QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট » সাম্প্রতিক বিষয়াদি http://www.quraneralo.com ইসলামিক রিসোর্সেস - আকিদা, কুরআন, হাদিস, ইসলামী প্রবন্ধ, ইসলামী বই, ইসলামী ওয়াজ | Bangla/Bengali Islamic Website | Bangla Islamic Articles, Bangla Islamic Books, Bangla Islamic Waz Tue, 28 May 2013 12:48:19 +0000 en-US hourly 1 http://wordpress.org/?v=3.5.1 সমস্ত মুসলমানদেরকে যদি হত্যা করা হয়, তবুও বিজয় ইসলামেরই হবে http://www.quraneralo.com/story-of-a-believing-boy/ http://www.quraneralo.com/story-of-a-believing-boy/#comments Sun, 05 May 2013 21:12:35 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3973 সংকলন ও সম্পাদনাঃ  شادمان سكب

8504655484_efc8d2c5d6

ঈমানদার যুবক ও আছহাবুল উখদূদের কাহিনী

হযরত সুহায়েব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে জে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ বহুকাল পূর্বে একজন রাজা ছিলেন। সেই রাজার ছিল একজন যাদুকর। ঐ যাদুকর বৃদ্ধ হ’লে একদিন সে রাজাকে বলল, ‘আমি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছি এবং আমার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। সুতরাং আমার নিকট একটি ছেলে পাঠান, যাকে আমি ভালভাবে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব’। বাদশাহ তার নিকট একটি বালককে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাকে যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগলেন। বালকটি যাদুকরের নিকট যে পথ দিয়ে যাতায়াত করত, সে পথে ছিল এক সন্ন্যাসীর আস্তানা। সন্ন্যাসী ঐখানে বসে কখনো ইবাদাত করতেন, আবার কখনো লোকদের নিকট ওয়াজ-নসিহাত করতেন।  বালকটিও পথের পাসে দাঁড়িয়ে তার ওয়াজ নসীহত শুনত।  ফলে যাদুকরের নিকট পৌছাতে বালকটির দেরী হ’ত বলে যাদুকর তাকে প্রহার করত। বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট এ কথা জানালে তিনি বালককে শিখিয়ে দেন যে, তুমি যদি যাদুকর কে ভয় কর তাহ’লে বলবে, বাড়ীর লোকজন আমাকে পাঠাতে বিলম্ব করেছে এবং বাড়ীর লোকজনকে ভয় পেলে বলবে, যাদুকরই আমাকে ছুটি দিতে বিলম্ব করেছে।

বালকটি এভাবে একদিকে যাদু বিদ্যা অন্যদিকে ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষা  করতে লাগলো। একদিন পথে সে দেখল, একটি বৃহদাকার প্রাণী মানুষের চলাচলের পথ রোধ করে বসে আছে। বালকটি ভাবল, আজ পরীক্ষা করে দেখব যে আল্লাহর কাছে যাদুকরের ধর্ম শ্রেষ্ঠ, না সন্ন্যাসীর ধর্ম শ্রেষ্ঠ ? অতঃপর সে একটি পাথর নিয়ে বলল, ‘হে আল্লাহ্‌! যাদুকরের কার্যকলাপ অপেক্ষা সন্ন্যাসীর কার্যকলাপ যদি তোমার নিকট অধিকতর প্রিয় হয়, তবে এই প্রাণীটিকে এই পাথরের আঘাতে মেরে ফেল। যেন লোকজন যাতায়াত করতে পারে’। এই বলে প্রাণীটিকে লক্ষ্য করে সে পাথরটি ছুঁড়ে মারল এবং প্রাণীটি মারা গেল ও লোক চলাচল শুরু হ'ল। এরপর বালকটি সন্ন্যাসীর নিকট গিয়ে তাকে ঘটনাটি জানালে তিনি তাকে বললেন, ‘বৎস! তুমি এখনই আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছ। তোমার প্রকৃত স্বরূপ আমি বুঝতে পারছি। শীঘ্রই তোমাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। যদি তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হও তাহ’লে যেন আমার কথা প্রকাশ করে দিও না’।

তারপ বালকটির দো‘আয় জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেতে লাগলো , কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি নিরাময় হ’তে লাগল এবং লোকজন অন্যান্য রোগ হ’তেও আরোগ্য লাভ করতে লাগল।

এদিকে রাজার একজন সহচর অন্ধ হয়েছিল। সে বহু উপঢৌকনসহ বালকটির নিকট গিয়ে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দাও, তাহ’লে এ সবই তোমার’। বালকটি বলল, ‘আমিতো কাউকে আরোগ্য করতে পারি না । বরং রোগ ভাল করেন আল্লাহ্‌। অতএব আপনি যদি আল্লাহ্‌ প্রতি ঈমান আনেন, তাহ’লে আমি আপনার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহ্‌ নিকটে দো‘আ করতে পারি। তাতে তিনি হয়ত আপনাকে আরোগ্য দান করতে পারেন’। ফলে লোকটি আল্লাহ্‌ প্রতি ঈমান আনল। আল্লাহ্‌ তাকে আরোগ্য দান করলেন।

পূর্বের ন্যায় তিনি রাজার নিকটে গিয়ে বসলে রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল’? সে বলল, ‘আমার রব’। রাজা বললেন, আমি ছাড়া তোমার রব আছে কি’? সে বলল, ‘আমার ও আপনার উভয়ের রব আল্লাহ্‌’। এতে রাজা তাকে ধরে তার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। অবশেষে সে বালকটির নাম প্রকাশ করে দিল। অতঃপর বালকটিকে রাজদরবারে আনা হ’ল। রাজা তাকে বললেন, ‘বৎস! আমি জানতে পারলাম যে, তুমি তোমার যাদুর গুণে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত লোকদের রোগ নিরাময় করছ এবং অন্যান্য কঠিন রোগও নিরাময় করে চলেছ। বালকটি বলল, আমি কাউকে রোগ মুক্ত করি না। রোগ মুক্ত করেন আল্লাহ্‌’। তখন রাজা তাকে পাকড়াও করে তার উপর উৎপীড়ন চালাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সে সন্ন্যাসীর কথা প্রকাশ করে দিল। তখন সন্ন্যাসীকে ধরে আনা হ’ল এবং তাঁকে বলা হ’ল, তুমি তোমার ধর্ম পরিত্যাগ কর। কিন্তু সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। তখন রাজার আদেশক্রমে করাত নিয়ে আসা হ’লে তিনি তা তার মাথার মাঝখানে বসালেন এবং তাঁর মাথা ও শরীর চিরে দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন। তারপর রাজার সহচরকে আনা হ’ল এবং তাকেও তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হ’ল। কিন্তু সেও অস্বীকৃতি জানালে তাকেও করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করা হ’ল।

তারপর বালকটিকে হাযির করে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলা হ’ল। বালকটিও নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করল। তখন রাজা তাকে তার লোকজনের নিকট দিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকে সঙ্গে করে পাহাড়ে আরোহণ করতে থাক। যখন তোমরা পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে পৌঁছবে, তখন তাকে তার ধর্ম পরিত্যাগ করতে বলবে। সে যদি অস্বীকার করে, তাহ’লে তোমরা তাকে সেখান থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলে দিবে’। তারা বালকটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে উঠলে বালকটি দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ্‌! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের কাছ থেকে রক্ষা কর’। তৎক্ষণাৎ পাহাড়টি কম্পিত হয়ে উঠল এবং তারা নীচে পড়ে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্থ দেহে) রাজার নিকট এসে উপস্থিত হ’ল। রাজা তখন তাকে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীদের কি হ’ল’? তখন সে বলল, আল্লাহ্‌ই আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।

তারপর রাজা তাকে তার একদল লোকের নিকট সোপর্দ করে আদেশ দিলেন, ‘একে একটি বড় নৌকায় উঠিয়ে নদীর মাঝখানে নিয়ে যাও। যদি সে নিজ ধর্ম পরিত্যাগ করে, তো ভাল। নচেৎ তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর’। তারা বালকটিকে নিয়ে মাঝ নদীতে পৌঁছলে বালকটি পূর্বের ন্যায় দো‘আ করল, ‘হে আল্লাহ্‌! তোমার যেভাবে ইচ্ছা হয়, সেভাবে তুমি আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা কর’। এতে নৌকা ভীষণভাবে কাত হয়ে পড়ল। ফলে রাজার লোকজন নদীতে ডুবে মারা গেল। আর বালকটি (সুস্ত দেহে) রাজার নিকটে আসলে রাজা তাকে বললেন, তোমার সঙ্গীদের কি অবস্থা? সে বলল, আল্লাহ্‌ই আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর সে রাজাকে বলল, ‘আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন আমাকে কোনভাবেই হত্যা করতে পারবেন না। যতক্ষণ না আমি যা বলব, আপনি তা করবেন। রাজা বললেন, ‘সেটা কি’? বালকটি বলল, ‘আপনি একটি বিস্তীর্ণ মাঠে সকল লোককে হাযির করুন এবং সেই মাঠে খেজুরের একটি গুঁড়ি পুঁতে তার উপরিভাগে আমাকে বেঁধে রাখুন। তারপর আমার তূণীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকে সংযোজিত করুন। তারপর  (بسم الله الرحمن الرحيم ) "বালকটির রব আল্লাহ্‌ নামে" বলে আমার দিকে তীরটি নিক্ষেপ করুন।

আপনি যদি এ পন্থা অবলম্বন করেন, তবেই আমাকে হত্যা করতে পারবেন। বালকের কথামত এক বিস্তীর্ণ মাঠে রাজা সকল লোককে সমবেত করলেন এবং বালকটিকে একটি খেজুর গাছের গুঁড়ির উপরে বাঁধলেন। তারপর রাজা বালকটির তূণীর হ’তে একটি তীর নিয়ে ধনুকের মধ্যভাগে সংযোজিত করলেন। তারপর বলে বালকটির দিকে তীর নিক্ষেপ করলেন। তীরটি বালকের চোখ ও কানের মধ্যভাগে বিদ্ধ হ’ল। বালকটি এক হাতে তীর-বিদ্ধ স্থানটি চেপে ধরল। অতঃপর সে মারা গেল।

এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনগণ বলে উঠল, ‘আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। আমরা বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনলাম’। তারপর রাজার লোকজন তাঁর নিকট গিয়ে বলল, ‘আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তাই শেষ পর্যন্ত ঘটে গেল। সব লোক বালকটির রবের প্রতি ঈমান আনল’। তখন রাজা রাস্তা গুলির চৌমাথায় প্রকাণ্ড গর্ত খনন করার নির্দেশ দিলেন। তার কথা মতো গর্ত খনন করে তাতে আগুন প্রজ্বলিত করা হ’ল। তারপর রাজা হুকুম দিলেন, ‘যে ব্যক্তি বালকের ধর্ম পরিত্যাগ করবে না, তাকে ঐ আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মার। অথবা তাকে বলবে, তুমি এই আগুনে ঝাঁপ দাও। রাজার লোকেরা তার হুকম পালন করতে লাগল। ইতিমধ্যে একজন রমণীকে তার শিশুসন্তান সহ উপস্থিত করা হ’ল। রমণীটি আগুনে ঝাঁপ দিতে ইতস্ততঃ করতে থাকলে শিশুটি বলে উঠল, ‘মা ছবর অবলম্বন করে আগুনে প্রবেশ করুন। কেননা আপনি হক পথে আছেন’।

পবিত্র কুরআনের সূরা বুরূজে এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে,ধ্বংস হয়েছিল গর্ত ওয়ালারা- ইন্ধন পূর্ণ যে গর্তে ছিল অগ্নি, যখন তারা তার পাশে উপবিষ্ট ছিল এবং তারা মুমিনদের সাথে যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু একারণে যে, তারা বিশ্বাস করত পরাক্রমশালী ও প্রশংসা আল্লাহর’ (বুরূজ ৪-৮)

[ছহীহ মুসলিম হা/৩০০৫ ‘যুহদ ও রক্বাক্ব’ অধ্যায়, অনুচেছদ-১৭, ছুহাইব বিন সিনান আর-রূমী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, আহমাদ হা/২৩৯৭৬]।

বিস্তারিত পড়ুনঃ তাফসীর ইবনে কাসির, ১৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫-১২২।  

শিক্ষা :

১. প্রত্যেকটি আদম সন্তান স্বভাবধর্ম ইসলামের উপর জন্মগ্রহণ করে।
২. মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহ্‌কে স্মরণ করবে ও কায়মনোবাক্যে তাঁর নিকট দো‘আ করবে।
৩. রোগমুক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ্‌; কোন পীর-ফকীর বা সাধু-সন্ন্যাসী নয়।
৪. আল্লাহ্‌ পথের নির্ভীক সৈনিকেরা বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত করে না।
৫. মুমিন দুনিয়াবি জীবনে পদে পদে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এর মাধ্যমে
আল্লাহ্‌ তার ঈমানের মজবুতি পরখ করেন।
৬. হক্বের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
৭. সুরা আল-বুরুজে আল্লাহ এমন একটা জাতির কথা বর্ণনা করেছেন, ঈমান আনার কারণে যাদেরকে আগুনের গর্তে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো। একটা মুসলিম উম্মাহর সবগুলো মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হলো অথচ আল্লাহ এই ঘটনাকে "এটাই হলো সুস্পষ্ট বিজয়" বলেছেন।

এ শত্রুতা এবং শাস্তির কারণ শুধু এটাই ছিল জে, তারা পরাক্রমশালী ও প্রশংসনীয় আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান এনেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্‌ তা'আলাই সর্বশক্তিমান। তাঁর আশ্রয়ে আশ্রিত লোকেরা কখনো ধ্বংস হয় মা, ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। যদি তিনি কখনো নিজের বিশেষ বান্দাদেরকে কাফিরদের দ্বারা কষ্টও দিয়ে থাকেন, সেটাও বিশেষ কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য এবং তার রহস্য কারো জানা না থাকতেও পারে। কিন্তু সেটা একটা প্রছন্ন ও বিশেষ অন্তর্নিহিত রহমত ও ফজিলতের ব্যাপার বৈ কিছু নয়।

আমাদের দুনিয়ার জীবনের বিবেচনায় অবাক হওয়ার মতো কথা, কিন্তু মুসলিমদের চূড়ান্ত বিজয় হলো জান্নাত। সমস্ত মুসলিমদেরকেও যদি হত্যা করা হয় বা আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় তবু সেই বিজয়ের সামান্যতম ক্ষতি হবেনা। কিন্তু কথা হচ্ছে আমরা যেনো আমাদের ইসলামকে ধরে রাখতে পারি, আমাদের কাছে মৃত্যু চলে আসা পর্যন্ত। 

আল্লাহ আমাদের সকলকেই ঈমানের সহিত মৃত্যুবরণ করার মহাসোওভাগ্য দান করুন। আমিন।

]]>
http://www.quraneralo.com/story-of-a-believing-boy/feed/ 7
মানব ও সমাজসেবায় ইসলামের প্রেরণা http://www.quraneralo.com/manob-o-shomaj-shebai-islam-er-perona/ http://www.quraneralo.com/manob-o-shomaj-shebai-islam-er-perona/#comments Thu, 25 Apr 2013 04:42:02 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=4416 সংকলন: আলী হাসান তৈয়ব | সম্পাদক: মো: আব্দুল কাদের

Islam_is_Peace_by_MeAli_ADK

‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও

তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়া এবং পরের বিপদে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা একটি মহৎ গুণ। এক ধরনের নেকীর কাজ। হিতৈষী মনোভাব ও সহমর্মিতার গুণ ছাড়া মানবিকতা ও মহানুভবতার বিকাশ পূর্ণতা পায় না।

আমি তিনবেলা পেট পুরে খেতে পারি। একাধিক পদের তরকারি ছাড়া আমার খাবার রোচে না। বিচিত্র স্বাদ আস্বাদন ছাড়া আমার রসনা তৃপ্ত হয় না। বাসার নৈশ প্রহরী কুকুরকে নিত্য টাটকা গোশত খাওয়াই। দুই বেলা শাহী খাবার খেতে দেই। শ্যাম্পু ছাড়া ওর গোসল হয় না। অথচ পাশের বস্তিতে খাবার না পেয়ে অবোধ শিশুরা চিৎকার করে কাঁদে। জঠরজ্বালা সইতে না পেরে কত বনী আদম পথের ধারে উপুড় হয়ে কাতরায়। ফল-ফ্রুটস খেতে খেতে আমার আদরের দুলালের অরুচি ধরে যায়। অথচ বাড়ির বুয়ার অভুক্ত সন্তানদের মুখে মৌসুমী ফলটি পর্যন্ত ওঠে না। ক্ষুদে মাছির লঘু পদভার পড়ামাত্র সুডৌল আপেল, রসে টইটুম্বর আঙ্গুর ও টসটসে কমলা ওরা প্রায়শই নিক্ষেপ করে ডাস্টবিনে। অথচ এরা পঁচা ও উচ্ছিষ্ট ফল খাওয়ার জন্য ইতর প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ করে ডাস্টবিনে। ফ্যাশন বদলের সঙ্গে সঙ্গেই আমার মেয়ের শীতবস্ত্র আর গ্রীষ্মের পোশাক বদল হয়। অথচ অদূরের গাঁয়েই কি-না শীতবস্ত্রের অভাবে গরীবের প্রাণ যায়।

এসব তো বিবেক বা মানবতার পরিচায়ক নয়। অমানবের চেয়ে মানব শ্রেষ্ঠ কেন? প্রাণের কারণে? কেবল বুদ্ধির কারণে? মোটেও না। প্রাণের বৈশিষ্ট্যে মানুষ ও জীব-জন্তু প্রায় অভিন্ন। মানুষ বুদ্ধিমান জীব বলে অন্য সব জীবজন্তু একেবারে বুদ্ধিহীন নয়। বরং বুদ্ধির সঙ্গে বিবেক এবং আপন চাহিদার সঙ্গে মানবিকতার সংশ্লেষই অন্য সব জীব-জন্তুর ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে। ইসলাম এ কারণে মানব সমাজে এমন বৈষম্য ও প্রভেদের কোনো সুযোগ রাখে নি। ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, পরহিতৈষণা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রেরণ দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧﴾ [الأنبياء: ١٠٧]

‘আর আমি আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ [ সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭]

অনাহারীর কষ্টের ভাগিদার হতে এবং জনমদুখী বান্দার দুঃখে সমব্যথী হতে আল্লাহ তা‘আলা রমযানের সিয়াম ফরয করেছেন। দুঃখীর অভাব মোচনে যাকাত ফরয ও সাদাকুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। একই উদ্দেশে সালাত, সিয়াম ইত্যাদির ফিদইয়া ও লে‘আনের বিধান এবং কসম ইত্যাদির কাফফার বিধান প্রবর্তন করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে। যেমন :

ক. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَّن ذَا ٱلَّذِي يُقۡرِضُ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا فَيُضَٰعِفَهُۥ لَهُۥ وَلَهُۥٓ أَجۡرٞ كَرِيمٞ ١١﴾ [الحديد: ١١]

‘এমন কে আছে যে, আল্লাহকে উত্তম করয দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।’ [ সূরা আল-হাদীদ, আয়াত : ১১]

খ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَّن ذَا ٱلَّذِي يُقۡرِضُ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا فَيُضَٰعِفَهُۥ لَهُۥٓ أَضۡعَافٗا كَثِيرَةٗۚ وَٱللَّهُ يَقۡبِضُ وَيَبۡصُۜطُ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ ٢٤٥﴾ [البقرة: ٢٤٥]

‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর আল্লাহ সংকীর্ণ করেন ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরানো হবে।’ [ সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৬১]

গ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿مَّثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنۢبُلَةٖ مِّاْئَةُ حَبَّةٖۗ وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ ٢٦١﴾ [البقرة: ٢٦١]   

‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ [সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২৬১]

ঘ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿إِنَّ ٱلۡمُصَّدِّقِينَ وَٱلۡمُصَّدِّقَٰتِ وَأَقۡرَضُواْ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا يُضَٰعَفُ لَهُمۡ وَلَهُمۡ أَجۡرٞ كَرِيمٞ ١٨﴾ [الحديد: ١٨]

‘নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম করয দেয়, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।’ [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত : ১৮]

ঙ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ وَٱسۡمَعُواْ وَأَطِيعُواْ وَأَنفِقُواْ خَيۡرٗا لِّأَنفُسِكُمۡۗ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٦ إِن تُقۡرِضُواْ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا يُضَٰعِفۡهُ لَكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡۚ وَٱللَّهُ شَكُورٌ حَلِيمٌ ١٧﴾ [التغابن: ١٦،  ١٧]

‘অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শ্রবণ কর, আনুগত্য কর এবং তোমাদের নিজদের কল্যাণে ব্যয় কর, আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়, তারাই মূলত সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম ধৈর্যশীল।’   [সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত : ১৬-১৭]

চ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَقۡرِضُواْ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗاۚ وَمَا تُقَدِّمُواْ لِأَنفُسِكُم مِّنۡ خَيۡرٖ تَجِدُوهُ عِندَ ٱللَّهِ هُوَ خَيۡرٗا وَأَعۡظَمَ أَجۡرٗاۚ وَٱسۡتَغۡفِرُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمُۢ ٢٠﴾ [المزمل: ٢٠]

‘আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর রূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ [ সূরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত : ২০]

ছ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَفِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ لِّلسَّآئِلِ وَٱلۡمَحۡرُومِ ١٩ ﴾ [الذاريات: ١٩] 

‘আর তাদের ধনসম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক।’ {সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত : ১৯}

জ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ وَٱلَّذِينَ فِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ مَّعۡلُومٞ ٢٤ لِّلسَّآئِلِ وَٱلۡمَحۡرُومِ ٢٥ ﴾ [المعارج: ٢٤،  ٢٥] 

‘আর যাদের ধন-সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত হক, যাচ্ঞাকারী ও বঞ্চিতের’। {সূরা আল-মা‘আরিজ, আয়াত : ২৪-২৫}

এ ধরনের আরো অসংখ্য আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা মানবের সেবা ও সমাজের কল্যাণের নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন। তেমনি মানবমুক্তি ও সমাজকল্যাণের মহান প্রতিভূ মুহাম্মদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনভর এ শিক্ষা প্রচার করেছেন। মানবসেবা ও সমাজকল্যাণের চর্চা করেছেন আপন কর্মে যেমন, তেমনি নানা উপলক্ষ্যে নানাভাবে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন আপন বাণী বা উক্তিসমগ্রে। কিয়ামত অবধি আগত মানবতার শান্তি ও কল্যাণে তিনি অনাগত সকল ঈমানদারের সামনে এ আদর্শ রেখে গেছেন।

নবুওয়ত লাভের প্রাক্কালে হিলফুল ফুযূল নামক সংস্থা গড়েছিলেন। সেখানে কিছু যুবককে নিয়ে তিনি এ মর্মে অঙ্গিকারাবদ্ধ হন, ‘আমরা নিঃস্ব ও অসহায় দুর্গতদের সেবা করব। অত্যাচারী প্রাণপণে বাধা দেব, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করব এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনে সচেষ্ট হব।’ [বিশ্বনবী পৃ. : ৫৭]

সেকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আর্তমানব সেবার অনন্য উপমা খুঁজে পাওয়া যায় মা খাদিজা রাদিআল্লাহু আনহার প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তিতে। প্রথম ওহী দর্শনে ভীত-সন্ত্রস্ত স্বামীকে অভয় দিতে গিয়ে যা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন। যেমনটি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু আনহা সূত্রে ইমাম বুখারীর সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আস্বস্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন,

« كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ ، وَتَحْمِلُ الكَلَّ، وَتَكْسِبُ المَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الحَقِّ».

(ভার্বার্থ) ‘কখনো নয়, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়দের প্রতি দয়াশীল, পীড়িত মা ও আতুরদের ব্যয়ভার বহন করেন, নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আপনি অতিথিপরায়ন এবং সত্যিকার বিপদাপদে সদা সাহায্যকারী।’ [বুখারী : ০৩; মুসলিম : ৪২২]

৬ষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে খায়বার বিজিত হয়। ৯ম হিজরীতে যখন আরব উপদ্বীপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুগত হয়,   তখন তিনি বিশাল রাজ্যের অধিপতি। চারদিক থেকে মদীনায় যত ধন-দৌলত প্রেরিত হয় সবই তিনি অকাতরে বিলিয়ে দেন অনাথ ও দুস্থদের মাঝে। নিজে কিছুই ভোগ করেন না তিনি। মা আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহার ভাষ্য মতে, তিনি এমনভাবে ইহলোক ত্যাগ করেছেন যে তাঁর পরিবার লাগাতার দু’দিন পেট পুরে যবের রুটি খেতে পারে নি।

প্রখ্যাত সাহাবী জাবির ইবন আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনো কোনো প্রার্থীকে ‘না’ বলেন নি। তাঁর বদান্যতা, পরোপকার, মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে অবদানের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাস ও হাদীস গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মানব সেবায় গুরুত্বারোপ এবং এতে উদ্বুদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসংখ্য বাণী উচ্চারণ করেছেন, স্বল্প পরিসরে যা উল্লেখ সম্ভব নয়। সেদিকে না দিয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাক।

আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَاللَّهُ فِى عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِى عَوْنِ أَخِيهِ».

‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাকে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে যায়।’ [মুসলিম : ৭০২৮; আবূ দাঊদ : ৪৯৪৮; তিরমিযী : ১৪২৫]

অপর হাদীসে রয়েছে, প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لاَ وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ ، لاَ وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ ، لاَ وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ قَالُوا : وَمَنْ ذَاكَ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : جَارٌ لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ ، قِيلَ : وَمَا بَوَائِقُهُ ؟ قَالَ : شَرُّهُ.

‘না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি’; ‘না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি’; ‘না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি’। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ‘সেই ব্যক্তি  যার হঠকারিতা থেকে প্রতিবেশি নিরাপদ নয়।’ জিজ্ঞেস করা হলো, হঠকারিতা কী? তিনি বললেন, ‘তার অনিষ্ট বা জুলুম’। [মুসনাদ আহমদ : ৮৪১৩; মুসনাদ বাযযার : ২০২৬]

বলাবাহুল্য আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের অপচয় করা অথচ নিকটস্থ অসহায়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করাও এক ধরনের জুলুম।

একে অপরকে সাহায্য করা, একে অন্যকে যৎসামান্য হলেও কিছু দেয়াও তাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«يَا نِسَاءَ الْمُسْلِمَاتِ لاَ تَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ».

‘হে মুসলিম নারীগণ, এক প্রতিবেশি যেন তার অপর প্রতিবেশির পাঠানো দানকে তুচ্ছজ্ঞান না করে, যদিও তা ছাগলের পায়ের একটি ক্ষুর হয়।’ [বুখারী : ২৫৬৬; মুসলিম : ২২৬]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারিদ্রক্লিষ্ট বনী আদম এবং অসহায় নারীদের সাহায্যে উদ্বুদ্ধ করেছেন ব্যাপকভাবে। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« السَّاعِى عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِى سَبِيلِ اللَّهِ - وَأَحْسِبُهُ قَالَ - وَكَالْقَائِمِ لاَ يَفْتُرُ وَكَالصَّائِمِ لاَ يُفْطِرُ ».

‘বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।’ (বর্ণনাকারী বলেন,) আমার ধারণা তিনি আরও বলেন, ‘এবং সে ওই সালাত আদায়কারীর ন্যায় যার ক্লান্তি নেই এবং ওই সিয়াম পালনকারীর ন্যায় যার সিয়ামে বিরাম নেই।’ [বুখারী : ৬০০৭; মুসলিম : ৭৬৫৯]

তিনি স্ত্রীদের প্রতি সবিশেষভাবে সহমর্মিতা ও দয়ার্দ্র আচরণের উপদেশ দিয়েছেন। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ ، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَىْءٍ فِى الضِّلَعِ أَعْلاَهُ ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ »

‘তোমরা (সদুপদেশ ও সদাচারের মাধ্যমে) নারীদের কল্যাণ কামনা করো, কেননা নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড় থেকে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা হাড় হলো ওপরেরটি। তুমি যদি সেটি সোজা করতে যাও তাহলে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর নিজ অবস্থায় যদি ছেড়ে দাও তবে তা বাঁকা হতেই থাকবে। সুতরাং সদুপদেশ ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নারীর কল্যাণ কামনা করো।’ [বুখারী : ৩৩৩১; মুসলিম : ২৬৭১]

স্ত্রীর প্রতি সদাচারে তাগিদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বাণীও উচ্চারণ করেছেন যা নিয়ে আমাদের মা-বোনেরা সত্যিই গর্ব করতে পারেন। যা লজ্জা দিতে পারে তথাকথিত নারী স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের। মা আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لأَهْلِى ».

‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ [তিরমিযী : ৩৮৯৫]

অন্য ভাইয়ের প্রয়োজনে এগিয়ে যাওয়া, অন্যের আহ্বানে সাড়া দেয়াকে তিনি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এটাকে তিনি ঐচ্ছিক হিসেবে নয়; একেবারে দায়িত্বের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। যেমন : আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ ». قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ « إِذَا لَقِيتَهُ فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ ».

‘এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো সেগুলো কী হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, (১) তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে। (২) সে যখন তোমাকে নিমন্ত্রণ করবে তা গ্রহণ করবে। (৩) সে যখন তোমার মঙ্গল কামনা করবে, তুমিও তার মঙ্গল কামনা করবে। (৪) যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত করুন) বলবে। (৫) যখন সে অসুস্থ হবে তাকে, দেখতে যাবে। (৬) এবং যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে।’ [মুসলিম : ৫৭৭৮; মুসনাদ আহমাদ : ৮৮৩২]

আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, আবূ মূসা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« عُودُوا الْمَرِيضَ، وَأَطْعِمُوا الْجَائِعَ، وَفُكُّوا الْعَانِيَ ».

‘অসুস্থ লোকের সেবা করো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করো।’ [বুখারী : ৫৬৪৯; মুসনাদ আবী ই‘আলা : ৭৩২৫]

মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে ইসলামের অতি আগ্রহ এবং অনন্ত প্রেরণার স্বাক্ষর হিসেবে আর কিছু নয় কেবল নিম্নোক্ত হাদীসে কুদসীই যথেষ্ট হতে পারে। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

« إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَا ابْنَ آدَمَ مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِى. قَالَ يَا رَبِّ كَيْفَ أَعُودُكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ. قَالَ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِى فُلاَنًا مَرِضَ فَلَمْ تَعُدْهُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ عُدْتَهُ لَوَجَدْتَنِى عِنْدَهُ يَا ابْنَ آدَمَ اسْتَطْعَمْتُكَ فَلَمْ تُطْعِمْنِى. قَالَ يَا رَبِّ وَكَيْفَ أُطْعِمُكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ. قَالَ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّهُ اسْتَطْعَمَكَ عَبْدِى فُلاَنٌ فَلَمْ تُطْعِمْهُ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ أَطْعَمْتَهُ لَوَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِى يَا ابْنَ آدَمَ اسْتَسْقَيْتُكَ فَلَمْ تَسْقِنِى. قَالَ يَا رَبِّ كَيْفَ أَسْقِيكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ قَالَ اسْتَسْقَاكَ عَبْدِى فُلاَنٌ فَلَمْ تَسْقِهِ أَمَا إِنَّكَ لَوْ سَقَيْتَهُ وَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِى ».

‘কেয়ামত দিবসে নিশ্চয় আল্লাহ তাআ’লা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করো নি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক। আপনিতো বিশ্বপালনকর্তা কিভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাও নি। তুমি কি জান না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে।?’ ‘হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাও নি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কি জান না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাও নি। তুমি কি জান না যে, তুমি যদি তাকে আহার করাতে বে আজ তা প্রাপ্ত হতে।?’ ‘হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাও নি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামীন তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাকে তুমি পান করাও নি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।’ [মুসলিম : ৬৭২১; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭৩৬]

এত সব আয়াত ও হাদীসকে সামনে রাখলে কোনো মুসলিমের পক্ষেই সমাজসেবা বিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। কুরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক উলামায়ে কিরাম তাই এ ব্যাপারে সবসময় সচেতন ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায় আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ বিদায়ের পর থেকে দুইশ বছরের গোলামীর ক্ষতি পুষিয়ে এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয় নি। জাগতিক লাভের উদ্দেশে কিংবা আত্মপ্রচারমুখী সংস্থা, দল বা ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে যেমন সন্তোষজনক জনসেবা জাতি নিকট অতীতে পায় নি; তেমনি উলামায়ে কিরামকেও এ অঙ্গনে পর্যাপ্ত সংখ্যায় সম্পৃক্ত হতে দেখা যায় নি। আশার কথা হলো বর্তমান আলেম সমাজ ও ইসলামী আদর্শের লোকেরা জনসেবামূলক বিভিন্ন সংস্থা তথা ইসলামভিত্তিক এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর্ত মানবতার সেবায় তারাও ব্যাপকভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, আল-মুনাতাদা আল-আসলামী, আল-মারকাযুল ইসলামী, আন-নাদিল ইমদাদী আল-ইসলামীসহ খ্যাত-অখ্যাত অনেক ইসলামী সাহায্য সংস্থা মানবসেবায় এগিয়ে এসেছে এবং উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

অতি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, বাংলাদেশে বর্তমানে কর্মরত প্রায় ১৬ হাজার এনজিওর মধ্যে অধিকাংশের ব্যাপারে খ্রিস্টধর্ম প্রচার, ধর্মান্তর প্রচেষ্টা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনভিপ্রেত নাক গলানো এবং সেবার নামে আসা কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অসংখ্য নজির ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমগুলো যথেষ্ট সমালোচনা মুখর নয়। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সরকারও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হচ্ছে না। তাদের সম্পর্কে দেশে নাশকতা ও দুষ্কৃতিমূলক কাজে সহায়তা করার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় না। পক্ষান্তরে নিষ্ঠা ও সততার সাথে কর্মরত মুসলিম এনজিওগুলোকে জঙ্গিদের মদদদানের অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণ ছাড়াই হয়রানির শিকার হতে হয়। শুধু বাংলাদেশে নয়; অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা বিরাজ করছে।

পরিশেষে ইসলামী এনজিওগুলোর উদ্দেশে বলতে চাই আপনারা নিজেদের কর্মকাণ্ড শুধু মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন, কুরআন শিক্ষা ইত্যাদির মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে এতিমদের পুনর্বাসন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বিধবাদের সহায়তা প্রদান, যৌতুক প্রতিরোধ, মাদকদ্রব্য নির্মূল, বৃক্ষরোপন, স্যানিটেশন প্রকল্প, ইসলামভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প, বেকারদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সেবাকর্মের মাধ্যমে মানুষের আরও কাছে ঘেঁষতে চেষ্টা করুন। আর্ত-মানবতার সেবায় ইসলামের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরুন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই পার্থিব লালসা ও ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসের রোগ থেকে নিজেদের দূরে থাকতে হবে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে ব্যাপক সেবাকর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিন ইসলাম শুধু মুসলমানের জন্যই আসে নি বরং পৃথিবীর সব মানুষের জন্যই এসেছে। এছাড়াও ভুল বোঝাবুঝি ও অপপ্রচার রোধে নিজেদের সেবার ক্ষেত্র, আয়ের উৎস ইত্যাদির বিবরণ সম্বলিত তথ্য সরকার ও জনসমক্ষে তুলে ধরে আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টিও নিশ্চিত করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

]]>
http://www.quraneralo.com/manob-o-shomaj-shebai-islam-er-perona/feed/ 0
পহেলা বৈশাখ: ইতিহাস ও বিধি-বিধান http://www.quraneralo.com/history-of-bangla-newyear/ http://www.quraneralo.com/history-of-bangla-newyear/#comments Sat, 13 Apr 2013 02:47:08 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=3054 লেখকঃ  আ.স.ম শো‘আইব আহমাদ | সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

এপ্রিল মাসে আমরা বাংলাদেশীরা একটি উৎসব করে থাকি, তা হলো ১৪ই এপ্রিল। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ পালন করা। আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরী সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরর চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এজাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সম্রাট আকবার তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার এ হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

তাহলে বাংলা সন মূলত হিজরী সন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরত থেকেই এ পঞ্জিকার শুরু। ১৪১৫ বঙ্গাব্দ অর্থ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরতের পর ১৪১৫ বৎসর। ৯৬২ চান্দ্র বৎসর ও পরবর্তী ৪৫৩ বৎসর সৌর বৎসর। সৌর বৎসর চান্দ্র বৎসরের চেয়ে ১১/১২ দিন বেশি এবং প্রতি ৩০ বৎসরে চান্দ্র বৎসর এক বৎসর বেড়ে যায়। এজন্য ১৪৩৩ হিজরী সাল মোতাবেক বাংলা ১৩১৮-১৯ সাল হয়।

মোগল সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং কিছু আনন্দ উৎসব করা হতো। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি মূলত: রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিয়ম-কানুনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে কাজ-কর্ম পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ছিল। এ ধরনের কিছু সংঘটিত হওয়া মূলত ইসলামে নিষিদ্ধ বলার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

কিন্তু বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে এমন কিছু কর্মকান্ড করা হচ্ছে যা কখনোই পূর্ববর্তী সময়ে বাঙালীরা করেন নি; বরং এর অধিকাংশই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে প্রচণ্ডভাবে সাংঘর্ষিক। পহেলা বৈশাখের নামে বা নববর্ষ উদযাপনের নামে যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীদেরকে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এদেশের মানুষেরা যা জানত না এখন নববর্ষের নামে তা আমাদের সংস্কৃতির অংশ বানানো হচ্ছে।

বাংলার প্রাচীন মানুষেরা ছিলেন দ্রাবিড় বা সম্মানিত রাসূল নূহ আলাইহিস সালাম-এর বড় ছেলে সামের বংশধর। খৃস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে ইয়াফিসের সন্তানদের একটি গ্রুপ আর্য নামে ভারতে আগমন করে। ক্রমান্বয়ে তারা ভারত দখল করে ও আর্য ধর্ম ও কৃষ্টিই পরবর্তীতে ‘‘হিন্দু’’ ধর্ম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ভারতের দ্রাবিড় ও অর্নায ধর্ম ও সভ্যতাকে সর্বদা হাইজ্যাক করেছে আর্যগণ। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘‘বাঙালী’’ সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে হাইজ্যাক করা। আর্যগণ বাংলাভাষা ও বাঙালীদের ঘৃণা করতেন। বেদে ও পুরাণে বাংলাভাষাকে পক্ষীর ভাষা ও বাঙালীদেরকে দস্যু, দাসের ভাষা ইত্যাদি বলা হয়েছে। মুসলিম সুলতানগণের আগমনের পরে তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। বাঙালী সংস্কৃতি বলতে বাংলার প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতির সংমিশ্রণ বুঝানো হতো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে আর্যগণ ‘‘বাঙালীত্ব’’ বলতে হিন্দুত্ব বলে মনে করেন ও দাবি করেন। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদিগণ Hindutva অর্থাৎ ভারতীয়ত্ব বা ‘‘হিন্দুত্ব’’ হিন্দু ধর্মত্ব বলে দাবি করেন এবং ভারতের সকল ধর্মের মানুষদের হিন্দু ধর্মের কৃষ্টি ও সভ্যতা গ্রহণ বাধ্যতামূলক বলে দাবি করেন। তেমনিভাবে বাংলায় আর্য পণ্ডিতগণ বাঙালীত্ব বলতে হিন্দুত্ব ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালী সংস্কৃতি বলতে হিন্দু সংস্কৃতি বলে মনে করেন। এজন্যই তারা মুসলিমদের বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত গল্পে আমরা দেখেছি যে বাঙালী বলতে শুধু বাঙালী হিন্দুদের বুঝানো হয়েছে এবং মুসলিমদেরকে তাদের বিপরীতে দেখানো হয়েছে। এ মানসিকতা এখনো একইভাবে বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদেরকে ‘‘বাঙালী’’ পরিচয় দিলে বা জাতিতে ‘‘বাঙালী’’ লিখলে ঘোর আপত্তি করা হয়। এ মানসিকতার ভিত্তিতেই ‘‘পহেলা বৈশাখে’’ বাঙালী সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিক বা অশ্লীল কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে প্রচার করা হচ্ছে।

এক সময় বাংলা বর্ষপঞ্জি এদেশের মানুষের জীবনের অংশ ছিল। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য কৃষি ও কর্ম এ পঞ্জিকা অনুসারেই চলত। এজন্য পহেলা বৈশাখ হালখাতা বা অনুরূপ কিছু অনুষ্ঠান ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে আমাদের জীবনের কোথাও বঙ্গাব্দের কোনো প্রভাব নেই। কাগজে কলমে যাই লেখা হোক, প্রকৃতপক্ষে আমরা নির্ভর করছি খৃস্টীয় পঞ্জিকার উপর। যে বাংলা বর্ষপঞ্জি আমরা বছরের ৩৬৪ দিন ভুলে থাকি, সে বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনে আমরা সবাই ‘‘বাঙালী’’ সাজার চেষ্টা করে এ নিয়ে ব্যাপক হইচই করি। আর এ সুযোগে দেশীয় ও বিদেশী বেনিয়াগণ ও আধিপত্যবাদীগণ তাদের ব্যবসা বা আধিপত্য প্রসারের জন্য এ দিনটিকে কেন্দ্র করে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার প্রচার করে।

পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক ভাল দিক আছে। কর্মস্পৃহা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি অনেক গুণ তাদের মধ্যে বিদ্যমান। পাশাপাশি তাদের কিছু দোষ আছে যা তাদের সভ্যতার ভাল দিকগুলি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ দোষগুলির অন্যতম হলো মাদকতা ও অশ্লীলতা। আমরা বাংলাদেশের মানুষের পাশ্চাত্যের কোনো ভালগুণ আমাদের সমাজে প্রসার করতে পারি নি বা চাই নি। তবে তাদের অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও মাদকতার ধ্বংসাত্মক দিকগুলি আমরা খুব আগ্রহের সাথে গ্রহণ করতে ও প্রসার করতে চাচ্ছি। এজন্য খৃস্টীয় ক্যালেন্ডারের শেষ দিনে ও প্রথম দিনে থার্টিফার্স্ট নাইট ও নিউ-ইয়ারস ডে বা নববর্ষ উপলক্ষ্যে আমাদের বেহায়পনার শেষ থাকে না।

পক্ষান্তরে, আমাদের দেশজ সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি সকল মূল্যবোধ আমরা সমাজ থেকে তুলে দিচ্ছি। পক্ষান্তরে দেশীয় সংস্কৃতির নামে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো হচ্ছে।

বেপর্দা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মাদকতা ও অপরাধ একসূত্রে বাধা। যুবক-যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার সুযোগ দিবেন, অথচ তারা অশ্লীলতা, ব্যভিচার, এইডস, মাদকতা ও অপরাধের মধ্যে যাবে না, এরূপ চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যান্য অপরাধের সাথে অশ্লীতার পার্থক্য হলো কোনো একটি উপলক্ষ্যে একবার এর মধ্যে নিপতিত হলে সাধারণভাবে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা আর এ থেকে বেরোতে পারে না। বরং ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকে। কাজেই নিজে এবং নিজের সন্তান ও পরিজনকে সকল অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করুন।

আল্লাহ বলেছেন: ‘‘তোমরা নিজেরা জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা কর এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর। যার ইন্দন হবে মানুষ ও পাথর; যার উপর নিয়োজিত রয়েছেন কঠোর হৃদয় সম্পন্ন ফিরিশতাগণ, তারা আল্লাহ যা নির্দেশ করেন তা বাস্তবায়নে অবাধ্য হোন না, আর তাদের যা নির্দেশ প্রদান করা হয়, তা-ই তামিল করে’’। [সূরা আত-তাহরীম: ৬]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (বুখারী : ৮৯৩; মুসলিম: ১৮২৯)

প্রিয় পাঠক ! পহেলা বৈশাখ বা অন্য কোনো উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদেরকে বেপর্দা ও বেহায়পনার সুযোগ দিবেন না। তাদেরকে বুঝান ও নিয়ন্ত্রণ করুন। আপনি মসজিদে নামায আদায় করছেন আর আপনার ছেলেমেয়ে পহেলা বৈশাখের নামে বেহায়াভাবে মিছিল বা উৎসব করে বেড়াচ্ছে। আপনার ছেলেমেয়ের পাপের জন্য আপনার আমলনামায় গোনাহ জমা হচ্ছে। শুধু তাই নয়। অন্য পাপ আর অশ্লীলতার পার্থক্য হলো, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দেয় তাকে ‘‘দাইউস’’ বলা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বারংবার বলেছেন যে, তিন ব্যক্তি আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত হারাম করেছেন, মাদকাসক্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং দাইউস, যে তার পরিবারের মধ্যে ব্যভিচারকে প্রশ্রয় দেয়” (মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৯)

নিজেকে এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার পাশাপাশি মুমিনের দায়িত্ব হলো সমাজের মানুষদেরকে সাধ্যমত ন্যায়ের পথে ও অন্যায়ের বর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কাজেই পহেলা বৈশাখ ও অন্য যে কোনো উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার ক্ষতি, অন্যায় ও পাপের বিষয়ে সবাইকে সাধ্যমত সচেতন করুন। যদি আপনি তা করেন তবে কেউ আপনার কথা শুনুক অথবা না শুনুক আপনি আল্লাহর কাছে অফুরন্ত সাওয়াব লাভ করবেন। আর যদি আপনি তা না করেন তবে এ পাপের গযব আপনাকেও স্পর্শ করবে। কুরআন ও হাদীসে বিষয়টি বারংবার বলা হয়েছে।

ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো স্বার্থে অনেক মুসলিম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার পথ খুলে দেওয়ার জন্য মিছিল, মেলা ইত্যাদির পক্ষে অবস্থান নেন। আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য এরচেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছুই হতে পারে না। অশ্লীলতা প্রসারের ভয়ঙ্কর পাপ ছাড়াও ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা শুনুন:

‘‘যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।’’ (সূরা নূর: ১৯)

সাবধান হোন! সতর্ক হোন! আপনি কি আল্লাহর সাথে পাল্লা দিবেন? আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে আপনি কি জয়ী হবেন? কখন কিভাবে আপনার ও আপনার পরিবারের জীবনে ‘‘যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’’ নেমে আসবে তা আপনি বুঝতেও পারবেন না। আপনার রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্য পথ দেখুন। অন্য বিকল্প চিন্তা করুন। তবে কখনোই অশ্লীলতা প্রসার ঘটে এরূপ কোনো বিষয়কে আপনার স্বার্থ উদ্ধারের বাহন বানাবেন না।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন!!
জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

]]>
http://www.quraneralo.com/history-of-bangla-newyear/feed/ 16
ইসলামের দৃষ্টিতে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ http://www.quraneralo.com/banglanewyear/ http://www.quraneralo.com/banglanewyear/#comments Fri, 12 Apr 2013 03:40:43 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=1518 লেখক : ইঞ্জিনিয়ার মো: এনামুল হক | সম্পাদক : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া - মো: আব্দুল কাদের

ভূমিকা

নববর্ষ বা New Year’s day – এই শব্দগুলো নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসিঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, রাতে অভিজাত এলাকার ক্লাব ইত্যাদিতে মদ্যপান তথা নাচানাচি, পটকা ফুটানো – এই সবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? ৮৭ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এইসকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন ? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে ।

 

ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা

অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরূপ, খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হত ২৫শে মার্চ, এবং তা পালনের উপলক্ষ ছিল এই যে, ঐ দিন খ্রীস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট ঐশী বাণী প্রেরিত হয় এই মর্মে যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারী নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাত হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলাম ধর্মে নবী মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।” [বুখারী, মুসলিম]

বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ সম্পর্কে বলেন:

“উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ, যা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ [আল-মায়িদাহ :৪৮]

‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ [আল-হাজ্জ্ব :৬৭]

যেমনটি কিবলাহ, সালাত এবং সাওম ইত্যাদি। সেজন্য তাদের [অমুসলিমদের] উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। আর এসবের একাংশের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের শাখাবিশেষের সাথে একমত হওয়া। উৎসব-অনুষ্ঠানাদি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দ্বারা ধর্মগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।…নিঃসন্দেহে তাদের সাথে এসব অনুষ্ঠান পালনে যোগ দেয়া একজনকে কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর বাহ্যিকভাবে এগুলোতে অংশ নেয়া নিঃসন্দেহে পাপ। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসূলুল্লাহ(সা.) ইঙ্গিত করেছেন, যখন তিনি বলেন:

‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ [বুখারী, মুসলিম]

এছাড়া আনাস ইবনে মালিক(রা.) বর্ণিত:

 

“রাসূলুল্লাহ(সা.) যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি(সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ(সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন: ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর ।’ ” [সূনান আবু দাউদ]

এ হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।

ইসলামের এই যে উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়, এবং এই বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, যা হচ্ছে:

অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকান্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে, এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালানোর কারণে।

অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন:


“আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।” [সূরা যারিয়াত:৫৬]

 

সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা ।

তাইতো দেখা যায় যে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এ দুটো উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ পালন সম্পন্ন করার প্রাক্কালে। ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ সাওম পালনের পর পরই মুসলিমরা পালন করে ঈদুল ফিতর, কেননা এই দিনটি আল্লাহর আদেশ পালনের পর আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার ও ক্ষমার ঘোষণা পাওয়ার দিন বিধায় এটি সাওম পালনকারীর জন্য বাস্তবিকই উৎসবের দিন – এদিন এজন্য উৎসবের নয় যে এদিনে আল্লাহর দেয়া আদেশ নিষেধ কিছুটা শিথিল হতে পারে, যেমনটি বহু মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা এই দিনে আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভুলে গিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, বরং মুসলিমের জীবনে এমন একটি মুহূর্তও নেই, যে মুহূর্তে তার ওপর আল্লাহর আদেশ নিষেধ শিথিলযোগ্য। তেমনিভাবে ঈদুল আযহা পালিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হাজ্জ পালনের প্রাক্কালে। কেননা ৯ই জিলহজ্জ হচ্ছে ইয়াওমুল আরাফা, এদিনটি আরাফাতের ময়দানে হাজীদের ক্ষমা লাভের দিন, আর তাই ১০ই জিলহজ্জ হচ্ছে আনন্দের দিন – ঈদুল আযহা। এমনিভাবে মুসলিমদের উৎসবের এ দুটো দিন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করার দিন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শরীয়তসম্মত বৈধ আনন্দ উপভোগের দিন – এই উৎসব মুসলিমদের ঈমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।

 

নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক

নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোন বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোন উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মু্হাররামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবীজীর(সা.) মৃত্যুর বহু পরে, উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে ইংরেজি বা অন্য কোন নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?

কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে আল্লাহ এই উপলক্ষের দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন:

“নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা মায়িদাহ :৭২]

নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে বলে কোন কোন সূত্রে দাবী করা হয় , যা কিনা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। মুসলিমদেরকে এ ধরনের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের যে মূলতত্ত্ব: সেই তাওহীদ বা একত্ববাদের ওপর পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি: শয়তানের পুরোনো কূটচালের নবায়ন

আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে: পটকা ফুটিয়ে বা আতশবাজি পুড়িয়ে রাত ১২টায় হৈ হুল্লোড় করে পরিবেশ ও প্রতিবেশের শান্তি বিনষ্ট করে নববর্ষকে স্বাগত জানানো, ব্যান্ড সঙ্গীত বা অন্যান্য গান-বাজনার ব্যবস্থা, সম্ভ্রান্ত পল্লীর বাড়ীতে বা ক্লাবে গান-বাজনা, মদ্যপান ও পান শেষে ব্যভিচারের আয়োজন ইত্যাদি – এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্রপত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র ও “রাশিফল” প্রকাশ।

এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকান্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক:

নতুন দিন তথা সূর্যকে স্বাগত জানানো:

এ ধরনের কর্মকান্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র, যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রীস্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় “অ্যাটোনিসম” মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলত। এমনি ভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। খ্রীস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পালিত যীশু খ্রীস্টের তথাকথিত জন্মদিন ২৫শে ডিসেম্বরও মূলত এসেছে রোমক সৌর-পূজারীদের পৌত্তলিক ধর্ম থেকে, যীশু খ্রীস্টের প্রকৃত জন্মতারিখ থেকে নয়। ১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির সাথে আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “ক্লাসিকাল ট্রিক” বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে তুলে ধরেছেন:

“আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…”[সূরা আন নামল :২৪]

 

নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা:

নববর্ষের পার্টি বা “উদযাপন আয়োজনের” অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নারীর সহজ-লভ্যতা – নিউ-ইয়র্কের টাইম স্কোয়ারে অথবা ঢাকার গুলশান ক্লাবে – পশ্চিমেও এবং তাদের অনুকরণে এখানেও ব্যাপারটা একটা অলিখিত প্রলোভন। নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ-বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। নববর্ষের পার্টি বা উদযাপন আয়োজনের সবর্ত্রই সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীকে পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত দেখা যাবে। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে যে সকল আকষর্ণীয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন:

“আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোন ফিতনা রেখে যাচ্ছি না।” [বুখারী ও মুসলিম]

সমাজ নারীকে কোন অবস্থায়, কি ভূমিকায়, কি ধরনের পোশাকে দেখতে চায় – এ বিষয়টি সেই সমাজের ধ্বংস কিংবা উন্নতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। নারীর বিচরণক্ষেত্র, ভূমিকা এবং পোশাক এবং পুরুষের সাপেক্ষে তার অবস্থান – এ সবকিছুই ইসলামে সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ দ্বারা নির্ধারিত, এখানে ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রথা, হালের ফ্যাশন কিংবা ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের কোন গুরুত্বই নেই। যেমন ইসলামে নারীদের পোশাকের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়া আছে, আর তা হচ্ছে এই যে একজন নারীর চেহারা ও হস্তদ্বয় ছাড়া দেহের অন্য কোন অঙ্গই বহিরাগত পুরুষেরা দেখতে পারবে না।

বহিরাগত পুরুষ কারা? স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীদের পুত্র, ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, মুসলিম নারী, নিজেদের মালিকানাধীন দাসী, যৌনকামনাহীন কোন পুরুষ এবং এমন শিশু যাদের লজ্জাস্থান সম্পর্কে সংবেদনশীলতা তৈরী হয়নি, তারা বাদে সবাই একজন নারীর জন্য বহিরাগত। এখানে ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের প্রশ্ন নেই। যেমন কোন নারী যদি বহিরাগত পুরুষের সামনে চুল উন্মুক্ত রেখে দাবী করে যে তার এই বেশ যথেষ্ট শালীন, তবে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা শালীনতা-অশালীনতার সামাজিক মাপকাঠি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, আর তাই সমাজ ধীরে ধীরে নারীর বিভিন্ন অঙ্গ উন্মুক্তকরণকে অনুমোদন দিয়ে ক্রমান্বয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে যে, যেখানে বস্তুত দেহের প্রতিটি অঙ্গ নগ্ন থাকলেও সমাজে সেটা গ্রহণযোগ্য হয় – যেমনটা পশ্চিমা বিশ্বের ফ্যাশন শিল্পে দেখা যায়। মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা ভারতবর্ষে যা শালীন, বাংলাদেশে হয়ত এখনও সেটা অশালীন – তাহলে শালীনতার মাপকাঠি কি? সেজন্য ইসলামে এধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে মানুষের কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি, বরং তা কুরআন ও হাদীসের বিধান দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে। তেমনি নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা এই অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তাই ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। যিনা-ব্যভিচার ইসলামী শরীয়াতের আলোকে কবীরাহ গুনাহ, এর পরিণতিতে হাদীসে আখিরাতের কঠিন শাস্তির বর্ণনা এসেছে। এর প্রসারে সমাজ জীবনের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও সন্ত্রাস এবং কঠিন রোগব্যাধি। আল্লাহর রাসূলের হাদীস অনুযায়ী কোন সমাজে যখন ব্যভিচার প্রসার লাভ করে তখন সে সমাজ আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে ওঠে। আর নারী ও পুরুষের মাঝে ভালবাসা উদ্রেককারী অপরাপর যেসকল মাধ্যম, তা যিনা-ব্যভিচারের রাস্তাকেই প্রশস্ত করে।

এ সকল কিছু রোধ করার জন্য ইসলামে নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, নারী ও পুরুষের বিচরণ ক্ষেত্র পৃথক করা এবং দৃষ্টি অবনত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যে সমাজ নারীকে অশালীনতায় নামিয়ে আনে, সেই সমাজ অশান্তি ও সকল পাপকাজের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়, কেননা নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের চরিত্রে বিদ্যমান অন্যতম অদম্য এক স্বভাব, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সামাজিক সমৃদ্ধির মূলতত্ত্ব। আর এজন্যই ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের ফলাফল দেখতে চাইলে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকানোই যথেষ্ট, গোটা বিশ্বে শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঝান্ডাবাহী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয় মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত তথাকথিত সভ্য দেশে মানুষের ভিতরকার এই পশুকে কে বের করে আনল? অত্যন্ত নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেও সহজেই বুঝতে পারে যে, স্রষ্টার বেঁধে দেয়া শালীনতার সীমা যখনই শিথিল করা শুরু হয়, তখনই মানুষের ভিতরকার পশুটি পরিপুষ্ট হতে শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের অশালীনতার চিত্রও কিন্তু একদিনে রচিত হয়নি। সেখানকার সমাজে নারীরা একদিনেই নগ্ন হয়ে রাস্তায় নামেনি, বরং ধাপে ধাপে তাদের পোশাকে সংক্ষিপ্ততা ও যৌনতা এসেছে, আজকে যেমনিভাবে দেহের অংশবিশেষ প্রদর্শনকারী ও সাজসজ্জা গ্রহণকারী বাঙালি নারী নিজেকে শালীন বলে দাবী করে, ঠিক একইভাবেই বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে দেহ উন্মুক্তকরণ শুরু হয়েছিল তথাকথিত “নির্দোষ” পথে।

নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাল-চলন নিয়ে ইসলামের বিধান আলোচনা করা এই নিবন্ধের আওতা বহির্ভূত, তবে এ সম্পর্কে মোটামুটি একটা চিত্র ইতিমধ্যেই তুলে ধরা হয়েছে। এই বিধি-নিষেধের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীর যে অবাধ উপস্থিতি, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা – তা পরিপূর্ণভাবে ইসলামবিরোধী, তা কতিপয় মানুষের কাছে যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয়ই হোক না কেন। এই অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ৩ বছরের বালিকা ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিদ্যাপীঠে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন, পিতার সম্মুখে কন্যা এবং স্বামীর সম্মুখে স্ত্রীর শ্লীলতাহানি – বাংলাদেশের সমাজে এধরনের বিকৃত ঘটনা সংঘটনের প্রকৃত কারণ ও উৎস কি? প্রকৃতপক্ষে এর জন্য সেইসব মা-বোনেরা দায়ী যারা প্রথমবারের মত নিজেদের অবগুন্ঠনকে উন্মুক্ত করেও নিজেদেরকে শালীন ভাবতে শিখেছে এবং সমাজের সেইসমস্ত লোকেরা দায়ী, যারা একে প্রগতির প্রতীক হিসেবে বাহবা দিয়ে সমর্থন যুগিয়েছে।

ব্যভিচারের প্রতি আহবান জানানো শয়তানের ক্লাসিকাল ট্রিকগুলোর অপর একটি, যেটাকে কুরআনে “ফাহিশাহ” শব্দের আওতায় আলোচনা করা হয়েছে, শয়তানের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

“হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু আছে তা থেকে তোমরা আহার কর আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু । সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ [ব্যভিচার, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি] করতে এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন সব বিষয় বলতে যা তোমরা জান না।” [সূরা আল বাকারা :১৬৮-১৬৯]

এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা:

“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২]

ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

বিভিন্ন সাজে সজ্জিত পর্দাবিহীন নারীকে আকর্ষণীয়, প্রগতিশীল, আধুনিক ও অভিজাত বলে মনে হতে পারে, কেননা, শয়তান পাপকাজকে মানুষের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। যেসব মুসলিম ব্যক্তির কাছে নারীর এই অবাধ সৌন্দর্য প্রদর্শনকে সুখকর বলে মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য:

ক. ছোট শিশুরা অনেক সময় আগুন স্পর্শ করতে চায়, কারণ আগুনের রং তাদের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু আগুনের মূল প্রকৃতি জানার পর কেউই আগুন ধরতে চাইবে না। তেমনি ব্যভিচারকে আকর্ষণীয় মনে হলেও পৃথিবীতে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি এবং আখিরাতে এর জন্য যে কঠিন শাস্তি পেতে হবে, সেটা স্মরণ করলে বিষয়টিকে আকর্ষণীয় মনে হবে না।

খ. প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, একজন নারী যখন নিজের দেহকে উন্মুক্ত করে সজ্জিত হয়ে বহু পুরুষের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের মনে যৌন-লালসার উদ্রেক করে, তখন সেই দৃশ্য দেখে এবং সেই নারীকে দেখে বহু-পুরুষের মনে যে কামভাবের উদ্রেক হয়, সেকথা চিন্তা করে এই নারীর বাবার কাছে তার কন্যার নগ্নতার দৃশ্যটি কি খুব উপভোগ্য হবে? এই নারীর সন্তানের কাছে তার মায়ের জনসম্মুখে উন্মুক্ততা কি উপভোগ্য? এই নারীর ভাইয়ের কাছে তার বোনের এই অবস্থা কি আনন্দদায়ক? এই নারীর স্বামীর নিকট তার স্ত্রীর এই অবস্থা কি সুখকর? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কিভাবে একজন ব্যক্তি পরনারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনকে পছন্দ করতে পারে? এই পরনারী তো কারও কন্যা কিংবা কারও মা, কিংবা কারও বোন অথবা কারও স্ত্রী? এই লোকগুলোর কি পিতৃসুলভ অনুভূতি নেই, তারা কি সন্তানসুলভ আবেগশূন্য, তাদের বোনের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ স্নেহশূন্য কিংবা স্ত্রীর প্রতি স্বামীসুলভ অনুভূতিহীন?

নিশ্চয়ই নয়। বরং আপনি-আমি একজন পিতা, সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী হিসেবে যে অনুভূতির অধিকারী, রাস্তার উন্মুক্ত নারীটির পরিবারও সেই একই অনুভূতির অধিকারী। তাহলে আমরা আমাদের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য যা চাই না, তা কিভাবে অন্যের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য কামনা করতে পারি? তবে কোন ব্যক্তি যদি দাবী করে যে, সে নিজের কন্যা, মাতা, ভগ্নী বা স্ত্রীকেও পরপুরুষের যথেচ্ছ লালসার বস্তু হতে দেখে বিচলিত হয় না, তবে সে তো পশুতুল্য, নরাধম। বরং অধিকাংশেরই এধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে। তাই আমাদের উচিৎ অন্তর থেকে এই ব্যভিচারের চর্চাকে ঘৃণা করা। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি নবীজী(সা.) বর্ণনা করেছেন:

“…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।” [বুখারী ও মুসলিম]

দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।

সঙ্গীত ও বাদ্য:

নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। ইসলামে নারীকন্ঠে সংগীত নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ – একথা পূর্বের আলোচনা থেকেই স্পষ্ট। সাধারণভাবে যে কোন বাদ্যযন্ত্রকেও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন বিশেষ কিছু উপলক্ষে দফ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুমতি হাদীসে এসেছে। তাই যে সকল স্থানে এসব হারাম সংগীত উপস্থাপিত হয়, সে সকল স্থানে যাওয়া, এগুলোতে অংশ নেয়া, এগুলোতে কোন ধরনের সহায়তা করা কিংবা তা দেখা বা শোনা সকল মুসলিমের জন্য হারাম। কিন্তু কোন মুসলিম যদি এতে উপস্থিত থাকার ফলে সেখানে সংঘটিত এইসকল পাপাচারকে বন্ধ করতে সমর্থ হয়, তবে তার জন্য সেটা অনুমোদনযোগ্য। তাছাড়া অনর্থক কথা ও গল্প-কাহিনী যা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তা নিঃসন্দেহে মুসলিমের জন্য বর্জনীয়। অনর্থক কথা, বানোয়াট গল্প-কাহিনী এবং গান-বাজনা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য শয়তানের পুরোনো কূটচালের একটি, আল্লাহ এ কথা কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন:

“এবং তাদের মধ্যে যাদেরকে পার পর্যায়ক্রমে বোকা বানাও তোমার গলার স্বরের সাহায্যে, … ” [সূরা বনী ইসরাঈল :৬৪]

যে কোন আওয়াজ, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহবান জানায়, তার সবই এই আয়াতে বর্ণিত আওয়াজের অন্তর্ভুক্ত। [তফসীর ইবন কাসীর]

আল্লাহ আরও বলেন:

“এবং মানুষের মাঝে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে [মানুষকে] বিচ্যুত করার জন্য কোন জ্ঞান ছাড়াই অনর্থক কথাকে ক্রয় করে, এবং একে ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে, এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” [সূরা লোকমান :৬]

রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেছেন:

“আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।” [বুখারী]

এছাড়াও এ ধরনের অনর্থক ও পাপপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এবং আল্লাহর রাসূলের হাদীসে।

যে সকল মুসলিমদের মধ্যে ঈমান এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের উচিৎ এসবকিছুকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাগ করা।

আমাদের করণীয়

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নববর্ষ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এজন্য যে, এতে নিম্নোলিখিত চারটি শ্রেণীর ইসলাম বিরোধী বিষয় রয়েছে:

১. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত
২. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান
৩. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান
৪. সময় অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ

এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে, নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকা এবং মুসলিম সমাজ থেকে এই প্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে:

- এ বিষয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্ব হবে আইন প্রয়োগের দ্বারা নববর্ষের যাবতীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।

- যেসব ব্যক্তি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এই নির্দেশ জারি করতে পারেন যে, তার প্রতিষ্ঠানে নববর্ষকে উপলক্ষ করে কোন ধরনের অনুষ্ঠান পালিত হবে না, নববর্ষ উপলক্ষে কেউ বিশেষ পোশাক পরতে পারবে না কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবে না।

- মসজিদের ইমামগণ এ বিষয়ে মুসল্লীদেরকে সচেতন করবেন ও বিরত থাকার উপদেশ দেবেন।

- পরিবারের প্রধান এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোন অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়। (এটুকু ইনশা’আল্লাহ্ চাইলে সবাই/অনেকেই করতে পারবেন)

- এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের মানুষকে উপদেশ দেবেন এবং নববর্ষ পালনের সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন, এবং কল্যাণ ও শান্তি বর্ষিত হোক নবী(সা.)-এঁর ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর।


“এবং তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার পরিধি আসমান ও জমীনব্যাপী, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য।” [সূরা আলে-ইমরান:১৩৩]

]]>
http://www.quraneralo.com/banglanewyear/feed/ 40
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবদান http://www.quraneralo.com/human-rights-in-islam/ http://www.quraneralo.com/human-rights-in-islam/#comments Thu, 11 Apr 2013 04:14:06 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=4064

hands

অনুবাদঃ ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী | সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

ভূমিকা:

মানবাধিকার বলতে বুঝায় মহান আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত মানুষের সহজাত অধিকার। সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যদিও মানবাধিকারের মানদন্ড, সমাজভেদে এর সংজ্ঞা, প্রয়োগ ও সীমারেখা নিয়ে তৈরী হচ্ছে নানা বিতর্ক। প্রাসঙ্গিকভাবেই জাতিসংঘের বিশ্ব মানবাধিকারের বিষয়টিও সে সব আলোচনা সমালোচনায় উঠে আসছে। মানবাধিকার রক্ষায় বিশ্বের শক্তিধর রাষ্টসমূহের গৃহীত পদক্ষেপ মানুষের প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক নাকি অধিকার হরণের কৌশল তা নিয়েও বিশ্বব্যাপী চলছে ব্যাপক আলোচনা।

এমনি প্রেক্ষাপটে আমরা যদি সপ্তম ঈসায়ী শতাব্দির শুরুতে ফিরে যাই, তাহলে দেখা পাব এক অনুপম মহামানবের, যিনি নর-নারী তথা সকল মানবের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্ববাসীর সামনে হাযির করেছিলেন মানবাধিকারের সার্বজনীন রূপরেখা। তিনি হলেন বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব এবং সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি হলেন জগতের সবার জন্য Role-Model ও উসওয়ায়ে হাসানাহ। Practical Teachings এর মাধ্যমে তিনি সর্বক্ষেত্রে চমৎকার সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তাঁর দেয়া ফর্মুলাই জগতকে দিতে পারে শান্তি, সফলতা ও মুক্তি। তাঁর পূর্বযুগে যত অজ্ঞতা ছিল, বর্বরতা ছিল, যত নির্যাতন ও শোষণ ছিল, সন্ত্রাস, ভয়-ভীতি ও সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণী বিদ্বেষ ছিল, সবই তাঁর মহান আদর্শের পরশ পাথরে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল।

সমকালীন বিশ্বে মানুষের সার্বজনীন অধিকার প্রতিষ্ঠায় ওহীর নির্দেশনায় তাঁর প্রবর্তিত নীতি-দর্শন ও দিক-নির্দেশনার প্রয়োগ কেবল গ্রহণযোগ্য বা প্রয়োগ উপযোগীই নয়, বরং তা একান্ত আবশ্যক। এ প্রবন্ধে আমরা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এ মহামানবের অবদানের প্রধানতম দিকগুলো তুলে ধরব।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়ত প্রাপ্তির অনেক আগ থেকে তাঁর উত্তম চরিত্র ও মানবিক গুণাবলীর জন্যে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ঐতিহাসিকরা যে সময়কে ‘জাহেলিয়াতের বা অন্ধকার যুগ’ বলেছেন সেই সময়ে জন্মলাভ করেও ঝগড়া-বিবাদ, নরহত্যা, সম্পদ লুন্ঠন, ব্যভিচার ইত্যাদি অকল্যাণকর, মানবতার জন্যে চরম অবমাননাকর কাণ্ডে তিনি কখনো জড়িত হন নি। অথচ তখনকার সমাজে যে কোনো যুবকের জন্যে তা ছিল স্বাভাবিক। বরং তিনি ছিলেন এতিম, অসহায়, নির্যাতিতদের একমাত্র সহায়, সান্ত্বনাদানকারী, ধন-সম্পদের আমানত রক্ষাকারী এবং অনেকের আশ্রয়দাতা। চুরি-ডাকাতির ভয়ে ভীত, আতঙ্কিত মানুষ তাঁর কাছে হাজির হয়ে তাদের মূল্যবান সম্পদ আমানত রেখে যেত, আর তিনি সেই আমানতের যথাযত হেফাযত করতেন এবং যথারীতি তা ফেরত দিতেন। এভাবে নবুওয়ত লাভের অনেক আগেই আরববাসী তাকে ‘আল-আমীন’ বা ‘পরম বিশ্বস্ত’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। নবুওয়াতের পাঁচ বছর আগে পবিত্র কাবা শরীফ মেরামতকালে সেখানকার কালো পাথর ‘হাজরে আসওয়াদ’ স্বস্থানে তুলে নেয়ার ব্যাপারে কলহ-দ্বন্দের সূত্রপাত হয় এবং প্রত্যেক গোত্রই এই কাজ করে মর্যাদা লাভের প্রতিযোগিতায় যুদ্ধোন্মুখ হয়ে পড়ে, তখন সেই গুরুতর সমস্যার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র ৩৫ বছর বয়সে এমন একটি সমাধান দেন; যাতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মর্যাদাই রক্ষিত হয়েছিল। সকলেই সন্তুষ্টচিত্তে সে ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল, আর তা ছিল একটি চাদরের মাঝখানে পাথরটি রেখে গোত্রপতিদের দিয়ে চাদরটি ধরে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া ও সবশেষে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজ হাতে সেটিকে প্রতিস্থাপন করা।

সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার এই উদাহরণ তাঁর জীবনের শুরু থেকেই আজীবন নানাভাবে দেখা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন তিনি গোটা আরব জাহানের নেতা হয়ে উঠলেন তখন তিনি কি সমাজ জীবনে, কি পারিবারিক জীবনে, কি রাষ্ট্রীয় তথা নাগরিক জীবনে, কি বিশ্ব নাগরিক হিসাবে, সর্বক্ষেত্রে মানুষের মূল্য-মর্যাদা ও মানবাধিকারের যে সার্বজনীন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল, অভূতপূর্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নীতি-দর্শনের কয়েকটি দিকের উপর আলোকপাত করেলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

মানুষের বেঁচে থাকার ও নিরাপত্তা লাভের অধিকার

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের জীবনের অধিকার ও জান-মালের নিরাপত্তা বিধানের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। নরহত্যা যেখানে নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল সেখানে নরহত্যাকে জঘন্য অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করে বলেছেন,

সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার বানানো এবং মানুষকে হত্যা করা…..।[1]

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

কোনো মু‘আহাদকে (মুসলিম রাষ্ট্রে অবস্থানরত চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককে) হত্যাকারী জান্নাতের সুঘ্রাণ পর্যন্ত পাবে না। যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ ৪০ বছর দূরত্ব থেকে পাওয়া যায়।[2]

বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে (যাকে মানবাধিকারের আদি সনদ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়) মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল মানুষকে সম্বোধন করে বলেছেন,

নিশ্চয়ই তোমাদের পরস্পরের জীবন, সম্পদ এবং সম্ভ্রম তোমাদের (অবৈধ হস্তক্ষেপ থেকে) পবিত্র, যেরূপ তোমাদের এই দিন পবিত্র তোমাদের এ মাসে তোমাদের এ শহরে।[3]

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মহত্যাকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং আত্মহত্যাকারী তার নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেওয়ার শাস্তি হিসেবে আখেরাতে আত্মহত্যার অনুরূপ পন্থায় শাস্তিভোগ করবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।[4]

জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে, বিশেষত আরবদের নবজাতক বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের জন্মলাভের পরপরই দারিদ্রের ভয়ে হত্যা বা জীবন্ত প্রোথিত করার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসলামী সমাজে শিশু হত্যার এ জঘন্য প্রবণতাকে দণ্ডযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে পবিত্র কুরআনের প্রত্যাদেশের মাধ্যমে[5] শিশুদের জীবনের অধিকার ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা হয়।

বিবাহ ও পরিবার গঠনের অধিকার

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন দর্শনে সমাজের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। ইসলামে বিবাহ সমভাবে একটি অধিকার ও ধর্মীয় দায়িত্ব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

আর আমি নারীদের বিবাহ করি। সুতরাং যে আমার সুন্নাহ্ থেকে বিমুখ হল সে আমার আদর্শভুক্ত নয়।[6]

প্রকৃতপক্ষে ইসলামে ‘বিবাহ’ কেবলমাত্র জৈবিক চাহিদা পূরণের পন্থাই নয়, বরং পারস্পরিক ভালবাসা, সমঝোতা, সমবেদনা ও নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত বিবাহ ব্যবস্থা এমন একটি সামাজিক চুক্তি যাতে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মত বা অসম্মত হবার সমান অধিকার স্বীকৃত। বিবাহের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেহেতু স্বামী-স্ত্রীই হল পরিবারের মূল ভিত্তি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের উপরই প্রাথমিকভাবে পারিবারিক জীবনের শান্তি ও সুখ নির্ভর করে, তাই পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে, এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে  কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে:

তাঁরা (স্ত্রীগণ) হবে তোমাদের (স্বামীদের) ভূষণ আর তোমরা (স্বামীগণ) তাদের (স্ত্রীদের) ভূষণ।[7]

সম্পত্তির মালিকানার অধিকার

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত ইসলামী অর্থব্যবস্থা সমাজতন্ত্রবাদ বা পুঁজিবাদ কোনটিকেই পুরোপুরি সমর্থন করে না বরং তা একটি কল্যাণ রাষ্ট্রীয় ধারণাকে সমর্থন করে। এখানে ব্যক্তির জন্য সম্পত্তির অপ্রকৃত মালিকানা স্বীকৃত। তবে তা এতটাই নিয়ন্ত্রিত যে, ব্যক্তি এখানে সম্পদ উপর্জনের লাগামহীন স্বাধীনতা লাভ করে না। ইসলামী সমাজের সকল সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আল্লাহর। মানুষ দায়িত্বপ্রাপ্ত (trustee) হিসাবে এর অর্জন, ভোগ ও বণ্টনের অধিকার লাভ করে। আল-কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে,

তাদের সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।[8]

দান, খয়রাত, সদকা, যাকাত, ফিতরা প্রভৃতির মাধ্যমে বর্ধিত সম্পদের বিলি-বন্টন করে ইসলামে একটি ভারসাম্যপূর্ণ  অর্থনৈতিক অবস্থার কথাই কেবল বলা হয় নি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে কার্যকরভাবে তা প্রতিষ্ঠাও করেছেন।

স্বাধীনভাবে চলাচল, বসবাস, রাজনৈতিক আশ্রয় ও নাগরিকত্ব লাভের অধিকার

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রের যে কোনো স্থানে স্বাধীনভাবে চলাচল ও বসবাসের অধিকার প্রদান করে। একই ভাবে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের বাইরে যাওয়া ও অন্য রাষ্ট্রে বসবাসের অধিকারও প্রতিটি ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে একটি ‘বিশ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা’ ধারণায় বিশ্বাসী ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাষ্ট্রদর্শন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্ব আল্লাহর রাজত্বস্বরূপ- যা তিনি সকল মানুষের চলাচল ও বসবাসের জন্যে অবারিত করে দিয়েছেন।

নিপীড়ন-নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্তি লাভের অধিকার

শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক-মানসিক শাস্তিদান বা তাকে কষ্ট দেওয়াকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেছেন,

প্রকৃত মুসলিম হচ্ছে সে ব্যক্তি, যার কথা বা হাত (কাজের নিপীড়ন) থেকে মুসলিমগণ নিরাপদে থাকেন।[9]

এমনকি এক্ষেত্রে অমুসলিম নাগরিকগণের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় তিনি বলেছেন,

যদি কোনো মুসলিম অমুসলিম নাগরিকের উপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার উপর সাধ্যাতীত বোঝা (জিযিয়া বা প্রতিরক্ষা কর) চাপিয়ে দেয় অথবা তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষাবলম্বন করব।’’[10]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো অপরাধের জন্য অন্যকে দণ্ড দেওয়ার যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রেওয়াজও চিরতরে রহিত করে দেন। বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক অভিভাষণে তিনি বলেন,

জেনে রাখ, কারো অপরাধের জন্য তারা নিজেকেই দণ্ড বহন করতে হবে। সুতরাং পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে এবং পুত্রের অপরাধে জন্য পিতাকে দায়ী করা যাবে না।[11]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ঘোষণার মূলে ছিল কুরআনের সেই বাণী,

প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী।[12]

প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে তা শুধু তারই উপর বর্তায়, আর কেউ অন্যের বোঝা বহন করে না।[13]

অবাধ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অধীনে ন্যায়বিচার লাভের অধিকার

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রবর্তিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক-সামাজিক পেশাগত মর্যাদা নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক একটি নিরপেক্ষ, অবাধ ও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অধীনে স্বাভাবিক ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার লাভ করে। মূলত ন্যায়বিচার ধারণার উপর ইসলামে এতটা গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে যে, কুরআনে প্রায় ষাটটি আয়াতে এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন একটি আয়াতে বলা হয়েছে,

হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক, আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে, যদিও তা তোমাদের নিজদের  কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকট আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।[14]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত ইসলামী খিলাফতের শাসনামলে ইসলামে বিচার ব্যবস্থা যা শাসক গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপমুক্ত, স্বাধীন, অবাধ ও নিরপেক্ষ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে, তা ছিল মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মানবতাবোধ ও মানবাধিকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উৎসারিত।

শান্তি, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায়

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট ভাষায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন যে,

আমি তোমাকে সমগ্র সৃষ্টির জন্যে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।[15]

কুরআনের এ বাণী পরিপূর্ণভাবে সত্যে পরিণত করেছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সমাজ, রাষ্ট্র ও সমগ্র মানব জাতির ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, সাম্য ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় তিনি যে অনন্য সাধারণ উদাহরণ রেখে গেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে তা আজো অদ্বিতীয় এবং সর্বজনস্বীকৃত অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে পরিগণিত। কেননা তিনি কেবল মুসলিমদের আদর্শ ছিলেন না, ছিলেন গোটা মানব জাতির আদর্শ। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এই মর্মে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন,

বলুন (হে নবী), হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার জন্য আল্লাহর রাসূল।[16]

দয়া, ক্ষমা ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায়

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু, ক্ষমাশীল ও কোমল। দয়া, ক্ষমা, শান্তি ও সাম্যের প্রতিরূপ এই মহামানব স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন,

যে মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহ তা‘আলা তাকে দয়া করেন না।[17]

এখানে কেবল মুসলিমদের কথাই নয় বরং গোটা মানব জাতির কথা বলা হয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শনকে তিনি নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন। অন্য একটি হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

যমীনে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া করা, তাহলে উর্ধ্বালোকে যিনি আছেন তিনি তোমার প্রতি সদয় হবেন।[18]

অন্যদিকে শ্রমিক অধীনস্থ কর্মচারী ও চাকর-চাকরানীদের প্রতি সদয় ব্যবহার করা, তাদেরকে নিজেদের অনুরূপ খাওয়া-দাওয়া প্রদান, পোশাক-আশাক দেওয়া ও বিশ্রাম ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেও তিনি বারংবার তাগিদ দিয়েছেন। বস্তুত বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শ্রমিকদের সব প্রকার বঞ্চনা, অত্যাচার, নিপীড়ন আর গ্লানির অবসান করে এমন সব শ্রমনীতির প্রবর্তন করে গেছেন যার সিকি শতাংশও জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আই.এল.ও) বিগত ১১৮ বছর ধরে মে দিবস উদযাপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি।

তাঁর এই গুণাবলী ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মুগ্ধ বিখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্যিক জর্জ বার্ণাড শ’ তাই বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি,

“If all the world was united under one leader, Mohammad would have been the best fitted man to lead the peoples of various creeds, dogmas and ideas to peace and happiness.”

নারী অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়

নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। নারী মুক্তির প্রবক্তা হিসাবে আমরা হয়ত কেট মিলে (Kate Millet), জার্মেন গ্রীয়ার (Germaine Greer) বা অ্যানী নূরাকীন (Anee Nurakin) প্রমুখের নাম জানি; এক্ষেত্রে আরো উল্লেখ করা হয় মেরী উলস্টন, অ্যানী বেসামন্ত, মার্গারেট সাঙ্গাঁর, সুলতানা রাজিয়া, বেগম সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ মহিলাদের সংগ্রামের ইতিহাস। কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারীর অধিকার ও মর্যাদার জন্য যে ব্যক্তি প্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠেন, নারীকে সংসার ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য অংশ হিসাবে যে ব্যক্তি প্রথম স্বীকৃতি দেন, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারীর অধিকার পরিপূর্ণ আকারে যে ব্যক্তি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন, সত্যিকার অর্থে যিনি নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির প্রবক্তা, তিনি হচ্ছেন ‘একজন পুরুষ’ এবং তিনি আর কেউ নন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। একথা আদৌ অত্যুক্তি হবে না যে, জীবনে অন্য কিছু না করলেও শুধুমাত্র নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানই বিশ্ব মনীষায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুউচ্চ আসনে সুদৃঢ়ভাবে অধিষ্ঠিত করবে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম পদক্ষেপ ছিল কন্যা শিশু হত্যা বন্ধ করা। তিনি বরং কন্যা শিশুর লালন-পালনকে নানাভাবে উৎসাহিত করেছেন এবং নিজেও তাঁর কন্যাদের লালন-পালন কালে সেটা করে দেখিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন,

(পুরুষদের জন্যে) দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নেয়ামত হচ্ছে উত্তম স্ত্রী।’’[19]

অন্যদিকে নারীকে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পরে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মর্যাদার অধিকারী করেছেন। হাদীসে এসেছে,

আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মানুষের মধ্যে কে আমার কাছে সর্বোত্তম সম্মান, মর্যাদা ও সদ্ব্যবহার পাবার যোগ্য? তিনি বললেন, তোমার মা। সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সাহাবী আবারো জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার বাবা।[20]

নারী মুক্তির দিশারী মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীকে শুধু বাঁচিয়ে রেখে মর্যাদা দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, তিনি নারীকে যথাযথ অধিকার দিয়ে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। নারীকে তিনি অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষাগত, আইনগত এবং ধর্মীয় সব দিক দিয়ে তার অধিকার নিশ্চিত করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তসমূহকে সংক্ষেপে এভাবে উল্লেখ করা যায় :

  • ক. নারীকে পিতার সম্পত্তিতে, স্বামী, সন্তান ও মায়ের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী ধার্য করা হয়েছে।
  • খ. বিয়ের সময় নারীকে মোহরানা বা দেনমোহর প্রাপ্তি আবশ্যিক করেছেন এবং তা আদায় না করার বা তা থেকে জোর করে ব্যয় করার অধিকার স্বামী, পিতা বা ভাই কাউকে দেওয়া হয় নি।
  • গ. নারীকে স্বামী নির্বাচনের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে কোথাও বিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে একজন অকর্মন্য, অত্যাচারী স্বামী থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের পূর্ণ অধিকার নারীকে দেওয়া হয়েছে। একই সাথে বিধবা ও তালাকপ্রাপ্তা নারীকে ২য় বিবাহের বা পুনঃবিবাহের অধিকার দেওয়া হয়েছে।
  • ঘ. দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইনে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেন নি তিনি।
  • ঙ. বিদ্যাশিক্ষা করা বা জ্ঞানার্জন করার ব্যাপারে নারীকে পুরুষের মতই সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিম (নরনারী) এর উপর ফরয বা অবশ্য কর্তব্য’’।
  • চ. অত্যাচার, অপমান, অশালীনতা ও অবমাননা থেকে নারীকে রক্ষার জন্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের পোশাক পরিধানে ও জনসমক্ষে চলাফেরার সময় একটি অনুসরণীয় পোষাক-বিধি (Dress Code) মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন।

উপসংহার

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জীবনদর্শন, মানবিক মর্যাদার রূপরেখা, মানবাধিকারের পরিধি ও সীমা নির্দিষ্ট করেছেন তা মহান আল্লাহ তা‘আলারই অনুমোদিত জীবন বিধান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই জীবন বিধান যা মানবাধিকারের প্রথম মৌলিক এবং পূর্ণাঙ্গ দিক নির্দেশনা হিসাবে স্বীকৃত তা কেবল কোনো দলীল লিখিত নয়, কোনো স্বাক্ষরিত চুক্তি নয়, কোনো অনুকল্প নয় (hypothesis) , বরং তা হচ্ছে কঠোর বাস্তবতা। নিজের শৈশব থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ৬৩ বছরের প্রত্যক্ষ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রত রেখে নিজের জীবদ্দশাতেই একটি ধ্বংসস্তুপ থেকে, একটি পুঁতিগন্ধময় অন্ধকার আস্তাকুড় থেকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও মানবিক মুল্যবোধকে তুলে এনে এক সুষম, অনুসরণযোগ্য, সার্বজনীন কল্যাণকর সভ্যতা গড়ে তুলেছিলেন – মানবাধিকার, মানুষের মর্যাদা ও আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যই ছিল যার ভিত্তি।

মানবতার মুক্তিদূত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে এই অর্জন, এই স্পষ্ট সর্বজনগ্রাহ্য কল্যাণকর জীবন বিধান বিশ্বের অনেক গবেষক, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছে। মাইকেল হার্ট ‘দ্য হানড্রেড’ গ্রন্থে একশ জন ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্বের ক্রম-বিন্যাস করেছেন। তালিকার প্রথমেই (অর্থাৎ ১ নম্বরে) মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দ্বিধায় দাঁড় করিয়ে তিনি লিখেছেন:

“My choice of Muhammad to lead the list of the world’s most influential persons may surprise some readers and may be questioned by others, but he was the only man in history who was supremely successful on both religious and secular levels.”[21]

নির্দ্বিধায় তাই বলা যায়, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানব মর্যাদা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।


[1] আল্-হাদীস, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৭১।

[2] আল্-হাদীস, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৬৬।

[3] আল্-হাদীস, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৭, ১০৫, ১৭৩৯।

[4] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৫১-১২৫৩।

[5] কুরআনে বলা হয়েছে, ‘‘দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানকে হত্যা করো না, তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা এ জঘন্য অপরাধ’’। সূরা আল-ইসরা/বনী ইসরাইল: ৩১।

[6] আল হাদীস, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০৬৩।

[7]  সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৭।

[8] সূরা আল-মা’আরিজ: ২৪-২৫।

[9] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৪৮৪।

[10] আল-বায়হাকী, মা‘রিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং ৫৭৫০।

[11] আল-হাদীস, সুনান ইবনু মাজা, হাদীস নং ২৬৬৯ ও সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস নং ২১৫৯।

[12] সূরা আত-তূর: ২১।

[13] সূরা আল-আন‘আম : ১৬৪।

[14] সূরা আন-নিসা: ১৩৫।

[15] সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭।

[16] সূরা আল-‘আরাফ: ১৫৮।

[17] হাদীস নং ৭৩৭৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৬১৭২।

[18] সুনান আবি দাউদ, হাদীস নং ৪৯৪৩, সুনান আত-তিরমিযি, হাদীস নং ১৯২৪।
[19] মুসলিম, ১৪৬৭।
[20] আল-হাদীস, সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৭১।

[21] প্রাগুক্ত, পৃ.৫৫।

]]>
http://www.quraneralo.com/human-rights-in-islam/feed/ 3
ইসলাম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রত্যাখ্যান করে http://www.quraneralo.com/islam-condemn-terrorism/ http://www.quraneralo.com/islam-condemn-terrorism/#comments Thu, 04 Apr 2013 04:05:58 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=1664  

সংকলক: আলী হাসান তৈয়ব | সম্পাদনা : মো: আবদুল কাদের

ইসলাম যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে ধর্মের নামেই রয়েছে শান্তির সুবাস, যে ধর্মের নবীকেই প্রেরণ করা হয়েছে জগতবাসীর জন্য শান্তি ও রহমত স্বরূপ [ . পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ১০৭। ], সে ধর্ম সম্পর্কে এমন অপপ্রচার একান্তই বিদ্বেষপ্রসূত। ইসলাম বিদ্বেষী ভাইদের অপপ্রচারে যাতে সরলমনা মুসলিম ভাই-বোনেরা বিভ্রান্ত না হন, তাই আজ পবিত্র কুরআনে এদু’টি শব্দ কতভাবে এসেছে তা আলোচনা করে এ ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরার প্রয়াস পাব এ নিবন্ধে ইনশাআল্লাহ।

অনেক রাজনৈতিক নেতা ও চিন্তাবিদই আরবী ‘উনুফ’ বা ‘সহিংসতা’ (Violence) শব্দ ও ‘ইর‘আব’ বা ‘আতঙ্কসৃষ্টি’ (Terrorism) শব্দের মধ্যে, তেমনি ‘উনুফ’ বা ‘সহিংসতা’ ও ‘আল-ইর‘আব আল-উদওয়ানী’ বা ‘আগ্রাসন’ শব্দের মধ্যে এবং ‘উনুফ’ বা ‘সহিংসতা’ ও ‘আল-ইর‘আব আয-যরুরী’ বা ‘ত্রাস’ শব্দের মধ্যে পার্থক্য করেন না।

বস্তুত বিদেশি শব্দ সন্ত্রাস বা Terrorism-এর আরবী প্রতিশব্দ ‘ইরহাব’ নয়; ‘ইর‘আব’ . কেননা (‘ইরহাব’ শব্দের ধাতুমূল তথা) ‘রাহ্ব’ (الرهب) শব্দ ও তা থেকে নির্গত শব্দাবলি পবিত্র কুরআনে ত্রাস নয় বরং সাধারণ ভীতি-সঞ্চার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাতে একটি নির্দিষ্ট বস্তুর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অর্থ মিশে থাকে। অন্যের বেলায় মানুষ শব্দটি ব্যবহার তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাবার জন্য [ সূরা তাওবা : ৩৪; নাহল : ৫১; আম্বিয়া : ৯০; কাসাস : ৩২; হাদীদ : ২৭; হাশর : ১৩। ]। আর এ শব্দ কিন্তু ‘র‘ব’ (الرعب) শব্দ থেকে ভিন্ন অর্থ বহন করে। কেননা ‘র‘ব’ শব্দের অর্থ তীব্র ভীতি-সঞ্চার অর্থাৎ ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা[ . সূরা আলে-ইমরান : ১৫১; আনফাল : ১২; আহযাব : ২৬; হাশর : ২। ] । মানুষ এ শব্দটিকে ব্যবহার করে অন্যকে শায়েস্তা করা এবং তাদের ওপর জুলুম চালানোর জন্য। আবার এর কতক সংঘটিত হয় উদ্দেশ্যহীন, অনির্দিষ্ট ও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কারণে[ইবন মানযুর, আল-বুসতানী। ] ।

তবে এতদসত্ত্বেও ‘ইরহাব’ ও ইর‘আব’ শব্দ আরবী ভাষায় ধাতুগতভাবে শুধু মন্দ বা শুধু ভালোর জন্য ব্যবহৃত হয় না। এদুটি এমন মাধ্যম যা ভালো বা মন্দের পক্ষাবলম্বন করে না। উভয় শব্দ সত্য প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় প্রতিরোধ এবং নিপীড়িতের সাহায্যার্থে ব্যবহৃত হয়। তেমনি শব্দদুটিকে নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষের ওপর অত্যাচার, অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ও অধিকার হরণ এবং তাদের ভূমি দখলের জন্যও ব্যবহৃত হয়।

তবে ‘উনুফ’‘ইরহাব’ শব্দের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। ‘উনুফ’ অর্থ চিন্তা, মতবাদ, দর্শন কিংবা সাধারণ বা বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রকাশ্যে সহিংস মাধ্যম বা উপায় অবলম্বন করা। যেমন : আঘাত, শারীরিক নির্যাতন বা অস্ত্র ব্যবহার। পক্ষান্তরে ‘ইরহাব’ ও ‘ইর‘আব’ শব্দদুটি এর চেয়ে ব্যাপক অর্থ বহন করে। কারণ তা হতে পারে সহিংস উপায়ে আবার হতে পারে অহিংস উপায়ে। যেমন :

আকার-ইঙ্গিতের মাধ্যমে ভয় দেখানো। (তাকে এভাবে ইঙ্গিতে জবাই করার ভয় দেখানো।) অথবা কথার দ্বারা ভয় দেখানো। যেমন : অর্থনৈতিকভাবে বয়কটের হুমকি, কঠোরতা আরোপের হুমকি, না খেয়ে মারার হুমকি কিংবা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি ইত্যাদি। ‘ইরহাব’ ও ‘ইর‘আব’ শব্দদুটি ভেটোর ক্ষমতা প্রয়োগ অথবা জালেমের নিন্দা প্রস্তাবে ভোট দেয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করে। অসত্য অভিযোগ প্রচারের মাধ্যমেও ‘ইরহাব’ ও ‘ইর‘আব’ সংঘটিত হতে পারে। যেমন : টার্গেট গোষ্ঠীর সুনাম ক্ষুণ্ন করতে বা তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে অপপ্রচার ও প্রচলিত মিডিয়া যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করা।

এই ‘ইরহাব’ ও ‘ইর‘আব’ কখনো হামলার শিকার ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক হত্যা করে না। বরং তাকে দীর্ঘ শাস্তি ও ধারাবাহিক নির্যাতন করে ধুঁকিয়ে ধুঁকিয়ে মারে। অর্থাৎ এ দুটি কখনো তৎক্ষণাৎ না মেরে ধীরে ধীরে মৃত্যু ডেকে আনে। এটি করা হয় তাকে গৃহহীন অবস্থা ও ক্ষুধার মুখে ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে।

আমাদের চারপাশে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ব্যাপকার্থে যারা ‘ইরহাব’ ও ‘ইর‘আব’ করছে- যার মধ্যে রয়েছে সত্য প্রতিষ্ঠা করা ও নির্যাতন প্রতিরোধ করা অথবা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া ও অত্যাচারীকে আশ্রয় দেয়া- এরা প্রধানত তিন দলে বিভক্ত। যথা :

১. যারা নীতি-নৈতিকতার বাইরে গিয়ে শব্দদুটিকে ব্যবহার করে তাদের নির্যাতন বা অন্যায়কে বৈধতা দেবার জন্য। আখিরাতে বিশ্বাসী হোক বা না হোক- এরা মানবস্বভাব ও ঐশী শিক্ষার বিরোধী। যার মধ্যে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শও রয়েছে।

২. যারা যথাসাধ্য প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে থেকে শব্দদুটি ব্যবহার করে আত্মরক্ষা কিংবা অক্ষম ও নিরপরাধ লোকদের থেকে জুলুম প্রতিরোধের উদ্দেশে। তারা আখিরাত বা শাশ্বত জীবনে বিশ্বাস রাখে না। তারা এসব করে আল্লাহ প্রদত্ত সুস্থ বিবেকের তাড়নায়।

৩. যারা শব্দদুটি ব্যবহার করে আত্মরক্ষা বা অক্ষম ও নিরপরাধ লোকদের ওপর জুলুম প্রতিরোধে যথাসম্ভব শরীয়ত ও প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে থেকে। তারা বিশ্বাস করে এজন্য তারা আখিরাত বা শাশ্বত জীবনে বিশাল প্রতিদান লাভ করবে। অতএব, তারা এসব করে সুস্থ বিবেক ও অনন্ত জীবনের বিশাল প্রতিদানের প্রত্যাশায়।

এ জন্যই দেখা যায় শেষোক্ত দলটি আত্মোৎসর্গ ও আত্ম নিবেদনে সবচে বেশি আগ্রহী ও সাহসী হয়। কেননা ,তার দৃষ্টিতে পার্থিব জীবন কেবল উসিলা বা বিধেয় মাত্র; মাকসাদ বা উদ্দেশ্য নয়। সম্ভবত এটিই মানুষকে নিজেদের সম্মানিত স্থান, নিজেদের মাতৃভূমি ও নিপীড়িত স্বজনদের রক্ষায় প্রাণোৎসর্গমূলক জিহাদী কার্যক্রমে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।

সাধারণভাবে আত্মঘাতমূলক তৎপরতার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের আইন ব্যাখ্যাকারী তথা ফিকহবিদদের মতভিন্নতা হেতু বিভিন্ন হয়। তাদের অনেকে কাজটিকে বৈধ বলেন এবং এ কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধও করেন। যতক্ষণ তা হয় আত্মরক্ষার্থে এবং অন্যায়ভাবে অন্যের ওপর সীমালঙ্ঘনের ইচ্ছে ছাড়া। উপরন্তু তা নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও পরিচালিত না হয়, যাদের ওপর ইসলাম যুদ্ধক্ষেত্রে পর্যন্ত হামলার অনুমতি দেয় না। যেমন : নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও নিরস্ত্র ব্যক্তি। অনুরূপভাবে সব রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই মানবরচিত আইন সেনাদেরকে নিজের দৃষ্টিতে বৈধ যুদ্ধক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি নিতে এমনকি জীবন উৎসর্গ করতে পর্যন্ত উৎসাহিত করে। পক্ষান্তরে অনেক শরীয়তবিদ কাজটিকে আত্মহত্যার সঙ্গে তুলনা করে হারাম বলে অভিহিত করেন। তাদের মতে, জীবনের ঝুঁকি নেয়া ভিন্ন জিনিস। কারণ সেখানে জীবন রক্ষার সম্ভাবনাই প্রবল। তাছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকি গ্রহণকারীর মৃত্যুর কোনো অভিপ্রায়ই থাকে না।

আসমানী রিসালত বা ঐশী বার্তাপ্রাপ্ত ধর্ম পালনকারী ব্যক্তিমাত্রেই জানেন, দুনিয়ার এ জীবন মূলত একটি পরীক্ষাতুল্য। এর মাধ্যমে চিরস্থায়ী জীবনে পুরস্কারযোগ্য সৎকর্মশীল এবং অনন্ত জীবনে তিরস্কারযোগ্য অসৎ ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য রচনা করা হয়। আর সত্যপন্থী ও মিথ্যাপন্থীর সংঘাত এবং নিপীড়ক ও নিপীড়িতের দ্বন্দ্ব এ পরীক্ষার একটি অংশ মাত্র। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন,

وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنْصُرَنَّ اللَّهُ مَنْ يَنْصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ (40)

 

‘আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা দমন না করতেন, তবে বিধস্ত হয়ে যেত খৃস্টান সন্ন্যাসীদের আশ্রম, গির্জা, ইয়াহূদীদের উপাসনালয় ও মসজিদসমূহ- যেখানে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়।’[হজ : ৪০।]

 

‘ইরহাব’ ও ‘ইর‘আব’ কখনো সংঘটনের ইচ্ছা ছাড়া সংঘটিত হতে পারে। ভুলক্রমেও হতে পারে কখনো। তবে এ ব্যাপারে তাকে সতর্ক করার পরও যদি সে এমন কাজ থেকে নিবৃত না হয়, যা ‘ইরহাব’ বা ‘ইর‘আব’-এর কারণ হয়, তখন তা ইচ্ছাকৃত ‘ইরহাব’ বা ‘ইর‘আব’ বলেই গণ্য হবে।

ইসলাম যেহেতু মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের ব্যাপক শান্তি কিংবা অন্তত নানা ধর্মের মানুষের মধ্যে শুধু দুনিয়ার শান্তির প্রতি আহ্বান জানায়। তাই এ ধর্ম অন্যের ওপর অত্যাচার বা সীমালঙ্ঘনমূলক ‘ইরহাব’‘ইর‘আব’ সংঘটনকে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করে। তীব্রভাবে একে প্রত্যাখান করে এবং সীমালঙ্ঘন বা উৎপীড়নমূলক ‘ইরহাব’ ‘ইর‘আব’ এর জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে।

হ্যা, ইসলাম এতদুভয়ের অনুমতি দেয় ঠিক; তবে তা শাস্তিকে অপরাধী পর্যন্ত সীমিত রাখা এবং অনুমোদিত ক্ষেত্র অতিক্রম না করার শর্তে। অনুমোদিত ক্ষেত্র হলো, আত্মরক্ষা, শত্রু দমন ও নির্যাতিতের সাহায্যের জন্য। বিশেষত জুলুম প্রতিরোধের কোনো ক্ষমতাই সেসব দুর্বল ও অক্ষম ব্যক্তির নেই। একেই ইসলামে ‘জিহাদ’[যিনিই আরবী ‘জিহাদ’ শব্দ ও এর ধাতুমূল নিয়ে চিন্তা করবেন, দেখবেন তাতে পূর্বে সংঘটিত কোনো কিছুর প্রতিরোধ অর্থ লেপ্টে আছে। কোনো হামলার সূচনার অর্থ নেই তাতে। যেমন দেখতে পারেন, ইবনুল কায়্যিম : ৩/৫-৯।] অথবা ‘কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ’ বলা হয়। যার উদ্দেশ্য কেবল নিরস্ত্র, অক্ষম ও দুর্বলদের থেকে জুলুম তুলে দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا (75)

 

‘আর তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না! অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা বলছে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে বের করুন এ জনপদ থেকে’ যার অধিবাসীরা যালিম এবং আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন। আর নির্ধারণ করুন আপনার পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী।’[নিসা : ৭৫।]

 

হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنِّى حَرَّمْتُ عَلَى نَفْسِى الظُّلْمَ وَعَلَى عِبَادِى فَلاَ تَظَالَمُوا.

 

‘হে আমার বান্দা, আমি নিজের ওপর জুলুম হারাম করেছি এবং তোমাদের জন্যও একে হারাম করেছি। অতএব তোমরা একে অপরের ওপর জুলুম করো না।’[মুসলিম : ৬৭৪০।]

 

এ কারণেই মুসলমানদের ক্ষেত্রে এমন বিচিত্র নয় যে তারা তাদের প্রজা সাধারণ (যিম্মী) বা সংখ্যালঘুদের বাঁচাতেও জিহাদ করছে।[ইবন কুদামা মুকাদ্দেসী; ইবন তাইমিয়া হাররানী, আশ-শিরাজী; আল-হানাফী।] এককথায়, কারও ওপর জুলুম চালানোর জন্য নয়; ইসলামে ‘জিহাদ’ নামক বিধান রাখা হয়েছে বৈধ প্রতিরোধের জন্য। আর নির্যাতন প্রতিরোধের পদক্ষেপকে গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য দেশের মানব রচিত সকল ব্যবস্থাই সমর্থন করে। এ উদ্দেশ্যেই তো সকল রাষ্ট্র শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করে। নিজেকে সুসজ্জিত করে বিধ্বংসী সব অস্ত্র দিয়ে।

আত্মরক্ষামূলক এবং আক্রমণাত্মক ভীতিপ্রদর্শনের মধ্যে পার্থক্য করবো কিভাবে
ইতোমধ্যে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়েছে, ভীতিপ্রদর্শন ও ভয় দেখানো শব্দটিকে সন্ত্রাসী (জালেম) ও সন্ত্রাসের শিকার (মাজলুম) উভয়েই ব্যবহার করে। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে আমরা এদুয়ের মধ্যে জালেম ও মজলুমকে পার্থক্য করবো কিভাবে?

আত্মরক্ষার্থে ভীতিপ্রদর্শন আর সন্ত্রাসমূলক ভীতিপ্রদর্শনের মধ্যে মোটাদাগে পার্থক্য এই :

অন্যের বিরুদ্ধে কে প্রথমে ত্রাস বা সন্ত্রাসের সূচনা করেছে? যে সূচনা করেছে সে চর্চা করছে আক্রমণাত্মক ভীতিপ্রদর্শন আর যিনি প্রতিরোধ করছেন তিনি হলেন আত্মরক্ষাকারী। একইভাবে যিনি জালেমকে বস্তুগত বা নৈতিকভাবে সমর্থন করবেন তিনি আক্রমণাত্মক ভীতিপ্রদর্শনকারীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবেন। পক্ষান্তরে যিনি মজলুমকে সাহায্য করবেন তিনি আত্মরক্ষাকারী বলে গণ্য হবেন।
এটা ঠিক সচরাচর সহজে সূচনাকারী শনাক্ত করা যায় না। কারণ, জালেম পক্ষের গরিমা ও অহঙ্কার বেশি হয়। নিপীড়কের শক্তি হয় পর্বতপ্রমাণ। এমনকি মজলুমের চেয়ে জালেমের প্রমাণও হয় দৃঢ়তর। তথাপি বিষয়টি অন্যভাবে খোলাসা করা সম্ভব।
তবে সূচনাকারী শনাক্ত করা মুশকিল হলে অন্যভাবে তা চি‎হ্নিত করা যায়। যেমন আমরা উভয় পক্ষের মধ্যে মিমাংসার চেষ্টা করে দেখবো। যে পক্ষ ইনসাফভিত্তিক সালিশের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাবে সে-ই জালেম, হোক সে মুসলিম। কারণ আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ (9)

 

‘আর যদি মুমিনদের দু’দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের ওপর বাড়াবাড়ি করে, তাহলে যে দলটি বাড়াবাড়ি করবে, তার বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না সে দলটি আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি দলটি ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে মীমাংসা কর এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।’[সূরা আল-হুযরাত, আয়াত : ০৯।]

 

সন্ত্রাস ও আগ্রাসী হামলা কখনো ভিন্ন রূপ ধারণ করে। তা হলো, অভিযোগ প্রমাণ না করেই কোনো মানুষকে শাস্তি দেয়া। কিংবা কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ওপর নির্ভর করে একটি জাতিকে বা পুরো মানব সমাজকে শাস্তি দেয়া। এ কাজ ইসলাম কিছুতেই সমর্থন করে না। শাস্তি দিলে তা অবশ্যই অনুমোদিত সীমা অতিক্রম না করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণের পরও শাস্তি থাকতে হবে যুক্তিগ্রাহ্য সীমারেখার ভেতর। পরন্তু শাস্তির প্রকৃতিও হওয়া চাই অভিন্ন। অত্যাচারী বা জালেমের ভিন্নতায় তা যেন ভিন্ন ভিন্ন না হয়। অতএব যালেম দুর্বল হলে বা মিত্র না হলে তার শাস্তি কঠোর হবে না। তেমনি যালেম শক্তিধর, মিত্র বা তার কাছে কোনো স্বার্থ থাকলে তার শাস্তি লঘু করা হবে না। সর্বদা শাস্তি হবে ইনসাফের আলোয় উদ্ভাসিত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সর্বাবস্থায় ইনসাফের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآَنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ (8)

 

‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোন কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’[সূরা আল-মায়িদা, আয়াত : ৮।]

 

তবে ইসলামের এসব সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকার পরও মুসলিম নামধারী অনেকে ইসলামের মহান আদর্শকে উপেক্ষা করে। আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অমান্য করে তারা সন্ত্রাস ও আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়। এটা স্বাভাবিক যে প্রতিটি রাষ্ট্রই তার নাগরিকদের সঠিক আচরণ শিক্ষা দেয়। তারপরও তো প্রতিটি দেশেই অপরাধীতে পূর্ণ অনেক কয়েদখানা থাকে। তাই বলে কি আমরা বলবো যে অমুক জাতি পুরোটাই অপরাধী? কিংবা অমুক জাতি তার সদস্যদের অপরাধ শিক্ষা দেয়? আমেরিকার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮২-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৫টি অন্যায় হামলা বা সন্ত্রাস সংঘটিত হয়েছে। এর অধিকাংশ সংঘটিত হয়েছে খ্রিস্টান দ্বারা, তারপর ইহুদিদের দ্বারা। তাই বলে কি আমরা বলবো সকল খ্রিস্টান বা সব ইহুদিই সন্ত্রাসী বা আগ্রাসী? অবশ্যই না।

অতএব আজ যারা ইসলামের সঙ্গে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের সম্পর্ক আবিষ্কার করতে চান, কুরআনের ভেতর অনুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে মানবাধিকার পরিপন্থী কথা তালাশ করে হয়রান হন, তারা হয়তো অমুসলিমদের প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে কিংবা ইসলাম বিরুদ্ধ শক্তির প্রভাবে এমনটি করে থাকেন। ইদানীং মুসলিম নামধারী অনেককেও দেখা যায় ইসলাম-আরাতীদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতে। তাদের সুরে কথা বলতে। বরং ইসলামের অনিষ্ট চিন্তায় অমুসলিমদের চেয়ে এসব মুসলিম নামধারীরাই একধাপ এগিয়ে। তাদের জন্য থাকছে আমাদের বুকভরা ভালোবাসা, একরাশ করুণা আর অনন্ত শুভ কামনা। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এবং সকল মুসলিমকে হেদায়াত দিন। সবাইকে ইসলাম বিরোধী শক্তির অপ্রচারের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার তাওফীক দিন। আমীন।

কৃতজ্ঞতা-স্বীকার : ড. সাঈদ ইসমাঈল চীনী, তাসাউলাত জাদালিয়্যাহ হাওলাল ইসলাম ও তালীকাত।

]]>
http://www.quraneralo.com/islam-condemn-terrorism/feed/ 4
এপ্রিলের মিথ্যাচার http://www.quraneralo.com/april/ http://www.quraneralo.com/april/#comments Sun, 31 Mar 2013 18:15:23 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=1487

লেখক :  মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ | অনুবাদক : সানাউল্লাহ নজির আহমদ

 

মিথ্যা একটি চারিত্রিক ব্যাধি। যার মধ্যে মনুষ্য রুচিবোধ কিংবা সুস্থ প্রকৃতি বিদ্যমান সে কোনক্রমেই এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করতে পারে না। আর না করাই হচ্ছে স্বাভাবিক মনুষ্য ধর্ম। সকল ধর্মেই এর প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে।

‘পক্ষান্তরে সত্য পৃথিবীর স্থায়িত্বের একটি মূল ভিত্তি। প্রশংসাযোগ্য বস্তু, নবুওয়তের অংশ ও তাকওয়ার ফল। এ সত্য না থাকলে শরিয়তের বিধানসমূহ অকেজো হয়ে যেত।  মূলত মিথ্যা বলার দোষে দুষ্ট হওয়ার অর্থ হচ্ছে মানবতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া। কারণ, কথা বলা মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য আর কথা সত্য না হলে তার কোন অর্থই থাকে না।’ (মুহাম্মদ আল-খাদেমি: বারীকাতুন মাহমূদিয়া, ৩/১৮৩)

আমাদের পবিত্র দীনে ইসলামে এর সামান্যতম আশ্রয়-প্রশ্রয় নেই। কুরআন, হাদিস এবং উম্মতের ঐকমত্য দ্বারা প্রমাণিত যে এটা হারাম, এটা নিষিদ্ধ ও গর্হিত। যে মিথ্যা বলে তার পরিণাম দুনিয়া ও আখেরাতে খুবই নিন্দনীয়।

নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্র ব্যতীত মিথ্যা বলার কোন অবকাশ নেই। এ মিথ্যার মাধ্যমে কারো অধিকার হরণ করা যাবে না, কাউকে হত্যা করা যাবে না এবং কারো ইজ্জত সম্মানে আঘাত হানা যাবে না। বরং কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিংবা দু’জনের মধ্যে ছিন্ন সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার জন্য অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত তৈরি করার জন্য এ মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে, অন্যথায় নয়।

ইসলাম ধর্মে এমন একটি মুহূর্ত কিংবা দিন-ক্ষণ নেই যার মধ্যে মিথ্যা বলা বৈধ বা মানুষ যা চায় তা বলার জন্য সে স্বাধীন। পক্ষান্তরে কতক সমাজে প্রচলিত রেওয়াজ যেমন পহেলা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুল নামে যে কুসংস্কার চলে আসছে যে, তাতে মিথ্যা বলা বা কাউকে ধোঁকা দেয়া সম্পূর্ণ বৈধ, তার কোন ভিত্তি ইসলাম ধর্মেই নেই। বরং মিথ্যা সবসময়ই মিথ্যা এবং সবসময় তা হারাম।

মিথ্যার ক্ষতিসমূহ :

মিথ্যা বলা হারাম :

১. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যুক।’ (সূরা নাহাল : ১০৫)

ইবনে কাসির রহ. বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, রাসূল সা. মিথ্যা তৈরি করেন না এবং মিথ্যা বলেনও না। কারণ, আল্লাহ এবং তার রাসূলের নামে যারা মিথ্যা রটায় তারা নিকৃষ্ট মাখলুক। তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর বিশ্বাস রাখে না, তারা কাফের, তারা নাস্তিক; তারা মানুষের নিকট মিথ্যুক হিসেবে পরিচিত। পক্ষান্তরে রাসূল সা. মানুষের মাঝে সব চেয়ে সত্যবাদী হিসেবে, সব চেয়ে সৎকর্মশীল হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কওমের সবাই তাকে বিশ্বস্ত মু‏হাম্মদ বা আল-আমীন মুহাম্মদ বলে ডাকত।’ (ইবনে কাসির : ২/৫৮৮)

২. আবুহুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘মুনাফেকদের নিদর্শন তিনটি : কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, ওয়াদা করে ভঙ্গ করা এবং আমানতের মধ্যে খেয়ানত করা।’ (বুখারি : ৩৩, মুসলিম : ৫৯)

ইমাম নববি রহ. বলেন, অধিকাংশ আলেমে রায় হচ্ছে এগুলো মুনাফেকির আলামত ও স্বভাব। যার মধ্যে এগুলো থাকবে সে এসব স্বভাবে মুনাফেকদের ন্যায় ও তাদের আচরণ গ্রহণকারী।

  • আর সব চেয়ে বড় মিথ্যা :

সব চেয়ে বড় মিথ্যা হচ্ছে আল্লাহ ও তার রাসূল সা. এর ওপর আরোপ করা। এর শাস্তি ভয়াবহ, কেউ কেউ এ জাতীয় মিথ্যুককে কাফের পর্যন্ত বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার ওপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।’ (নাহাল : ১১৬)

আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘তোমরা আমার ওপর মিথ্যা বলবে না, যে আমার ওপর মিথ্যা বলবে, সে যেন আগুনে প্রবেশ করে।’ (বুখারি : ১০৬)

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘যে আমার ওপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি : ১১০, মুসলিম : ৩)

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,

‘এর অর্থ হচ্ছে যে রাসূল সা. এর ওপর মিথ্যা বলবে সে যেন নিজ স্থায়ী ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়।’ (তারিকুল হিজরাতাইন : ১৬৯)

বেচাকেনায় মিথ্যা বলা :

সাহাবি আবু যর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘কেয়ামতের দিন তিন জন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না এবং সংশোধন করবেন না, আরও তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আবু যর বলেন, রাসূল সা. একথাগুলো তিনবার বললেন। আবু যর বলেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা ধ্বংস প্রাপ্ত, তাদের পরিচয় কি হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, উপকার করে খোটা প্রদানকারী ব্যক্তি ও মিথ্যা কসমের মাধ্যমে বিক্রয়কারী ব্যক্তি।’ (মুসলিম : ১০৬)

হাকিম ইবন হিযাম থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘ক্রেতা ও বিক্রেতা ইচ্ছাধীন যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়। যদি তারা সত্য বলে ও দোষ-গুণ বর্ণনা করে দেয়, তবে তাদের মধ্যে বরকত প্রদান করা হয়। আর যদি তারা গোপন রাখে ও মিথ্যা বলে তবে তাদের বরকত নষ্ট করে দেয়া হয়।’ (বুখারি : ১৯৭৩, মুসলিম : ৫৩২)

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘আল্লাহ সত্য ও স্পষ্ট করে বলার জন্য আদেশ দিয়েছেন এবং মিথ্যা ও গোপন করার জন্য নিষেধ করেছেন, যেসব ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলার প্রয়োজন হয়, সেসব ব্যাপারে। যেমন রাসূল সা. বলেছেন,

‘ক্রেতা ও বিক্রেতা ইচ্ছাধীন যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়। যদি তারা সত্য বলে ও দোষ-গুণ বর্ণনা করে দেয়, তবে তাদের মধ্যে বরকত প্রদান করা হয়। আর যদি তারা গোপন রাখে ও মিথ্যা বলে তবে তাদের বরকত নষ্ট করে দেয়া হয়।’

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোন কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর।’ (মায়েদা : ৮)

(মিনহাজুস সুন্নাহ : ১/৬১)

স্বপ্নের ব্যাপারে মিথ্যা বলা হারাম :

কেউ কেউ স্বপ্নে কিছু না দেখেও বলে যে, আমি স্বপ্নে এমন এমন দেখেছি, অতঃপর মানুষের কাছে তা বলে বেড়ায়। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘যে ব্যক্তি স্বপ্ন না দেখেও স্বপ্ন দেখার ভান করবে, তাকে দু’টি গমের মাঝে গিরা দিতে বলা হবে, অথচ তা সে করতে সক্ষম  হবে না। আর যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা কান পেতে শুনল, অথচ তারা তাকে তা শোনাতে চায় নি, তার কানে কেয়ামতের দিন শিশা ঢালা হবে, যে ব্যক্তি ছবি অঙ্কন করবে কেয়ামতের দিন তাকে শাস্তি দেয়া হবে  এবং তাকে বলা হবে তাতে রুহ সঞ্চার করতে, অথচ তা করতে সে সক্ষম হবে না।’ (বুখারি : ৬৬৩৫)

মুনাবি রহ. বলেন, ‘দু’টি গমের মাঝে তাকে গিরা দিতে বলা হবে’ এর অর্থ হচ্ছে তাকে সর্বদা শাস্তি দেয়া হবে। জাগ্রত অবস্থার চেয়ে ঘুমন্ত অবস্থার মিথ্যা ব্যাপারে কেন এ কঠিন শাস্তি ? অথচ জাগ্রত অবস্থায় মিথ্যা বলে কাউকে তো হত্যা পর্যন্ত করা যায়। এর উত্তর হচ্ছে, ঘুমন্ত অবস্থায় মিথ্যা বলার অর্থ হল আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলা। কারণ, স্বপ্ন নবুয়তের একটি অংশ, তাই নবুওয়তের অংশও আল্লাহর পক্ষ থেকেই। সবার নিকট বিদিত যে, মানুষের ওপর মিথ্যা বলার চেয়ে আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলার শাস্তি ভয়াবহ ও কঠিন।’ (ফায়জুল কাদির : ৬/৯৯)

সব শোনা কথা বলাও হারাম :

হাফস ইবন আসেম থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেনে,

‘ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বলবে।’ (মুসলিম : ৫)

ইমাম নববি রহ. বলেন, ‘এ সব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যা যা শোনা যায় তার সব কিছু বলা নিষেধ। কারণ, প্রতিনিয়ত সত্য-মিথ্যা অনেক কিছুই শোনা যায়, অতএব যে ব্যক্তি সব কিছু বলে বেড়াবে তার দ্বারা মিথ্যা প্রচারিত হওয়াই স্বাভাবিক, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোন সম্পর্ক বিদ্যমান থাকবে না। আর এটাই হচ্ছে মিথ্যা, মিথ্যার জন্য ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দখল নেই। হ্যাঁ, গোনাহগার হওয়ার ইচ্ছা শর্ত।আল্লাই ভাল জানেন।’ (মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থ : ১/৭৫)

সব চেয়ে ঘৃণিত হচ্ছে হাসিতামাশাচ্ছলে মিথ্যা বলা :

অনেকে ধারণা করে যে হাসি-রসিকতায় মিথ্যা বলা বৈধ। আর এ থেকেই বিশ্ব ধোঁকা দিবস বা এপ্রিল ফুলের জন্ম। এটা ভুল ধারণা, এর কোন ভিত্তি নেই ইসলাম ধর্মে। রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় মিথ্যা সর্বাবস্থায় হারাম।

ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,

‘আমি রসিকতা করি ঠিক, তবে সত্য ব্যতীত কখনো মিথ্যা বলি না।’ (তাবরানি ফিল মুজামুল কাবির : ১২/৩৯১, সহিহ আল-জামে : হাদিস নং ২৪৯৪)

আবুহুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম একদা বলল,

হে আল্লাহ রাসূল, আপনি তো আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন। তিনি বললেন, ‘আমি সত্য ভিন্ন কিছু বলি না।’ (তিরমিজি : ১৯৯০)

আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লা রহ. বলেন, রাসূল সা. এর সাহাবিগণ বলেছেন যে, তারা রাসূল সা. সঙ্গে কোন সফরে ছিল, তাদের একজন ঘুমিয়ে পড়লে অপর কেউ তার তীর নিয়ে নেয়, লোকটি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে ভীত হয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে সবাই হেসে দিল। রাসূল সা. বললেন, তোমরা হাসলে কেন? তারা বলল, কিছু হয়নি। তবে আমি তার তীরটি নিয়েছিলাম আর এতেই সে ঘাবড়ে গেছে। রাসূল সা. বললেন,

‘কোন মুসলিমের জন্য অন্য কোন মুসলিমকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।’ (আবুদাউদ : ৫০০৪, আহমদ : ২২৫৫৫, অনুবাদ আহমদ থেকে, সহিহ আল-জামে : ৭৬৫৮)

অপর এক হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন,

‘তোমাদের কেউ কারো আসবাব পত্র ইচ্ছায় বা রসিকতায় ধরবে না, কেউ কারোটা ধরে থাকলে তার উচিত তাকে তা ফেরৎ দেয়া।’ (আবুদাউদ : ৫০০৩, তিরমিজি : ২১৬০, সহিহ আল-জামে : ৭৫৭৮, হাদিসটি হাসান)

বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাচ্ছলে মিথ্যা বলা :

বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ, এটা বাচ্চাদের অন্তরে গেঁথে যায়। রাসূল সা. এর থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

আমাকে আমার আম্মা একদিন ডাকলেন, তখন রাসূল সা. আমাদের ঘরে বসা ছিলেন, আম্মা বললেন, তুমি আস, আমি তোমাকে দেব। রাসূল সা.  বললেন, তুমি তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা করেছ? তিনি বললেন, আমি তাকে খেজুর দেব। রাসূল সা. তাকে বললেন, হ্যাঁ, যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তবে তার সঙ্গে তোমার এটা মিথ্যা বলা হত।’ আবু হুরায়রা রা. বলেন, যে ব্যক্তি কোন বাচ্চাকে বলল, আস আমি তোমাকে দেব, অতঃপর সে যদি না দেয়, তবে তার এটা মিথ্যা কথা হবে। (আবুদাউদ : ৪৯৯১, হাদিসটি সহিহ আল-জামেতে হাসান বলা হয়েছে, হাদিস নং ১৩১৯)

লোক হাসানোর জন্য মিথ্যা বলা :

মুয়াবিয়া ইবন হাইদা বলেন, আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি,

‘ধ্বংস তার জন্য যে, লোক হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।’ (তিরমিজি : ২৩৫, তিনি বলেছেন, হাদিসটি হাসান, আবুদাউদ : ৪৯৯০)

মিথ্যার পরিণাম :

মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ধ্বংসাত্মক। এর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস আর আখেরাত রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। নিম্নে কয়েকটি তুলে ধরা হল :

ক. মিথ্যার কারণে অন্তরে কপটতার সৃষ্টি হয়।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘সুতরাং পরিণামে তিনি তাদের অন্তরে নিফাক রেখে দিলেন সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তারা আল্লাহকে যে ওয়াদা দিয়েছে তা ভঙ্গ করার কারণে এবং তারা যে মিথ্যা বলেছিল তার কারণে।’ (তওবা : ৭৭)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন,

‘মুনাফিকদের পরিচয় তিনটি : যখন কথা বলবে মিথ্যা বলবে, আর ওয়াদা করে ভঙ্গ করবে ও আমানত রাখলে খেয়ানত করবে। অতঃপর তিনি দলিল স্বরূপ সুরা তওবার ৭৫-৭৭ পর্যন্ত আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ৬/১২৫)

খ. মিথ্যা পাপাচার ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন,

‘সত্যবাদিতা হচ্ছে শুভ কাজ। আর শুভ কাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর বান্দা যখন সত্য বলতে থাকে, একসময় আল্লাহর নিকট সে সিদ্দিক হিসেবে পরিগণিত হয়। আর মিথ্যা হচ্ছে পাপাচার, পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়, বান্দা যখন মিথ্যা বলতে থাকে, আল্লাহর নিকট একসময় সে মিথ্যুক হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারি : ৫৭৪৩, মুসলিম : ২৬০৭)

সানআনি বলেন, ‘হাদিসে এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, বান্দা সত্য বললে সত্যবাদিতা তার একটি আলামত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে বান্দা মিথ্যা বললে মিথ্যা বলা তার অভ্যাস ও আলামতে পরিণত হয়। সত্যবাদিতা ব্যক্তিকে জান্নাতে নিয়ে যায় আর মিথ্যা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। অধিকন্তু সত্যবাদীর কথার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে ও তা মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায় আর মিথ্যুকদের কথার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে না এবং মানুষের নিকট তা গ্রহণযোগ্যতাও পায় না।’ (সুবুলুস্‌সালাম : ২/৬৮৭)

গ. মিথ্যুকদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না।

ইবনুল কাইয়ূম রহ. বলেন,

যেসব কারণে ফতোয়া, সাক্ষ্য ও  বর্ণনা পরিত্যাগ করা হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মিথ্যা। মিথ্যা মানুষের মুখের কার্যকারিতাই নষ্ট করে দেয়। যেমনিভাবে অন্ধ ব্যক্তির চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় এবং বধির ব্যক্তির শোনার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, মুখ একটি অঙ্গের ন্যায় যখন তা মিথ্যা বলা আরম্ভ করবে তখন তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং মানুষের ক্ষতির মূল কারণই হচ্ছে মিথ্যা জবান।’ (আলামুল মুয়াক্কিঈন : ১/৯৫)

ঘ. মিথ্যার কারণে দুনিয়া আখেরাত উভয় জাগতেই চেহারা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যায়

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে।’ (জুমার : ৬০)

আল্লাহ এবং তার রাসূলের ওপর মিথ্যা বলার শাস্তি হচ্ছে চেহারা কালো হয়ে যাওয়া।

ঙ. হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মিথ্যুকের চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।

সামুরা ইবন জুনদুব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই বলতেন,

“তোমাদের কেউ কি কোনো স্বপ্ন দেখেছে?” তখন আল্লাহ যা মঞ্জুর করেন, তা কেউ কেউ বর্ণনা করতেন। একদিন প্রত্যুষে তিনি বললেন, আমার কাছে রাতে (স্বপ্নে) দু জন আগন্তুক এসেছিল। তারা আমাকে উঠালো এবং বলল, আমাদের সাথে চলুন। আমরা গেলাম, তখন এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছলাম, যে তার পিঠের উপরে শুয়ে ছিল আর অন্য একজন লোহার কাঁচি নিয়ে তার উপরে দণ্ডায়মান ছিল। সে তার চেহারার এক পার্শ্বে এসে তার চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত, তার নাসিকা চিরে গর্দান পর্যন্ত এবং তার চক্ষু চিরে গর্দান পর্যন্ত কেটে নিয়ে যাচ্ছিল। …. অতঃপর অপর চেহারার অপর পার্শ্বে গিয়ে এ পার্শ্বে যা করেছিল তাই করল। এক পার্শ্ব শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে আবার তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেত। ফলে সে অপর পার্শ্বে গিয়ে পুনরায় একই কাজ করত।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ!! এই দু জন কারা? তারা আমাকে বলল, সামনে এগিয়ে যান, সামনে এগিয়ে যান।” (অতঃপর ফেরেশতা দু জন তিনি যা দেখেছেন তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলল:) “আপনি যে লোককে দেখেছেন তার চোয়াল গর্দান পর্যন্ত, তার নাসিকা চিরে গর্দান পর্যন্ত এবং তার চক্ষু গর্দান পর্যন্ত চিরে নেওয়া হচ্ছিল, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে তার ঘর থেকে সকালে বের হয়ে এমন এক মিথ্যা কথা বলে, যা দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে।” (বুখারি : ৫৭৪৫)

মিথ্যা সম্পর্কে মনীষীদের উক্তি:

আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

‘কোনো মানুষ সত্য বলবে এবং সত্য বলার প্রচেষ্টায় থাকবে, অবশেষে তার অন্তরে সুঁই পরিমাণ স্থান থাকবে না মিথ্যার জন্য। আবার, কোনো মানুষ মিথ্যা বলবে এবং মিথ্যা বলতে চেষ্টা করবে, অবশেষে তার অন্তরে সুঁই পরিমাণ স্থানও অবশিষ্ট থাকবে না সত্যের জন্য।’

আরও বর্ণিত আছে, তিনি বলেন:

‘রসিকতা কিংবা একান্তভাবে— কখনোই মিথ্যা বলবে না।’

অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন:

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্‌র তাক্ওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।” [সূরা আত-তাওবা: ১১৯]

আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

‘তোমরা মিথ্যা থেকে সাবধান থাক! কেননা, মিথ্যা ঈমানের পরিপন্থী।’

সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

‘একজন মুমিন ব্যক্তির মধ্যে মিথ্যা ও বিশ্বাসঘাতকতা ব্যতীত সকল চরিত্রই থাকতে পারে।’

উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

‘কখনওই সত্যিকারের ঈমানে পৌঁছতে পারবে না, যতক্ষণ না ঠাট্টাচ্ছলে মিথ্যা বলা ত্যাগ না করতে পার।’

(মুসান্নাফ ইবন আবী শায়বা: ৫/২৩৫, ২৩৬)

যেসব কারণে মিথ্যা বলা যায় :

তিন জায়গায় মিথ্যা বলা বৈধ।

  • ১. যুদ্ধে মিথ্যা বলা বৈধ।
  • ২. দু’গ্রুপের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ।
  • স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মিল-মহব্বত সৃষ্টি করার জন্যও মিথ্যা বলা বৈধ।

উম্মে-কুলসুম রা. বলেন, আমি রাসূল সা. কে বলতে শুনেছি :

‘যে ব্যক্তি দু’জনে মাঝে সমঝোতা করার জন্য ভালো কথার আদান-প্রদানকালে মিথ্যা বলে সে মিথ্যুক নয়।’ (বুখারি : ২৫৪৬, মুসলিম : ২৬০৫)

আসমা বিনতে ইয়াজিদ বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, ‘

তিন জায়গা ব্যতীত মিথ্যা বলা বৈধ নয়। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মিথ্যা বলা, যুদ্ধে মিথ্যা বলা এবং দু’জনের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ। তিরমিজি : ১৯৩৯, সহিহ আল-জামে : ৭৭২৩)

(মূল থেকে সামান্য সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে)

সমাপ্ত

সূত্রঃ ইসলাম হাউজ

]]>
http://www.quraneralo.com/april/feed/ 2
নারীকে আবেদনময়ী দেখালেই পুরুষ ধর্ষণ করবে? http://www.quraneralo.com/reasons-for-rape/ http://www.quraneralo.com/reasons-for-rape/#comments Sun, 31 Mar 2013 05:25:43 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=4036 17656628দিল্লিতে গত ডিসেম্বরে চলন্ত বাসে মেডিকেলের এক শিক্ষার্থীকে গণধর্ষণ। গত সপ্তাহে মধ্যপ্রদেশে এক সুইস নারীকে গণধর্ষণ। একই সপ্তাহে আগ্রায় হোটেলের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে এক ব্রিটিশ নারীর ধর্ষণ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা। সম্প্রতি ভারতে সংঘটিত আলোচিত ধর্ষণকাণ্ডের অন্যতম এগুলো।

সরকারি হিসাব মতে, ভারতে প্রতি ২১ মিনিটে একটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের ব্যাপারে ভারতীয় পুরুষেরা কী ভাবেন? এ প্রশ্নটি মাথায় রেখে ভারতের গোয়া রাজ্যের কয়েকজন ব্যক্তির মতামত জানতে চেয়েছিল ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ‘অবজারভার’। মতামত দেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় সবার বক্তব্য ছিল, মেয়েদের আবেদনময়ী দেখালে ছেলেরা ধর্ষণ করবে—এটাই স্বাভাবিক।

‘ধর্ষণ একটা সমস্যা। এটা নারীদের দিক থেকেই শুরু হয়। ওরাই পুরুষদের উত্তেজিত করে তোলে।’ বলছিলেন ৩২ বছর বয়সী এক পানশালার মালিক পাপি গঞ্জালেস। মাথা নেড়ে তাঁর কথায় সম্মতি দিলেন পানশালার কর্মী রবিন শ্রীঠা। ২১ বছর বয়সী এ তরুণের বক্তব্য, ‘মেয়েদের আবেদনময়ী দেখালে ছেলেরা নিজেদের আর ধরে রাখতে পারে না।’

২৮ বছর বয়সী অভিজিত্ হারমালকার পেশায় গাড়িচালক। ধর্ষণের ব্যাপারে তাঁর মতামত, ‘ধর্ষণের জন্য শুধু পুরুষকে দোষারোপ করা হচ্ছে। অথচ তরুণীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে কেউ কথা বলছে না। আমাদের এটা বোঝা উচিত যে, রাতের বেলায় মেয়েদের বাড়ির বাইরে যাওয়া উচিত নয়। আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন।’

হারমালকারের ছোট ভাই অবিনাশের (২৪) ভাষ্য, মা-বাবার উচিত বেশি রাতে মেয়েদের বাইরে যাওয়া বন্ধ করা। তাহলে এ ধরনের অপরাধ ঘটবে না। ২৬ বছর বয়সী ভিভরেশ বানাওলিকার একটি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমার এক বোন আছে। ও যদি রাতে বাইরে যায়, আমি চিন্তায় পড়ে যাই। সাতটা পেরিয়ে গেলে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ি। পুরুষেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ভারতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও বিশ্বাস করেন, ধর্ষণের দায় শুধুই পুরুষের নয়। চলন্ত বাসে মেডিকেলছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হওয়ার পর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল অনেকে। এ অবস্থার মধ্যেও মেয়েদের সাজগোজ ও পোশাক নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ছেলে এবং পার্লামেন্ট সদস্য অভিজিত্ মুখার্জি। ভারতের ধর্মীয় গুরু আসারাম বাপু বলেছিলেন, ‘ধর্ষণের শিকার নারী নির্দোষ ছিল না। এক হাতে কখনো তালি বাজে?’

গঞ্জালেস বলেন, ‘নারীদের ওপরে যৌন নিপীড়ন ঠেকানোর একটি উপায় হতে পারে মা-বাবার কড়া শাসন, রাতে বাড়ির বাইরে যেতে না দেওয়া। এটা অনেক দিন ধরে প্রচলিত একটি উপায়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে, আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছিল পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে। এ জন্য আমরা মা-বাবাকে সম্মান করতাম। তাঁরা আমাদের যা বলতেন, আমরা তাই করতাম। মা-বাবা চিৎকার করে বলতেন, “এটা কর, ওটা কর”, আমরা করতাম। কিন্তু এখনকার প্রজন্মে ওসব বদলে গেছে।’

হারমালকার বলেন, যে পুরুষেরা বাসে নারীদের ওপরে নিপীড়ন করে, তারা একা থাকে না। তাদের বাঁচানোর জন্য আরও অনেকে থাকে বলেই তারা এমনটা করার সাহস পায়। আবার এমনও হয়, তারা যে ভুল করছে, এটা তারা বোঝে না।

যাঁদের মত নেওয়া হচ্ছিল, তাঁরা কেউ সমাধানের ব্যাপারে একমত হতে পারছিলেন না। বানাওলিকার বলেন, ধর্ষণ বন্ধের একমাত্র উপায় হলো ছেলেদের কাজে ব্যস্ত রাখা এবং পথ থেকে সরিয়ে নেওয়া। তিনি বলেন, ‘আমি যে কাজ করি, তাতে সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। ওসব করার সময় আমার নেই। যদি আপনি তাদের (ছেলেদের) ব্যস্ত রাখেন, তবে তাদের সামলাতে পারবেন। বেকার ছেলেরাই ওসব কাজ করে।’

বানাওলিকার বলেন, ‘যদি তারা (ছেলেরা) কাউকে কিছু করতে দেখে, তাহলে নিজেরাও সেটি করতে চায়। মেয়েদের বেলায়ও এমনটি ঘটে। দিনের বেলা সে সুবোধ বালিকা, কিন্তু রাত হলেই সে বুঝে যায় কী করতে হবে। এ জন্য সে তার বন্ধুদের পটায়।’

সবার মত হলো, মা-বাবা ও স্কুলের উচিত ঠিক-বেঠিক শিক্ষা দেওয়া।

ভারতে যাঁরা নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এ আলোচনাটি আশঙ্কাজনক ও ভীতিকর। গত সপ্তাহে দেশটির লোকসভায় ধর্ষণবিরোধী আইন পাস হয়েছে। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। নারীদের হয়রানি বা উত্ত্যক্ত করার জন্যও কড়া শাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ওই আইনে। তবে গোয়ার সমুদ্রতীরে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে অবজারভারের আলাপে এতটুকু বোঝা গেছে, যাঁরা যৌন নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে প্রচার চালাচ্ছেন, তাঁদের জন্য খুব বেশি আশা নেই। অবিনাশ বলেন, ‘কিচ্ছু বদলাবে না। প্রতিদিন এসব হচ্ছে। তবু কিছু হবে না। দুনিয়াটা ধ্বংস হলে যদি কিছু হয়!’

এইটা ছিল অমুসলিম দের সমাধান।(১) 

আসুন এবার দেখী ইসলাম ধর্মে ধর্ষণ বা নারীর উপর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে কি কি পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেঃ 

ধর্ষণের বা নারীর প্রতি নিপীড়নের কারন

১। পুরুষের অতিরিক্ত লালসা/ মাত্রাতিরিক্ত যৌন আকাংখাঃ

ধর্ষণের জন্য পুরুষের অতিরিক্ত লালসা/ মাত্রাতিরিক্ত যৌন আকাংখাই দায়ী এটা মানতেই হবে। কিন্তু এটা বর্তমানে ভারতে, বাংলাদেশে এতো বেড়ে গেল কেন। সামাজিক বিশ্লেষণ এবং মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটাই প্রমাণিত হবে যে কথিত পশ্চিমা আধুনিক বস্তুবাদী জড়বাদী ভোগবাদী কালচারই তার পুঁজিবাদী স্বার্থে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীকে পণ্য হিসেবে এবং ভোগের উপচার হিসেবে তুলে ধরে অসংশোধিত পুরুষের যৌন লালসাকে uncontrolled কিরে তাকে নরপশুতে পরিনত করেছে। পুরুষের এই অবাধ কামনা দূর করতে হবে এই কালচারের অপনোদন আগে দরকার। আমাদের দেশের নরপশুদের ধর্ষকামী মানসিকতা আগের চেয়ে বাড়ার কারন এই ভোগবাদী পুঁজিবাদী সংস্কৃতির বিস্তার বেড়ে গেছে। বলিউড কালচার আর হলিউড কালচার , পুঁজিবাদী ভোগবাদী কালচার যেভাবে নারীকে ভোগের উপচার হিসেবে তুলে ধরে তাতে অনেক বখাটে লোকের মাঝে ধর্ষকামী মানসিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটাকে আড়াল করে সমস্যার সমাধান হবে না। আপনি নারীকে সমাজে, সাহিত্তে, বিজ্ঞাপনে, নাটকে, সিনেমায় ভোগের পণ্য হিসেবে তুলে ধরবেন আর বলবেন ধর্ষণ প্রতিরধের কথা তা হবে না।

২। শাস্তি না হওয়াঃ ধর্ষণের শাস্তি না হওয়া এর হার বৃদ্ধি করে এটা সবাই জানে। আর বাংলাদেশের কথা বলতেই লজ্জা পাচ্ছি। এই বাংলাদেশেই জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা যেখানে মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার কথা সেখানে এই দেশের শাসকগোষ্ঠী তাকে উল্টা সরকারী চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করল।

এবার আসুন দেখা যাক ইসলাম ধর্ষণ বা নারীর উপর যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে কি কি পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছে

ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে নারী ধর্ষণ ও উৎপীড়ন। সাথে সাথে কার্যকর করতে বলেছে নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় উভয়ের কঠোরভাবে পালনীয় হিজাব বা পর্দা এবং সাব্যস্ত ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।

১. ধর্ষণ ও উৎপীড়নের শেকড় শুদ্ধ নির্মূল করার পরামর্শঃ 

বড় বড় সকল ধর্ম নারী ধর্ষণ ও উৎপীড়ন জঘন্য অপরাধবলে ঘোষণা করে। ইসলামের শিক্ষাও তাই। তাহলে কি পার্থক্য ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের? পার্থক্যের বিষয়টা হলে ইসলাম শুধুমাত্র নারী মর্যাদার ওয়াজই করেনা বা ধর্ষণ ও উৎপীড়ণকে ঘৃনার সাথে জঘন্য অপরাধ হিসেবে পরিত্যাগ করতেই বলে না। সাথে সাথে সুস্পস্ট নির্দেশনাও দেয় কিভাবে সমাজ থেকে এই অপরাধ সম্পূর্ন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ধর্ষকামী মানসিকতা আসে অতিরিক্ত যৌন লালসা থেকে, আবার তা আসে নারীকে শুধুই ভোগ্যপণ্য মনে করলে। নারীকে মানবিক ভাবে না দেখে কেবলি লালসা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ভাবলেই যৌন নিপীড়ন থেকে শুরু করে ধর্ষণ পর্যন্ত হতে পারে। এজন্য নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আগে ঠিক করতে হবে।এজন্য ইসলামে মানুষকে সর্বপ্রকার লালসা, লোভ, পরিহার করে সংযমের শিক্ষা দেয়া হয়, কোরআনে বলা হয়েছে, “ওই ব্যক্তিই সফল যে নিজেকে সংশোধিত করতে পেরেছে” ইসলাম একজন মানুষকে(নারী বা পুরুষ) সব রকমের দুনিয়ার মাত্রাতিরত আকর্ষণ (তা অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতার লোভ, অবাধ ভোগবাদ) থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। তাই প্রাথমিকভাবেই ইসলামি শিক্ষায় বা নৈতিকতায় গড়ে একজন নারী/পুরুষ আত্মিক ভাবেই সংশোধিত মানব। তার পক্ষে এসব নারী নিপীড়নে জড়িয়ে পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই।

২.পুরুষের পর্দাঃ 

হিজাব বা পর্দা ইসলামের একটি বিধান। জ্যোতির্ময় কুরআন প্রথম উল্লেখ করেছে পুরুষের পর্দা। তারপরে তা নারীর জন্য।

(হে রাসূল!) মোমেন পুরুষদের বলোঃ তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে চলে। এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সমূহ হেফাজত তরে। এটা তাদের আরো পবিত্র হয়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। (তাদের চরিত্র নির্মাণের জন্য) যা কিছুই তারা করে অবশ্য অবশ্যই আল্লাহ সে সব কিছু সম্পর্কেই খবর রাখবেন। (সূরা নূরঃ ৩০)

যে মুহুর্তে একটি পুরুষ একজন নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলো যদি কোনো ধরনের অশ্লিল চিন্তা মাথায় এসে যায় এই ভয়ে সাথে সাথে তার দৃষ্টি নামিয়ে নেবে।

৩. নারীর পর্দাঃ 

কুরআন নারীর পর্দা সম্পর্কে এভাবে বরেছেঃ আর (হে নবী) মোমেন স্ত্রীলোকদের বলুন! তারা যেন নিজেদের চোখ অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সমূহের যথাযথ সংরক্ষণ করে। আর যেন প্রদর্শনী না করে তাদের রুপ-সৌন্দর্য ও অলংকারের। তবে এ সবের মধ্যে যা অনিবার্যভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়। আর তারা যেন ঝুলিয়ে দেয় তাদের ওড়না তাদের বুকের ওপর। আর তারা প্রকাশ করবে না তাদের রুপ-সৌন্দর্য তাদের স্বামী অথবা তাদের পিতা অথবা তাদের স্বামীদের পিতা (শ্বশুর) অথবা তাদের পুত্র।(সূরা নূরঃ৩১)

বিস্তারিত জানতে এই বইটি পড়ুন -  পর্দা একটি ইবাদাত 

হিজাব উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করে

নারীকে কেন আল্লাহ হিজাব ধারণ করতে বরেছেন কুরআনে তা এভাবে বলা হয়েছে

হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ ও কন্যাগণ এবং ঈমান গ্রহণকারী নারীদেরকে বলে দিন তারা যেন ঝুলিয়ে দেয়া তাদের নিজেদের ওপর তাদের বড় চাগর জাতীয় কিছু (যখন বাইরে যাবে)। এটা তাদের পরিচিতির জন্য ন্যুনতম (পোষাক) তাহলে তারা আর উৎপীড়িত হবে না। আর আল্লাহ তো আছেনই ক্ষমা দানকারী দয়াময়। (সূরা আহযাবঃ ৫৯)

কুরআন বলে, নারীকে এই কারণে হিজাব পড়তে বলা হয়েছে যেন তারা রুচিশিলা মহিলা হিসাবে পরিচিত হয়। এটা তাদেরকে উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করবে।

৪. ধর্ষকের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি মৃত্যুদন্ড

ইসলাম নরপশুদের সতর্ক করে দিয়েছে যে তারা যদি ধর্ষণ করে তাহলে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। ধর্ষণের জন্য এই কঠোর শাস্তির বিধান হচ্ছে ইসলামের চতুর্থ রক্ষাকবচ। ইসলামের বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষ যদি কোনো নারী ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে তার শাস্তি প্রকাশ্য মৃত্যুদন্ড। (২) 

উৎসঃ

১) প্রথম আলো ২৫-০৩-১৩

২) এক ভাইয়ের ব্লগ থেকে 

]]>
http://www.quraneralo.com/reasons-for-rape/feed/ 1
পঙ্গপালের হুমকি নিয়ে বিপাকে ইসরাইল http://www.quraneralo.com/swarm-attack-on-isreal/ http://www.quraneralo.com/swarm-attack-on-isreal/#comments Sun, 10 Mar 2013 04:49:12 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3995 article-2288908-1879E4F0000005DC-469_634x383

গত চার মার্চ থেকে এক অবিশ্বাস্য ও বিরল আক্রমণের শিকার মধ্যপ্রাচের দেশ ইসরাইল। আর এই আক্রমণ করছে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল। সোমবার মিসর থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে আক্রমণ চালিয়েছে এরা। মিশর বলছে এই সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। খবর রয়টার্স

পঙ্গপালের আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইসরাইলিদের জীবন। পঙ্গপালের কারণে বাড়ির বাহিরে বের হতে পারছে মানুষ না। আক্রমণের কারণে ফসলের বিপুল ক্ষয়-ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে স্থল ও বিমান থেকে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে।

এই ঘটনা ঘটল যখন কিনা ইহুদিদের অন্যতম বড় উৎসব ‘পেসাহ’ এর আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি। হজরত মুসার (আ.) আমলেও পঙ্গপালের আক্রমণ হয়েছিল। ইহুদিদের অবকাশ দিবসে মিসরের দাসত্ব থেকে ইসরাইলের মুক্তির কাহিনী প্রচার করা হচ্ছে। হজরত মুসার বাণী মানতে অস্বীকার করলে ফেরাউনের ওপর ১০টি মহামারী নাজিল হয়েছিল। পঙ্গপালের আক্রমণ সেই ১০ টির মধ্যে অষ্টম নাম্বার। তারা মিসরের শস্যক্ষেত্রে আক্রমণ করেছিল। কোরআনেও পঙ্গপালের বর্ণনা রয়েছে।

রয়টার্স জানায়, তিন সপ্তাহ ধরে মিসর সীমান্ত থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল অনুপ্রবেশ করছে। এগুলোকে বাইবেলে বর্ণিত আল্লাহ্‌র গজব হিসেবে দেখছেন ইসরাইলিরা। ফেরাউনের ওপর গজব হিসেবে পঙ্গপালের আক্রমণ হয়েছিল।

প্রথমবারের মতো সোমবার ইসরাইল পঙ্গপালের আক্রমণ সতর্কতা জারি করে। এ সময় কায়রো থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় নেগেভ মরুভূমিতে অনুপ্রবেশ শুরু করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বাতাস ও জলবায়ুর পরিবর্তিত অবস্থার কারণে পঙ্গপালের আন্তঃসীমান্ত অনুপ্রবেশ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ইসরাইল পঙ্গপালের বিরুদ্ধে রণপ্রস্তুতি নিয়েছে। শরু হয়েছে স্থল ও বিমান হামলা। পঙ্গপালের গতিবিধি সম্পর্কে জানানোর জন্য খোলা হয়েছে হটলাইন।

ইসরাইলের কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০০৫ সালের পর এই প্রথম ইসরাইলে পঙ্গপালের আক্রমণ হলো। তবে এবার যেভাবে হামলা হয়েছে ১৯৫০ এর দশকের পর এরকম হামলা আর হয়নি।

কুরআনে পঙ্গপাল সম্পর্কে যা বলা হয়েছে:

Locusts moving in Swarms (পঙ্গপাল) 

"They will emerge from their graves with downcast eyes, like swarming locusts." (Qur'an, 54:7)

"(সেদিন) তারা অবনত দৃষ্টি নিয়ে (একে একে) কবর থেকে এমনভাবে বেরিয়ে আসবে, যেন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পঙ্গপালের দল" (৫৪:৭)

This verse describes all people's situation in the Hereafter as one resembling swarming locusts. There is great wisdom in this simile.

A great deal of information was obtained about locusts in the twentieth century by conducting wide-ranging studies using micro-cameras. Locust swarms contain huge numbers of individual locusts that behave as a single body. Coming together in swarms that are kilometres long and wide, they look just like a dark cloud. It has been established, for instance, that a single swarm of desert locusts can cover 1,200 square kilometres (460 square miles) and contain between 40 and 80 million locusts per square kilometre. (157)

In addition, they deposit their eggs in sandy soils like seeds and, after the larvae have remained underground for a long period of time, they all emerge together. After digging a 10-15 cm-long tunnel in the ground, a female locust lays 95-158 eggs at once. Females can lay eggs at least three times in their lifetime. When the larvae have matured after 10-65 days, depending on the air temperature, they emerge in a large group. Up to 1,000 egg pods have been found in one square metre. Locust swarms are large enough to cover several hundred square kilometres, with the number of adult locusts per square kilometre varying from between 40 to 80 million. (158) Their long underground existence and sudden emergence in vast numbers all at the same time may resemble the resurrection of human beings on the Day of Judgement. (Allah knows best.)

Today, locusts are being studied by special units, which employ remote control imaging systems. Even NASA satellite data are used to identify areas in Africa where desert locust colonies have developed. Thanks to satellite data, it is possible to carry out wide-ranging research on land and in space over an 18 million square kilometre area.

As we have seen, the fact that the Qur'an made such a comparison at a time when these technologies did not exist is one of the proofs that it is the revelation of the Omniscient Allah.

157. “The Reach of the Desert Locust,” http://earthobservatory.nasa.gov/Study/Locusts/locusts2.html.

158. Frequently Asked Questions, Desert Locust Information Service, www.fao.org/NEWS/GLOBAL/LOCUSTS/LOCFAQ.htm#q5

Pictures:

locusts

Infestation: Locusts hang on a tree as a swarm arrives in Israel near the Egyptian border

Plagued: An Israeli motorcyclist negotiates the road despite a plague of locusts surrounding him

Beseiged: An Israeli motorcyclist negotiates the road despite a plague of locusts surrounding him

 

Panic: An Israeli man runs through the plague in Kmehin, Israel, earlier today

Panic: An Israeli man runs through the plague in Kmehin, Israel, earlier today

Swarms descending: A swarm of an estimated 30million locust has descended on Egypt (including these insects seen over the Al-Mogattam district of Cairo) as Israel braces for the infestation to head their way

]]>
http://www.quraneralo.com/swarm-attack-on-isreal/feed/ 9
দ্বীনের প্রতি বিদ্রূপ ও তার পবিত্রতাহানি করার হুকুম http://www.quraneralo.com/ruling-on-mocking-islam/ http://www.quraneralo.com/ruling-on-mocking-islam/#comments Fri, 08 Mar 2013 04:42:09 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=3986 লেখক: সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান | অনুবাদক: মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী
12

দ্বীনের প্রতি বিদ্রূপকারী মুরতাদ হয়ে যায় এবং পুরোপুরি দ্বীন ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ  لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ 

‘বলুন (মুহাম্মাদ), তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর নিদর্শনাবলীর সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছল-ছুতা দেখিয়ো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফুরী করেছ।’ [১]

এ আয়াত প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফুরী, রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ কুফুরী। অতএব যে ব্যক্তি এ বিষয়গুলোর কোন একটির প্রতি বিদ্রূপ করে, সে সবগুলোর প্রতি বিদ্রূপকারী হিসাবে গণ্য হবে। আর সে যুগের মুনাফেকদের পক্ষ থেকে যা ঘটেছিল তা এই যে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণের প্রতি বিদ্রূপ করত। তখনই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতএব এ বিষয়গুলোর প্রতি বিদ্রূপ করা একটি অন্যটির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সুতরাং যারা আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি ঠাট্টা করে এবং আল্লাহ তাআলা ব্যতীত মৃত লোকদের কাছে দোয়া করাকে বড় মনে করে, যখন তাদেরকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করা হয় এবং শিরক থেকে নিষেধ করা হয়, তখন তারা তৎ প্রতি বিদ্রূপ করতে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذَا رَأَوْكَ إِنْ يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَذَا الَّذِي بَعَثَ اللَّهُ رَسُولًا  إِنْ كَادَ لَيُضِلُّنَا عَنْ آَلِهَتِنَا لَوْلَا أَنْ صَبَرْنَا عَلَيْهَا  الفرقان

‘তারা যখন আপনাকে দেখে তখন আপনাকে কেবল বিদ্রূপের পাত্ররূপে গ্রহণ করে এবং বলে এই কি সে - যাকে আল্লাহ রাসূল করে প্রেরণ করেছেন? সে তো আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের কাছ থেকে দূরে সরিয়েই দিত, যদি আমরা তাদেরকে আঁকড়ে ধরে না থাকতাম।’ [২]

তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদেরকে শিরক থেকে নিষেধ করেছিলেন, তারা তাঁকে বিদ্রূপ করতে থাকে। প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুশরিকগণ নবীগণের দোষত্রুটি বর্ণনা করে আসছে এবং যখনই তাঁরা তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন তাঁদেরকে তারা নির্বোধ, ভ্রষ্ট ও পাগল বলে অভিহিত করে। কেননা তাদের অন্তরে রয়েছে শিরকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। অনুরূপভাবে দেখা যায় - মুশরিকদের সাথে যাদের সাদৃশ্য রয়েছে, যখনই তারা কাউকে তাওহীদের প্রতি আহ্বান করতে দেখে, নিজেদের অন্তরে শিরক থাকায় তারা তৎ পতি বিদ্রূপ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ 

আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদেরকে তাঁর সমক স্থির করে। আল্লাহকে ভালোবাসার মতই তারা তাদেরকে ভাল-বাসে। [৩]

অতএব কেউ যদি আল্লাহকে ভালোবাসার ন্যায় সৃষ্টি জগতের কোন কিছুকে ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে হবে মুশরিক। আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসা এবং আল্লাহর সাথে কাউকে ভালোবাসা এত দু ভয়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা উচিত। এজন্য যারা কবর ও মাজারকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা আল্লাহর একত্ববাদ ও ইবাদতের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে থাকে এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তারা শাফায়াতকারী রূপে গ্রহণ করেছে, তাদের প্রতি খুবই সম্মান প্রদর্শন করে। তাদের যে কেউ আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম খেতে পারে কিন্তু স্বীয় পীর ও শায়খের নামে মিথ্যা কসম খাওয়ার সাহস কারো নাই। এদের অনেকেই মনে করে যে, পীর ও শায়খের কাছে সাহায্য চাওয়া - চাই তা তার কবরে পাশে হোক কিংবা অন্য কোথাও - প্রত্যুষে মসজিদে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়ার চেয়েও তাদের জন্য বেশি উপকারী। যারা তাদের পথ ছেড়ে তাওহীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাদের প্রতি তারা উপহাস করে। তাদের অনেকেই মসজিদ ভেঙে দরগাহ বানায়। এসব কিছুই আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি উপহাস এবং শিরকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বই আর কিছু নয়। [৪] কবরপন্থীদের মধ্যে আজকাল এ ধরনের ঘটনা প্রচুর ঘটে থাকে।
ঠাট্টা-বিদ্রূপ দু’ভাগে বিভক্ত:

এক. স্পষ্ট বিদ্রূপ 

তা এমন বিদ্রূপ যে ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন তাদের এমন কথা বলা যে, ‘‘আমাদের এ সকল ক্বারীদের ন্যায় এত বেশি পেটুক, এত বড় মিথ্যাবাদী ও যুদ্ধের সময় এত ভীরু লোক আমরা দেখি নাই।’’ কিংবা অনুরূপ আরো কোন কথা যা বিদ্রূপকারীরা সাধারণত বলে থাকে। যেমন কারো এমন কথা যে, ‘‘তোমাদের এই ধর্ম পঞ্চম ধর্ম’’ অথবা বলা যে, ‘‘তোমাদের ধর্ম বানোয়াট’’।

একই ভাবে সৎকাজের আদেশ দাতা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী কাউকে দেখে উপহাসমূলক এমন কথা বলা যে,‘‘তোমাদের কাছে তো দ্বীনের লোকজন এসে গেছে’’। এ রকম আরো অসংখ্য কথাবার্তা যা গণনা করা কষ্টসাধ্য। এসব কথাবার্তা সে সব লোকদের কথার চেয়েও ভয়াবহ, যাদের ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল।

দুই: অস্পষ্ট বিদ্রূপ

এ হল এমন সমুদ্র সদৃশ যা কোন কূল-কিনারা নেই। যেমন চোখ টেপা, জিহ্বা বের করা, ঠোঁট উল্টানো, আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াতের সময় কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পড়ার সময় অথবা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার সময় হাত দিয়ে ইশারা করা [৫] অনুরূপ ভাবে এ ধরনের কথাও বলা যে ‘‘মানব-রচিত আইন অনুযায়ী শাসন পরিচালনা মানুষের জন্য ইসলামী আইন অনুযায়ী শাসন পরিচালনার চেয়ে উত্তম’’ আর যারা তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে এবং কবর পূজা ও ব্যক্তিপূজাকে বাধা দিচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যে বলা যে, ‘‘এরা মৌলবাদী’’ অথবা ‘‘এরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়’’ অথবা ‘‘ এরা ওহাবী’’ অথবা ‘‘এরা পঞ্চম মাজহাবের অনুসারী’’। এ ধরনের আরো অনেক অনেক কথাবার্তা রয়েছে যা প্রকারন্তরে দ্বীন ও দ্বীনদারদের প্রতি গালি এবং বিশুদ্ধ আক্বীদার প্রতি বিদ্রূপ হিসাবে পরিচিত। লা হাওলা ওয়া কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

এসব বিদ্রূপ ও উপহাসের মধ্যে রয়েছে সেই ব্যক্তির প্রতি বিদ্রূপ, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন সুন্নাহকে শক্ত ভাবে মেনে চলে। তারা দাঁড়ি রাখার প্রতি উপহাস করে বলে : দ্বীন-ধর্ম তো চুলের মধ্যে নেই, ইত্যাদি আরো নানারকম বিশ্রী কথা।

সমাপ্ত

[১] সূরা তাওবা, ৬৫-৬৬
[২] ফুরক্বান, ৪১-৪২
[৩] সূরা বাকারা, ১৬৫
[৪] ফাতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, ১৫তম খন্ড ৪৮-৪৯
[৫] মাজমুউত তাওহীদ, ৪০৯

 সূত্রঃ ইসলাম হাউজ

]]>
http://www.quraneralo.com/ruling-on-mocking-islam/feed/ 1