ইবাদত হিসেবে করে থাকে। শুকরিয়া আদায়ের এই স্তরটি তাদের, যারা সৎকর্মে অগ্রগামী এবং আল্লাহ্‌  তা‘আলা’র অধিক নৈকট্যলাভকারী। [জামি‘উল ‘উলুম ও’য়াল হুকাম (পৃষ্ঠা ২৪৫, ২৪৬)

 সারকথা :

আল্লাহ্‌র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে চাইলে, আপনাকে অবশ্যই অন্তরে স্বীকার করতে হবে যে, সমস্ত অনুগ্রহ এবং নেয়ামতের যোগানদাতা হলেন শুধুমাত্র আল্লাহ্‌। এই আন্তরিক স্বীকারোক্তির ফলে আপনি আল্লাহ্‌কে শ্রদ্ধা এবং ভক্তির সাথে ভালবাসতে পারবেন। আপনি মুখ দিয়ে স্বীকার করবেন, তিনিই হলেন একমাত্র অনুগ্রহকারী। অতএব, ঘুম থেকে জেগে উঠেই আপনি তার প্রশংসা করবেন। কারণ তিনি আপনাকে নতুন জীবন দান করেছেন। পানাহার করার পরে তাঁর প্রশংসা করবেন। কারণ তিনি অনুগ্রহ করে আপনাকে খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন। আর এভাবে প্রতিটি অনুগ্রহের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করবেন।

আপনি শারীরিক ক্ষমতার মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করবেন। চোখ দিয়ে মন্দ কিছু দেখবেন না। কান দিয়ে গান বাজনার মতো খারাপ কিছু শুনবেন না। পায়ে হেঁটে নিষিদ্ধ স্থানে যাবেন না। হাত দিয়ে কোনো পাপ কাজ করবেন না। যেমন : কোনো নিষিদ্ধ প্রেমপত্র বা নিষিদ্ধ চুক্তি লিখবেন না। শারীরিক ক্ষমতা দ্বারা শুকরিয়া করার মধ্যে রয়েছে কোরআন পড়া, জ্ঞান বাড়ে এমন বই পড়া , উপকারী ও প্রয়োজনীয় জিনিস শোনা । এছাড়া অন্য সকল ক্ষমতা বিভিন্ন ইবাদাত এবং আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করা উচিত।

মনে রাখবেন, আল্লাহ্‌র নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারাটাও তাঁর পক্ষ থেকে আরেকটি নেয়ামত এবং এজন্যও শুকরিয়া আদায় করতে হবে। ফলে শোকরকারী যতই আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করে, ততই আল্লাহ্‌র নেয়ামত উপভোগ করে অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়।

আমরা দো‘আ করি আল্লাহ্‌ যেন আপনাকে আমাকে এবং সর্বোপরি সবাইকে তা-ই করার তাওফীক দান করেন যা তিনি ভালোবাসেন এবং পছন্দ করেন।

সূত্র : Islamqa

]]>
http://www.quraneralo.com/how-we-should-thank-allah/feed/ 0
আল্লাহর সতর্কবাণী http://www.quraneralo.com/warning-from-allah/ http://www.quraneralo.com/warning-from-allah/#comments Wed, 06 Feb 2013 03:30:04 +0000 Mohammad Gaffer http://www.quraneralo.com/?p=3413 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

লিখেছেনঃ রফীক আহমাদ    ।    ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ -ই- গাফফার

23

আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় ও অসীম সত্তার অধিকারী। আর মানুষ হ’ল তাঁর সর্বাধিক প্রিয় সৃষ্টি। তিনি মানুষকে শয়তান হ’তে সাবধান থাকার পুনঃ পুনঃ নির্দেশ প্রদান করেছেন। কুরআন আল্লাহর গ্রন্থ। এ গ্রন্থে আল্লাহ ইহকাল ও পরকাল সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক-সাবধান করেছেন।

 

পবিত্র কুরআনের বাণী সমূহের প্রতি আস্থাশীল ও অকৃত্রিম বিশ্বাসী থাকারআহ্বান জানান হয়েছে। এতদসত্ত্বেও কেউ কল্পনাপ্রসূতভাবে নিত্যনতুন কর্মকান্ডে প্রবৃত্ত হ’লে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। এখানে এই ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্কবাণীর অবতারণা করা হ’ল। মহান আল্লাহ রাসূল (ছাঃ)-কে সতর্ককারীরূপে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁর মাধ্যমেই মানুষকে হুঁশিয়ার করেছেন। আল্লাহ বলেন,

 ‘আপনি তো কেবল একজন সতর্ককারী। আমি আপনাকে সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছি সংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। এমন কোন সম্প্রদায় নেই যাতে সতর্ককারী আসেনি’ (ফাতির ২৩-২৪)।

 

একই মর্মার্থে অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,

‘বলুন, আমি তো কোন নতুন রাসূল নই। আমি জানি না আমার ও তোমাদের সাথে কি ব্যবহার করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি অহি করা হয়। আমি স্পষ্ট সতর্ককারী বৈ নই’ (আহক্বাফ ৯)।

 

অন্যত্র তিনি বলেন,

‘হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়ক রূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে। আপনি মুসলমানদের সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ রয়েছে। আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের উৎপীড়ন উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা করুন। আল্লাহ কার্যনির্বাহী রূপে যথেষ্ট’ (আহযাব ৪৫-৪৮)।

 

একই বিষয়ে অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে,

‘বলুন, আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং পরাক্রমশালী আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর পালনকর্তা, পরাক্রমশালী, মার্জনাকারী। বলুন, এটি এক মহাসংবাদ’ (ছোয়াদ ৬৫-৬৭)।

 

মানুষকে শয়তানের ব্যাপক প্রভাব ও আধিপত্যের বেড়াজাল হ’তে রক্ষার জন্য তাদেরকে সতর্ক করে পরম করুণাময় আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

 ‘আমার বান্দাদেরকে বলে দিন, তারা যেন যা উত্তম এমন কথাই বলে। শয়তান তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধায়। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (বানী ইসরাঈল ৫৩)।

 

মহান আল্লাহ আরও বলেন,

‘যদি শয়তানের পক্ষ থেকে আপনি কিছু কুমন্ত্রণা অনুভব করেন, তবে আল্লাহর শরণাপন্ন হোন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞ’ (হা-মীম সাজদাহ ৩৬)।

 

মানুষ ও জিন জাতিকে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয়েছে তাদের জীবন-যাপন পদ্ধতি ও ধর্মীয় বিধানাবলী। স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত এই বিধানাবলীর বিপরীত কাজ করার কোন অবকাশ নেই মানব সম্প্রদায়ের। তজ্জন্য আল্লাহ তা‘আলা বহু সতর্কবাণী দ্বারা মানব জাতিকে বারংবার সাবধান করেছেন এবং তাদের পথপ্রদর্শক মহানবী (ছাঃ)-কেও সতর্ক করা হয়েছে তাঁর উম্মতের স্বপক্ষে। উপরের আয়াতগুলো তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। মহানবী (ছাঃ)-এর প্রতি অর্পিত অপরিসীম গুরুদায়িত্বের প্রেক্ষাপটে তাঁকে পুনঃ পুনঃ প্রত্যাদেশ দ্বারা প্রত্যক্ষ সতর্ককারী হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কুরআনে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর অস্তিত্বের বিকল্প যে কোন প্রকারের ধারণা হ’তে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এই সতর্কবাণীর সঠিক মূল্যায়নকারী মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হ’তে সুসংবাদ এবং অবমূল্যায়নকারী কাফির ও মুনাফিকদের বর্জন করার সংবাদও দেওয়া হয়েছে। অতঃপর সকল অপকর্মের হোতা শয়তান হ’তে সাবধান থাকার সবিশেষ প্রত্যাদেশ এসেছে। শয়তান যে কোন পরিস্থিতিতে দুর্বল বান্দাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে এবং শক্তিশালী বান্দাকেও আক্রমণের চেষ্টা করতে পারে। এমতাবস্থায় আল্লাহর শরণাপন্ন হওয়া বা আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

 

অপরদিকে মহানবী (ছাঃ)-এর বাণী ও জীবনাদর্শ সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য একইভাবে অনুসরণযোগ্য। অর্থাৎ আল্লাহর আদেশ, নির্দেশ ও সতর্কবাণীর পাশাপাশি মহানবী (ছাঃ)-এর আদেশ, নির্দেশ ও সতর্কবাণীরও যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। নইলে আমাদের জীবনের সকল সৎকর্ম সমূহ নিষ্ফল হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন,

‘আমি আপনাকে (রাসূল) প্রেরণ করেছি অবস্থা ব্যক্তকারী রূপে, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারী রূপে। যাতে তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে সম্মান ও সাহায্য কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর’ (ফাতাহ ৭-৯)।

 

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান না আনার পরিণতি ভয়াবহ। যারা কাফের তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আল্লাহ বলেন,

 ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাস করে না, আমি সেসব কাফেরের জন্য জ্বলন্ত অগ্নি প্রস্ত্তত করে রেখেছি। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান’ (ফাতাহ ১৩-১৪)।

 

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতার পরিণাম ভাল নয়; তাদেরকে আল্লাহ পথভ্রষ্টতায় নিপতিত বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন   সিদ্ধান্তের ক্ষমতা নেই। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে, সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়’ (আহযাব ৩৬)।

 

পবিত্র কুরআন করীমের ব্যাখ্যা ও মর্মানুযায়ী একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উম্মতের প্রত্যেকের উপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর হক সব চাইতে বেশী। স্বয়ং মহান আল্লাহ তা‘আলা নিজ কালামে তাঁর আদেশ মান্য করার সাথে সাথে রাসূলের আদেশও মান্য করার হুকুম দিয়েছেন। অতঃপর যারা তাঁর ও রাসূলের আদেশ অমান্য করবে বা তাঁদেরকে অবিশ্বাস করবে, তাদের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়টিও উপরের আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন ঈমানদার পুরুষ বা ঈমানদার নারী আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ পালনে ভিন্নমত পোষণ করে না। একমাত্র অবিশ্বাসীরাই ভ্রষ্টতায় পতিত হয়। এ বিষয়ে হাদীছে এসেছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

‘আমার উম্মতের সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যারা অস্বীকার করেছে তারা ব্যতীত। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! কে অস্বীকার করে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আমার দ্বীনের আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে ব্যক্তি আমাকে অমান্য করবে সেই অস্বীকার করে’ (বুখারী হা/৭২৮০)।

 

অন্য হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

বাক্য একটি, আর আমি বলেছি দ্বিতীয়টি। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সমকক্ষ আছে বিশ্বাস রেখে মৃত্যুবরণ করে সে আগুনে (জাহান্নামে) প্রবেশ করবে। আর আমি বলেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সমকক্ষ অস্বীকার করে মৃত্যুবরণ করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’ (বুখারী)।

 

পবিত্র কুরআন হচ্ছে সর্বশেষ আসমানী কিতাব, যা মহান আল্লাহর তরফ থেকে মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। আর হাদীছ হ’ল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর কার্যাবলীর বিবরণ ও তাঁর বক্তব্যের অথবা আল-কুরআনের বাস্তব রূপ। ছহীহ বুখারীর উপরোল্লিখিত হাদীছ দু’টি মহানবী (ছাঃ)-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সতর্কবাণীর প্রমাণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, মহানবী (ছাঃ)-এর যাবতীয় হাদীছ সংরক্ষিত হয়েছে। সুতরাং পবিত্র কুরআন ও হাদীছ উভয় সতর্কবাণীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। এসব হাদীছের সমর্থনপুষ্ট আরও বহু আয়াত রয়েছে।

 

আখিরাতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে সকল কর্ম বাতিল হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ মানুষকে সতর্ক করে বলেন,

‘বস্ত্ততঃ যারা মিথ্যা জেনেছে আমার আয়াত সমূকে এবং আখেরাতের সাক্ষাৎকে, তাদের যাবতীয় কাজকর্ম ধ্বংস হয়ে গেছে। তেমন বদলাই সে পাবে যেমন আমল সে করত’ (আ‘রাফ ১৪৭)।

 

অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন,

‘অতঃপর তার চেয়ে বড় যালেম কে আছে, যে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করেছে কিংবা তাঁর আয়াত সমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে? কস্মিনকালেও পাপীদের কোন কল্যাণ হয় না’ (ইউনুস ১৭)।

 

আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীব (ছাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন,

‘আপনি আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু এবং এটাও জানিয়ে দিন যে, আমার শাস্তিই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (হিজর ৪৯-৫০)।

 

এ সকল আয়াতে আল্লাহর সতর্কবাণী বিদ্যমান।

 

আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন থাকলে শয়তান তাকে পথভ্রষ্ট করতে চেষ্টা করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয় (ভুলে থাকে), আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সেই হয় তার সঙ্গী’ (যুখরুফ ৩৬)।

 

পবিত্র কুরআনের এই অভাবনীয় বাণী একদিকে মানবতাকে আল্লাহর স্মরণে ডুবে থাকার আহবান জানিয়েছে, অপরদিকে সতর্কতা অবলম্বনের ঐকান্তিক দীক্ষাও প্রদান করেছে। সুতরাং শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম সুরক্ষায় আল্লাহর স্মরণ যেমন অপরিহার্য, অনুরূপভাবে আল্লাহর সতর্কবাণীর অনুসরণও একইভাবে প্রয়োজন। ইহকালীন জীবনের পরিসমাপ্তির পর পরকালীন জীবনে প্রবেশ মুহূর্তেই আল্লাহর সতর্কবাণীর প্রভাব প্রতিফলিত হবে। আর বিশ্বস্ত বান্দাদের পক্ষেই এতদসংক্রান্ত বিষয়ে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা অর্জন করা সম্ভব। অতঃপর এদেরকে কল্যাণের পথে ফিরানোর লক্ষ্যেই পবিত্র কুরআনে এই সতর্কবাণী সম্বলিত আয়াতগুলো সংযোজন করা হয়েছে।

 

বস্ত্তত সকল সতর্কবাণীর মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষকে সংশোধনের মাধ্যমে তাদের মুক্তির পথে পরিচালিত করা। মহান আল্লাহ বলেন,

‘আমার দায়িত্ব পথপ্রর্দশন করা। আর আমি মালিক ইহকালের ও পরকালের। অতএব আমি তোমাদেরকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি। এতে নিতান্ত হতভাগ্য ব্যক্তিই প্রবেশ করবে, যে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ থেকে দূরে রাখা হবে আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে। যে আত্মশুদ্ধির জন্য তার ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং তার উপর কারও কোন প্রতিদানযোগ্য অনুগ্রহ থাকে না, তার মহান পালনকর্তার সন্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতিত, সে সত্বরই সন্তুষ্টি লাভ করবে’ (আল-লায়ল ১২-২১)।

 

উপরের আয়াতগুলোতে অপরাধীদের লক্ষ্য করে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডের অর্থাৎ জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। অপরদিকে আল্লাহভীরু ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণকারীদের পুরোপুরি অভয় দেওয়া হয়েছে।

 

মহানবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অমূল্যবাণী তথা হাদীছ পৃথকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে হাদীছ গ্রন্থে। পবিত্র কুরআনের সতর্ক বাণীর ন্যায়, হাদীছ গ্রন্থেও বহু সতর্কবাণী রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ একটি হাদীছ পেশ করা হ’ল,

হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট কল্যাণকর বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করত। আর আমি অকল্যাণকর বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম, এতে আমার পতিত হওয়ার ভয়ে। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা মূর্খতা ও অকল্যাণের মধ্যে ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এ কল্যাণ (ঈমান) দান করেছেন, তবে কি এ কল্যাণের পর পুনরায় অকল্যাণ (সংঘটিত) হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ হবে। আমি বললাম, সেই অকল্যাণের পরেও কি পুনরায় কল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আসবে। তবে তা ধূয়াযুক্ত (নির্ভেজাল) হবে। জিজ্ঞেস করলাম, দুখান (ধূ‘য়া) অর্থ কি? তিনি বললেন, লোকেরা আমার পথ ব্যতীত অন্য পথ অবলম্বন করবে। তাদের পক্ষ হ’তে ভাল ও মন্দ উভয়ই তুমি প্রত্যক্ষ করবে। আমি বললাম, অতঃপর এ কল্যাণের পর কি পুনরায় অকল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ আসবে। তা এই যে, জাহান্নামের দিকে কতক আহবানকারী হবে, যারা তাদের আহবানে সাড়া দিবে, তাদেরকে তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমাদেরকে তাদের পরিচয় জানিয়ে দিন। তিনি বললেন, তারা আমাদের মতই হবে এবং আমাদের কথার ন্যায়ই কথা বলবে। আমি বললাম, আমি সে অবস্থায় উপনীত হ’লে আমাকে কি নির্দেশ দেন? (আমার করণীয় কি হবে)? তিনি বললেন, তখন অবশ্যই মুসলমানদের জামা‘আত (সংগঠন) ও মুসলমানদের ইমামকে আকড়ে ধরে থাকবে। আমি বললাম, সে সময় যদি কোন মুসলিম সংগঠন ও মুসলিম ইমাম না থাকে (তখন আমাদের করণীয় কি)? তিনি বললেন, বৃক্ষমূলকে ধারণ করে হ’লেও সেসব (কুফরী) দলকে পরিত্যাগ করে চলবে। এমনকি এ অবস্থায় তোমাদের মৃত্যু উপস্থিত হয়ে যাবে, অথচ তুমি ঐ অবস্থায়ই থাকবে (অর্থাৎ বাতিল ফিরকা থেকে বিরত থেকে দৃঢ়ভাবে হক ধারণ করে থাকবে) (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৩৮২)।

 

বান্দার প্রতি আল্লাহর সতর্কবাণীর ন্যায় মহানবী (ছাঃ)-এর সতর্কবাণীরও যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, উপরের আলোচনায় তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আল্লাহর সতর্কবাণীকে প্রত্যক্ষ ঘোষণা এবং মহানবী (ছাঃ)-এর সতর্কবাণীকে পরোক্ষ ঘোষণা বলা যেতে পারে। তবে উভয় সতর্কবাণীর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। অতএব আমরা সর্বান্তকরণে এক আল্লাহর আদেশ ও তার বাস্তবায়নকারী মহানবী (ছাঃ)-এর বাণীর সমন্বয়ে আমাদের ভবিষ্যত কর্মপন্থা সুস্থির করব। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!

 

 

]]>
http://www.quraneralo.com/warning-from-allah/feed/ 2
বই – আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবেন কিভাবে? http://www.quraneralo.com/allahor-priyo-banda-hoben-kibhabe/ http://www.quraneralo.com/allahor-priyo-banda-hoben-kibhabe/#comments Thu, 29 Nov 2012 03:30:37 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3810

লেখকঃ আবু আহমাদ সাইফুদ্দীন বেলাল মাদানী

সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ

আল্লাহর প্রিয় ও মাহবুব বান্দা হওয়া কী সম্ভব?
আল্লাহ কি তাঁর কোন বান্দাকে ভালবাসেন?
হ্যাঁ, সম্ভব এবং আল্লাহ তাঁর কিছু সংখ্যক বান্দাকে ভালবাসেন।

কেউ আল্লাহকে ভালবাসলে বা কেউ আল্লাহকে ভালবাসার দাবী করলেই যে, আল্লাহ তাকে ভালবাসেন তা বলা অসম্ভব। অসংখ্য মানুষ আল্লাহর ভালবাসার দাবীদার। কিন্তু সত্যিকারে আল্লাহ তায়ালা কাকে ভালবাসেন এবং কাকে ভালবাসেন না তা একমাত্র আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবার জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান ও আমল।

আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীস এবং সালাফে সালেহীনদের নির্ভরযোগ্য বাণীসমূহ দ্বারা “আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবেন কিভাবে?” বিষয়ে আপনাদেরকে এ ছোট বইটি উপহার দিচ্ছি।

তাই দেরি না করে আমরা আজ থেকেই সঠিক জ্ঞানার্জন ও অমল করা শুরু করে দেই।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে তোমার একান্ত মাহবুবপ্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন

 

Download [1.35 MB]

Download from MediaFire

]]>
http://www.quraneralo.com/allahor-priyo-banda-hoben-kibhabe/feed/ 1
মুমিনদের শাফা‘আত http://www.quraneralo.com/shafaat/ http://www.quraneralo.com/shafaat/#comments Wed, 07 Nov 2012 04:33:50 +0000 Mohammad Gaffer http://www.quraneralo.com/?p=3449 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

লিখেছেনঃমুসাম্মাৎ শারমীন আখতার    ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ -ই- গাফফার

Hand Protecting a Plant

ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর বিচারের পরে যারা সৎকর্মশীল তারা জান্নাতে চলে যাবে। আর মুমিনরা অন্য মুমিনদের জন্য আল্লাহর কাছে সুফারিশ করবে। ফলে বহু মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। এ সম্পর্কেই নিম্নোক্ত হাদীছটি।

আবু সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত,

একদা কতিপয় লোক জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ক্বিয়ামতের দিন কি আমরা আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাব? তিনি বললেন, হ্যাঁ। মেঘমুক্ত দ্বিপ্রহরের আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের কষ্ট হয় এবং মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে কি তোমাদের কোন অসুবিধা হয়? তারা বলল না, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! এ সময় চন্দ্র-সূর্য দেখতে তোমাদের যে অসুবিধা হয় ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখতে এর চেয়ে বেশী কোন অসুবিধা হবে না।

 

যখন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, তখন একজন ঘোষক ঘোষণা দিবেন, প্রত্যেক উম্মত যে যার ইবাদত করত সে যেন তার অনুসরণ করে। তখন যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যের ইবাদত করত, তাদের একজনও বাকী থাকবে না। সকলেই জাহান্নামের মধ্যে গিয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত এক আল্লাহর ইবাদতকারী নেককার ও গুনাহগার ছাড়া আর কেউ বাকী থাকবে না। তারপর আল্লাহ তাদের নিকট আসবেন এবং বলবেন,

তোমরা কার অপেক্ষায় আছ? প্রত্যেক উম্মত, যে যার ইবাদত করত, সে তার অনুসরণ কর। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা তো সে সব লোকদেরকে দুনিয়াতেই বর্জন করেছিলাম, যখন আজকের অপেক্ষায় তাদের কাছে আমাদের বেশী প্রয়োজন ছিল। আমরা কখনও তাদের সঙ্গে চলিনি।

আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আমাদের নিকট না আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এ স্থানে অপেক্ষা করব। যখন আমাদের প্রতিপালক আসবেন, তখন আমরা তাকে চিনতে পারব।

আর আবু সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ)-এর বর্ণনায় আছে, আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমাদের এবং তোমাদের প্রতিপালকের মধ্যে এমন কোন চিহ্ন আছে কি যাতে তোমরা তাঁকে চিনতে পারবে? তারা বলবে, হ্যাঁ। তখন আল্লাহর পায়ের নলা প্রকাশ করা হবে এবং বিশেষ আলো প্রকাশিত হবে। তখন যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহকে সিজদা করত, শুধু তাকেই আল্লাহ সিজদার অনুমতি দিবেন। আর যারা কারো ভয়ে কিংবা মানুষকে দেখানোর জন্য সিজদা করত, তারা থেকে যাবে। তারা পিঠের পিছনের দিকে চিৎ হয়ে উল্টে পড়ে যাবে।

 

তারপর জাহান্নামের উপর দিয়ে পুলছিরাত পাতানো হবে এবং শাফা‘আতের অনুমতি দেওয়া হবে। তখন নবী রাসূলগণ স্ব স্ব উম্মতের জন্য এ প্রার্থনা করবেন, হে আল্লাহ! নিরাপদে রাখ, নিরাপদে রাখ। অনেক মুমিন এ পুলছিরাতের উপর দিয়ে চোখের পলকে পার হয়ে যাবে। অনেকেই বিদ্যুতের গতিতে পার হবে। অনেকেই বাতাসের গতিতে পার হবে। অনেকেই ঘোড়ার গতিতে পার হবে। আবার অনেকেই উটের গতিতে পার হবে। কেউ ছহীহ-সালামতে বেঁচে যাবে। আবার কেউ এমনভাবে পার হয়ে আসবে যে তার দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে। আবার কেউ খন্ড-বিখন্ড হয়ে জাহান্নামে পড়বে। অবশেষে মুমিনগণ জাহান্নাম হ’তে নিষ্কৃতি লাভ করবে। তারপর নবী করীম (ছাঃ) কসম করে বললেন,

  • তোমাদের যে কেউ নিজের হক বা অধিকারের দাবীতে কত কঠোর তা তো তোমাদের কাছে স্পষ্ট। কিন্তু মুমিনগণ তাদের সে সমস্ত ভাইদের মুক্তির জন্য আল্লাহর সাথে আরও অধিক ঝগড়া করবে, যারা তখনও জাহান্নামে পড়ে রয়েছে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! এ সমস্ত লোকেরা আমাদের সাথে ছিয়াম পালন করত, ছালাত আদায় করত এবং হজ্জ পালন করত। সুতরাং তুমি তাদেরকে জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ দাও।

তখন আল্লাহ বলবেন, যাও তোমরা যাদেরকে চিন তাদেরকে জাহান্নাম হ’তে মুক্ত করে আন। তাদের মুখের আকৃতি জাহান্নামের আগুনের প্রতি হারাম করা হয়েছে। এজন্য তারা মুখ দেখে চিনতে পারবে। তখন তারা জাহান্নাম হ’তে অনেক লোক বের করে আনবে।

 

  • তারপর বলবেন, হে আমাদের প্রতিপালক! এখন সেখানে আর এমন একজন লোকও নেই যাকে বের করার জন্য আপনি আদেশ করেছেন।

তখন আল্লাহ বলবেন, আবার যাও যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে বের করে আন। এতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে বের করে আনবে। তারপর আল্লাহ বলবেন, পুনরায় যাও যাদের অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে বের করে আন। সুতরাং তাতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে।

 

  • তারপর আল্লাহ বলবেন, আবার যাও যাদের অন্তরে এক বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে বের করে আন। এবারও তারা বহুসংখ্যক লোককে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবে এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! ঈমানদার কোন ব্যক্তিকে আমরা জাহান্নামে রেখে আসিনি।

তখন আল্লাহ বলবেন, ফেরেশতাগণ, নবীগণ এবং মুমিনগণ সকলেই শাফা‘আত করেছেন। এখন আমি পরম দয়ালু ব্যতীত আর কেউ বাকী নেই। এ বলে তিনি মুষ্টি ভরে এমন একদল লোককে জাহান্নাম থেকে বের করবেন যারা কখনও কোন নেক কাজ করেনি, যারা জ্বলে-পুড়ে কালো কয়লা  হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে জান্নাতের সামনে একটি নহরে ঢেলে দেওয়া হবে, যার নাম হ’ল ‘নহরে হায়াত’।

এতে তারা স্রোতের ধারে যেমনভাবে গাছের বীজ গজায়, তেমনিভাবে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সজীব হয়ে উঠবে। তখন তারা সেখান থেকে বের হয়ে আসবে মুক্তার মত চকচকে হয়ে। তাদের কাঁধে সীল মোহর থাকবে। জান্নাতীরা তাদের দেখে বলবে এরা পরম দয়ালু আল্লাহর মুক্তকৃত দাস। আল্লাহ্ তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, অথচ তারা পূর্বে কোন আমল বা কোন কল্যাণের কাজ করেনি। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, এ জান্নাতে তোমরা যা দেখছ, তা তোমাদেরকে দেওয়া হ’ল এর সঙ্গে অনুরূপ পরিমাণ আরও দেওয়া হ’ল’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫৩৪১)।

 

 

দুনিয়াতে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের ইবাদত করলে কিংবা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলে পরকালে ঐ উপাস্য-মা‘বূদ ও শরীকদের সাথেই জাহান্নামে যেতে হবে। পক্ষান্তরে যারা কেবল আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখত, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করতো না; তারা কোন নেকীর কাজ না করলেও এক সময় জান্নাতে যাবে তাদের ঈমানের কারণে। তাই আল্লাহর প্রতি খালেছ অন্তরে ঈমান আনতে হবে। তাহ’লে জান্নাত লাভ করা যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রতি একনিষ্ঠভাবে ঈমান আনার তাওফীক্ব দিন- আমীন!
পিঞ্জুরী, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।

 

]]>
http://www.quraneralo.com/shafaat/feed/ 12
আল্লাহ তাআলার হক বা প্রাপ্য http://www.quraneralo.com/rights-of-allah/ http://www.quraneralo.com/rights-of-allah/#comments Fri, 19 Oct 2012 05:12:26 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3714 লিখেছেনঃ সানাউল্লাহ নজির আহমদ    ।    ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবন গাফফার

166

আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের জলে-স্থলে, শরীরে ও দিগন্ত জুড়ে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নেয়ামতরাজি দ্বারা আবৃত করে রেখেছেন। তিনি এরশাদ করেন—

‘তোমরা কি দেখ না আল্লাহ তাআলা নভোমন্ডল ও ভূ-মণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন ?’ [১]

 

অন্যত্র বলেন—

‘যে সকল বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি-ই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। আফসোস ! মানুষ সীমাহীন অন্যায় পরায়ন, অকৃতজ্ঞ।' [২]

 

‘যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ [৩]

 

তবে বান্দার উপর সবচেয়ে বড় নেয়ামত : রাসূল সা.-কে প্রেরণ করা, কিতাব অবতীর্ণ করা ও ইসলামের হেদায়াত দান করা। এ জন্য বান্দা হিসেবে আমাদের উপর ওয়াজিব আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য অধিকার বা হকসমূহ জানা। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আবশ্যকীয় ও বাধ্যতামূলক হকসমূহ আদায়ের প্রতি যত্নবান থাকা। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হক তথা অধিকারের বিবরণ তুলে ধরা হলো :—

 

প্রথম অধিকার : আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান আনা

আল্লাহ তাআলার উপর ঈমান চারটি জিনিস অন্তর্ভুক্ত করে :—

 

এক : আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বের ঈমান বা বিশ্বাস:

দলিল-প্রমাণাদির ভিত্তিতে বিশ্বাস স্থাপন করা, অবোধ কিংবা অন্ধ ভাবে নয় : যেমন—

আল্লাহ তাআলার মাখলুকাত তথা সৃষ্টি জগত দেখে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। যেহেতু স্রষ্টা ছাড়া কোন সৃষ্টি নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে কিংবা অস্তিত্বে আনতে পারে না—কারণ প্রত্যেক জিনিসই তার অস্তিত্বের পূর্বে বিলুপ্ত, অবিদ্যমান ও অস্তিত্বহীন থাকে—বিধায় সৃষ্টি করার প্রশ্নই আসে না। আবার কোন জিনিস হঠাৎ বা আকস্মিকভাবে অস্তিত্বে বা দৃশ্যপটে চলে আসবে তাও সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি ঘটমান বস্তু বা সম্পাদিত কাজের নেপথ্যে সংঘটক বা সম্পাদনকারী থাকা জরুরি।

 

অতএব, যখন আমরা জানতে পারলাম এ বিশ্বজগত নিজে-নিজেই দৃশ্যপটে চলে আসেনি, আবার অকস্মাৎ তৈরি হয়েও যায়নি, তাই আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার হয়ে গেল, এর একজন স্রষ্টা রয়েছেন। আর তিনি হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।

 

দুই : রুবুবিয়্যাতের ঈমান :

আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতের উপর ঈমান রাখা—অর্থাৎ সৃষ্টি তার, মালিকানা তার, পরিচালনার দায়িত্ব তার, তিনি ছাড়া কেউ মালিক নয়, কেউ পরিচালনাকারী নয়। এরশাদ হচ্ছে—

‘শুনে রেখ, তারই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ করা।’ [৪]

 

আরো বলেন—

‘তিনিই আল্লাহ ! তোমাদের পালনকর্র্তা, সাম্রাজ্য তারই। তার পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আটিরও অধিকারী নয়।’ [৫]

 

দুনিয়ার ইতিহাসে এমন কাউকে পাওয়া যায়নি যে, অন্তরের সাক্ষ্য, প্রাকৃতিক বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতকে অস্বীকার করেছে। তবে এমন অনেকেই আছে, যারা জেদ ধরে অহংকার বশত, নিজের কথায় আস্থা না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাত অস্বীকার করেছে। যেমন- ফেরআউন তার সম্প্রদায়কে বলেছিল—

‘আমিই তোমাদের সেরা পালনকর্তা।’ [৬]

 

অন্য জায়গায় বলেন—

‘হে পরিষদবর্গ, আমি জানি না যে আমি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য আছে কি-না। [৭]

 

ফেরআউন নিজের উপর আস্থা কিংবা বিশ্বাস রেখে একথা বলেনি, কারণ আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন—

‘তারা অহংকার করে নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল।’ [৮]

 

মূসা আ. ফেরআউনকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন—

‘তুমি জান, যে আসমান ও জমিনের পালনকর্তাই এসব নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বরূপ নাজিল করেছেন। হে ফেরআউন, আমার ধারণা তুমি ধ্বংস হতে চলেছ।’ [৯]

 

এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার ‘উলুহিয়্যাতে’ শরিক করেও ‘রুবুবিয়্যাতে’-কে স্বীকার করতো। আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘বলুন, পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কারা ? যদি তোমরা জান, তবে বল। এখন তারা বলবে : সবই আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা চিন্তা করো না ? বলুন : সপ্ত আকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে ? এখন তারা বলবে : আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না ? বলুন : তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না। এখন তারা বলবে আল্লাহর। বলুন : তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে জাদু করা হচ্ছে ?’ [১০]

 

অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে—

‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে নভোমন্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছে ? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ।’ [১১]

 

আরো এরশাদ হচ্ছে—

‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে ? তবে অবশ্যই তারা বলবে আল্লাহ।’ [১২]

 

তিন : আল্লাহ তাআলার উলুহিয়্যাতের ঈমান :

অর্থাৎ ‘আল্লাহ সুবহানাহু ও তাআলাই একমাত্র উপাস্য’ এ কথার উপর ঈমান রাখা। যথা তিনি সত্যিকারার্থে প্রভু। বিনয় ও মহব্বত সম্বলিত এবাদতের উপযুক্ত। তিনি ছাড়া কেউ এবাদতের উপযুক্ত নয়। এরশাদ হচ্ছে—

‘আর তোমাদের উপাস্য একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া মহান করুণাময় দয়ালু কেউ নেই।’ [১৩]

 

আরো এরশাদ হচ্ছে—

‘পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ ? তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের এবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছ। আল্লাহ এদের ব্যাপারে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি।’ [১৪]

 

আল্লাহ তাআলা উল্লেখিত জিনিসগুলোর প্রভুত্ব কিছু যুক্তির মাধ্যমে খণ্ডন করেছেন :—

[১] মুশরিকরা যে সমস্ত বস্তুকে প্রভু বানিয়েছিল, তাদের ভিতর প্রভুত্বের কোন গুণ বিদ্যমান নেই। এগুলো সৃষ্টি করতে পারে না, কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না এবং তাদেরকে অনিষ্ট হতে রক্ষা করতে পারে না। এরা তাদের জীবন-মৃত্যুর মালিক নয়। আসমান-জমিনের মাঝে কোন জিনিসের মালিক নয় এবং এতে তাদের অংশীদারিত্বও নেই। এরশাদ হচ্ছে—

‘তারা তার পরিবর্তে কত উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না এবং তারা নিজেরাই সৃষ্ট, নিজেদের ভালও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না। জীবন, মরণ এবং পুনরুজ্জীবনেরও মালিক নয় তারা।’ [১৫]

 

আরো এরশাদ হচ্ছে—

‘তারা কি এমন কাউকে শরিক সাব্যস্ত করে যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে ? আর তারা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না নিজের সাহায্য করতে পারে !’ [১৬]

 

তাদের বানানো প্রভুদের এমন অসহায়ত্ব ও দুরবস্থা প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলাকে বাদ দিয়ে এগুলোকে প্রভু বানানো নিরেট বোকামি, চরম বাতুলতা।

 

[২] মুশরিকরা বিশ্বাস করতো—আল্লাহ তাআলাই প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা, তার হাতেই সমস্ত জিনিসের মালিকানা, তিনি রক্ষা করেন, তার কবল হতে কেউ রক্ষা করতে পারে না। এরশাদ হচ্ছে—

‘আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে ? তাহলে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ।’ [১৭]

 

আরো এরশাদ হচ্ছে—

‘তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুজি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও জমিন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক ? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন ? এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন ? কে করেন কর্ম-সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা ? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ ! তুমি বল, তারপরেও ভয় করছ না ?’ [১৮]

 

তারা যখন নিজেরাই এর সাক্ষ্য প্রদান করল, যুক্তির ভিত্তিতে এখন তাদের অবশ্য কর্তব্য একমাত্র প্রভু, একমাত্র প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার এবাদত করা। ধারণা প্রসূত ঐ সমস্ত প্রভুদের নয়—যারা নিজেদের কোন উপকার করতে পারে না। নিজেদের থেকে কোন বিপদ হটাতে জানে না।

 

চার : আল্লাহ তাআলার নাম ও সিফাতের ঈমান :

বান্দা হিসেবে আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান আনবে। যে সমস্ত নাম ও সিফাত (বিশেষ্য ও বিশেষণ) আল্লাহ তাআলা স্বীয় কিতাব অথবা রাসূল সা. স্বীয় হাদিসে উল্লেখ করেছেন, সেগুলোকে আল্লাহ তাআলার নাম ও সিফাত হিসেবে আল্লাহ তাআলার অবস্থান মোতাবেক বিশ্বাস করবে, একমাত্র তার জন্য প্রযোজ্য বলে জ্ঞান করবে। কোন ধরনের অপব্যাখ্যা, নিষ্কর্ম করণ, আকৃতি প্রদান ও সামঞ্জস্য বিধান করবে না। এরশাদ হচ্ছে—

‘আর আল্লাহর রয়েছে উত্তম নাম সমূহ, কাজেই সে নাম ধরেই তাকে আহ্বান কর। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তার নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।’ [১৯]

 

অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে—

‘কোন কিছুই তার অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, দেখেন।’ [২০]

 

দ্বিতীয় অধিকার :

পূর্ণ এখলাস ও আন্তরিকতাসহ একমাত্র আল্লাহ তাআলার জন্য এবাদত উৎসর্গ করা : যার পদ্ধতি হলো—বান্দা তার আমলের মাধ্যমে একমাত্র তাআলার সন্তুষ্টি কামনা করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা এর প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন—

‘আমি আপনার উপর এ কিতাব যথার্থ-ই নাজিল করেছি। অতএব আপনি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহ তাআলার এবাদত করুন।’ [২১]

 

আরো বলেন—

‘আপনি বলুন : আমার নামাজ, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন-মরণ বিশ্ব প্রতিপালকের জন্য। তার কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্য পোষণকারী।’ [২২]

 

সহিহ হাদিসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন—

আমি সমস্ত অংশীদারদের ভিতর বেশি অমুখাপেক্ষী, যে এমন আমল করল, যার ভিতর সে আমার সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করেছে, সে আমল ঐ অংশীদারের জন্য, আমি তার থেকে মুক্ত।’

 

মুআয ইবনে জাবাল রা. বলেন, আমি একটি গাধার পিঠে রাসূলের সঙ্গী ছিলাম। যে উটকে ‘উফাইর’ বলা হয়। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন—

‘হে মুআয, তুমি কি জান বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার কি কি হক রয়েছে ? এবং আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার কি কি হক রয়েছে ? আমি উত্তর দিলাম—আল্লাহ এবং তার রাসূল সা. ভাল জানেন। তিনি বললেন, বান্দার উপর আল্লাহ তাআলার হক হচ্ছে : তারা তাঁর এবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরিক করবে না। আল্লাহ তাআলার উপর বান্দার হক হচ্ছে, যে তার সাথে কাউকে শরিক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দেবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সা. আমি কি সকলকে এর সুসংবাদ দেব না ? তিনি বললেন তাদের সুসংবাদ দিওনা, তাহলে তারা কর্মহীন হয়ে যাবে।’ [২৩]

 

রাসূল সা. আরো বলেন—

‘আল্লাহ তাআলা তোমাদের শরীর ও চেহারার দিকে তাকান না। তবে তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। রাসূল সা. আরো বলেছেন—কেয়ামতের দিবসে—যে দিবসের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই—যখন আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে জমা করবেন, একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেবে, যে ব্যক্তি তার আমলের ভিতর অন্য কাউকে শরিক করেছে, সে যেন তার সওয়াব আল্লাহ তাআলা ছাড়া যাকে শরিক করেছে তার কাছ থেকে চেয়ে নেয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা সমস্ত শরিকদের থেকে অমুখাপেক্ষী। [২৪]

 

একজন বান্দা হিসেবে সকলের জন্য জরুরি—এবাদত বিষয়ে আন্তরিকতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা এবং সেভাবে আল্লাহ তাআলার প্রাপ্য আদায় করা, এর বিপরীত অর্থাৎ শিরক হতে বিরত থাকা ।

 

[১] সূরা লোকমান : ২০।

[২] সূরা ইবরাহিম : ৩৪।

[৩] সূরা নাহাল : ১৮।

[৪] সূরা আল আরাফ : ৫৪

[৫] সূরা ফাতের : ১৩

[৬] সূরা আন নাযেআত : ৩৮

[৭] সূরা আল কাসাস : ৩৮

[৮] সূরা আন নামল : ১৪

[৯] সূরা বনী ইসরাইল : ১০২

[১০] মুমিনুন : ৮৪-৮৯

[১১] সূরা যুখরুফ : ৯

[১২] সূরা যুখরুফ : ৮৭

[১৩] সূরা আল বাক্বারা : ১৬৩

[১৪] সূরা ইউসুফ : ৩৯-৪০

[১৫] সূরা আল ফুরকান-৩

[১৬] সূরা আল আরাফ : ১৯১-১৯২

[১৭] সূরা আদ দুখান : ৮৭

[১৮] সূরা ইউনুস : ৩১

[১৯] সূরা আল আরাফ-১৮০

[২০] সূরা আশ শুরা : ১১

[২১] সূরা আয যুমার : ২।

[২২] সূরা আল আনআম-১৬১-১৬২।

[২৩] বোখারি ও মুসলিম

[২৪] হাদিসটি ইমাম তিরমিজি রহ. বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন হাসান গরিব

 

]]>
http://www.quraneralo.com/rights-of-allah/feed/ 0
আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব – পর্ব ২ http://www.quraneralo.com/brotherhood-for-allah-2/ http://www.quraneralo.com/brotherhood-for-allah-2/#comments Thu, 13 Sep 2012 03:13:08 +0000 Mohammad Gaffer http://www.quraneralo.com/?p=3620

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

লিখেছেনঃ আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান       ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবন গাফফার

পর্ব ১ | পর্ব ২

  ভাইয়ের উপর ভাইয়ের দায়িত্বঃ~

[১]~ প্রয়োজনের সময়ে সঙ্গ দেয়া এবং পাশে দাঁড়ানো। এর বিভিন্ন স্তর হতে পারে।

  প্রথমত:সর্বনিু স্তর, অর্থাৎ যদি ভাই সাহায্য করে, তবে তাকে সাহায্য করা।

দ্বিতীয়ত: মধ্যবর্তী স্তর, অর্থাৎ সাহায্য প্রার্থনা ব্যতীতই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। তৃতীয়ত: সর্বোচ্চ স্তর, অর্থাৎ ভাইয়ের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের তুলনায় অধিক গুরুত্ব প্রদান করা। আমাদের মহান পূর্বপুরুষদের মাঝে এমনও দৃষ্টান্তও বিরল নয় যে, কারো মৃত্যুর পর তিনি দীর্ঘ চল্লিশ বছর অনবরত তার পরিবারকে সেবা দিয়ে গেছেন, তাদের প্রয়োজন সমূহ অভিভাবকের অনুরূপ পূরণ করেছেন।

[২]~ ভাইয়ের উপস্থিতিতে কিংবা অনুপস্থিতিতে, সর্বাবস্থায় তার দোষ-ত্র“টি উল্লেখ হতে বিরত থাকা। এবং সরাসরি তার বিরোধিতায় লিপ্ত না হওয়া—তবে বিষয়টি যদি আমর বিল মা’রুফ ও নেহি আনিল মুনকারের পর্যায়-ভুক্ত হয়, তবে তা বৈধ এবং সিদ্ধ বলে গণ্য হবে। [প্রাগুক্ত : পৃষ্ঠা : ১১৫]

[৩]~ তার ভুল-ত্র“টিকে ক্ষমা সুন্দর মার্জনীয় দৃষ্টিতে দেখা। ত্র“টিহীন মানুষের কল্পনা এক অবাস্তব কল্পনা, এটি সর্বৈবে ভিত্তিহীন একটি বিষয়। বরং, যে ব্যক্তির মাঝে অনুত্তমের তুলনায় উত্তম আচরণ অধিক-হারে বিদ্যমান, সেই আমাদের কাছে পরম ব্যক্তিত্ব। ইবনে মুবারক রহ. বলেন, মোমিন অপরের মাঝে অপরাগতার সন্ধান করে, আর মোনাফিক খুঁজে বেড়ায় ত্র“টি ও পদস্খলন।

[৪]~ ভালো এবং মন্দ—উভয় অবস্থায় তাকে সহায়তা প্রদান করা।

[৫]~ ভাইয়ের কষ্টকে বরদা শত না করা, এবং তার প্রতিকারার্থে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ভাইয়ের দু:খ-কষ্টে ভারাক্রান্ত হওয়া।

[৬]~ সাক্ষাৎকালীন সালাম প্রদান। তার ডাকে সাড়া দেওয়া। অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া। ইন্তেকাল করলে জানাজায় শরিক হওয়া। যদি উপদেশ প্রার্থনা করে, তবে সৎ উপদেশ প্রদান করা।

[৭]~ ভাইয়ের কল্যাণে উৎফুল্ল হওয়া, এবং কল্যাণ পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান, যেভাবে মানুষ নিজের কল্যাণে উৎফুল্ল হয়ে উঠে এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় রত হয়।

[৮]~ মুসলিম ভাইদের মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন :—

জালেম এবং মাজলুম—উভয় অবস্থায় তুমি তোমার ভাইকে সহযোগিতা কর। এক ব্যক্তি বলল, যখন ব্যক্তি মাজলুম হবে তাকে সহযোগিতা করব। কিন্তু যখন সে জালেম হবে, তাকে কীভাবে সহযোগিতা করব ? রাসূল বললেন : তোমরা তাকে জুলুম হতে বাধা প্রদান করবে, এটিই তার জন্য সহযোগিতা। [বোখারি : ৬৯৫২]

 

এ হাদিস ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইবনে উসাইমিন রহ. বলেন : উক্ত হাদিসে প্রশ্নকারী বলেছিল :

হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি বলুন, যদি সে জালেম হয়, তবে কীভাবে তাকে সহযোগিতা করব ? সে কিন্তু এ কথা বলেনি যে, এ অবস্থায় আমি তাকে সহযোগিতা করব না। সে বরং, বলেছে, আমি কীভাবে তাকে সহযোগিতা করব ? অর্থাৎ তাকে তো অবশ্যই সহযোগিতা করব, কিন্তু তার প্রক্রিয়াটি কি হবে ? রাসূল এর উত্তরে বলেছেন : তাকে জুলুম হতে বাধা প্রদান করবে, এটিই তার জন্য সহযোগিতা। যদি দেখ জালেম মানুষের উপর অত্যাচার করছে, তবে তাকে বাধা প্রদান করবে, এটিই তার জন্য সহযোগিতা। এ হাদিসের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়, উক্ত প্রক্রিয়ায় জালেম এবং মাজলুম—উভয়কে সহযোগিতা করা ওয়াজিব বা অবশ্য কর্তব্য। [শরহু রিয়াযিস সালেহিন : পৃষ্ঠা : ৬৪২ ; প্রাগুক্ত]

 

[৯]~ কঠিন বিষয়গুলো তার জন্য সহজ করে তোলা।

[১০]~ সর্বদা তার জন্য দোয়া করা।

[১১]~ উপদেশ প্রদান। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : মোমিন তার ভাইয়ের জন্য আয়না তুল্য, মোমিন অপর মোমিনের ভাই স্বরূপ। সে তার সম্পদ রক্ষা করে এবং তার অবর্তমানে তা হেফাজত করে। [ইমাম বোখারি আদাবে মুফরাদ গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, আলবানী উক্ত হাদিসকে ‘হাসান’ বলেছেন]

 

[১২]~ মানুষের জন্য নয়, আল্লাহর জন্য এখলাস ও বিশ্বস্ততা অবলম্বন করা। বিশ্বস্ততার মর্ম হচ্ছে সহমর্মিতা ও ভালোবাসার উপর অটল থাকা এবং ব্যক্তির মৃত্যু অবধি, এমনকি, মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখা। মৃত্যুর পর—কারণ, অপরের প্রতি ভালোবাসার প্রাপ্তি পরকালীন, পার্থিব নয় কোন অর্থেই। যদি মৃত্যুর পূর্বে তাতে ব্যাঘাত ঘটে, তবে এ যাবৎকালের সব কিছু বিফলে পর্যবসিত হবে। খাদীজা [রা]-এর জীবৎকালে যে নারী রাসূলের পরিবারে যাতায়াত করতেন, পরবর্তীতে তার অনুপস্থিতিতে যখন উক্ত নারী রাসূলের দরবারে আগমন করতেন, তিনি তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। এ ঘটনাটি এ বিষয়টির জন্য সর্বোত্তম দলিল হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

[১৩]~ সহজ আচরণে তাকে আপ্লুত করা, অতিরঞ্জন এবং কঠিন আচরণ পরিহার করা। এ প্রসঙ্গে ইমাম জাফর সাদেক বলেন :

আমার কাছে সে ভাইয়ের সাহচর্য কষ্টকর, যে আমার কাছে নিজেকে উপস্থিত করে কঠিন করে, এবং আমি তার থেকে বেঁচে থাকি। আর সহজ এমন ব্যক্তির সাহচর্য, যার সাথে আমি নিজের মত থাকতে পারি। যেভাবে আমি একাকী থাকি, সেভাবে তার সাথেও কাটাতে পারি। 

 

[১৪]~ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পর সাক্ষাৎ করা। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

আমি কি তোমাদের জান্নাতীদের সুসংবাদ দেব না ? নবী জান্নাতে অবস্থান করবেন, শহীদ জান্নাতে অবস্থান করবেন, সিদ্দীক জান্নাতে অবস্থান করবেন, নবজাতক জান্নাতে অবস্থান করবে এবং যে ব্যক্তি শহরের কোথাও তার ভাইয়ের সাথে আল্লাহর জন্য মিলিত হয়, জান্নাতে অবস্থান করবে। [সহিহ জামে সগির : পৃষ্ঠা : ২৬০১]

 

শোভনীয় সামাজিকতাঃ~

উত্তম সামাজিকতার শোভা হচ্ছে অহংকারহীন গাম্ভির্যে নিজেকে পূর্ণ করে তোলা। লাঞ্ছনা এড়িয়ে নিজেকে বিনয়ের ভূষণে সজ্জিত করা। ভয় এবং তাচ্ছিল্য পরিহার করে স্মিত মুখে শত্র“ কিংবা বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করা। যখন তুমি ভরা মজলিসে অবস্থান করবে, তখন অযথা নাকে আঙুল দেয়া পরিহার করবে, হাই তোলা, থুথু ফেলা, ইত্যাদি বর্জন করবে। বক্তার প্রতি মনোনিবেশ করবে পরিপূর্ণভাবে। অযথা পিছনে ফিরে তাকাবে না। হাসি তামাশা এড়িয়ে যাবে।

 

ভ্রাতৃত্বের উদ্বোধকঃ~

কিছু মৌলিক আচরণীয় নীতিমালা রয়েছে যার সঠিক অনুবর্তনের ফলে মানুষের মনে গভীর হৃদ্যতা এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জেগে উঠে। তার অন্যতম হচ্ছে ভালো-মন্দ যাবতীয় ক্ষেত্রে নিজের সাথে অপরের তুলনা করা এবং সে অনুসারে অপরের সাথে আচরণ করা। পরস্পর সহমর্মিতা, ভালোবাসা বাড়িয়ে তোলে ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্কের আদান-প্রদান, আন্তরিকতার বহি:প্রকাশের মাধ্যমে। হাদিসে এসেছে—

তোমরা পরস্পর মোসাফাহা কর, বিদ্বেষ লোপ পাবে। একে অপরকে হাদিয়া প্রদান কর, ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে। এবং ঘৃণা দূরীভূত হবে। [মুয়াত্তা মালেক : ৯০৮/২]

 

পারস্পরিক সালাম ও হাদিয়া প্রদান বিদ্বেষী মনোভাব গলিয়ে দিয়েছে, একে-অপরের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি করেছে—এমন দৃষ্টান্ত আমরা অহরহ দেখতে পাব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :—

সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ ! তোমরা ঈমান আনয়ন ব্যতীত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। পারস্পরিক হৃদ্যতা ব্যতীত তোমাদের ঈমান আনয়ন পূর্ণাঙ্গ হবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন কিছুর সন্ধান দেব না, যা পালন করলে তোমরা একে অপরে হৃদ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ হবে ? তোমরা নিজেদের মাঝে সালামের প্রচলন ঘটাও। [ সহিহ জামে : ৭০৮১]

 

ভাইয়ের প্রতি সহমর্মিতা ও হৃদ্যতার সর্বোত্তম উদাহরণ হচ্ছে তার অনুপস্থিতিতে, অজ্ঞাতে তার জন্য দোয়া করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

মুসলিম তার ভাইয়ের অজ্ঞাতে তার জন্য যে দোয়া করে, তা কবুল করা হয়। (দোয়াকালীন) তার সম্মুখে একজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন, যখনই সে তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে, নিয়োজিত ফেরেশতা বলেন : আমিন, তোমাকেও এরূপ প্রদান করা হোক। [ মুসলিম : ৮৮]

 

ইমাম নববী রহ. বলেন :

মহান সালাফগণ যখনই নিজের জন্য দোয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন ভাইয়ের জন্য অনুরূপ দোয়া করতেন। কারণ, এর ফলে তার দোয়া কবুল করা হয় এবং ভাইয়ের জন্য দোয়ার সমপরিমাণ তাকেও প্রদান করা হয়। [ হা যিহি আখলাকুনা : ১৬৬-১৬৮।]

 

মানুষের মাঝে এ জাতীয় হৃদ্যতার সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ় করে তোলে অপরের সাথে স্মিত সম্ভাষণ, বিনয় ও করুণার আচরণ, আন্তরিক উপস্থাপন। এভাবে, যাবতীয় মতবিরোধ লোপ পায়, বিদ্বেষ বিলুপ্ত হয়, দৈহিকভাবে নানা কাঠামে বিভক্ত হলেও, মানুষ আন্তরিকভাবে হয়ে উঠে এক, সুমহান ঐক্যে একই মনোভাবনার অভিলাষী। ফুজাইল বিন আয়াজ—আবেদুল হারামাইন—মন্তব্য করেন:

ব্যক্তি তার সঙ্গীদের সাথে হৃদ্যতামূলক আচরণ করা, উত্তম সামাজিকতার অনুবর্তী হওয়া রাত জেগে এবাদত এবং দিনভর রোজা রাখার চেয়ে উত্তম। [ আল ওফিয়্যাত : ৪৮/৪]

 

ভ্রাতৃত্বের সুফলঃ~

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন :

তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর : তোমরা ছিলে পরস্পর শত্র“ এবং তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তার অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। [সূরা আলে ইমরান : ১০৩]

 

ভ্রাতৃত্ব আল্লাহ প্রদত্ত এক পরম নেয়ামত, তিনি প্রিয় বান্দা ও নির্বাচিত বন্ধুদের তা দান করেন। ভ্রাতৃত্ব হচ্ছে ফুল ও পল্লবে শোভিত এক বরকতপূর্ণ বৃক্ষ, নানাভাবে নিরবধি যা ফলদায়ক। ভ্রাতৃত্বের অন্যতম সুফল এই—

[১]~ ঈমানের স্বাদ অনুভব, এবং সৌভাগ্যবানদের জীবন উপভোগ করা যায়।

[২]~ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধদের আল্লাহ তাআলা তার করুণা দ্বারা পরিবেষ্টন করে রাখেন। কেয়ামতের ভয়াবহ দিবসে তাদের রক্ষা করেন।

[৩]~ আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভ্রাতৃত্ব ও হৃদ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ যারা, তারা শান্ত ও উৎফুল্ল সময় যাপন করে, যেদিন একমাত্র আল্লাহ পাকের আরশের ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না, এবং সেদিন যে-সাত শ্রেণির লোকদের ছায়া প্রদান করবেন, তারা তাদের অন্যতম হিসেবে গণ্য হবেন। আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত এক মুত্তাফাক আলাইহি হাদিসে এসেছে,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন : সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তার ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন তার ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোন ছায়া থাকবে না...(তাদের মাঝে তিনি উল্লেখ করেন)...এমন দু ব্যক্তিকে, যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে। তার উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে তাকেই কেন্দ্র করে। [মুত্তাফাক আলাইহি]

 

[৪]~ যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে একে-অপরে ভালোবাসায় আবদ্ধ হন, তারা অনুভব করেন এক অনাবিল আন্তর স্বাদ, আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

[৫]~ আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধন এক মজবুত রজ্জু, যে ব্যক্তি একে আঁকড়ে থাকবে, সে নাজাত পাবে।

[৬]~ আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তিগণ কেয়ামতের ভয়াবহ দিবসে আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেয়ামত প্রাপ্ত নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালিহীনদের সাথে অবস্থান করবেন।

[৭]~ আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ব্যক্তির আন্তর শুদ্ধতা, সৌকর্য মণ্ডিত আমল, আল্লাহ ভীতি, তাকওয়া, তার কিতাবের প্রতি সম্মান এবং রাসূলের সুন্নতের প্রেমের প্রমাণ বহন করে।

 

এ ছাড়াও, হে আমার প্রিয় ভাই, আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্বের রয়েছে আরো বিচিত্র সুফল, সঙ্কুচিত কলেবরে উল্লেখ সম্ভব নয় বলে আমরা এখানে তার উল্লেখ হতে বিরত থাকলাম। আল্লাহ পাক কেবল তারই উদ্দেশ্যে ভালোবাসা এবং শত্র“তা পোষণকে ইসলামের অন্যতম শক্তিশালী রজ্জু হিসেবে ঘোষণা করেছেন, যেমন এক রেওয়ায়েতে এসছে—

ঈমানের অন্যতম রজ্জু হচ্ছে আল্লাহর জন্য বন্ধুতা, তারই জন্য শত্র“তা, এবং আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, তারই জন্য বিদ্বেষ পোষণ। [সহিহ জামে : ২৫৩৯]
মানবীয় এই আন্তর আবেগের পরিপূর্ণ বিকাশ ও তার সফল রূপায়ণ ব্যতীত, কখনই, ঈমান পূর্ণাঙ্গ হবে না। সুতরাং ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ভালোবাসবে, তারই জন্য ঘৃণার বশবর্তী হবে, দান করবে আল্লাহর জন্য, তারই জন্য দানের হাত গুটিয়ে নিবে, নিশ্চয় তার ঈমান পূর্ণতা প্রাপ্ত হবে।’ [সহিহ জামে : ৫৯৬৫]

 

শয়তানের মন্ত্রণার বিরোধিতা, প্রবৃত্তির শাসন করার অনুপম স্বাদ আস্বাদনে যে আগ্রহী, এবং কেবল আল্লাহ, তার রাসূল, এবং মোমিনদের সদর্থে ভ্রাতৃত্ব লালনের অপরিমেয় সৌভাগ্য আহরণে ব্যগ্র, এটিই তার জন্য একমাত্র পথ: হাদিসে এসেছে—

তিনটি গুণ যার মাঝে পাওয়া যাবে, সে ঈমানের আস্বাদ লাভ করবে : আল্লাহ ও তার রাসূল তার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বলে গণ্য হবেন, মানুষকে ভালোবাসবে কেবল আল্লাহর জন্য, আল্লাহ তাআলা কুফুর হতে বিমুক্ত করার পর তাতে ফিরে যাওয়া ততটাই অপছন্দ করবে, যেমন অপছন্দ করে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে। [মুত্তাফাক আলাইহি]

 

আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব বাস্তবায়নে প্রতিকূলতা ও বিপদঃ~

আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনার পরও, পাঠক বিশেষের মন্তব্য হতে পারে, এ প্রক্রিয়ার অনৈতিক দিকগুলো এড়ানো এবং তাকে যথার্থ অর্থে আল্লাহর জন্য ভালোবাসা রূপে রূপায়ণ করার রক্ষাকবচ কি হবে ? এর বিবিধ ভালো দিক রয়েছে, এবং তুলনায় সেগুলোই অধিকাংশ সন্দেহ নেই, কিন্তু এর সংঘটনে, পাশাপাশি, রয়েছে এমন কিছু প্রতিকূলতা ও বিপদ যা এড়িয়ে যাওয়া এবং যা হতে নিজেকে রক্ষা অতীব আবশ্যক। নিম্নে আমরা এ সংক্রান্ত আলোচনা উপস্থাপনে প্রয়াস পাব।

প্রথম বিপদ : স্বার্থপরতা, আমিত্ব, অহমিকা

মানুষের মাঝে যদি স্বার্থপরতা ও আমিত্ব প্রকট হয়ে দেখা দেয়, তবে তা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, নষ্ট হয়ে যায় একে একে তার চরিত্রের যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্য। অহমিকা যদি হয়ে উঠে ব্যক্তির চরিত্রের প্রধান উপাদান, তবে লোপ পায় তার কল্যাণ, জেগে উঠে তার মাঝে এক কঠিন দুরাচারী সত্তা। তাকে আবদ্ধ করে সংকীর্ণ এমন এক ইতর বলয়ে, যেখানে সে নিজেকে ব্যতীত ভিন্ন কাউকে দেখতে পায় না। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন : অহংকার হচ্ছে সত্যের অপলাপ, এবং মানুষের সাথে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা।

 

দ্বিতীয় বিপদ : অপরের সাথে তাচ্ছিল্য ও উপহাস করা

উপহাস ও ঠাট্টা-বিদ্রƒপ ভ্রাতৃত্ব বিনষ্ট করে চূড়ান্তভাবে। মূর্খতা ও অনবধানতার ফলে মানুষের মাঝে এ আচরণের উদ্ভব ঘটে। দুর্বলের দৌর্বল্যের দাবিই হচ্ছে তাকে সহায়তা করা। বিভ্রান্তকে ঠাট্টা নয় ; পথ দেখানোই হচ্ছে মানবিকতা।

 

তৃতীয় বিপদ : বংশ ও বিত্ত নিয়ে গর্ব

মুসলমানদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সংরক্ষণ ও রূপায়ণ, তাদের মাঝে চাপিয়ে দেওয়া শ্রেণিভেদ দূরীকরণ, সামাজিক যাবতীয় সাম্য সংঘটনের লক্ষ্যে ইসলাম বংশ অহমিকাকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছে। কারণ, আদম আ. মানব জাতির পিতা, এবং সেই সূত্রে সকলই একই বংশের, একই রক্তের উত্তরাধিকারী। কারো মাঝে কোন তারতম্য নেই।

 

চতুর্থ বিপদ : মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনকে মান্য না করা

ইসলাম সমাজব্যবস্থার অনুবর্তনই তার সদস্যদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব সংঘটনের অন্যতম চালিকাশক্তি। এ সমাজব্যবস্থার অন্যতম গুণ হবে এই যে, এর সদস্যরা একে অপরকে ভালোবাসবে আল্লাহর জন্য, তারই জন্য বিদ্বেষ পোষণ করবে অপরের প্রতি, দান করবে তারই জন্য, দানের হাত গুটিয়ে নিবে তারই স্মরণে। এমন সমাজ ব্যবস্থার প্রধান চালিকা শক্তি প্রণোদনা হবেন মহান আল্লাহ তাআলা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে :

কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ ! তারা মোমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার উপর অর্পণ না করে ; অত:পর তোমার সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়। [সূরা নিসা : ৬৫]

 

পঞ্চম বিপদ : আল্লাহ প্রদত্ত বিধান পরিত্যাগ

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাই-মিয়া বলেন :

মূর্খতা কিংবা প্রবৃত্তির প্রতারণার শিকার হয়ে মানুষ যখন আল্লাহর দেয়া বিধান পরিত্যাগ করে, তখন তাদের মাঝে জন্ম নেয় শত্র“তা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ। কারণ, তখন সকলের সম্মিলিত কোন দায় থাকে না যাকে কেন্দ্র করে তারা একত্রিত হবে। তারা, বরং, বিভক্ত হয়ে পড়ে, তুষ্ট থাকে যে যার মতিতে। [আল উখুওয়া : ৩৮-৪১]

 

উল্লেখিত প্রতিকূলতা ও বিপদকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীনের মুণ্ডনকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি এরশাদ করেন :

পারস্পরিক বিশৃঙ্খলাই মুণ্ডনকারী। আমি বলছি না যে, তা চুল মুণ্ডন করে, বরং তা দীন মুণ্ডন করে। [আবু দাউদ, তিরমিজি]

 

আমরা আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেন।

 

ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ

 

]]>
http://www.quraneralo.com/brotherhood-for-allah-2/feed/ 0
আল্লাহর জন্যে ভ্রাতৃত্ব – পর্ব ১ http://www.quraneralo.com/brotherhood-for-allah-1/ http://www.quraneralo.com/brotherhood-for-allah-1/#comments Sat, 01 Sep 2012 00:23:11 +0000 shabab http://www.quraneralo.com/?p=3582

লেখক : আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান | সম্পাদনা : কাউসার বিন খালেদ

 সমকালীন চৈতন্য জগতে, চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রই, দৃষ্টিপাত করে লক্ষ্য করবেন, এবং বিমূঢ় হবেন যে, বোধ, চেতনা এবং চিন্তায় ব্যাপক পতন—উদ্দিষ্ট মর্মের তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বিভিন্ন শব্দের। এ গোত্রেরই একটি শব্দ হচ্ছে الأخوة في الله বা আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব।

الأخوة في الله বা আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব সে মজবুত দৃঢ় বন্ধন, যা প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মাঝে সুদৃঢ় বন্ধন অটুট রাখে ; এ প্রেমের বন্ধন অন্য কিছু নয়, কেবল প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মাঝে আল্লাহর নৈকট্য সঞ্জাত প্রেম। ‘মোহাববাত’ বা প্রেম-ভালোবাসাকে, মুসলিম মনীষী ইমাম নববী, সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—যা প্রেমিকের ‘মত’, তার প্রতি ঝোঁক। ইবনে হাজর রহ. এর ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে—ঝোঁক দ্বারা উদ্দেশ্য যা সর্বতোভাবে ঐচ্ছিক—পিতা-মাতা-বা যাদের সাথে সম্পর্ক-ভালোবাসা প্রাকৃতিক, এবং যে প্রেম-ভালোবাসা চাপিয়ে দেয়া—তা নয়। ভালোবাস হচ্ছে, যাকে কল্যাণময় বলে জ্ঞান করে, বিশ্বাস করে, তা উদ্দেশ্য করা।[1]

সৎ ভ্রাতৃত্ব মানুষের আদি স্বভাবের গভীরে প্রোথিত, যা পর্যবসিত হয় নিজের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়ায়। আবু হুরাইরা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে তার, ও তার মায়ের জন্য মোমিনদের সাথে ভালোবাসার সম্পর্কের দোয়া প্রার্থনা করেছিলেন। রাসূল দোয়া করে বলেছিলেন—হে আল্লাহ ! আপনার মোমিন বান্দাদের মাঝে এই বান্দা ও তার মায়ের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন। এবং তাদের কাছেও মোমিনদের প্রিয় করে তুলুন।[2] কুরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন—

الْأَخِلَّاءُ يَوْمَئِذٍ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ إِلَّا الْمُتَّقِينَ.

অর্থ : ভ্রাতৃগণ সেদিন পরস্পর পরস্পরের শত্রু হবে—মুত্তাকীগণ ব্যতীত।[3]

কারণ, মুত্তাকীগণ ব্যতীত অন্যদের ভ্রাতৃত্ব পার্থিবে ছিল আল্লাহ ব্যতীত ভিন্ন কারো জন্য ; তাই কেয়ামত দিবসে তা পরিবর্তিত হয়েছে শত্রুতায়। তবে, যারা শিরক ও পাপাচারে তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদের ভ্রাতৃত্ব অক্ষয়-অটল, যে যাবৎ আল্লাহই হবেন তাদের ভালোবাসার একমাত্র সূত্র, তাদের ভ্রাতৃত্ব অব্যাহত থাকবে।[4] অপর স্থানে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন—

فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآَتَوُا الزَّكَاةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَنُفَصِّلُ الْآَيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ.

অত:পর তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে, এবং জাকাত আদায় করে, তবে তারা তোমাদের দীনের ভাই, আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেই।[5]

আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভ্রাতৃত্বের মৌলিক ভিত্তি হচ্ছে পাপ হতে তওবা, সালাত কায়েম, জাকাত আদায়। ভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন—

إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ ﴿45﴾ ادْخُلُوهَا بِسَلَامٍ آَمِنِينَ ﴿46﴾ وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ ﴿47﴾ لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُمْ مِنْهَا بِمُخْرَجِينَ ﴿48﴾.

মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে, প্রস্রবণসমূহের মাঝে ; তাদের বলা হবে, তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে তাতে প্রবেশ কর ; আমি তাদের অন্তর হতে বিদ্বেষ দূর করব ; তারা ভ্রাতৃভাবে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে আসনে অবস্থান করবে। সেখানে তাদেরকে অবসাদ স্পর্শ করবে না, এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না।[6]

উপরোক্ত আয়াত ও পূর্ববর্তী আলোচনা হতে আমরা দেখতে পাই যে, তাকওয়া ভিত্তিক ভ্রাতৃত্ব ব্যতীত যে কোন ভ্রাতৃত্ব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যাদের ভ্রাতৃত্ব আল্লাহর জন্য, আল্লাহকে ভিত্তি করে, তা অক্ষয়। জান্নাতে প্রবেশ অবধি অব্যাহত।

ভ্রাতৃত্বের মৌল ভিত্তি

ভ্রাতৃত্বের মৌল ও একক ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা। আর ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা’-র মৌল ভিত্তি হচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ যা পছন্দ করেন, তা নির্বাচন করা। আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন, পছন্দ করেন পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের। যারা এহসানকারী, মুত্তাকী, ধৈর্যশীল, ন্যয়পরতা অবলম্বনকারী, আল্লাহর রাস্তায় জোটবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ যাদের একান্ত কাম্য—আল্লাহ এদের সবাইকে আপন করে নিয়েছেন। আল্লাহর জন্য অপছন্দ করার মৌল ভিত্তিও, এমনিভাবে, হচ্ছে আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, সকলের জন্য তা অপছন্দ করা। আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন জালেম ও সীমা-লঙ্ঘন কারীদের ; অপব্যয়ী, বিশৃঙ্খলা বিস্তারকারী, খিয়ানত ও অহংকার অবলম্বীদের তিনি আপন করেন না। যে ভ্রাতৃত্ব আল্লাহর জন্য, তা হবে সর্বব্যাপী, তাবৎ মোমিনদের পরিবেষ্টন করবে তা। তবে, তারতম্য হবে তাদের কল্যাণের উপর ভিত্তি করে। পাপাচারে লিপ্ত হয়ে, সুতরাং, অত:পর তা হতে তওবা করেছে, কিংবা যার উপর ইসমালী শরিয়া ভিত্তিক আইনি শাস্তি কার্যকরী হয়েছে, তার সঙ্গে শত্রুতার আচরণ করা যাবে না,—যতক্ষণ সে ইসলামের গন্ডিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখে ; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এক হাদিসে পাওয়া যায়, জনৈক সাহাবীর উপর অভিশাপ প্রদানে বাধা দিচ্ছেন, যার উপর মদ্য-পানের শাস্তি কার্যকর করা হয়েছিল। এই নিষেধাজ্ঞা কয়েকবার উচ্চারণ করে তিনি বলেন : তোমরা তাকে লা’নত (অভিশাপ) দিয়ো না, আল্লাহর শপথ ! আমি নিশ্চিত যে সে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে।[7]

এ হাদিসের উপর ভিত্তি করে ইবনে হাজরের মন্তব্য—পাপীর অন্তরে পাপের সংঘটন এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের ভালোবাসা একই সময়ে সহাবস্থান সম্ভব। পুন: পুন: পাপ সংঘটনের পরও পাপীর অন্তর হতে আল্লাহ ও তার রাসূলের ভালোবাসা ছিনিয়ে নেয়া হয় না।[8]

উপরোল্লেখিত আলোচনা হতে এ স্পষ্ট যে, ভ্রাতৃত্ব কখনো ব্যক্তিক হতে পারবে না, বরং ব্যক্তির সাথে কেবল তখনি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে যখন সে আল্লাহর নৈকট্য দ্বারা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠবে। ভ্রাতৃত্বের পরিমাণে তারতম্য হবে আল্লাহর সাথে নৈকট্যের তারতম্যের ভিত্তিতে। প্রেমাস্পদ যতটা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, তার সাথে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনও হবে ততটা দৃঢ় ও মজবুত। আল্লাহর সাথে নৈকট্য ও দূরত্বের ভিত্তিতেই তারতম্য হবে ভ্রাতৃত্বে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে এক নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য লাঞ্ছনার বদ-দোয়া করতে শুনলেন, তিনি তাদেরকে এই বলে বাধা দিলেন যে, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের বিপক্ষে শয়তানের সহযোগী হয়ো না।[9] কারণ, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি তাদের বদ-দোয়া শুনে তার ভ্রান্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাবে বৈ হ্রাস পাবে না ; এভাবে, সে ক্রমে আল্লাহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। বরং, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তোমরা তার মাগফিরাতের দোয়া কর, তাকে উপদেশ প্রদান কর—হয়তো এভাবেই সে পাপাচার পরিত্যাগে উদ্যোগী হয়ে উঠবে।

‘আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব’ মর্মের মানদন্ড

আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব, যা ব্যতীত ঈমান কখনো পূর্ণতা লাভ করে না, তার মৌলিক মানদন্ড হচ্ছে—যা রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবগত করিয়েছেন এই বলে—সে সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ ! তোমাদের কেউ ততক্ষণ মোমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে যে-কল্যাণ নিজের জন্য পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে।[10] কিরমানী এর সাথে আরো সংযোজন করেন—এবং ঈমানের অন্যতম অঙ্গ হচ্ছে যে-অকল্যাণ নিজের জন্য অপছন্দ করে, তা তার ভাইয়ের জন্যও অপছন্দ করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টি উল্লেখ করেননি, কারণ, কোন কিছুকে ভালোবাসা বা পছন্দ করার অনিবার্য অর্থই হচ্ছে তার বিপরীত বিষয়কে অপছন্দ করা। তাই, রাসূল কেবল পছন্দনীয় বিষয়ের উল্লেখের মাঝেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।[11] আল্লামা ইবনে উসাইমিন, হাদিসটির ব্যাখ্যায় আরো সংযোজন করেন যে, এই শর্ত ব্যতীত পরিপূর্ণ মোমিন হবে না : কল্যাণের যা নিজের জন্য পছন্দ করে, তা তার ভাইয়ের জন্যও পছন্দ করবে...ফলে সে সক্ষম হবে না তাদের সাথে প্রতারণা করতে, খিয়ানত করতে, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করতে এবং সে সক্ষম হবে না তাদের বিরুদ্ধে জুলুম করতে—যেভাবে সে সক্ষম হয় না বা তার পক্ষে সম্ভব নয় নিজের ক্ষেত্রে এ আচার অবলম্বন করতে। এ হাদিস প্রমাণ করে, ব্যক্তি নিজের জন্য পছন্দনীয় কোন বিষয় যদি তার ভাইয়ের জন্য অপছন্দ করে, বা নিজের জন্য যা পছন্দ করে না, যদি তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে (নির্বাচন করে) তবে সে মোমিন নয়। অর্থাৎ তার ঈমান পরিপূর্ণতা সমৃদ্ধ নয়। এবং এ ধরনের আচার কবিরা গুনাহ ভুক্ত।[12]

বন্ধু বা সঙ্গীর মাঝে যে সমস্ত গুণ আবশ্যকীয়

মুসলমান মাত্রই অপর মুসলমানের কাছে দীনী ভাই। এর মানে এই নয় যে, আমরা সকলের সাথে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলি। নিম্নে আমরা এমন কিছু গুণ উল্লেখ করব, যা বন্ধু বা সঙ্গীর মাঝে থাকা আবশ্যকীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন—

মানুষ তার বন্ধুর ধর্মই গ্রহণ করে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেই যেন বন্ধু নির্বাচনে সতর্কতা অবলম্বন করে।[13] এ গুণ সমূহের মাঝে অন্যতম হচ্ছে—

  • বন্ধু হতে হবে মুসলমান, যে তার কথায়, কর্মে দীনকে আঁকড়ে থাকবে। সৎকাজের আদেশ দেবে, অসৎ কাজে বাধা প্রদান করবে।
  • ইসলামের আচরণীয় গুণ দ্বারা সমৃদ্ধ হবে, অভ্যাস ও আচরণে যা সুন্দর, সু-শোভনীয় বলে গৃহীত, তা রক্ষা করবে সযত্নে।
  • বন্ধুকে হতে হবে পরিচ্ছন্ন মানসিকতার অধিকারী, যাবতীয় কলুষতা ও ত্রুটি হতে বিমুক্ত, আল্লাহ তাআলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশের উপর অবিচল ও দৃঢ়। কারণ, দুরাচার ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন কোন ব্যক্তির সাথে বন্ধুতার কোন অর্থ নেই। তাকে বিশ্বাস করা যায় না, তার আচার ও ব্যবহার সতত পরিবর্তনশীল। এমনিভাবে, তার সাহচর্য, এমনকি তার কৃতকর্মের দর্শনও বর্জনীয় সর্বার্থে। এর ফলে অন্তরে পাপের বিষয়টি লঘু হয়ে যায়, বিলুপ্ত হয় তার প্রতি ঘৃণা।
  • পার্থিবের প্রতি লোভী হতে পারবে না। কারণ, এটি পার্থিবের প্রতি আসক্তের গুণ।[14] এবং এ আসক্তি খুবই সাময়িক। এক কবি বলেন : ‘যখন গুনবে, দেখবে মানুষ অসংখ্য, কিন্তু বিপদকালীন কাউকেই খুঁজে পাবে না।’

উপরোক্ত আলোচনাকে আমরা উমর ফারুক রা.-এর কথায় প্রতিফলিত এবং মৌলিক বক্তব্য হিসেবে দেখতে পাই। তিনি বলেন :—তুমি সৎ ভ্রাতৃগণের সংসর্গ অবলম্বন কর, নিজেকে তাদের বলযে মিশিয়ে দাও। কারণ, স্বাচ্ছন্দ্যে তারা সৌন্দর্য হয়ে উপস্থিত হবে, বিপদে আসবে দুর্গ হয়ে। তোমার ভাইয়ের বিষয়টি (যদি সে কোন অপ্রীতিকর কিছু করে ফেলে) উত্তমভাবে বিবেচনা কর যতক্ষণ এ বিষয়ে ব্যাখ্যার কোন সূত্র না পাও। এবং এ বিষয়ে তার সাথে তুমি দূরত্ব বজায় রাখ, তোমার গোপন বিষয় (অর্থাৎ, তুমি যে জান, সে বিষয়টি) তাকে অবগত করিয়ো না, এবং দীনের ব্যাপারে এমন ব্যক্তিদের পরামর্শ তুমি গ্রহণ কর, যারা আল্লাহকে ভয় করে।[15]

উপরোক্ত গুণাবলি সমৃদ্ধ ব্যক্তির সন্ধান পেলেই কেবল তার সাথে বন্ধুত্ব করবে, কারণ, আমরা এমন এক সময়ে বাস করি, যে সময়ে সৎ বন্ধু ও সঙ্গী পাওয়া খুবই দুর্লভ।



[1] ফতহুল বারি : ১/৫৮

[2] মুসলিম।

[3] সূরা যুখরুফ : ৬৭

[4] সা’দীর তাফসীর : পৃষ্ঠা : ৭৬৯

[5] সূরা তওবা : আয়াত : ১১

[6] সূরা হিজর : ৪৫-৪৮

[7] বোখারি : ৬৭৮

[8] ফতহুল বারি : ১২/৬৭৮

[9] বোখারি : ৬৭৮

[10] মুত্তাফাক আলাইহি

[11] ফতহুল বারি ৫৮/১

[12] শরহু রিয়াযুস সালিহীন : ইবনে উসাইমিন ৬৪১/১

[13] আবু দাউদ : ২০৬২/৪, তিরমিজি : ৫০৯/৪

[14] আল উখুওয়াত : জাসিম বিন মুহাম্মদ আল ইয়াসিন, পৃষ্ঠা : ৯-১১

[15] মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদীন : ইবনে কুদামা, পৃষ্ঠা : ১১৪

]]>
http://www.quraneralo.com/brotherhood-for-allah-1/feed/ 4
আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আমল – পর্ব ২ http://www.quraneralo.com/good-deeds-that-allah-likes-very-much-2/ http://www.quraneralo.com/good-deeds-that-allah-likes-very-much-2/#comments Tue, 07 Aug 2012 05:35:30 +0000 shabab http://www.quraneralo.com/?p=3572 লেখিকাঃ আসমা বিনতে রাশেদ আর-রুয়াইশেদ   | অনুবাদ : জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের   | সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

 পর্ব ১  |  পর্ব ২ 

 

সাত. আল্লাহর নিকট উত্তম আমল হল, আল্লাহর যিকির করা:

প্রমাণ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

 «أحب الأعمال إلى الله أن تموت ولسانك رطب من ذكر الله».

“আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল, তুমি মারা যাবে এ অবস্থায় যে তোমার জিহ্বা আল্লাহর যিকিরে থাকবে তরতাজা।  [1]

আল্লামা তীবী রহ. বলেন,

জবান তরতাজা রাখার অর্থ হল, জবানে অতি সহজে আল্লাহর যিকির চলতে থাকা। আর এর বিপরীতে জবান শুষ্ক থাকার অর্থ হল, মুখে যিকির বন্ধ থাকা। তারপর মুখ আল্লাহর যিকির দ্বারা সচল থাকার অর্থ হল, সবসময় আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত থাকা।

মূলত: যিকির হল, যার যিকির করা হয়, তার বিষয়ে সবসময় অন্তর সতর্ক ও সজাগ থাকা। যিকিরকে যিকির বলে নাম রাখার কারণ, যিকির অর্থ স্মরণ করা। আর মুখের যিকির অন্তরে স্মরণ করার উপর প্রমাণ বহনকারী। কিন্তু যেহেতু মুখের কথার উপর যিকিরের প্রয়োগটা অধিক, তাই মুখের যিকিরকেই যিকির বলে নাম করা হয়েছে এবং যিকির বললে আমরা সাধরণত মুখের যিকিরকেই দ্রুত বুঝি।

যিকির: যে সব শব্দাবলীকে অধিক পরিমাণে বলার জন্য হাদিস ও কুরআনে উৎসাহ দেয়া হয়েছে, সে সব শব্দগুলোকে বলা বা উচ্চারণ করাকে যিকির বলা হয়। যেমন, “আল-বাকীয়াতুস সালিহাত” বা স্থায়ী নেক আমলসমূহ, আর সেগুলো হচ্ছে,

سبحان الله، الحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر  

অনুরূপ আরও যেমন, লা হাওলা..., বিসমিল্লাহ, হাসবুনাল্লাহ..., ইস্তেগফার, ইত্যাদি, এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা।

আবার কোনো কোনো সময় ‘যিকির’ শব্দ ব্যবহার করে তার দ্বারা উদ্দেশ্য, ঐ সব নেক আমলসমূহ যেগুলোকে বান্দার উপর ওয়াজিব বা মোস্তাহাব করা হয়েছে, সেগুলোকে সবসময় চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত করা, হাদিস অধ্যয়ন করা, ইলমি আলোচনা করা ও নফল সালাত আদায় করা।

যিকির অনেক সময় মুখ দ্বারা হয়ে থাকে এবং তার উপর উচ্চারণকারীকে সাওয়াব দেয়া হয়। কিন্তু শর্ত হল, তার দ্বারা যেন কেবল শব্দের অর্থই উদ্দেশ্য হয়। আর যদি উচ্চারণের সাথে অন্তরের যিকিরের সাথেও সম্পৃক্ত করা হয়, তা হলে তা হবে, অধিক পরিপূর্ণ যিকির। আর যদি তার সাথে সাথে যিকির দ্বারা যিকিরকৃত শব্দগুলোর অর্থ ও যিকিরের শব্দগুলোর মধ্যে যে আল্লাহর মাহাত্ম্য ও তাঁর থেকে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি দূরিকরণ রয়েছে তা উদ্দেশ্য হয়, তবে তার পরিপূর্ণতা আরও বেড়ে যায়। আর যদি যিকিরের শব্দাবলী কোনো নেক আমলের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবে তার পরিপূর্ণতা আরও বৃদ্ধি পায়। আর যদি যিকিরের মধ্যে আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ও ইখলাস সঠিকভাবে সম্পৃক্ত হয়, তবে তা চূড়ান্ত পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।

মুখের যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য- ঐসব শব্দাবলী যে সব শব্দাবলী আল্লাহর তাসবীহ-পবিত্রতা, তাহমীদ-প্রসংশা ও তামজীদ-বড়ত্ব এর প্রমাণ বহন করে।

আর অন্তরের যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য- আল্লাহর সত্ত্বা ও সিফাতসমূহের প্রমাণসমূহের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা করা, আল্লাহর তা‘আলা তার বান্দাদের যে সব আদেশ-নিষেধ করেছেন, সে আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হওয়ার উদ্দেশ্যে তাতে চিন্তা করা, আমলের বিনিময় সংক্রান্ত সংবাদগুলোর উপর চিন্তা করা এবং আল্লাহর মাখলুকাতের সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তা করা।

বস্তুত: অন্তরের যিকির দুই প্রকার:

এক. এ প্রকারের যিকির হচ্ছে, সর্বাধিক উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ যিকির, আর তা হচ্ছে, আল্লাহর মাহাত্ম্য, শান-শওকত, ক্ষমতা, মালিকানা, ও আসমান ও যমীনে তার যে সব নিদর্শন রয়েছে সেগুলো উপলব্ধি করার জন্য নিজের চিন্তা-শক্তিকে নিয়োগ করা।

দুই. আদেশ নিষেধসমূহ পালনের সময় অন্তরের যিকির; আল্লাহর নিকট সাওয়াব লাভের আশায় এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার ভয়ে, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা পালন করবে এবং আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে।

আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যিকির; আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত থাকা এবং তার আনুগত্যে ডুবে থাকা। এ কারণেই সালাতকে যিকির বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ فَٱسۡعَوۡاْ إِلَىٰ ذِكۡرِ ٱللَّهِ ٩ ﴾ [الجمعة: ٩]

“তখন তোমরা আল্লাহর স্মরনের দিকে ধাবিত হও”। [আল-জুমু‘আ, আয়াত: ৯]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرٗا كَثِيرٗا ٤١ ﴾ [الاحزاب: ٤١]   

“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর”। [আল-আহযাব, আয়াত: ৪১]

এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ্ তা‘আলা তার বান্দাদেরকে আল্লাহর যিকির করা ও তার শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দেন, আরও নির্দেশ দেন যেন অধিকাংশ সময়ে তারা যাতে তাদের জিহ্বাকে আল্লাহর যিকির, তাসবীহ, তাহলীল, আল্লাহ প্রশংসা ও বড়ত্বের বর্ণনায় লিপ্ত রাখেন।

আল্লামা মুজাহিদ রহ. বলেন, যিকিরের শব্দগুলো এমনই যেগুলো পবিত্র, সাধারণ অপবিত্র ও বেশী অপবিত্র ব্যক্তিও বলতে পারে। তিনি আরও বলেন, একজন ব্যক্তি ততক্ষণ আল্লাহর যিকির-কারী হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় এবং শোয়া অবস্থায় আল্লাহর যিকির করবে।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা একমাত্র যিকির ছাড়া আর যত প্রকারের ইবাদত বান্দার উপর ফরয করেছেন, সব ইবাদতের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং অপারগতার সময় তার অপারগতাকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যিকিরের এমন কোনো সীমা নির্ধারণ করেন নি যেখানে গিয়ে বান্দা থামবে। অনুরূপভাবে যিকির ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে কারও ওজরকে গ্রহণ করেন নি, যদি না তাকে ছাড়ার ব্যাপারে জোর করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ فَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ قِيَٰمٗا وَقُعُودٗا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمۡۚ ١٠٣ ﴾ [النساء: ١٠٣]

“তখন দাড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করবে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৩]

রাতে-দিনে, জলে-স্থলে, সফরে-আবাসস্থলে, প্রাচুর্য- দারিদ্রতা, অসুস্থতা-সুস্থতা. প্রকাশ্যে-গোপনে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করতে হবে। যখন তোমরা তা করবে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর সালাত পেশ করবেন, (তোমাদের কথা তাঁর কাছে যারা আছে তাদের কাছে বর্ণনা করবেন) অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণও তা করবেন।

মু‘আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন,

«ما شيء أنجى من عذاب الله من ذكر الله».

আল্লাহর আযাব হতে মুক্তি দেয়ার জন্য যিকির থেকে অধিক শক্তিশালী আর কিছুই নাই” [2]

আল্লাহ্ তা‘আলা যিকির শব্দটি কুরআনের অনেক আয়াতে উল্লেখ করেন। আর যিকিরকারীর জন্য ‘আল্লাহর স্মরণ করা’ আল্লাহ্ তা‘আলা তার বিনিময় বলে আখ্যায়িত করেন। একজন যিকিরকারীকে আল্লাহ স্মরণ করবে, এটি তার জন্য দুনিয়ার সব কিছু হতে উত্তম এবং দুনিয়াতে এর চেয়ে বড় কোনো আমল হতেই পারে না। আর এর মাধ্যমেই নেক আমলসমূহের পরিসমাপ্তি ঘটানোর কথা বলেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ألا أنبئكم بخير أعمالكم، وأزكاها عند مليككم، وأرفعها في درجاتكم، وخير لكم من إنفاق الذهب والورق، وخير لكم من تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم، ويضربوا أعناقكم؟! قالوا: بلى! قال: ذكر الله تعالى» [أخرجه الترمذي].

“আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের জন্য সর্ব উত্তম আমলসমূহ সম্পর্কে জানিয়ে দেব? আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মুনিবের নিকট পবিত্র আমল কোনটি তা জানিয়ে দেব? আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে, এমন আমলসমূহ সম্পর্কে জানিয়ে দেব? আমি কি তোমাদেরকে এমন আমল বাতলিয়ে দেব, যা তোমাদের জন্য স্বর্ণ মুদ্রা আল্লাহর রাহে ব্যয় করা থেকে উত্তম? আমি কি তোমাদেরকে এমন আমল বিষয়ে তোমাদের জানিয়ে দেব, যা তোমাদের জন্য দুশমনদের সাথে মুখোমুখি হয়ে তোমরা তাদের হত্যা করবে এবং তারা তোমাদের হত্যা করবে তা হতে উত্তম? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ! তিনি বললেন, তা হল, আল্লাহ তা‘আলার যিকির” [তিরমিযি] [3]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«أحب الكلام إلي الله أربع؛ سبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر؛ لا يضرك بأيهن بدأت» [أخرجه مسلم].

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় কালাম চারটি। এক- সুবহানাআল্লাহ দুই- আলহামদু লিল্লাহ-তিন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ চার-আল্লাহু আকবর। যেটি দিয়েই শুরু কর, তাতে কোন অসুবিধা নাই” [মুসলিম] [4]

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর উপকারিতা: বলা হয়ে থাকে যে, এ কালিমার মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য আছে:

এক. এ কালেমার মধ্যে যতটি শব্দ আছে সব কটি শব্দ ‘হুরুফে জাওফিয়া’ অর্থাৎ শব্দগুলোর উচ্চারণের স্থান হল, মুখের মধ্যখান যাকে পেট বলা হয়। এ কালেমার মধ্যে এমন কোনো শব্দ নেই যে শব্দের উচ্চারণের স্থান ঠোট ব্যবহার করতে হয়,  যেমন ‘বা’, ‘মিম’, ‘ফা’, ইত্যাদি। এ দ্বারা ইশারা করা হল, এ কালেমা মানুষ যেন শুধু ঠোটে বা মুখে উচ্চারণ না করে বরং পেট-অন্তর-থেকে উচ্চারণ করে, শুধু ঠোটে -মুখে- উচ্চারণ যথেষ্ট নয়।

দুই. এ কালেমার মধ্যে নুকতা বিশিষ্ট কোন শব্দ নাই; বরং সবকটি হরফ বা শব্দ নুকতা হতে খালি। এ দ্বারা উদ্দেশ্য এ কথার দিক ইশারা করা, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নাই। এ কালেমা আল্লাহ ছাড়া যত মা‘বুদ আছে সমস্ত মা‘বুদ হতে খালি।

আট. সর্বাধিক প্রিয় আমল উত্তম চরিত্র:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أحب عباد الله إلى الله أحسنهم خلقًا».

“আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় বান্দা হল, যাদের চরিত্র সুন্দর। [5]

‘খুলুক’ ও ‘খালক’ দুটি শব্দই আরবিতে একত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন বলা হয়, অমুক حَسَنُ الخُلُقِ والخَلْق؛ অর্থাৎ লোকটি ভিতর ও বাইর উভয় দিক দিয়ে সুন্দর।

মানুষ গোস্ত মাংস দ্বারা ঘটিত যা চোখ দ্বারা দেখা যায়, এবং এক রূহ ও আত্মা দিয়ে তৈরি যা চোখ দিয়ে দেখা যায় না; তবে তা মানুষ তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পায়। আর প্রতিটির জন্য একটি অবস্থা ও আকৃতি রয়েছে; তা হয়তো খারাপ অথবা সুন্দর।

আর চরিত্র: সে তো এক মজবুত অবস্থার নাম যা মানবাত্মার মধ্যে প্রগাঢ় হয়ে বিদ্যমান; তা থেকে যাবতীয় কর্মগুলো কোন প্রকার চিন্তা-ফিকির ও কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া অতি সহজে প্রকাশ পায়। আর কোনো মানুষকে ততক্ষণ পর্যন্ত সৎ চরিত্রবান বলে আখ্যায়িত করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার আত্মার মধ্যে সুন্দর চরিত্র প্রগাঢ় ও মজবুতভাবে স্থাপিত না হয় এবং সুন্দর চরিত্র ও যাবতীয় কর্ম তার থেকে কোনো প্রকার কৃত্রিমতা ও কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া প্রকাশ না পায়। আর যদি কোনো ব্যক্তি ভনিতা করে কোনো ভালো কাজ করে, তাকে এ কথা বলা যাবে না যে, এটি তার চরিত্র। এর দৃষ্টান্ত হল, যে ব্যক্তি কোনো জরুরি প্রয়োজনে ভান করে তার টাকা ব্যয় করলো অথবা অতি কষ্টে রাগের সময় চুপচাপ থাকল, তাকে এ কথা বলা যাবে না, লোক দানশীল বা ধৈর্যশীল।

মানুষের বাহ্যিক আকৃতির পরিবর্তন করা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়; কিন্তু মানুষের আখলাক বা চরিত্রের পরিবর্তন করা সম্ভব। মানব চরিত্র পরিবর্তন হয়। এ জন্যই দ্বীনের আগমন ঘটেছে; যা মানুষকে ভালো ও উত্তম চরিত্রের প্রতি আহ্বান করে এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করার প্রতি দাওয়াত দেয়। আর এতে অসিয়ত, ওয়ায ও শিক্ষা দেয়ার বিধান পাওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنفُسِهِمۡۗ ١١﴾ [الرعد: ١١]

“নিশ্চয় আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে”। [সূরা রা‘আদ, আয়াত: ১১]

অনুরূপভাবে নতুন নতুন আখলাক ও চরিত্রসমূহ চেষ্টা ও সাধনা করে অর্জন করা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রভুকে ডাকতেন, যাতে তিনি তাকে সর্বাধিক সুন্দর আমলসমূহের দিকে পথ দেখান  এবং সুন্দর চরিত্রসমূহের প্রতি পথ দেখান, আর তাকে চরিত্রবান হওয়ার তাওফিক দান করেন। তিনি বলে বলেন,

«اللهم اهدني لأحسن الأخلاق لا يهدي لأحسنها إلا أنت، واصرف عني سيئها لا يصرف عني سيئها إلا أنت». [أخرجه النسائي]،

“হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সুন্দর আখলাকসমূহের পথ দেখান। সুন্দর আখলাকের প্রতি আপনি ছাড়া কেউ পথ দেখাতে পারে না। আর আপনি আমার থেকে খারাপ চরিত্রগুলোকে হটিয়ে দিন, আমার থেকে খারাপ চরিত্রগুলো আপনি ছাড়া কেউ দূরে সরাতে পারে না” [বর্ণনায় নাসায়ী] [6]

তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এ বলে অসিয়ত করতেন-

«وخالق الناس بخُلُق حسن»

তোমরা মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার দ্বারা আচরণ কর [7]

কোনো কোনো আলেম সুন্দর চরিত্রের কিছু আলামত একত্র করেছেন। তারা বলেন, সুন্দর আখলাক হল, অধিক লজ্জা করা, মানুষকে কম কষ্ট দেয়া, অধিক যোগ্যতার অধিকারী হওয়া, কথাবার্তায় সত্যবাদী হওয়া, কম কথা বলা, অধিক জ্ঞান রাখা, পদস্খলনমূলক কাজ কম হওয়া, অনর্থক কথা কম বলা বা অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকা, সৎকাজে অগ্রণী হওয়া ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, আত্মসম্মান বজায় রাখা, ধৈর্যশীল হওয়া, কৃতজ্ঞ হওয়া, অল্পে তুষ্ট হওয়া, সহনশীল হওয়া, কোমলতা অবলম্বন, পবিত্র হওয়া, দয়ার্দ্র হওয়া, অভিশাপকারী না হওয়া, গালি-গালাজকারী না হওয়া, ছোগলখুরী না করা, গীবতকারী না হওয়া, তাড়াহুড়া কারি না হওয়া, হিংসুক না হওয়া, কৃপণ না হওয়া, বিদ্বেষ না থাকা, হাসি-খুশি থাকা, আল্লাহর জন্য মহব্বত কারি হওয়া এবং আল্লাহর জন্য দুশমনি করা, আল্লাহর জন্য রাজি-খুশি হওয়া এবং আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করা। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من شيءٍ يوضع في الميزان أثقل من حسن الخلق، وإن صاحب حسن الخلق ليبلغ به درجة صاحب الصوم والصلاة». [أخرجه الترمذي].

“উত্তম চরিত্র হতে আর কোন অধিক ভারি জিনিস কেয়ামতের দিন মিযানে রাখা হবে না। একজন উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি তার উত্তম চরিত্র দ্বারা রোযাদার ও সালাত আদায়কারীর মর্যাদায় পৌছতে পারবে।” [তিরমিযি] [8]

একজন চরিত্রবান ব্যক্তিকে এত বড় ফযিলত দেওয়ার কারণ হল, একজন রোযাদার ও রাতে সালাত আদায়কারী ব্যক্তি শুধুমাত্র তার নফসের বিরোধিতা করে থাকে, আর যে ব্যক্তি মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে থাকে, সে অনেকগুলো নফস যারা বিভিন্ন প্রকৃতি ও বিভিন্ন চরিত্রের অধিকারী হয়, যেন তাদের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা চালায়। এ কারণে একজন রোযাদার ও তাহাজ্জুদ আদায়কারী যে সাওয়াব পাবে একজন চরিত্রবান লোকও একই সাওয়াব পাবে। ফলে তারা উভয়ে সাওয়াবের দিক দিয়ে বরাবর। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অধিক সাওয়াবের অধিকারী হবে।

সুন্দর চরিত্রের অনেক ফলাফল রয়েছে, যেগুলো একজন ব্যক্তি চরিত্রবান হওয়ার প্রমাণবাহী নিদর্শন। বলা হয়ে থাকে যে, আল্লাহর সাথে তার জানা-শুনা অত্যধিক থাকার কারণে সে ঝগড়া-বিবাধ করে না। আবার কেউ বলে, মানুষের [বিপদ-আপদ, সুখে-দুখে] কাছা-কাছি হওয়া এবং তাদের মধ্যে অপরিচিত হওয়া বা প্রসিদ্ধ না হওয়া। আবার কেউ কেউ বলে, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া। আবার কেউ কেউ বলে, সর্বনিম্ন পর্যায় হচ্ছে, সহনশীল হওয়া, সমপরিমাণ প্রাপ্তির আশা ত্যাগ করা, যালেমের প্রতি দয়া করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, ও তার প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া।

নয়. আল্লাহ া‘আলা মুত্তাকী, ধনাঢ্য ও আত্মগোপনকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله يحب العبد التقي الغني الخفي».

“নিশ্চয় আল্লাহ তকী, (মুত্তাকী) গনী, (ধনাঢ্য) ও খফী, (আত্মগোপনকারী) বান্দাকে পছন্দ করেন।” [9]

তকী বা মুত্তাকী বলা হয়: যে গায়েবের উপর ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, আল্লাহর দেয়া রিযক থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহর আনুগত্য করে, যে শরী‘আত নিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের শেষ রাসূল এবং তাদের সরদারকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন, সে শরী‘আতের অনুসরণ করে।

গনী দ্বারা উদ্দেশ্য: আত্মার ধনী। আর আত্মার ধনীই হল, আর সেই ধনীই হচ্ছে আল্লাহর প্রিয়। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ليس الغنى عن كثرة العرض؛ ولكن الغنى غنى النفس» [أخرجه البخاري].

“ধন সম্পদ অধিক হওয়ার কারণে কেউ ধনী হতে পারে না। তবে সত্যিকার ধনী হল, সে ব্যক্তি যে আত্মার দিক দিয়ে ধনী” [10] [বুখারি]

আল্লামা ইবনে বাত্তাল রহ. বলেন, হাদিসে ধনী দ্বারা উদ্দেশ্য অধিক ধন-সম্পদ অধিকারী হওয়া নয়, কারণ, অনেক মানুষ এমন আছে, যাদের আল্লাহ্ তা‘আলা ধন-সম্পদ অধিক পরিমাণে দান করেছেন, কিন্তু সে তাতে সন্তুষ্ট হয় না, সে আরও বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে থাকে। কোথায় থেকে সে কামাই করবে তার প্রতি সে কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ করে না। এ ধরনের লোক তার অধিক লোভের কারণে ধনী হলেও ফকীর। আর সত্যিকার ধনী হল, সে ব্যক্তি যার অন্তর ধনী। অর্থাৎ তাকে যা দেয়া হয়েছে, তাতে সে কারও মুখাপেক্ষী হয় না, সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, বেশির প্রতি সে লোভ করে না এবং পাওয়ার জন্য সে বাড়াবাড়ি করে না। ফলে সেই হল একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি।

আর আত্মার ধনী হওয়ার বিষয়টি মনে সৃষ্টি হয় আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া ও তার নির্দেশকে মেনে নেওয়া দ্বারা। আর এ কথা বিশ্বাস করা দ্বারা যে আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে, তা অতি উত্তম ও স্থায়ী। আল্লামা ইবনে হাজার রহ. বলেন, ‘আত্মার ধনী হওয়া, অন্তরের ধনী হওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়। অর্থাৎ যখন একজন বান্দা যাবতীয় কাজে সে তার রবের মুখাপেক্ষী হয়, তখন তার মধ্যে এ উপলব্ধি হয়, ‘আল্লাহ তিনিই দাতা’ ও ‘নিষেধকারী’। তখন সে তার ফায়সালার উপর রাজি থাকে এবং তার নেয়ামতসমূহের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তার নেয়ামতসমূহের উপর শুকরিয়া আদায় করে, যাবতীয় মুসিবত দূর করার জন্য সে আল্লাহর নিকটই ছুটে যায়। তখন সব বিষয়ে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে তার অন্তরে আত্মার ধনী হওয়া সৃষ্টি হয়, সে আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রতি মুখাপেক্ষী হয় না।’

আর হাদিসে যে ‘খফী’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে এবং সে তার নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকে; অন্য কোনো দিক সে তাকায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«رب أشعث مدفوعٍ بالأبواب لو أقسم على الله لأبره» [أخرجه مسلم].

“অনেক ধুলি-মলিন অবিন্যস্ত চুলের অধিকারী লোক রয়েছে, যাদের মানুষ তাদের বাড়ির দরজা হতে তাড়িয়ে দেয়, তারা যদি আল্লাহর শপথ করে কোনো কথা বলে, আল্লাহ তাদের দায় মুক্ত করে” [11] [বর্ণনায় মুসলিম]

আল্লাহ্ তা‘আলা আত্মগোপনকারী মুত্তাকীকে মহব্বত করেন, যে ব্যক্তি অনুপস্থিত হলে তাকে কেউ অনুসন্ধান করে না, আর যদি উপস্থিত থাকে তাকে কেউ চিনে না। সে তার কোনো ভালো কাজ দেখিয়ে বেড়ায় না এবং ইলম ও আমল প্রকাশ করার মানসিকতা পোষণ করে না। মানুষ থেকে ইজ্জত সম্মান তালাশ করে না। স্রষ্টা তার ইবাদত বন্দেগী সম্পর্কে অবগত হওয়াতে সন্তুষ্ট থাকে, মাখলুকের অবগতির কোনো গুরুত্ব তার কাছে নেই। এক আল্লাহর প্রশংসার প্রতি সে সন্তুষ্ট মানুষের প্রশংসার প্রতি কোনো কৌতূহল তার মধ্যে নেই। [এ ধরনের লোককেই বলা হয়, আত্মগোপন কারী]

দশ. আল্লাহ দানশীল ব্যক্তিকে পছন্দ করেন:

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله يحب سمح البيع، سمح الشراء، سمح القضاء» [أخرجه الترمذي].

“আল্লাহ্ তা‘আলা বিক্রয়ে ছাড়-প্রবণ, কেনার সময় ছাড়-প্রবণ এবং ফায়সালার ছাড়-প্রবণতাকে পছন্দ করেন” [তিরমিযী] [12]

السماحة [আস-সামাহা]: শব্দের অর্থ হল, সহজ করা ও ছাড় দেয়া বা ক্ষমা করা। আর “سمحاً” এর অর্থ হচ্ছে, সহজ করতে,  ছাড় প্রদান করতে ও ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। বস্তুত: ‘সামাহা’ ঈমানের একটি অংশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الإيمان الصبر والسماحة»

“ঈমান হল, ধৈর্য ধারণ করা ও ক্ষমা করা [13]।” [বর্ণনায় আহমদ]

বেচা-কেনার মধ্যে অনুগ্রহ করার অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো কিছু বিক্রি করে বা খরিদ করে, তখন সে সহজ করে এবং দান করে। আর যখন বিক্রি করে তখন অনেক পাওনাকে সে ছেড়ে দেয়।

আর ফায়সালার ক্ষেত্রে ক্ষমাশীল হওয়ার অর্থ হল, সে ব্যক্তি তার হককে অত্যন্ত সহজ, সরল ও নমনীয়তার সাথে আদায় করতে চেষ্টা করে, কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা ক্ষতি করার চেষ্টা সে করে না। মোটকথা, ‘সামহ’ ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে মানুষের সাথে ক্ষমা ও সহজ আচরণ করে। সে মানুষের সাথে উন্নত আখলাক-চরিত্র প্রয়োগ করে এবং ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করে।

আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমাপ্রবণ ব্যক্তিকে পছন্দ করেন; কারণ সে নিজের পক্ষ থেকে সম্মানিত এবং সে উত্তম চরিত্রের অধিকারী; কারণ এর মাধ্যমে সে তার অন্তর থেকে ধন-সম্পদের মোহ কর্তন করতে সমর্থ হয়েছে, যে ধন-সম্পদ দুনিয়ার চিহ্ন। তাছাড়া সে আল্লাহর বান্দাদের উপর দয়া করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের কাছে উপকার পৌঁছাতে পেরেছে। আর এ সবই আল্লাহর মহব্বত লাভকে আবশ্যকীয় করে তুলেছে।

এগার. আল্লাহ্ তাআলা ক্ষমাকে পছন্দ করেন

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله يحب العفو»

“আল্লাহ ক্ষমাকে পছন্দ করেন”[14]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ خُذِ ٱلۡعَفۡوَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡعُرۡفِ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡجَٰهِلِينَ ١٩٩ ﴾ [الاعراف: ١٩٩]

“তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক”। [আ‘রাফ, আয়াত: ১৯৯]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿ وَٱلۡكَٰظِمِينَ ٱلۡغَيۡظَ وَٱلۡعَافِينَ عَنِ ٱلنَّاسِۗ وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٣٤ ﴾ [ال عمران: ١٣٤]

“আর ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্ম-শীলদের ভালো বাসেন”। [আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿ وَأَن تَعۡفُوٓاْ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۚ ٢٣٧ ﴾ [البقرة: ٢٣٧]

“আর তোমাদের মাফ করে দেয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৩৭]

عفوবা ক্ষমা বলা হয়, গুনাহের কারণে পাকড়াও করা ছেড়ে দেওয়া। আর صفح বা উপেক্ষা করার অর্থ হল, অন্তর থেকে গুনাহের প্রভাব দূর করা। আর ক্ষমা তার থেকেই হতে পারে, যার ধন-সম্পদ ইজ্জত সম্মান ইত্যাদিতে কোনো না কোনো হক বা অধিকার ছিল, কিন্তু সে তার সে অধিকার ছেড়ে দেয় এবং ক্ষমা করে দেয়।

আল্লাহ্ তা‘আলা যারা ক্ষোভের সময় ক্ষমা করে দেয়, তাদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের সুনাম তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِذَا مَا غَضِبُواْ هُمۡ يَغۡفِرُونَ ٣٧ ﴾ [الشورى: ٣٧]

“এবং যখন রাগান্বিত হয়, তখন তারা ক্ষমা করে দেয়”। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৩৭]

العَفُوُّ  ‘ক্ষমাকারী’ এটি আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্য থেকে একটি গুণবাচক নাম। আর عفو বা ‘ক্ষমা’ আল্লাহর সিফাতসমূহ থেকে একটি সিফাত। আল্লাহ্ তা‘আলা বান্দাদের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখা স্বত্বেও তাদের ক্ষমা করে দেন।

আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلۡيَعۡفُواْ وَلۡيَصۡفَحُوٓاْۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغۡفِرَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٌ ٢٢﴾ [النور: ٢٢]

“আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা নূর, আয়াত: ২২]

আর মানুষের আমলের বিনিময় তার আমলের ধরণ অনুযায়ীই হয়ে থাকে, সুতরাং যেভাবে যে তোমাকে কষ্ট দেয়, তাকে তুমি ক্ষমা করে দেবে, সেভাবে আল্লাহও তোমাকে মাফ করে দেবেন। আর তুমি যখন তোমার অপর ভাইয়ের দোষত্রুটি উপেক্ষা করবে, আল্লাহও তোমার দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করবেন।

অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা, ক্রোধকে হজম করা ও মানুষকে ক্ষমা করার জন্য উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এটি মহান ইবাদত ও নফসের সাথে জিহাদ করার সমতুল্য। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من جرعةٍ أعظم أجرًا عند الله من جرعة غيظ كظمها عبد ابتغاء وجه الله» [أخرجه ابن ماجه].

“এমন কোনো ঢোক সওয়াবের জন্য আল্লাহর নিকট বড় নেই, সে ঢোক হতে যা বান্দা ক্রোধের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে গিলে বা সম্বরণ করে ফেলে”[15]। [ইবনে মাজাহ্]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«من كظم غيظًا وهو يستطيع أن ينفذه، دعاه الله يوم القيامة على رؤوس الخلائق حتى يخيره من أي الحور شاء» [أخرجه الترمذي]

“যে ব্যক্তি রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে অথচ তা প্রয়োগ করার মত ক্ষমতা তার আছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে সমস্ত মানুষের সামনে ডেকে বলবেন, তুমি হূরদের থেকে যাকে পছন্দ কর গ্রহণ করতে পার”[16]। [তিরমিযী] অর্থাৎ মানুষের মাঝে আল্লাহ্ তা‘আলা তার সুনাম ছড়াবেন, তার প্রশংসা করবেন এবং তাকে নিয়ে তিনি অহংকার করবেন। যার ফলে তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা যে কোনো হূরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে স্বাধীনতা প্রদান করবেন।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«وما زاد الله عبدًا بعفوٍ إلا عزًا، وما تواضع أحد لله إلا رفعه الله».

“ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ্ তা‘আলা বান্দার সম্মানকেই বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ্ তা‘আলা তার মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেন”[17]।

এখানে দুটি দিক রয়েছে:

এক- হাদিসটি তার বাহ্যিক অর্থের উপরই রাখা হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ক্ষমা ও উপেক্ষা করা বিষয়ে প্রসিদ্ধ হবে, মানুষের অন্তরসমূহে সে মহান হবে এবং তার ইজ্জত ও সম্মান বৃদ্ধি পাবে।

দুই- অথবা হাদিসের অর্থ হল, তার সাওয়াব আখিরাতে আর সম্মান দুনিয়াতে।

আবার কোনো সময় উভয় অর্থ এক সাথে হতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে ইজ্জত ও সম্মান দান করবেন।

 

বার. আল্লাহ্ তাআলা কোমলতা পছন্দ করেন:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله يحب الرفق في الأمر كله» [أخرجه البخاري].

“আল্লাহ প্রতিটি কাজে কোমলতা পছন্দ করেন”[18]।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«إن الله رفيق يحب الرفق، ويعطي على الرفق ما لا يعطي على العنف، وما لا يعطي على ما سواه» [أخرجه مسلم].

“আল্লাহর তা’আলা নিজে কোমলময়, তিনি  কোমলতাকে পছন্দ করেন। তিনি কোমলতার উপর যে প্রতিদান দেন, জোর বা কঠোরতার উপর তা দেন না, অনুরূপ অন্য কিছুর উপরও এত বেশি প্রতিদান দেন না”[19]।

মূলত: কোমলতা যাবতীয় কল্যাণের কারণ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من يحرم الرفق يحرم الخير»

“যে ব্যক্তি কোমলতা থেকে বঞ্চিত হয়, সে যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়”[20]।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «إن الله رفيق»  ‘আল্লাহ কোমল’ এ কথার অর্থ হল, আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র, তিনি তাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠোরতা করতে চান না। আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে তাদের সাধ্যের বাহিরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ্ তা‘আলা ‘কোমলতা অবলম্বনের উপর প্রদান করার’ অর্থ তিনি সেটার উপর যে সাওয়াব দেন, অন্য কোন আমলের উপর এত বেশি সাওয়াব দেন না। কোমল ব্যবহারের উপর আল্লাহ্ তা‘আলা দুনিয়াতে সুন্দর প্রশংসা কুড়ানোর তাওফিক দেন, উদ্দেশ্য হাসিলে সফলতা দেন, এবং লক্ষ্য অর্জন করা সহজ করে দেন। আর আখিরাতে তার জন্য রয়েছে অধিক সাওয়াব, যা কঠোরতা করার কারণে অর্জন করা সম্ভব হয় না, আর যা অন্য কোনো আমলের কারণে লাভ করা যায় না।

বস্তুত: নমনীয়তা ও নরম ব্যবহার উত্তম চরিত্রেরই ফল এবং তারই পরিণতি।

বলা হয়ে থাকে যে, সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুকে যথাস্থানে প্রয়োগ করা। কঠোরতার জায়গায় কঠোরতা এবং কোমলতার স্থানে কোমলতা, যেখানে তলোয়ার উত্তোলন করা দরকার সেখানে তলোয়ার উঠানো, আর যেখানে লাঠি উঠানো দরকার সেখানে লাঠি উঠানো। সুতরাং যাবতীয় চরিত্রে যেমন মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, তেমনি কঠোরতা ও কোমলতা উভয়টির মধ্যেও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উত্তম। কিন্তু যেহেতু মানব স্বভাব কঠোরতার প্রতিই বেশি ধাবিত হয় তাই  মানুষকে কোমলতা অবলম্বন করার প্রতি বেশি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আর এ জন্যই কঠোরতার চেয়ে কোমলতা অবলম্বনের অধিক প্রশংসা করা হয়েছে।

সত্যিকার পূর্ণ তো সে-ই, যে ব্যক্তি কোথায় কঠোরতা করতে হবে এবং কোথায় কোমলতা অবলম্বন করতে হবে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। ফলে যেখানে যা করা দরকার সেখানে সে তাই করে। যদি কোন ব্যক্তির দূরদর্শিতা কম হয়, অথবা কোন ঘটনার পিছনে কি হিকমত আছে, তা না জানে, তাহলে তার জন্য কোমলতা অবলম্বন করা উত্তম। কারণ, অধিকাংশ সময় কোমলতার মধ্যেই সফলতা নিহিত থাকে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الرفق لا يكون في شيء إلا زانه، ولا ينزع من شيء إلا شانه».

“যে কোনো কিছুতে কোমলতা অবলম্বন করা সেটার সৌন্দর্যকে নিশ্চিত করে। আর কোন কিছু থেকে কোমলতা তুলে নেয়া সেটাকে কলঙ্কিতই করে থাকে”[21]।

তের: আল্লাহ্ তাআলা লজ্জা ও গোপন রাখাকে পছন্দ করেন:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله عز وجل حليم حيي ستير؛ يحب الحياء والستر؛ فإذا اغتسل أحدكم فليستتر» [أخرجه النسائي].

“আল্লাহ্ তা‘আলা ধৈর্যশীল, গোপনকারী, তিনি লজ্জা ও গোপন রাখাকে পছন্দ করেন। তোমরা যখন গোসল করবে, তখন যেন অবশ্যই ঢেকে রাখে।[22]” [নাসায়ী]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«الإيمان بضع وسبعون شعبة، والحياء شعبة من الإيمان» [أخرجه مسلم].

“ঈমানের সত্তরেরও বেশি (তিন থেকে নয় সংখ্যা পর্যন্ত) শাখা রয়েছে, আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা”[23]। [মুসলিম]

«وقد كان النبي صلى الله عليه و سلم أشد حياء من العذراء في خدرها».

“আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নিভৃতে অবস্থানকারী কুমারী নারীর চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন”[24]।

লজ্জা

অভিধানে حياء [লজ্জা] শব্দটি حياة [হায়াত] থেকে নির্গত। আর বলা হয়ে থাকে, استحيا الرجل যখন তার কাছে জীবনী শক্তি বেশি থাকে। সুতরাং লজ্জা অনুভূতির শক্তি ও সুক্ষ্মতা এবং জীবনী শক্তির কারণেই হয়ে থাকে। আর অন্তরের জীবন অনুসারেই সে মন বা অন্তরে লজ্জা চরিত্রের উদ্ভব ঘটে।

আর حياء [লজ্জা] একজন মানুষের মধ্যে তিন কারণে হতে পারে।

এক- আল্লাহ থেকে লজ্জা করা।

দুই- মানুষ থেকে লজ্জা করা

তিন- একজন তার নিজের থেকে লজ্জা করা।

আল্লাহ থেকে লজ্জা: তার দাবী হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলা যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, তা পালন করা, আর যা করা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«استحيوا من الله حق الحياء، قال: قلنا: يا رسول الله، إنا نستحيي والحمد لله! قال: ليس ذاك؛ ولكن الاستحياء من الله حق الحياء أن تحفظ الرأس وما وعى، والبطن وما حوى، ولتذكر الموت والبلى، ومن أراد الآخرة ترك زينة الدنيا؛ فمن فعل ذلك فقد استحيا من الله حق الحياء» [أخرجه الترمذي].

“তোমরা আল্লাহকে লজ্জা করার মত লজ্জা কর, বর্ণনাকারি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আমরা তো লজ্জা করি। তিনি বললেন, এ লজ্জা নয়, আল্লাহকে পরিপূর্ণ লজ্জা করার অর্থ- তুমি তোমার মাথা এবং মাথা যা অন্তর্ভুক্ত করে, তার হেফাজত করবে। আর তুমি তোমার পেট ও পেট যা শামিল করে, তার হেফাজত করবে। আর তুমি মৃত্যু ও মৃত্যুর পরের পরিণতিকে বেশি বেশি স্মরণ করবে। যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে, সে দুনিয়ার সৌন্দর্যকে ছেড়ে দেবে। আর যে ব্যক্তি এ কাজগুলো করবে, সে অবশ্যই আল্লাহকে লজ্জা করার মত লজ্জা করল[25]। [তিরমিযী]

এ প্রকারের লজ্জা সাধারণত একজন মানুষের দ্বীনের মধ্যে দৃঢ়তা ও ইয়াকীনের বিশুদ্ধতার কারণেই হয়ে থাকে।

আর মানুষের থেকে লজ্জা করা: তার দাবী হচ্ছে, মানুষের দুঃখ, দুর্দশা ও কষ্টকে প্রতিহত করা এবং কোনো অন্যায় ও অশ্লীলতাকে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা। এ প্রকারের লজ্জা মানুষ থেকে তখন সংঘটিত হয়, যখন একজন মানুষের মধ্যে মানবতা পুরোপুরি বিদ্যমান থাকে। আর সে মানুষের তিরস্কার ও  দুর্নামকে ভয় করবে।

আর নিজের সত্তা থেকে লজ্জা করা: তার দাবী হচ্ছে, সচ্চরিত্র অবলম্বন করা ও একাকীত্বের সময়ে নিজেকে পবিত্র ও সংরক্ষণ করা। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«الحياء لا يأتي إلا بخير»

“লজ্জা মানুষের জন্য কল্যাণই বয়ে আনে”[26]।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«الحياء خير كله»

“লজ্জার সবই কল্যাণকর।[27]” অথবা তিনি বলেন,

«الحياء كله خير»

“লজ্জা, তার সবই কল্যাণকর”[28]।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«ما كان الحياء في شيء إلا زانه».

“যে কোন বস্তুর মধ্যে লজ্জা পাওয়া গেলে তা তার মধ্যে সৌন্দর্য আনয়ন করে”[29]।

এখানে «في شيء» শব্দটি মুবালাগা বা অতিরঞ্জন হিসেবে ব্যবহৃত। অর্থাৎ যদি নিষ্প্রাণ বস্তুর মধ্যেও যখন লজ্জা থাকে, আল্লাহ তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। সুতরাং যদি একজন মানুষের মধ্যে লজ্জা থাকে তখন তার অবস্থা কেমন হতে পারে?!

গোপন করা বা ঢেকে রাখা:

আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞۚ ٢٦﴾ [الاعراف: ٢٦]

“হে বনী আদম, আমি তো তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জা-স্থান ঢাকবে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাক তা উত্তম”। [সূরা আরাফ, আয়াত: ২৬]

আল্লাহ্ তা‘আলা আদম সন্তানদের লজ্জা-স্থান ও দেহকে ঢেকে রাখার নির্দেশ দেন। কারণ, আল্লাহ্ তা‘আলা পর্দা করাকে পছন্দ করেন এবং উলঙ্গ হওয়াকে ঘৃণা করেন। অনুরূপভাবে  আল্লাহর রাসূলও পর্দা করা এবং সতরকে ডেকে রাখার প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দেন। আর বিবস্ত্র হওয়া হতে নিষেধ করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إياكم والتعري»

“তোমরা উলঙ্গ হওয়া থেকে বেঁচে থাক”[30]।

চৌদ্দ. মুসিবতে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি জ্ঞাপনকে আল্লাহ পছন্দ করেন:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن عظم الجزاء مع عظم البلاء، وإن الله إذا أحب قومًا ابتلاهم؛ فمن رضي فله الرضا، ومن سخط فله السخط» [أخرجه الترمذي].

“নিশ্চয় বড় পুরষ্কার বড় মুসিবতের বিনিময়ে প্রাপ্ত হয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন তখন তাদের উপর বিপদাপদ দেন, সুতরাং যে সন্তুষ্ট হবে, তার জন্য সন্তুষ্টি থাকবে, আর যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে, তার জন্য অসন্তুষ্টিই থাকবে[31]।”

মুসিবতে সন্তুষ্টচিত্ত থাকে এমন বান্দাকে আল্লাহ্ তা‘আলা মহব্বত করেন, তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা বিভিন্ন ধরনের মুসিবত ও বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন; তখন সে ধৈর্য ধারণ করে ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়ে এবং আল্লাহর দরবারে মুসিবত ও পরীক্ষা অনুযায়ী সাওয়াবের আশা করে। আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে যে সব মুসিবতে আক্রান্ত করেন, তা সে মেনে নেয়। আর তখন তার বিপদের পরিমানে তার জন্য সন্তুষ্টি ও পরিপূর্ণ সওয়াব নির্ধারিত হবে। আর দুনিয়াতে মুমিনদের যে সব মুসিবত হয়ে থাকে, তা শুধু আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণে হয় না, বরং কোনো অন্যায়কে প্রতিহত করা অথবা গুনাহগুলো ক্ষমা করা অথবা সম্মান বৃদ্ধি করার জন্য হয়।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من مسلم يصيبه أذى إلا حاتَّ الله عنه خطاياه؛ كما تحاتُّ ورق الشجر» [أخرجه البخاري].

“কোন মুসলিম যখন কোনো কষ্টের মুখোমুখি হয়, তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তার গুনাহসমূহ এমনভাবে ঝেড়ে ফেলে দেন, যেমন গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ে যায়”[32]।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সু-সংবাদ প্রতিটি মুমিনের জন্য। কারণ, অধিকাংশ মানুষ অসুস্থতা, পেরেশানি, দুশ্চিন্তা ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকে। বিপদ-আপদ মানুষ থেকে কখনো পৃথক হয় না। [ফলে এ ধরনের সু-সংবাদ তাদের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।]

আর মুসিবতের উপর ধৈর্য ধারণ করা, মুসিবতে আক্রান্ত হওয়ার প্রারম্ভেই করতে হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার প্রতি ইশারা করে বলেন,

«إنما الصبر عند الصدمة الأولى»

“ধৈর্য তো আঘাতের প্রারম্ভেই”[33]।

এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার প্রতি ইশারা করেন, মানুষের জন্য কষ্টকর ধৈর্য এবং যে ধৈর্যের উপর তাকে অধিক সাওয়াব দেয়া হবে, তা হল, মুসিবত সংঘটিত হওয়ার শুরুতে ধৈর্য ধারণ করা এবং যখন হঠাৎ মুসিবতের খবর শোনে তখন ধৈর্য ধারণ করা। ঐ সময় যখন একজন মানুষ তা মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, তখন প্রমাণিত হয়, লোকটির অন্তর মজবুত, ধৈর্যের স্থানে সে অটল ও অবিচল। কিন্তু যখন মুসিবতের উত্তেজনা কমে যায় এবং প্রশমিত হয়, তখন সবাই ধৈর্য ধারণ করে এবং এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না।

একজন মানুষ এ দুনিয়াতে সব সময় বিপদ-আপদ, ফিতনা-ফাসাদ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদির সম্মুখীন হতেই থাকে। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةٗۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٣٥ ﴾ [الانبياء: ٣٥]

“আর ভালো ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে”। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৫] অর্থাৎ আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের পরীক্ষা করে থাকি, বলা-মুসিবত ও নেয়ামত, তোমাদের কষ্ট ও সুখ, রোগ ও সুস্থতা, ধন-সম্পদ ও অভাব ইত্যাদি দিয়ে। অনুরূপভাবে হালাল ও হারাম, আনুগত্য ও নাফরমানি, হেদায়াত ও গোমরাহি দিয়েও তোমাদের পরীক্ষা করা হয়।

শুধু মুখে কালেমা উচ্চারণ করা দ্বারা একজন মানুষ ঈমানের মর্যাদায় পৌঁছুতে পারে না। বরং যে ঈমানের দাবি করে তাকে অবশ্যই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। এ কথার সমর্থন হচ্ছে আল্লাহর বাণী:

﴿أَحَسِبَ ٱلنَّاسُ أَن يُتۡرَكُوٓاْ أَن يَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا وَهُمۡ لَا يُفۡتَنُونَ ٢ وَلَقَدۡ فَتَنَّا ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۖ فَلَيَعۡلَمَنَّ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْ وَلَيَعۡلَمَنَّ ٱلۡكَٰذِبِينَ ٣ ﴾ [العنكبوت: ٢،  ٣]

“মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না। আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী”। [সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২,৩] আল্লাহ আরও বলেন,

﴿وَلَنَبۡلُوَنَّكُمۡ حَتَّىٰ نَعۡلَمَ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَنَبۡلُوَاْ أَخۡبَارَكُمۡ ٣١ ﴾ [محمد: ٣١]

“আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি প্রকাশ করে দেই তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ-কারী ও ধৈর্যশীল”। [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৩১]

পরীক্ষার কারণ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡمَوۡتَ وَٱلۡحَيَوٰةَ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۚ ٢ ﴾ [الملك: ٢]

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম”। [সূরা মুলুক, আয়াত: ২]

বিপদ-আপদের সম্মুখীন হওয়া আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দার জন্য পরীক্ষা। বান্দা কি সন্তুষ্ট হয় নাকি অসন্তুষ্ট হয়, সে কি ধৈর্য ধারণ করে, নাকি চিল্লা-পাল্লা করে, সে কি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে নাকি আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করে?

আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শেখান, মুসিবতের সময় আমরা যেন আল্লাহর নিকট দো‘আ করি এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও বিনিময় প্রার্থনা করি এবং যে মুসিবতে নিপতিত হয়েছে তা থেকে উত্তম বিনিময় কামনা করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله: إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللهم آجرني في مصيبتي واخلف لي خيرًا منها، إلا أخلف الله له خيرًا منها».

“যখন কোন মুসলিম ভাই মুসিবতে আক্রান্ত হয়, তারপর সে আল্লাহ্ তা‘আলা যা বলার নির্দেশ দিয়েছে, তা বলে, অর্থাৎ সে বলে, (إنا لله وإنا إليه راجعون) ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তনকারী। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার মুসিবতে সাওয়াব দান কর, আর আমার জন্য এর চেয়ে উত্তম বদলা দাও!’ তাহলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে পূর্বের তুলনায় উত্তম প্রতিদান ও বদলা দান করবেন”।

অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়ে দেন, আমরা যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত লোক দেখি, তখন প্রথমে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে যে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তার উপর আল্লাহর প্রশংসা করি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«من رأى مبتلى فقال: الحمد لله الذي عافاني مما ابتلاك به، وفضلني على كثير ممن خلق تفضيلاً، لم يصبه ذلك البلاء» [أخرجه الترمذي].

 যে ব্যক্তি কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখে এ দো‘আ পাঠ করে,

الحمد لله الذي عافاني مما ابتلاك به، وفضلني على كثير ممن خلق تفضيلاً

[অর্থ, সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি তোমাকে যে বিপদে আক্রান্ত করেছেন তা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং আমাকে তিনি তার মাখলুক থেকে অনেক মাখলুকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।] তাকে এ মুসিবত কখনো স্পর্শ করবে না”[34]। [তিরমিযী]

পনের: আল্লাহ্ তাআলা আমলকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করাকে পছন্দ করেন:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إن الله تعالى يحب من العامل إذا عمل أن يحسن»

“নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা একজন আমলকারী থেকে সুন্দর আমলকে পছন্দ করে যখন সে আমল করে”[35]।

সুন্দর আমল হল, ইখলাস এবং তা ইনসাফের সাথে আদায় করা। আর আল্লাহ্ তা‘আলা একজন আমলকারি যখন কোনো আমল করে, তখন সে যাতে সুন্দর আমল করে, তা তিনি পছন্দ করেন। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর আমানতকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যথাস্থানে আদায় করে এবং আল্লাহর ইবাদত হতে বিমুখ হয় না, তাকে পছন্দ করেন। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿رِجَالٞ لَّا تُلۡهِيهِمۡ تِجَٰرَةٞ وَلَا بَيۡعٌ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَإِقَامِ ٱلصَّلَوٰةِ وَإِيتَآءِ ٱلزَّكَوٰةِ يَخَافُونَ يَوۡمٗا تَتَقَلَّبُ فِيهِ ٱلۡقُلُوبُ وَٱلۡأَبۡصَٰرُ ٣٧﴾ [النور: ٣٧]

“সে সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিকির, সালাত কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে”। [সূরা নূর, আয়াত: ৩৭]

এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিরত রাখার যত উপকরণ আছে, তার মধ্যে ব্যবসাই হল সব চেয়ে বড় উপকরণ। আল্লাহর ইবাদতসমূহ থেকে বড় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল সালাত। এ কারণে আল্লাহ্ তা‘আলা ঐসব লোকদের প্রশংসা করেন, যাদেরকে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের ইবাদত থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না। নিঃসন্দেহে তারা ভালো কাজ করে এবং সুন্দর আমল করে। তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ইবাদত-বন্দেগী ও সালাতের সময়ের মাঝে সমন্বয় সাধন করে থাকে।

ষোল: আল্লাহর নিকট দুটি ফোটা ও দুটি চিহ্ন সমস্ত বস্তু হতে অধিক প্রিয়:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ليس شيء أحب إلى الله من قطرتين وأثرين؛ قطرة من دموع في خشية الله، وقطره دم تهراق في سبيل الله، وأما الأثران: فأثر في سبيل الله، وأثر في فريضةٍ من فرائض الله» [أخرجه الترمذي].

“দুটি ফোটা ও দুটি চিহ্ন থেকে অধিক প্রিয় কোনো বস্তু আল্লাহর নিকট নেই। এক- আল্লাহর ভয়ে নির্গত চোখের পানির ফোটা। দুই-আল্লাহর রাস্তায় প্রবাহিত রক্তের ফোটা। আর দুটি চিহ্ন: এক- আল্লাহর রাস্তায় আঘাতের চিহ্ন। দুই-আল্লাহর ফরযসমূহ থেকে কোনো ফরয আদায়ের চিহ্ন[36]।” [তিরমিযি]

আল্লাহর ভয়ে ও বড়ত্বের চিন্তায় যে চোখ থেকে অশ্রুর ফোটা নির্গত হয়, তার চেয়ে অধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর নিকট আর কোনো বস্তু নেই। এ দুটি চোখকে কখনোই জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।

বরং যে ব্যক্তি এ ধরনের চোখের অধিকারী হবে, যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করে, যেদিন একমাত্র আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন তাকে আল্লাহর আরশের ছায়া তলে ছায়া দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«سبعة يظلهم الله في ظله يوم لا ظل إلا ظله.. ورجل ذكر الله خاليًا ففاضت عيناه» [أخرجه البخاري].

“সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার ছায়ার তলে ছায়া দান করবেন। সেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না... তার মধ্যে এক ব্যক্তি সে, যে নির্জনে আল্লাহর স্মরণ করে এবং তার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়।”[37] [বুখারি]

আল্লাহ্ তা‘আলা যে সব নবীদের বিশেষ নেয়ামত দান করেন, তাদের প্রশংসা করে বলেন, তারা যখন আল্লাহর আয়াতসমূহ শোনেন, তখন তারা সেজদাবনত হন এবং কান্নাকাটি করেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿إِذَا تُتۡلَىٰ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُ ٱلرَّحۡمَٰنِ خَرُّواْۤ سُجَّدٗاۤ وَبُكِيّٗا۩ ٥٨ ﴾ [مريم: ٥٨]

“যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত”। [সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৫৮]

ওমর রাদিয়াল্লাহ আনহু সূরা মারিয়াম তিলাওয়াত করেন, তারপর তিনি সেজদা করেন এবং বলেন, এ তো সেজদা, কান্না কোথায়? অর্থাৎ অশ্রু।

আল্লাহ্ তা‘আলা যাদের ইলম দান করেছেন তাদের প্রশংসা করেন, তাদের নিকট যখন আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা কান্না-কাটি করে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,

﴿وَيَخِرُّونَ لِلۡأَذۡقَانِ يَبۡكُونَ وَيَزِيدُهُمۡ خُشُوعٗا۩ ١٠٩ ﴾ [الاسراء: ١٠٩]

“আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।” [সূরা ইসরা, আয়াত: ১০৯]

অনুরূপভাবে আল্লাহর ফরযসমূহ আদায়ে যে চিহ্ন পড়ে তার চেয়ে অধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর নিকট আর কিছুই হতে পারে না। যেমন, ঐ ব্যক্তি যে ফরযসমূহ আদায়, তার বাস্তবায়ন করা ও তার জন্য চেষ্টা করতে নিজেকে অনেক কষ্ট দেয়। যেমন শীতের দিনে অজুর পানি ব্যবহার করার কারণে পা ফেটে যাওয়া, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ, জুমার সালাত আদায় করার উদ্দেশ্যে বা হজের উদ্দেশ্যে হাটার কারণে পায়ে ধুলা-বালির চিহ্ন পড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

فعن عبايه بن رفاعة قال: أدركني أبو عبس وأنا أذهب إلى الجمعة، فقال: سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول: «من اغبرت قدماه في سبيل الله، حرمه الله على النار» [أخرجه البخاري]

উবায়া ইবন রেফায়া রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি জুমার সালাত আদায়ের জন্য যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে আমার সাথে আবু আব্বাসের দেখা হল, তখন তিনি আমাকে বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহর রাস্তায় যার পা দুটি ময়লাযুক্ত হল, আল্লাহ্ তা‘আলা জাহান্নামের জন্য তাকে নিষিদ্ধ করে দিল”[38]।[বুখারি] এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «في سبيل الله» দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যাবতীয় ইবাদত।

এ হল, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল সমূহের বর্ণনা যেগুলোকে একত্র করা আমার জন্য এ কিতাবে সহজ হয়েছে। অন্যথায় নেক আমলসমূহ যেগুলোর বিশেষ ফযিলত রয়েছে ও আল্লাহর নিকট প্রিয়, তার সংখ্যা এত বেশি যেগুলোর আলোচনা করে শেষ করা এখানে সম্ভব নয়। আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট প্রার্থনা করি আল্লাহ্ তা‘আলা যেন আমাদের আল্লাহর নিকট যে আমলগুলো অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়, সেগুলো করার তাওফিক দান করেন এবং আমাদের জন্য তার সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করেন। আর আমাদের শেষ পরিণতি যে তার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত করেন। আমীন!!

والحمد لله رب

 


[1] ইবন হিব্বান, ৩/৯৯; হাদীস নং ৮১৮।

[2] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৭।

[3] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৭।

[4] মুসলিম, হাদীস নং ২১৩৭।

[5] তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর ১/১৮১; হাদীস নং ৪৭১; আল-মু‘জামুল আওসাত্ব, ৬/২৬৮; হাদীস নং ৬৩৮০; ইবন হিব্বান, ২/২৩৬; হাদীস নং ৪৮৬; আল-হাকেম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/৪৪৩; হাদীস নং ৮২১৪।

[6] মুসলিম, হাদীস নং ৭৭১; আবু দাউদ, হাদীস নং ৭৬০; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪২১; নাসায়ী, হাদীস নং ৮৯৭।

[7] তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৮৭।

[8] তিরমিযী, হাদীস নং ২০০৩।

[9] মুসলিম, হাদীস নং ২৯৬৫।

[10] বুখারী, হাদীস নং ৬৪৪৬।

[11] মুসলিম, হাদীস নং ২৬২২।

[12] তিরমিযী, হাদীস নং ১৩১৯।

[13] মুসনাদে আহমাদ ৪/৩৮৫।

[14] আত-তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর ৯/১০৯; হাদীস নং ৮৫৭২।

[15] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪১৮৯।

[16] তিরমিযী, হাদীস নং ২০২১।

[17] তিরমিযী, হাদীস নং ২০২৯।

[18] বুখারী, হাদীস নং ৬০২৪।

[19] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৩।

[20] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯২।

[21] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৪।

[22] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০১২।

[23] মুসলিম, হাদীস নং ৩৫।

[24] বুখারী, হাদীস নং ৩৫৬২।

[25] তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৫৮।

[26] বুখারী, হাদীস নং ৬১১৭; মুসলিম, হাদীস নং ৩৭।

[27] মুসলিম, হাদীস নং ৩৭।

[28] মুসলিম, হাদীস নং ৩৭।

[29] তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৪।

[30] তিরমিযী, হাদীস নং ২৮০০। দুর্বল সনদে।

[31] তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৯৬।

[32] বুখারী, হাদীস নং ৫৬৪৭; মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭১।

[33] বুখারী, হাদীস নং ১৩০২; মুসলিম, হাদীস নং ৯২৬।

[34] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৩২।

[35] বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান, ৭/২৩৪; হাদীস নং ৪৯৩২। [হাসান সনদে]

[36] তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৯।

[37] বুখারী, হাদীস নং ৬৬০।

[38] বুখারী, হাদীস নং ৯০৭।

]]>
http://www.quraneralo.com/good-deeds-that-allah-likes-very-much-2/feed/ 2