QuranerAlo.com - কুরআনের আলো ইসলামিক ওয়েবসাইট » বোনদের জন্য http://www.quraneralo.com ইসলামিক রিসোর্সেস - আকিদা, কুরআন, হাদিস, ইসলামী প্রবন্ধ, ইসলামী বই, ইসলামী ওয়াজ | Bangla/Bengali Islamic Website | Bangla Islamic Articles, Bangla Islamic Books, Bangla Islamic Waz Sat, 18 May 2013 03:30:53 +0000 en-US hourly 1 http://wordpress.org/?v=3.5.1 আন্তরিকতা এবং আন্তরিক উপদেশ http://www.quraneralo.com/sincerity-and-sincere-advice/ http://www.quraneralo.com/sincerity-and-sincere-advice/#comments Sun, 12 May 2013 08:24:41 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=4449 মূলঃ ইমাম আন-নাওয়াবি । ভাষান্তর : জহিরুল কাইয়ূম ।  সম্পাদনা : আব্‌দ আল-আহাদ

5287427800_2194382be7

তামীম আদ-দারী (রা) বলেন : নবী (সা) (তিনবার করে) বলেছেন : “দ্বীন হলো নাসীহাহ (আন্তরিকতা এবং আন্তরিক উপদেশ)।” আমরা বললাম : কার প্রতি? তিনি বললেন : “আল্লাহ্‌, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসুল এবং মুসলিমদের নেতা ও সাধারণ মানুষের প্রতি।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৫]

উল্লিখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় [শার্‌হ সহীহ মুসলিম, ২/৩৮] ইমাম আন-নাওয়াবি (র) (মৃ. ৬৭৬ হি.) বলেন :

“যখন আল্লাহ্‌ তা‘আলার প্রতি আন্তরিকতার কথা বলা হয়, তখন তার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ্‌র উপর ঈমান (বিশ্বাস) রাখা এবং তাঁর সাথে কোনোকিছুকে শরীক না করা। তাঁর গুণ এবং বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ইলহাদ না করা বা সেগুলোকে অবজ্ঞা সহকারে পরিবর্তন না করা। তাঁর বর্ণনা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জন্য নির্ধারিত পূর্ণাঙ্গ, নিখুঁত, সর্বোচ্চ গুণাবলী ব্যবহার করা এবং তাঁর উপর কোনো প্রকার ত্রুটি, দুর্বলতা, অক্ষমতা ইত্যাদি আরোপ না করা। কোনো অবস্থাতেই তাঁর অবাধ্যতায় লিপ্ত না হওয়া। তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই কোনোকিছুকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা।  যারা তাঁর আনুগত্য করে তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং যারা তাঁর অবাধ্য তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা। যারা তাঁকে অবিশ্বাস কিংবা অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। তাঁর অনুগ্রহকে স্বীকার করা এবং সেগুলোর জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁর প্রশংসা করা। সকল কাজে আন্তরিকতা বজায় রাখা। যেগুলো উল্লেখ করা হলো সেগুলোর প্রতি অন্যদেরকে আহবান জানানো এবং উৎসাহ দেওয়া। আল-খাত্তাবী (র) (মৃ. ৩৮৮ হি.) বলেছেন : “এই ধরণের আন্তরিকতা মূলত বান্দার নিজের প্রতি আন্তরিকতাকেই বুঝায়। কারণ আল্লাহ্‌ কোনো বান্দার আন্তরিকতার মুখাপেক্ষী নন।”

যখন আল্লাহ্‌র কিতাবের প্রতি আন্তরিকতার কথা বলা হয়, তখন তার অর্থ হলো বিশ্বাস করা যে, এটি আল্লাহ্‌ তা‘আলার বাণী এবং তাঁর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁর সৃষ্ট মানুষের কথা এমন হতে পারে। তাঁর সৃষ্টি জগতের কারও কথা এর সমতুল্য নয়। অতঃপর তা তেলাওয়াত করা এবং এতে যেভাবে বলা আছে, ঠিক সেভাবেই এর নির্দেশনা অনুসরণ করে এর প্রতি যথাযোগ্য সম্মান দেখানো। তেলাওয়াতের সময় খুশূ‘ (বিনয় ও আনুগত্য) সহকারে তেলাওয়াত করা। প্রতিটি হরফ শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা। যারা তাহরীফ (বিকৃতি এবং পরিবর্তন) এর মাধ্যমে কুর‘আনের অপব্যাখ্যা করে এবং যারা কুর‘আনের উপর আক্রমণ করে, তাদেরকে প্রতিহত করা। কুর‘আনে যা আছে তা বিশ্বাস করা। এর বিধানসমূহকে সত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া এবং নেমে নেওয়া। এর বিজ্ঞানময় শাখা এবং দৃষ্টান্তগুলো জানা। এর সাবধানবানীগুলো গ্রহণ করা এবং বিস্ময়কর ঘটনাগুলো সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করা। এর সুস্পষ্ট আয়াতগুলোর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন যাপন করা এবং যেসব আয়াত মানুষের চিন্তাশক্তির বাইরে, সেগুলোকে সত্য বলে মেনে নিয়ে ক্ষান্ত থাকা। কুর‘আনের কোন বিষয়গুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং কোন বিশেষ অর্থবোধক, কোনগুলো রহিত হয়ে গেছে এবং কোনগুলোর দ্বারা রহিত হয়েছে — সকল বিষয়ে অনুসন্ধান করে জেনে নেওয়া। কুর‘আনের বৈজ্ঞানিক শাখাগুলো প্রচার করা এবং সেগুলোর প্রতি মানুষকে আহ্বান করা। এসবই হলো কুর‘আনের প্রতি আন্তরিকতা।

যখন আল্লাহ্‌র রাসূলের প্রতি আন্তরিকতার কথা বলা হয়, তখন তার অর্থ হলো, তিনি যে সত্যবাণীসহ প্রেরিত হয়েছেন তা সত্য বলে সাক্ষ্য দেওয়া। তাঁর দেওয়া আদেশ এবং নিষেধের অনুগত্য করা। তাঁর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যকে বাস্তবায় করার মাধ্যমে তাঁকে সাহায্য এবং সহযোগিতা করা। যারা তাঁর শত্রু, তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা। যারা তাঁর প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেছে, নিজেকে তাদের কাতারে শামিল করা। তাঁর সম্মান ও অধিকারকে শ্রদ্ধা করা। তাঁর জীবনাচরণ এবং সুন্নাহকে পুনর্জীবিত করা এবং সমুন্নত রাখা। তাঁর দা‘ওয়াহ্‌ (দ্বীন ইসলামের প্রতি আহ্বান) এবং শারি‘আহ্‌কে (আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ইসলামী আইন) মানুষের মাঝে প্রচার করা। এসব ব্যাপারে উদ্ভূত যেকোনো সংশয় নির্মূল করা। হাদীস বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। হাদীসের অর্থ উপলব্ধি করা এবং সেগুলো মেনে চলার জন্য মানুষকে আহ্বান করা। হাদীস অধ্যয়ন এবং শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা, কোমলতা ও দয়া অবলম্বন করা। এর প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা এবং গুরুত্ব দেওয়া। হাদীস পাঠের সময় সঠিক ‘আদব বা শিষ্টাচার প্রদর্শন করা। সঠিক এবং পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়া হাদীস বিষয়ে মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকা। হাদীস বিশেষজ্ঞদের যথাযোগ্য সম্মান দেখানো। আচার-আচরণ বিষয়ক হাদীসগুলোকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। আহলুল-বায়েত (নবী পরিবারের সদস্য) এবং সাহাবাগনকে ভালোবাসা। যারা সাহাবাদের নামে বিদ‘আহ্‌ (ইসলামে নতুন ইবাদত কর্ম) প্রচলন ঘটায় তাদেরকে এড়িয়ে চলা। এমনকি যারা একজন মাত্র সাহাবীর বিরুদ্ধেও কোনো কটুকথা বললে, তাদেরকে এড়িয়ে চলা।

যখন মুসলিম নেতাদের প্রতি আন্তরিকতার কথা বলা হয়, তখন তার অর্থ হলো, তাদেরকে সত্যের উপর অবিচল থাকতে সাহায্য করা। তারা সত্যের উপর থাকলে তাদের আনুগত্য করা। সত্যের মাধ্যমে তাদেরকে দিক নির্দেশনা প্রদান করা। সদয়চিত্ত এবং ভদ্রতা সহকারে তাদেরকে পরামর্শ দেওয়া এবং স্মরণ করিয়ে দেওয়া। তারা যেসব বিষয়ে অমনোযোগী এবং উদাসীন, সেগুলোর প্রতি তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা। মুসলিমরা এখনও যেসব অধিকার থেকে বঞ্চিত, সেগুলো পূরণ করতে তাঁদেরকে সাহায্য করা। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা। সাধারণ মানুষের হৃদয়কে তাদের প্রতি আনুগত্যের দ্বারা সুসংহত করে তোলা। আল-খাত্তাবী (র) বলেন : “তাদের প্রতি আন্তরিকতা থাকলেই তাদের পেছনে সালাত আদায় করা যায়, তাদের সঙ্গী হয়ে জিহাদ করা যায়, তাদের কাছে যাকাত জমা দেওয়া যায় এবং তাঁদের পক্ষ থেকে অবিচার অথবা খারাপ আচরণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করে থাকা যায়। তাদের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে তাদের মিথ্যা প্রশংসা করা যায় না এবং তাদের সৎকর্মশীলতার জন্য দো‘আ করা যায়।” এখানে মুসলমানদের নেতা বলতে কেবল সত্যাশ্রয়ী এবং ন্যায়পরায়ণ খলিফাদেরকেই বুঝানো হয়েছে। অধিকিন্তু, মুসলমানদের শাসনকার্যের জন্য কেউ প্রশাসনের কোনো দায়িত্বে থাকলে, তাকেও নেতা বুঝানো হয়েছে। আল-খাত্তাবী এই কথাগুলো বলার পর আরও উদ্ধৃত করেছেন : “এখানে ইমামদেরকেও বুঝানো হয়েছে যারা ‘আলেম (দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে সুগভীর এবং বিশুদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী)। তাদের প্রতি আন্তরিকতার মধ্যে আরও রয়েছে : তাদের দেওয়া তথ্যকে সত্য বলে গ্রহণ করা, ইসলামের বিধান অনুযায়ী সেগুলোর অনুসরণ করা এবং তাদের সম্পর্কে সুধারনা পোষণ করা।”

যখন সাধারণ মুসলিমদের (খালিফা এবং ‘আলেমগণ ছাড়া অন্যান্যরা) প্রতি আন্তরিকতার কথা বলা হয়, তখন তার অর্থ হলো, দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনে কল্যাণকর বিষয়ের প্রতি তাদেরকে আহ্বান করা। দ্বীন ইসলামের যেসব বিষয়ে তারা অজ্ঞ, সেসব বিষয়ে তাদেরকে শিক্ষা দান করে ওইসব ক্ষতিকর বিষয় থেকে তাদেরকে দূরে রাখা। এক্ষেত্রে তাদেরকে কথা এবং কাজের মাধ্যমে সাহায্য সহযোগিতা করা। তাদের ভুলত্রুটিগুলো গোপন রাখা এবং তাদের অভাব অভিযোগ পূরণ করা। তাদের জন্য ক্ষতিকর এমন সবকিছু তাদের থেকে দূর করা এবং তাদের জন্য কল্যাণকর এমন সবকিছুর ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করা। ভদ্রতা, আন্তরিকতা এবং সহমর্মিতার সাথে তাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করা এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। সাধারণ মুসলিমদের মধ্য থেকে যারা বয়োবৃদ্ধ, তাদের প্রতি সম্মান এবং তরুণদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করা। প্রয়োজনে মৃদু তিরস্কার করা এবং তাদের সাথে প্রতারণাপূর্ণ অভিনয় না করা। নিজের জন্য যেটা ভালো মনে হয়, তাদের জন্যও সেটা ভালো হিসেবে গ্রহণ করা। নিজের জন্য যা ক্ষতিকর মনে হয়, তাদের জন্যও সেটা ক্ষতিকর মনে করা। কথা ও কর্মের মাধ্যমে তাদের সুনাম ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা। আন্তরিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট উল্লিখিত সবগুলো বিষয় যেন তারা তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারে সে জন্য তাদেরকে উৎসাহিত করা এবং পরামর্শ দেওয়া। আনুগত্যের সাথে কাজ করার জন্য তাদের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলা।

আর আল্লাহ্‌ সকল বিষয় সবচেয়ে ভালো জানেন।

Source:  আল-ইবানাহ ম্যাগাজিন

]]>
http://www.quraneralo.com/sincerity-and-sincere-advice/feed/ 0
তাকওয়ার উপকারিতা http://www.quraneralo.com/taqwa/ http://www.quraneralo.com/taqwa/#comments Thu, 09 May 2013 04:54:11 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=2735
লিখেছেনঃ
মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন

অনুবাদ: সানাউল্লাহ নজির আহমদ  | ওয়েব এডিটিং: মোঃ মাহমুদ -ই- গাফফার

83

                                     

তাকওয়া এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আল্লাহ তা‘আলা যার অসিয়ত তার পূর্বাপর সকল বান্দাকে করেছেন ও তা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।  কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

﴿وَلَقَدۡ وَصَّيۡنَا ٱلَّذِينَ أُوتُواْ ٱلۡكِتَٰبَ مِن قَبۡلِكُمۡ وَإِيَّاكُمۡ أَنِ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ وَإِن تَكۡفُرُواْ فَإِنَّ لِلَّهِ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ غَنِيًّا حَمِيدٗا ١٣١ ﴾ [النساء: ١٣١] 

“আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা ‎আল্লাহকে ভয় কর। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে জমিনে সব আল্লাহরই। আর ‎আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত।” [সূরা নিসা: (১৩১)]

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার উম্মতকে তাকওয়া গ্রহণ করার ‎নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন হাদীসে এসেছে:‎

فعن أبي أمامة صُدى بن عجلان الباهلي قال: سمعت رسول الله يخطب في حجة الوداع فقال: {اتقوا ربكم وصلّوا خمسكم، وصوموا شهركم، وأدّوا زكاة أموالكم، وأطيعوا أمراءكم، تدخلوا جنة ربكم}.

আবু উমামা সুদাই ইব্‌ন আজলান আল-বাহেলী বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিদায়ী হজে খুতবা ‎দিতে শুনেছি। তিনি বলেন: “তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অর্জন কর, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় কর, তোমাদের ‎রমযানে সিয়াম পালন কর, তোমাদের সম্পদের যাকাত আদায় কর, তোমরা তোমাদের নেতাদের অনুসরণ কর, অতঃপর তোমরা তোমাদের রবের জান্নাতে প্রবেশ কর।” অনুরূপভাবে তিনি যখন কাউকে যুদ্ধাভিযানের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করতেন, তাকে তিনি বিশেষভাবে নিজের ব্যাপারে আল্লাহর তাকওয়া গ্রহণ করা ও মুসলিমদের ব্যাপারে কল্যাণ ‎কামনা করার অসিয়ত করতেন।‎

 

আমাদের আদর্শ পূর্ব পুরুষগণ তাদের চিঠি-পত্র, বয়ান-বক্তৃতা ও মৃত্যুর সময় তাকওয়ার অসিয়ত করতেন। ওমর ‎ইবনে আব্দুল আযীয তার ছেলে আব্দুল্লাহকে লেখেন: “অতঃপর... আমি তোমাকে আল্লাহর তাকওয়া অর্জন করার অসিয়ত ‎করছি, যার সাথে তোমাকে অবশ্যই সাক্ষাত করতে হবে, তিনি ব্যতীত তোমার কোন আশ্রয় নেই, তিনিই দুনিয়া-‎আখেরাতের মালিক।”

 

আরেক বুজুর্গ তার এক দীনি ভাইকে লেখেন: “অতঃপর... আমি তোমাকে আল্লাহর তাকওয়া অর্জন করার ‎নির্দেশ দিচ্ছি, যিনি তোমার গোপনের সাথী, প্রকাশ্যের পর্যবেক্ষক, অতএব রাত-দিনের প্রতি মুহূর্তে তুমি তাঁর কথা তোমার অন্তরে রাখ। তিনি তোমার যত কাছে এবং তোমার ওপর তার যে পরিমাণ ক্ষমতা রয়েছে, সে পরিমাণ তুমি তাকে ভয় কর। জেনে ‎‎রেখ, তুমি তার সামনেই আছ, তার কর্তৃত্ব থেকে বের হয়ে কারো কর্তৃত্ব যাওয়ার তোমার কোন সুযোগ নেই, তার রাজত্ব থেকে মুক্ত হয়ে কারো রাজত্বে যেতে পারবে না, সুতরাং তার ব্যাপারে তুমি খুব সতর্ক থাক এবং তাকে খুব ভয় কর। ওয়াস্‌সালাম।

 

তাকওয়ার অর্থ: বান্দা যে জিনিসকে ভয় করে তার থেকে বাঁচা ও তার থেকে আড়াল হওয়ার ঢাল গ্রহণ করার নাম তাকওয়া

 

আল্লাহর তাকওয়া অর্জন করার অর্থ: বান্দা যে জিনিসকে ভয় করে, যেমন আল্লাহর গোস্বা, শাস্তি ও অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচা ও তার থেকে সুরক্ষার জন্য আল্লাহর আনুগত্য করা ও তার নাফরমানি থেকে বিরত থাকা।

 

প্রিয় পাঠক, তাকওয়ার অর্থ আরো স্পষ্ট করার জন্য আমাদের মনীষীদের কিছু সংজ্ঞা আপনার সামনে পেশ ‎করছি:‎

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহ আনহু তাকওয়া অর্জনকারী মুত্তাকীর সংজ্ঞায় বলেছেন: “মুত্তাকী তারা, যারা আল্লাহ ও তার শাস্তিকে ভয় করে।”‎

তালক ইবনে হাবীব বলেছেন: “তাকওয়ার অর্থ: আল্লাহর নির্দেশমতো তুমি তার আনুগত্য কর ও তার ‎সাওয়াবের আশা রাখ এবং তার নির্দেশমতো তার নাফরমানী ত্যাগ কর ও তার শাস্তিকে ভয় কর।”‎

 

ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর নিম্নের বাণী:

﴿ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ ١٠٢ ﴾ [ال عمران: ١٠٢]

“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ‎ভয়।” প্রসঙ্গে বলেন: তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য করা তার নাফরমানী না করা, আল্লাহকে স্মরণ করা তাকে না ভুলা, তার ‎‎শোকর আদায় করা তার কুফরী না করা।”‎

 

প্রিয় পাঠক, আপনি আল্লাহর তাকওয়া অর্জন করার ব্রত গ্রহণ করুন। মনে রাখুন তিনিই একমাত্র ভয় ও সম্মানের পাত্র। তাকে ‎আপনার অন্তরের মণি কোঠায় বড়ত্বের মর্যাদায় আসীন করুন। নিম্নে আমরা তাকওয়ার কতক ইহকাল ও আখেরাতের উপকারিতা উল্লেখ করছি, যা আমাদের মুসলিম ভাইদেরকে তাকওয়া অর্জনে আগ্রহী করবে ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাদেরকে তাকওয়া গ্রহণে উৎসাহ দেবে। আল্লাহ সহায়।

 

প্রথমত: তাকওয়ার ইহকালীন উপকারিতা:‎

১. তাকওয়ার ফলে পার্থিব জগতে আল্লাহ মানুষের কাজগুলো সহজ করে দেন, তারা তাদের জরুরী প্রয়োজন সহজে সম্পাদন করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مِنۡ أَمۡرِهِۦ يُسۡرٗا ٤ ﴾ [الطلاق: ٤]  وقال تعالى: ﴿ فَأَمَّا مَنۡ أَعۡطَىٰ وَٱتَّقَىٰ ٥ وَصَدَّقَ بِٱلۡحُسۡنَىٰ ٦ فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلۡيُسۡرَىٰ ٧ ﴾ [الليل: ٥،  ٧] 

“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন।” [সূরা তালাক: (৪)] তিনি আরো বলেন: “সুতরাং ‎‎যে দান করেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে, আর উত্তমকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে, আমি তার জন্য সহজ পথে চলা ‎সুগম করে দেব।” [সূরা লাইল: (৫-৭)]

 

২. তাকওয়া পার্থিব জগতে মানুষকে শয়তানের সব অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ إِذَا مَسَّهُمۡ طَٰٓئِفٞ مِّنَ ٱلشَّيۡطَٰنِ تَذَكَّرُواْ فَإِذَا هُم مُّبۡصِرُونَ ٢٠١ ﴾ [الاعراف: ٢٠٠] 

“নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা ‎আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।” [সূরা আরাফ: (২০১)]

 

৩. দুনিয়াবাসীর তাকওয়ার ফলে আসমান ও যমিনের বরকত উন্মুক্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡقُرَىٰٓ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَفَتَحۡنَا عَلَيۡهِم بَرَكَٰتٖ مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ ٩٦ ﴾ [الاعراف: ٩٥] 

“আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমিন ‎‎থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম।” [সূরা আরাফ: (৯৬)]‎

 

৪. বান্দা তাকওয়ার ফলে হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হয় ও তা বুঝার তাওফিক লাভ করে। আল্লাহ তা‘আলা ‎বলেন:‎

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن تَتَّقُواْ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّكُمۡ فُرۡقَانٗا ٢٩ ﴾ [الانفال: ٢٩]  

وقال تعالى: ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَءَامِنُواْ بِرَسُولِهِۦ يُؤۡتِكُمۡ كِفۡلَيۡنِ مِن رَّحۡمَتِهِۦ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ نُورٗا تَمۡشُونَ بِهِۦ ٢٨ ﴾ [الحديد: ٢٨] 

“হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান প্রদান করবেন।” [সূরা ফুরকান: ‎‎(২৯)] ফুরকান অর্থ হক ও বাতিল এবং সত্য ও মিথ্যা পার্থক্য করার জ্ঞান। তিনি আরো বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি স্বীয় ‎রহমতে তোমাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কার দেবেন, আর তোমাদেরকে নূর দেবেন যার সাহায্যে তোমরা চলতে পারবে।” [সূরা ‎হাদীদ: (২৮)]‎

 

৫. তাকওয়া অর্জনকারী মুত্তাকী ব্যক্তি তার তাকওয়ার ফলে কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি পায় এবং এমন জায়গা থেকে রিযক লাভ ‎করে, যা তার কল্পনার ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا ٢ وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ ٣ ﴾ [الطلاق: ٢،  ٣] 

“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন ‎যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।” সূরা তালাক: (২-৩)‎

 

৬. তাকওয়ার দ্বারা পার্থিব জগতে বান্দা আল্লাহর বন্ধুত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়। কারণ তিনি মুত্তাকীদের বন্ধু ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ إِنۡ أَوۡلِيَآؤُهُۥٓ إِلَّا ٱلۡمُتَّقُونَ ٣٤ ﴾ [الأنفال: ٣٤]  وقال تعالى: ﴿ وَإِنَّ ٱلظَّٰلِمِينَ بَعۡضُهُمۡ أَوۡلِيَآءُ بَعۡضٖۖ وَٱللَّهُ وَلِيُّ ٱلۡمُتَّقِينَ ١٩ ﴾ [الجاثية: ١٩] 

“তার অভিভাবক (বন্ধু) তো শুধু মুত্তাকীগণ।” [সূরা আনফাল: (৩৪)] তিনি আরো বলেন: “আর নিশ্চয় যালিমরা মূলত একে ‎অপরের বন্ধু এবং আল্লাহ মুত্তাকীদের বন্ধু।” [সূরা জাসিয়া: (১৯)]‎

 

৭. পার্থিব জগতে মুত্তাকী তাকওয়ার ফলে কাফেরদের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা লাভ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَإِن تَصۡبِرُواْ وَتَتَّقُواْ لَا يَضُرُّكُمۡ كَيۡدُهُمۡ شَيۡ‍ًٔاۗ  ١٢٠ ﴾ [ال عمران: ١٢٠] 

“আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোন ক্ষতি করবে না।” [সূরা ‎আলে ইমরান: (১২০)]‎

 

৮. তাকওয়ার ফলে মুসিবত ও দুশমনের মোকাবিলার মুহূর্তে আসমান থেকে সাহায্য অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ ‎তা‘আলা বলেন:‎

﴿وَلَقَدۡ نَصَرَكُمُ ٱللَّهُ بِبَدۡرٖ وَأَنتُمۡ أَذِلَّةٞۖ فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ ١٢٣ إِذۡ تَقُولُ لِلۡمُؤۡمِنِينَ أَلَن يَكۡفِيَكُمۡ أَن يُمِدَّكُمۡ رَبُّكُم بِثَلَٰثَةِ ءَالَٰفٖ مِّنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ مُنزَلِينَ ١٢٤ بَلَىٰٓۚ إِن تَصۡبِرُواْ وَتَتَّقُواْ وَيَأۡتُوكُم مِّن فَوۡرِهِمۡ هَٰذَا يُمۡدِدۡكُمۡ رَبُّكُم بِخَمۡسَةِ ءَالَٰفٖ مِّنَ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ مُسَوِّمِينَ ١٢٥﴾ [ال عمران: ١٢٣،  ١٢٥] 

“আর অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরে সাহায্য করেছেন অথচ তোমরা ছিলে হীনবল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় ‎কর, আশা করা যায়, তোমরা শোকরগুজার হবে। স্মরণ কর, যখন তুমি মুমিনদেরকে বলছিলে, ‘তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট ‎নয় যে, তোমাদের রব তোমাদেরকে তিন হাজার নাযিলকৃত ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করবেন’? হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্য ধর ‎এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, আর তারা হঠাৎ তোমাদের মুখোমুখি এসে যায়, তবে তোমাদের রব পাঁচ হাজার চি‎হ্নিত ‎‎ফেরেশতা দ্বারা তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।” [সূরা আলে ইমরান: (১২৩-১২৫)] সাহায্য ও শক্তিবৃদ্ধির ঘোষণা একটি সুসংবাদ, যার ফলে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যের ঘোষণার কারণে নিজেদের মনোবল বাড়ে ও শক্তি সঞ্চয় হয়।

 

এরপর আল্লাহ বলেন:‎

 ﴿ وَمَا جَعَلَهُ ٱللَّهُ إِلَّا بُشۡرَىٰ لَكُمۡ وَلِتَطۡمَئِنَّ قُلُوبُكُم بِهِۦۗ وَمَا ٱلنَّصۡرُ إِلَّا مِنۡ عِندِ ٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَكِيمِ ١٢٦ ﴾ [ال عمران: ١٢٦] 

“আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তা কেবল সুসংবাদস্বরূপ নির্ধারণ করেছেন এবং যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ এর দ্বারা প্রশান্ত ‎হয়। আর সাহায্য কেবল পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে।” [সূরা আলে ইমরান: (১২৬)]‎

 

৯. তাকওয়ার ফলে আল্লাহর বান্দাগণ মুসিবত ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিরাপত্তা লাভ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَتَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡبِرِّ وَٱلتَّقۡوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُواْ عَلَى ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِۚ ٢ ﴾ [المائ‍دة: ٢]  وقال تعالى في قصة مريم: ﴿ فَأَرۡسَلۡنَآ إِلَيۡهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرٗا سَوِيّٗا ١٧ قَالَتۡ إِنِّيٓ أَعُوذُ بِٱلرَّحۡمَٰنِ مِنكَ إِن كُنتَ تَقِيّٗا ١٨ ﴾ [مريم: ١٧،  ١٨] 

“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না।” [‎সূরা মায়েদা: (২)] মারইয়াম আলাইহিস সালামের ঘটনায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তখন আমি তার নিকট আমার রূহ (জিবরীল)কে প্রেরণ ‎করলাম। অতঃপর সে তার সামনে পূর্ণ মানবের রূপ ধারণ করল। মারইয়াম বলল, ‘আমি তোমার থেকে পরম করুণাময়ের ‎আশ্রয় চাচ্ছি, যদি তুমি মুত্তাকী হও।” [সূরা মারইয়াম: (১৭-১৮)]‎

 

১০. তাকওয়া অর্জনকারী প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَمَن يُعَظِّمۡ شَعَٰٓئِرَ ٱللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقۡوَى ٱلۡقُلُوبِ ٣٢ ﴾ [الحج: ٣٢] 

“এটাই হল আল্লাহর বিধান; যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই।” [সূরা ‎হাজ্জ: (৩২)]‎

 

১১. তাকওয়ার ফলে আমল বিশুদ্ধ হয় ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং পাপ মোচন হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَقُولُواْ قَوۡلٗا سَدِيدٗا ٧٠ يُصۡلِحۡ لَكُمۡ أَعۡمَٰلَكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۗ ٧١ ﴾ [الأحزاب: ٧٠،  ٧١] 

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে শুদ্ধ ‎করে দেবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে ‎অবশ্যই এক মহা সাফল্য অর্জন করল।” [সূরা আহযাব: (৭০-৭১)]‎

 

১২. মুত্তাকী তার তাকওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আদব প্রদর্শনে সক্ষম হয়, অর্থাৎ তার সামনে তার আওয়াজ অনুচ্চ থাকে। জীবিত অবস্থায় তো বটেই, মৃত্যুর পরও তার নির্দেশ অতিক্রম করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصۡوَٰتَهُمۡ عِندَ رَسُولِ ٱللَّهِ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ ٱمۡتَحَنَ ٱللَّهُ قُلُوبَهُمۡ لِلتَّقۡوَىٰۚ ٣ ﴾ [الحجرات: ٣] 

“নিশ্চয় যারা আল্লাহর রাসূলের নিকট নিজদের আওয়াজ অবনমিত করে, আল্লাহ তাদেরই অন্তরগুলোকে তাকওয়ার জন্য ‎বাছাই করেছেন।” [সূরা হুজুরাত: (৩)]‎

 

১৩. তাকওয়ার দ্বারা আল্লাহর মহব্বত লাভ হয়। এ মহব্বত যেমন দুনিয়াতে লাভ হয়, অনুরূপ আখেরাতেও লাভ হবে। ‎হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন:‎

«ما تقرّب إليّ عبدٌ بشيء بأفضل مما افترضته عليه، ولا يزال عبدي يتقرّب إليّ بالنوافل حتى أحبه، فإذا أحببته كنت سمعه الذي يسمع به، وبصره الذي يبصر به، ويده التي يبطش بها، ورجله التي يمشي بها، ولئن سألني لأعطينه، ولئن استعاذ بي لأعيذنه»

“আমি বান্দার উপর যা ফরয করেছি, তার চেয়ে উত্তম জিনিসের মাধ্যমে কোন বান্দা আমার নৈকট্য অর্জন করতে ‎পারেনি। বান্দা নফলের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, এক সময় আমি তাকে মহব্বত করি। আমি যখন তাকে ‎মহব্বত করি, তখন আমি তার কর্ণে পরিণত হই, যে কর্ণ দিয়ে সে শ্রবণ করে, তার দৃষ্ট শক্তিতে পরিণত হই, যা দিয়ে ‎‎সে দেখে, তার হাতে পরিণত হই যা দিয়ে সে পাকড়াও করে এবং তার পায়ে পরিণত হই যা দিয়ে সে চলে।[1] সে ‎যদি আমার কাছে প্রার্থনা করে আমি তাকে অবশ্যই দেব এবং সে যদি আমার ওসিলায় আশ্রয় প্রার্থনা করে আমি তাকে ‎অবশ্যই আশ্রয় প্রদান করব।” [বুখারী: ৬৫০২]

 

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ بَلَىٰۚ مَنۡ أَوۡفَىٰ بِعَهۡدِهِۦ وَٱتَّقَىٰ فَإِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلۡمُتَّقِينَ ٧٦ ﴾ [ال عمران: ٧٦]

‘হ্যাঁ, অবশ্যই যে নিজ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে এবং তাকওয়া অবলম্বন ‎করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন।” [সূরা আলে ইমরান: (৭৬)]‎‏

 

১৪. তাকওয়ার ফলে ইলম ও জ্ঞান অর্জন হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱللَّهُۗ ٢٨٢ ﴾ [البقرة: ٢٨٢] 

“আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেবেন।” [সূরা বাকারা: (২৮২)]‎

 

১৫. আল্লাহর অনুগ্রহে ইসলামের হিদায়েত লাভ করার পর কেউ যদি পূর্ণ তাকওয়া অবলম্বন করে, তাহলে তার দ্বীনের সঠিক বুঝ অর্জন হয় ও সে পথভ্রষ্টতা থেকে সুরক্ষা পায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَأَنَّ هَٰذَا صِرَٰطِي مُسۡتَقِيمٗا فَٱتَّبِعُوهُۖ وَلَا تَتَّبِعُواْ ٱلسُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمۡ عَن سَبِيلِهِۦۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٥٣ ﴾ [الانعام: ١٥٣] 

“আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা ‎‎তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া ‎অবলম্বন কর।” সূরা আনআম: (১৫৩)‎

 

১৬. তাকওয়া দ্বারা আল্লাহর রহমত লাভ হয়। এ রহমত যেরূপ দুনিয়াতে লাভ হবে, অনুরূপ আখেরাতেও লাভ হবে। আল্লাহ ‎তা‘আলা বলেন:‎

﴿وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖۚ فَسَأَكۡتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ وَٱلَّذِينَ هُم بِ‍َٔايَٰتِنَا يُؤۡمِنُونَ ١٥٦ ﴾ [الاعراف: ١٥٥] 

“আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে ‎এবং যাকাত প্রদান করে। আর যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান আনে।” [সূরা আরাফ: (১৫৬)]‎

 

১৭. তাকওয়ার ফলে পার্থিব জগতে আল্লাহর সংঘ ও সাথীত্ব অর্জন হয়। বান্দার সাথে আল্লাহর সাথীত্ব দু’প্রকার। সাধারণ সাথীত্ব: এটা আল্লাহর সব বান্দার জন্য ব্যাপক, যেমন তার শুনা, দেখা ও জানা সবার জন্য সমান। তিনি সবার কাজকর্ম সমানভাবে প্রত্যক্ষ করেন, সব কিছু শুনেন ও সবার অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত রয়েছেন। তিনি বলেন:

﴿ وَهُوَ مَعَكُمۡ أَيۡنَ مَا كُنتُمۡۚ ٤ ﴾ [الحديد: ٤] وقال تعالى:  ﴿ أَلَمۡ تَرَ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۖ مَا يَكُونُ مِن نَّجۡوَىٰ ثَلَٰثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمۡ وَلَا خَمۡسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمۡ وَلَآ أَدۡنَىٰ مِن ذَٰلِكَ وَلَآ أَكۡثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمۡ أَيۡنَ مَا كَانُواْۖ ٧ ﴾ [المجادلة: ٧] 

“আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।” [সূরা হাদীদ: (৪)] তিনি আরো বলেন: “তুমি কি ‎লক্ষ্য করনি যে, আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে নিশ্চয় আল্লাহ তা জানেন? তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না ‎যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে ‎কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন।” [সূরা মুজাদিলা: (৭)] এসব আয়াতে আল্লাহর সাথীত্ব বা সাথে থাকার অর্থ তিনি বান্দার অবস্থা জানেন, তাদের কথা শ্রবণ করেন, তাদের সবকিছু তার নিকট স্পষ্ট।

 

দ্বিতীয় সাথীত্ব: এটা হচ্ছে আল্লাহর বিশেষ সংঘ বা সাথীত্ব: এ সাথীত্ব আল্লাহর সাহায্য, সমর্থন ও সহায়তার অর্থ প্রদান করে। যেমন আল্লাহ ‎তা‘আলা বলেন:

‎﴿لَا تَحۡزَنۡ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَاۖ ٤٠﴾التوبة: ٤٠  وقال تعالى: ﴿ قَالَ لَا تَخَافَآۖ إِنَّنِي مَعَكُمَآ أَسۡمَعُ وَأَرَىٰ ٤٦ ﴾ [طه: ٤٦]

“তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” সূরা তওবা: (৪০) অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে: “তিনি ‎বললেন, ‘তোমরা ভয় করো না। আমি তো তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।” সূরা ত্বহা: (৪৬) এসব আয়াতে আল্লাহ সাথে আছেন বা তার সাথীত্ব অর্থ হচ্ছে সাহায্য ও সমর্থন।

 

আল্লাহর এ জাতীয় সাথীত্ব একমাত্র তার বিশেষ বান্দাদের সাথে খাস। যেমন তিনি বলেন:

﴿ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَواْ وَّٱلَّذِينَ هُم مُّحۡسِنُونَ ١٢٨ ﴾ [النحل: ١٢٨] وقال تعالى: ﴿ وَٱعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلۡمُتَّقِينَ ١٩٤ ﴾ [البقرة: ١٩٤] 

“নিশ্চয় আল্লাহ ‎তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল।” [সূরা নাহাল: (১২৮)] তিনি আরো বলেন: “এবং জেনে ‎রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।” [সূরা বাকারা: (১৯৪)]

 

১৮. শুভ পরিণতি বা শেষ ফল তাকওয়ার অধিকারী আল্লাহর মুত্তাকী বান্দাগণ লাভ করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَٱلۡعَٰقِبَةُ لِلتَّقۡوَىٰ ١٣٢ ﴾ [طه: ١٣٢] وقال تعالى: ﴿ وَإِنَّ لِلۡمُتَّقِينَ لَحُسۡنَ مَ‍َٔابٖ ٤٩ ﴾ [ص: ٤٩] وقال تعالى: ﴿ إِنَّ ٱلۡعَٰقِبَةَ لِلۡمُتَّقِينَ ٤٩ ﴾ [هود: ٤٩] 

“আর শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।” [সূরা ত্বহা: (১৩২)] তিনি অন্যত্র বলেন: “আর মুত্তাকীদের ‎জন্য অবশ্যই রয়েছে উত্তম নিবাস।” [সূরা সাদ: (৪৯)] তিনি আরো বলেন: “নিশ্চয় শুভ পরিণাম কেবল মুত্তাকীদের জন্য।” [‎সূরা হুদ: (৪৯)]‎

 

১৯. তাকওয়ার অধিকারী মুত্তাকীগণ পার্থিব জগতে সুসংবাদ লাভ করেন। যেমন সে ভাল স্বপ্ন দেখল অথবা মানুষের ব্যাপক মহব্বত, প্রশংসা ও সম্মান লাভ করল ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ ٦٣ لَهُمُ ٱلۡبُشۡرَىٰ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِۚ ٦٤ ﴾ [يونس: ٦٣،  ٦٤] 

“যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবি জীবনে এবং আখিরাতে।” সূরা ‎ইউনুস: (৬৩-৬৪) ‎

 

ইমাম আহমদ আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন: ‎لَهُمُ الْبُشْرَى فِي ‏الْحَياةِ الدُّنْيَا‎ এর ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন এর অর্থ: “ভাল স্বপ্ন যা মুসলিম দেখে অথবা তাকে দেখানো হয়।”

 

আবুযর গিফারী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: হে আল্লাহর রাসূল, কেউ কোন আমল করার পর মানুষেরা তার প্রশংসা ‎করে ও তার গুণকীর্তন গায়, (এর হুকুম কি)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‎‏{تلك عاجل بشرى المؤمن}. ‏‎ ‎এটা হচ্ছে মুমিনের নগদ সুসংবাদ।‎

 

২০. নারীরা যদি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং কথা ও কাজে তার বাস্তবায়ন ঘটায়, তাহলে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা তাদের ওপর লোভ করার সুযোগ ও সাহস পায় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ كَأَحَدٖ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِنِ ٱتَّقَيۡتُنَّۚ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ وَقُلۡنَ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا ٣٢ ﴾ [الاحزاب: ٣٢] 

“হে নবী পত্নী গণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) ‎‎কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে।” [সূরা ‎আহযাব: (৩২)]‎

 

২১. যাদের অন্তরে তাকওয়া রয়েছে, তারা অসিয়ত ও ভাগ-বণ্টনে কারো ওপর যুলুম করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ كُتِبَ عَلَيۡكُمۡ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ ٱلۡمَوۡتُ إِن تَرَكَ خَيۡرًا ٱلۡوَصِيَّةُ لِلۡوَٰلِدَيۡنِ وَٱلۡأَقۡرَبِينَ بِٱلۡمَعۡرُوفِۖ حَقًّا عَلَى ٱلۡمُتَّقِينَ ١٨٠ ﴾ [البقرة: ١٨٠] 

“তোমাদের উপর ফরয করা হয়েছে যে, যখন তোমাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হবে, যদি সে কোন সম্পদ রেখে যায়, তবে ‎পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ন্যায়ভিত্তিক অসিয়ত করবে। এটি মুত্তাকীদের দায়িত্ব।” [সূরা বাকারা: (১৮০)]‎

 

২২. পুরুষের মধ্যে তাকওয়া থাকলে তালাক প্রাপ্ত নারী তার জরুরী খোর-পোষ ও বরণ-পোষণ লাভ করে। অর্থাৎ মুত্তাকী পুরুষেরা তাদের তালাক প্রাপ্তা স্ত্রীদের ওপর শরীয়তের নির্দেশ মোতাবেক খরচ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَلِلۡمُطَلَّقَٰتِ مَتَٰعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِۖ حَقًّا عَلَى ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٤١ ﴾ [البقرة: ٢٤١] 

“আর তালাকপ্রাপ্তা নারীদের জন্য থাকবে বিধি মোতাবেক ভরণ-পোষণ। (এটি) মুত্তাকীদের উপর আবশ্যক।” [সূরা বাকারা ‎‎: (২৪১)]

 

২৩. তাকওয়ার ফলে দুনিয়া ও আখেরাতের কোন প্রতিদান নষ্ট হয় না। ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার ভাই ও পরিবারের ‎সাথে একত্র হয়ে বলেন:

﴿ إِنَّهُۥ مَن يَتَّقِ وَيَصۡبِرۡ فَإِنَّ ٱللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجۡرَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ٩٠ ﴾ [يوسف: ٨٩] 

“নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, তবে অবশ্যই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।” [সূরা ইউসুফ: (৯০)]‎

 

২৪. তাকওয়ার ফলে হিদায়েত লাভ হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿  الٓمٓ ١ ذَٰلِكَ ٱلۡكِتَٰبُ لَا رَيۡبَۛ فِيهِۛ هُدٗى لِّلۡمُتَّقِينَ ٢ ﴾ [البقرة: ١،  ٢] 

“আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়েত।” [সূরা বাকারা: (১-২)]‎

 

দ্বিতীয়ত: তাকওয়ার পরকালীন উপকারিতা:‎

১. তাকওয়ার ফলে আখেরাতে আল্লাহর নিকট সম্মান লাভ হবে। তিনি বলেন:‎

﴿ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ ١٣ ﴾ [الحجرات: ١٣] 

“তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন।” [সূরা হুজুরাত: (১৩)]‎

 

২. তাকওয়া পরকালীন সফলতা ও কামিয়াবির চাবিকাঠি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَيَخۡشَ ٱللَّهَ وَيَتَّقۡهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَآئِزُونَ ٥٢ ﴾ [النور: ٥٢] 

“আর যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই ‎কৃতকার্য।” [সূরা হুজুরাত: (৫২)]‎

 

৩. কিয়ামতের দিন তাকওয়ার ফলে আল্লাহর শাস্তি থেকে নাজাত মিলবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَإِن مِّنكُمۡ إِلَّا وَارِدُهَاۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ حَتۡمٗا مَّقۡضِيّٗا ٧١ ثُمَّ نُنَجِّي ٱلَّذِينَ ٱتَّقَواْ وَّنَذَرُ ٱلظَّٰلِمِينَ فِيهَا جِثِيّٗا ٧٢ ﴾ [مريم: ٧١،  ٧٢]  وقال تعالى: ﴿ وَسَيُجَنَّبُهَا ٱلۡأَتۡقَى ١٧ ﴾ [الليل: ١٧] 

“আর তোমাদের প্রত্যেককেই তা অতিক্রম করতে হবে, এটি তোমার রবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তারপর আমি এদেরকে মুক্তি ‎‎দেব যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর যালিমদেরকে আমি  সেখানে রেখে দেব নতজানু অবস্থায়।” [সূরা মারইয়াম: ‎‎(৭১-৭২)] অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন: “আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকীকে।” [সূরা লাইল: (১৭)]‎

 

৪. তাকওয়ার ফলে আমল কবুল হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ ﴾ [المائ‍دة: ٢٧] 

“অন্যজন (হাবিল) বলল, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন।” [সূরা মায়েদা: (২৭)]‎

 

৫. তাকওয়ার ফলে আখেরাতে জান্নাতের মিরাস ও উত্তরাধিকার লাভ হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ تِلۡكَ ٱلۡجَنَّةُ ٱلَّتِي نُورِثُ مِنۡ عِبَادِنَا مَن كَانَ تَقِيّٗا ٦٣ ﴾ [مريم: ٦٣] 

“সেই জান্নাত, আমি যার উত্তরাধিকারী বানাব আমার বান্দাদের মধ্যে তাদেরকে যারা মুত্তাকী।” [সূরা মারইয়াম: (৬৩)]‎

 

৬. তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য আখেরাতে জান্নাতে সুদৃঢ় প্রাসাদ থাকবে, যার উপরেও থাকবে প্রাসাদ। আল্লাহ ‎তা‘আলা বলেন:‎

﴿ لَٰكِنِ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ رَبَّهُمۡ لَهُمۡ غُرَفٞ مِّن فَوۡقِهَا غُرَفٞ مَّبۡنِيَّةٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۖ وَعۡدَ ٱللَّهِ لَا يُخۡلِفُ ٱللَّهُ ٱلۡمِيعَادَ ٢٠ ﴾ [الزمر: ٢٠] 

“কিন্তু যারা নিজদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে কক্ষসমূহ যার উপর নির্মিত আছে আরো কক্ষ। তার নিচ দিয়ে ‎নদী প্রবাহিত। এটি আল্লাহর ওয়াদা; আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করেন না।” [সূরা যুমার: (২০)]‎

 

হাদীসে এসেছে:‎

{ إن في الجنة لغرفاً يرى بطونها من ظهورها، وظهورها من بطونها } فقال أعرابي: لمن هذا يا رسول الله؟ قال: { لمن أطاب الكلام، وأطعم الطعام، وصلّى بالليل والناس نيام }.

“নিশ্চয় জান্নাতের মধ্যে এমন কিছু প্রাসাদ রয়েছে, যার অভ্যন্তর বাহির থেকে দেখা যাবে এবং বাহির ভেতর থেকে দেখা ‎যাবে। এক বেদুঈন জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর রাসূল, এ প্রাসাদগুলো কার জন্যে হবে ? তিনি বললেন: “যে সুন্দর কথা ‎বলবে, খানা খাওয়াবে ও মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তখন সে সালাত পড়বে।‎

 

৭. মুত্তাকীগণ তাকওয়ার ফলে কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের মুহূর্তে, হাশরের ময়দানে, চলার পথে ও বসার ‎‎স্থানে কাফেরদের উপরে অবস্থান করবে। তারা জান্নাতের সুউচ্চ স্থানে সমাসীন হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُواْ ٱلۡحَيَوٰةُ ٱلدُّنۡيَا وَيَسۡخَرُونَ مِنَ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْۘ وَٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ فَوۡقَهُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ وَٱللَّهُ يَرۡزُقُ مَن يَشَآءُ بِغَيۡرِ حِسَابٖ ٢١٢ ﴾ [البقرة: ٢١٢] 

“যারা কুফরী করেছে, দুনিয়ার জীবনকে তাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে। আর তারা মুমিনদের নিয়ে উপহাস করে। ‎আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তারা কিয়ামত দিবসে তাদের উপরে থাকবে। আর আল্লাহ যাকে চান, বেহিসাব রিযক ‎‎দান করেন।” [সূরা বাকারা: (২১২)]‎

 

৮. তাকওয়ার ফলে আখেরাতে জান্নাত লাভ হবে, কারণ জান্নাত মুত্তাকীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ‎বলেন:‎

﴿وَسَارِعُوٓاْ إِلَىٰ مَغۡفِرَةٖ مِّن رَّبِّكُمۡ وَجَنَّةٍ عَرۡضُهَا ٱلسَّمَٰوَٰتُ وَٱلۡأَرۡضُ أُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِينَ ١٣٣ ﴾ [ال عمران: ١٣٣] وقال تعالى: ﴿ وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَكَفَّرۡنَا عَنۡهُمۡ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ وَلَأَدۡخَلۡنَٰهُمۡ جَنَّٰتِ ٱلنَّعِيمِ ٦٥ ﴾ [المائ‍دة: ٦٥] 

“আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও ‎জমিনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান: (১৩৩)] তিনি আরো বলেন: “আর যদি ‎কিতাবিরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমি তাদের থেকে পাপগুলো দূর করে দিতাম এবং ‎অবশ্যই তাদেরকে আরামদায়ক জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাতাম।” [সূরা মায়েদা: (৬৫)]‎

 

৯. আখেরাতে তাকওয়া গুনাহের কাফফারা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يُكَفِّرۡ عَنۡهُ سَيِّ‍َٔاتِهِۦ وَيُعۡظِمۡ لَهُۥٓ أَجۡرًا ٥ ﴾ [الطلاق: ٥]  وقال تعالى: ﴿ وَلَوۡ أَنَّ أَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ ءَامَنُواْ وَٱتَّقَوۡاْ لَكَفَّرۡنَا عَنۡهُمۡ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ ٦٥ ﴾ [المائ‍دة: ٦٥] 

“আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন।” [সূরা তালাক ‎‎: (৫)] তিনি আরো বলেন: “আর যদি কিতাবিরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমি তাদের ‎‎থেকে পাপগুলো দূর করে দিতাম।” [সূরা মায়েদা: (৬৫)]

 

১০. তাকওয়ার ফলে আখেরাতে মনের চাহিদা পূরণ হবে ও চোখের শীতলতা লাভ হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‎

﴿ جَنَّٰتُ عَدۡنٖ يَدۡخُلُونَهَا تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُۖ لَهُمۡ فِيهَا مَا يَشَآءُونَۚ كَذَٰلِكَ يَجۡزِي ٱللَّهُ ٱلۡمُتَّقِينَ ٣١ ﴾ [النحل: ٣١] 

“স্থায়ী জান্নাতসমূহ যাতে তারা প্রবেশ করবে, যার তলদেশে প্রবাহিত হচ্ছে নহরসমূহ। তারা চাইবে, তাদের জন্য তার ‎মধ্যে তাই থাকবে। এভাবেই আল্লাহ মুত্তাকীদের প্রতিদান দেন।” [সূরা নাহাল: (৩১)] ‎

 

১১. তাকওয়ার ফলে আখেরাতে ভয় ও পেরেশানি দূর হবে এবং কিয়ামতের দিন কোন অনিষ্ট মুত্তাকীকে স্পর্শ করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা ‎বলেন:‎

﴿ وَيُنَجِّي ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَوۡاْ بِمَفَازَتِهِمۡ لَا يَمَسُّهُمُ ٱلسُّوٓءُ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦١ ﴾ [الزمر: ٦٠] وقال تعالى: ﴿ أَلَآ إِنَّ أَوۡلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦٢ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ ٦٣ ﴾ [يونس: ٦٢،  ٦٣] 

“আর আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে তাদের সাফল্যসহ নাজাত দেবেন। কোন অমঙ্গল তাদেরকে স্পর্শ করবে না। আর তারা চিন্তিতও হবে না।” ‎তিনি আরো বলেন: “শুনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই, আর তারা পেরেশানও হবে না। যারা ঈমান এনেছে ‎এবং তাকওয়া অবলম্বন করত।” [সূরা ইউনুস: (৬২-৬৩)]‎

 

১২. তাকওয়ার ফলে কিয়ামতের দিন মুত্তাকীদের অভিযাত্রী দল হিসেবে (বর যাত্রীর ন্যায়)  উপস্থিত করা হবে। তারা বাহনে চড়ে ‎আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে, এরাই সর্বোত্তম অভিযাত্রী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ يَوۡمَ نَحۡشُرُ ٱلۡمُتَّقِينَ إِلَى ٱلرَّحۡمَٰنِ وَفۡدٗا ٨٥ ﴾ [مريم: ٨٥] 

“যেদিন পরম করুণাময়ের নিকট মুত্তাকীদেরকে সম্মানিত মেহমানরূপে সমবেত করব।” [সূরা মারইয়াম: (৮৫)]‎

 

ইবনে কাসীর রহ. নুমান ইব্‌ন বাশির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন:‎

( كنا جلوساً عند علي فقرأ هذه الآية: يَوْمَ نَحْشُرُ الْمُتَّقِينَ إِلَى الرَّحْمَنِ وَفْدًا.. قال: لا والله ما على أرجلهم يحشرون، ولا يحشر الوفد على أرجلهم، ولكن بنوق لم ير الخلائق مثلها، عليها رحائل من ذهب، فيركبون عليها حتى يضربوا أبواب الجنة ).

আমরা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিকট বসে ছিলাম, তিনি আমাদেরকে উপরোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি বললেন: ‎আল্লাহর শপথ, তারা তাদের পায়ে ভর করে হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে না। আর অভিযাত্রীদের পায়ে হেঁটে উপস্থিত ‎করানো হয় না, বরং এক ধরণের বাহন থাকবে, অনুরূপ বাহন কেউ দেখেনি। তার উপর স্বর্ণের শিবিকা থাকবে, তার উপর ‎চড়ে তারা জান্নাতের দরোজাসমূহ অতিক্রম করবে। ‎

 

১৩. আখেরাতে মুত্তাকীদের কাছে নিয়ে আসা হবে জান্নাত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَأُزۡلِفَتِ ٱلۡجَنَّةُ لِلۡمُتَّقِينَ ٩٠ ﴾ [الشعراء: ٩٠] وقال تعالى: ﴿ وَأُزۡلِفَتِ ٱلۡجَنَّةُ لِلۡمُتَّقِينَ غَيۡرَ بَعِيدٍ ٣١ ﴾ [ق: ٣١] 

“আর মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটবর্তী করা হবে।” [সূরা শুআরা: (৯০)] তিনি আরো বলেন: “আর জান্নাতকে ‎মুত্তাকীদের অদূরে, কাছেই আনা হবে।” [সূরা ক্বাফ: (৩১)]‎

 

১৪. আখেরাতে মুত্তাকীরা তাকওয়ার কারণে পাপী ও কাফেরদের বরাবর হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ أَمۡ نَجۡعَلُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ كَٱلۡمُفۡسِدِينَ فِي ٱلۡأَرۡضِ أَمۡ نَجۡعَلُ ٱلۡمُتَّقِينَ كَٱلۡفُجَّارِ ٢٨ ﴾ [ص: ٢٨] 

“যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে আমি কি তাদেরকে জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সমতুল্য গণ্য করব? নাকি আমি ‎মুত্তাকীদেরকে পাপাচারীদের সমতুল্য গণ্য করব?” [সূরা সাদ: (২৮)]‎

 

১৫. সকল বন্ধুত্ব¡ কিয়ামতের দিন শত্রুতায় পরিণত হবে, শুধু মুত্তাকীদের বন্ধুত্ব ব্যতীত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন‎‎:‎ ঃ

﴿ ٱلۡأَخِلَّآءُ يَوۡمَئِذِۢ بَعۡضُهُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوٌّ إِلَّا ٱلۡمُتَّقِينَ ٦٧ ﴾ [الزخرف: ٦٧] 

“সেদিন বন্ধুরা একে অন্যের শত্রু হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” [সূরা যুখরুফ: (৬৭)]‎

 

১৬. আখেরাতে মুত্তাকীদের জন্য নিরাপদ স্থান, জান্নাত ও ঝর্ণাধারা থাকবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٖ ٥١ فِي جَنَّٰتٖ وَعُيُونٖ ٥٢ يَلۡبَسُونَ مِن سُندُسٖ وَإِسۡتَبۡرَقٖ مُّتَقَٰبِلِينَ ٥٣ كَذَٰلِكَ وَزَوَّجۡنَٰهُم بِحُورٍ عِينٖ ٥٤ يَدۡعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَٰكِهَةٍ ءَامِنِينَ ٥٥ لَا يَذُوقُونَ فِيهَا ٱلۡمَوۡتَ إِلَّا ٱلۡمَوۡتَةَ ٱلۡأُولَىٰۖ وَوَقَىٰهُمۡ عَذَابَ ٱلۡجَحِيمِ ٥٦ ﴾ [الدخان: ٥١- ٥٦] 

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে, বাগÑবাগিচা ও ঝর্নাধারার মধ্যে, তারা পরিধান করবে পাতলা ও পুরু রেশমী বস্ত্র ‎এবং বসবে মুখোমুখী হয়ে। এরূপই ঘটবে, আর আমি তাদেরকে বিয়ে দেব ডাগর নয়না হুরদের সাথে।সেখানে তারা ‎প্রশান্তচিত্তে সকল প্রকারের ফলমূল আনতে বলবে। প্রথম মৃত্যুর পর সেখানে তারা আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। আর ‎তিনি তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করবেন।” [সূরা দুখান: (৫১-৫৬)]‎

 

১৭. আখেরাতে মুত্তাকীদের জন্য আল্লাহর নিকট তাদের তাকওয়া অনুপাতে বিভিন্ন আসন থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي جَنَّٰتٖ وَنَهَرٖ ٥٤ فِي مَقۡعَدِ صِدۡقٍ عِندَ مَلِيكٖ مُّقۡتَدِرِۢ ٥٥ ﴾ [القمر: ٥٤،  ٥٥] 

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।” [সূরা ‎কামার: (৫৪-৫৫)]‎

 

১৮. মুত্তাকীরা তাকওয়ার ফলে আখেরাতে বিভিন্ন নহরে গমন করতে পারবে। যেমন পরিচ্ছন্ন পানির নহর, সুস্বাদু দুধের নহর যার স্বাদ কখনো নষ্ট হবে না এবং মজাদার শরাব, যা পানকারীদের জন্য হবে সুপেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ مَّثَلُ ٱلۡجَنَّةِ ٱلَّتِي وُعِدَ ٱلۡمُتَّقُونَۖ فِيهَآ أَنۡهَٰرٞ مِّن مَّآءٍ غَيۡرِ ءَاسِنٖ وَأَنۡهَٰرٞ مِّن لَّبَنٖ لَّمۡ يَتَغَيَّرۡ طَعۡمُهُۥ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ خَمۡرٖ لَّذَّةٖ لِّلشَّٰرِبِينَ وَأَنۡهَٰرٞ مِّنۡ عَسَلٖ مُّصَفّٗىۖ وَلَهُمۡ فِيهَا مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ وَمَغۡفِرَةٞ مِّن رَّبِّهِمۡۖ كَمَنۡ هُوَ خَٰلِدٞ فِي ٱلنَّارِ وَسُقُواْ مَآءً حَمِيمٗا فَقَطَّعَ أَمۡعَآءَهُمۡ ١٥ ﴾ [محمد: ١٥] 

“মুত্তাকীদেরকে যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে রয়েছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের ঝরনাধারা, ‎যার স্বাদ পরিবর্তিত হয়নি, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু সুরার নহরসমূহ এবং আছে পরিশোধিত মধুর ঝরনাধারা। তথায় ‎তাদের জন্য থাকবে সব ধরনের ফলমূল আর তাদের রবের পক্ষ  থেকে ক্ষমা।”

 

[সূরা মুহাম্মদ: (১৫)] হাদীসে এসেছে, ‎রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:‎

{ إذا سألتم الله تعالى فاسألوه الفردوس، فإنه أوسط الجنة وأعلى الجنة، ومنه تفجر أنهار الجنة، وفوقه عرش الرحمن }.

“তোমরা যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে, তখন জান্নাতুল ফেরদাউসের প্রার্থনা করবে। কারণ এটা মধ্যবর্তী ও সর্বোচ্চ ‎জান্নাত, সেখান থেকে নহরসমূহ প্রবাহিত। তার উপরে রয়েছে আল্লাহর আরশ।‎

 

১৯. আখেরাতে তাকওয়ার ফলে মুত্তাকীরা জান্নাতের বৃক্ষসমূহের তলদেশ দিয়ে বিচরণ করবে ও তার ছায়া উপভোগ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي ظِلَٰلٖ وَعُيُونٖ ٤١ وَفَوَٰكِهَ مِمَّا يَشۡتَهُونَ ٤٢ كُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ هَنِيٓ‍َٔۢا بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٤٣ ﴾ [المرسلات: ٤١،  ٤٣] 

“নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে ছায়া ও ঝর্ণাবহুল স্থানে, আর নিজদের বাসনানুযায়ী ফলমূল-এর মধ্যে। (তাদেরকে বলা হবে) ‎‘তোমরা যে আমল করতে তার প্রতিদানস্বরূপ তৃপ্তির সাথে পানাহার কর।” [সূরা মুরসালাত: (৪১-৪৩)]‎

فعن أنس بن مالك قال: قال رسول الله: { إن في الجنة شجرة يسير الراكب في ظلها مائة عام لا يقطعها } [البخاري].

 

আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয় জান্নাতে একটি বৃক্ষ রয়েছে, আরোহী যার ছায়া তলে একশত বছর ভ্রমণ করেও শেষ করতে পারবে না”। [বুখারী]

 

২০. তাকওয়ার ফলে মুত্তাকীরা আখেরাতের মহাভীতির কারণে পেরেশান হবে না। তাদের সাথে ফেরেশতারা সাক্ষাত করবে। ‎আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ أَلَآ إِنَّ أَوۡلِيَآءَ ٱللَّهِ لَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ ٦٢ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَكَانُواْ يَتَّقُونَ ٦٣ لَهُمُ ٱلۡبُشۡرَىٰ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِۚ ٦٤ ﴾ [يونس: ٦٢- ٦٤] 

“শুনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর বন্ধুদের কোন ভয় নেই, আর তারা পেরেশানও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া ‎অবলম্বন করত। তাদের জন্যই সুসংবাদ দুনিয়াবি জীবনে এবং আখিরাতে।” সূরা ইউনুস: (৬২-৬৪)‎

 

ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:‎ আর তাদের আখেরাতের সুসংবাদ আল্লাহর এ বাণীতে ধ্বনিত হয়েছে। তিনি বলেন:

﴿ لَا يَحۡزُنُهُمُ ٱلۡفَزَعُ ٱلۡأَكۡبَرُ وَتَتَلَقَّىٰهُمُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ هَٰذَا يَوۡمُكُمُ ٱلَّذِي كُنتُمۡ تُوعَدُونَ ١٠٣ ﴾ [الانبياء: ١٠٣] 

“মহাভীতি তাদেরকে পেরেশান ‎করবে না। আর ফেরেশতারা তাদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলবে, ‘এটাই তোমাদের সেই দিন, যার ওয়াদা তোমাদেরকে ‎‎দেয়া হয়েছিল।” [সূরা আম্বিয়া: (১০৩)]‎

 

২১. আখেরাতে মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে চমৎকার ঘর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:‎

﴿ وَلَدَارُ ٱلۡأٓخِرَةِ خَيۡرٞۚ وَلَنِعۡمَ دَارُ ٱلۡمُتَّقِينَ ٣٠ ﴾ [النحل: ٣٠] 

“আর নিশ্চয় আখিরাতের আবাস উত্তম এবং মুত্তাকীদের আবাস কতইনা উত্তম!” সূরা নাহাল: (৩০)‎

 

২২. আখেরাতে মুত্তাকীদের তাকওয়ার কারণে তাদের নেকি ও প্রতিদান বহুগুন বর্ধিত করা হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ‎

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَءَامِنُواْ بِرَسُولِهِۦ يُؤۡتِكُمۡ كِفۡلَيۡنِ مِن رَّحۡمَتِهِۦ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ نُورٗا تَمۡشُونَ بِهِۦ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡۚ ٢٨ ﴾ [الحديد: ٢٨]  كفلين: أي أجرين.

“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন, তিনি স্বীয় রহমতে তোমাদেরকে দ্বিগুণ ‎পুরস্কার দেবেন, আর তোমাদেরকে নূর দেবেন যার সাহায্যে তোমরা চলতে পারবে এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে ‎‎দেবেন।” সূরা হাদীদ: (২৮) এখানে كفلين অর্থ দু’টি প্রতিদান ও সাওয়াব। আল্লাহ ভাল জানেন।

সমাপ্ত


[1] অর্থাৎ তার কর্ণ, দৃষ্টিশক্তি, হাত ও পা আমার সন্তুষ্টির বাইরে চলে না। সে তখন শুধু আমার নির্দেশনা অনুসারেই চলে। যেভাবে সে নিজের অঙ্গসমূহের সংরক্ষণ করে সেভাবে আমি তার অঙ্গসমূহের সংরক্ষণ করি।

এটিই হচ্ছে হাদীসের সঠিক অর্থ। এ অর্থের বাইরে অন্য কোন অর্থ গ্রহণ করা যাবে না। কখনও এটা বলা যাবে না যে আল্লাহ বান্দার কোন অংশ প্রবেশ করেন, নাউযুবিল্লাহ। [সম্পাদক]

]]>
http://www.quraneralo.com/taqwa/feed/ 2
সময়-ব্যবস্থাপনা — আপনার ফলপ্রসূ ও চৌকস জীবনের চাবিকাঠি http://www.quraneralo.com/time-management/ http://www.quraneralo.com/time-management/#comments Wed, 01 May 2013 03:16:19 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=4435 মূল : আবু প্রোডাক্টিভ | ভাষান্তর : মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ | সম্পাদনা : আব্‌দ আল-আহাদ

2283676770_6b53f8b77f

আমার পুরনো এক বন্ধু আমাকে একবার বলেছিল, “একটা পুরান কথা (myth) ইদানীং খুব চলছে। কথাটা এমন : “সময়কে ঠিকমতো গুছিয়ে নিতে পারলে, তোমার দ্বারা সবই সম্ভব!” আজ থেকে চার বছর আগে শুনেছি এই কথাটা। কিন্তু আজ আর বিশ্বাস করি না যে, কথাটা কোনো পুরান কথা।

সময়-ব্যবস্থাপনা (time management) এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা সবাই অনেক কথা শুনে থাকি। যথাযথ সময় ব্যবস্থাপনার জন্য মাঝে মাঝে মানুষের কাছে অনেক বকুনিও শুনতে হয় আমাদের। কিন্তু সময়-ব্যবস্থাপনার কার্যকর কোনো পদ্ধতি নিয়ে খুব একটা শোনা যায় না!

কীভাবে সময়-ব্যবস্থাপনা করা যায় তা বুঝতে হলে, প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে সময়-ব্যবস্থাপনা বিষয়টা আসলে কী। সময়-ব্যবস্থাপনা আসলে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো বিষয় নয়। কেননা ব্যবহারিক অর্থে, যার উপর আপনার নিয়ন্ত্রণ নেই, আপনি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না! (আপনি কি সময়ে ধরে রাখতে কিংবা দ্রুত পার করতে পারেন?!)- সময়-ব্যবস্থাপনা হচ্ছে নিজেকে এমন ভাবে পরিচালনা করা যাতে, আমরা যে সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ সেই সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এমনটি আসলে কীভাবে করা যায়?

বিখ্যাত বই “The Effective Executive” (পড়ে দেখার জোরালো আবেদন রইলো) এর লেখক পিটার ড্রাকার, সময়-ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি ধাপ অনুসরণের সুপারিশ করেন। বইটির যে অধ্যায়ে তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন, তিনি সেই অধ্যায়টার নাম দিয়েছেন: “নিজের সময়কে জানুন” :

১. আপনার সময়ের বিশ্লেষণ করুন।

২. নিষ্ফল বা নিরর্থক চাহিদাগুলো ছাঁটাই করুন।

৩. হাতে সময় নিয়ে আপনার কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্য স্থির করুন।

এবার চলুন, একজন চৌকস মুসলিমের প্রত্যাহিক জীবনরীতির আলোকে উপরোক্ত ধাপ তিনটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

আপনার সময়ের বিশ্লেষণ করুন :

কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় নিয়ে নিজের সময়কে লিপিবদ্ধ করুন। আমি এখানে সত্য কথাটাই বলল, এক সপ্তাহে আপনি কত সময় অপচয় করেন তা উপলব্ধি করার জন্য বুকে সাহস থাকা চাই। তবে নিজের সাথে সত্যবাদীর মতো আচরণ করাটাই হলো প্রতিকারের প্রথম পদক্ষেপ। সময় লিপিবদ্ধ করার দুই ধরণের পদ্ধতি আছে :

১. সাথে একটি ডাইরি রাখুন এবং প্রতি ঘন্টায় কী কী করলেন, তা লিখে রাখুন।

২. যখন আপনার সময় বিশ্লেষণ করবেন, তখন আপনার বন্ধু/প্রতিবেশী/স্বামী বা স্ত্রীকে সাক্ষী রাখুন। (কারণ আমরা যখন সময় লিপিবদ্ধ করি, তখন সততার সাথেই তা করি। কিন্তু শেষে গিয়ে নিজেই নিজেকে ধোঁকা দিয়ে বসি।)

নিষ্ফল বা নিরর্থক চাহিদাগুলো ছাঁটাই করুন :

আশা করছি, সময় বিশ্লেষণের পর একটা দুঃখবোধ আপনাকে পেয়ে বসবে! ভাববেন, আমরা এমন অনেক কিছুই করি যা একেবারেই ঝেড়ে ফেলা যায়। আপনার এখন মনে হবে : সকালবেলা কফি খাওয়ার অজুহাতে ক্যাফেতে বসে একঘণ্টা সময় বৃথা নষ্ট না করে বাড়িতেই কফি বানিয়ে খাওয়া যেতো না? কফি খেতে খেতে ই-মেইলগুলোও কি পড়া যেতো না? টিভির চ্যানেল হাতড়ে বা ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রতিদিন দুই ঘন্টা সময় ব্যয় করা কি আমাদের জন্য সত্যিই জরুরি? আমরা কি এসব থেকে সময় বাঁচাতে পারি না? (সাধবান! আল্লাহর জন্য বরাদ্দ সময় বাঁচাতে যাবেন না! “সময় বাঁচানো”-র নামে কিছু লোক মসজিদে সালাত আদায় করতে যায় না। এই রকম সময় বাঁচনো নিষ্ফল কর্ম। মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। অতএব, সময় বাঁচানোর নামে দ্বীনের কাজের সময় কমাতে যাবেন না। দ্বীনের জন্য যথেষ্ট সময় ব্যয় না করার দায়ে আমরা ইতোমধ্যেই অভিযুক্ত। তাই পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে আমরা যেন সময় বাঁচানোর অজুহাতকে ক্ষেত্রে ব্যবহার না করি।)

হাতে সময় নিয়ে আপনার কাজগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্য স্থির করুন :

যখন আপনি কঠিন কিছু নিয়ে কাজ করছেন এবং পুরোপুরি কাজের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে আছেন, ঠিক তখনই একটা ফোন কল বা ই-মেইল কিংবা মেসেজ এলার্ট কি বিরক্তিকর নয়?! এই তৃতীয় ধাপ বা কৌশলটিতে মূলত যা বলা হচ্ছে তা হলো, আপনাকে সময় ভাগ করে নিতে হবে এবং তা করতে হবে আপনার জন্য সম্ভব্য সর্বোচ্চ সময় খণ্ডে। (অনেকের মতে, এক নাগাড়ে সর্বোচ্চ ৯০ মিনিট মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব। তবে এই ৯০ মিনিট হতে হবে বিরতিহীন)। সামান্য পরিমাণ কাজ করে সর্বোচ্চ পরিমাণ সুফল পেতে এই পদ্ধতি সহায়তা করবে। কারণটা খুব সহজ। আর তা হলো, আপনি এভাবে কাজ করলে একটি কাজের প্রতি আপনার সবটুকু মনোযোগ কাজে লাগে নিবিড়ভাবে এবং নির্বিঘ্নে। এক ঘন্টার একটি কাজ করতে আপনার ৪ ঘণ্টা লেগে যাবে যদি প্রতি ১০-১৫ মিনিটে আপনি বিরতি নেন বা বাধা প্রাপ্ত হন।

আজ এ পর্যন্তই। আশা করছি, সময়-ব্যবস্থাপনার পুরান কথাটিকে কীভাবে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়, তা বুঝতে এ লেখা আপনাকে সহায়তা করবে।

]]>
http://www.quraneralo.com/time-management/feed/ 0
দৃষ্টি সংযত রাখার মাহাত্ম্য ও মর্যাদা http://www.quraneralo.com/virtue-of-lowering-the-gaze/ http://www.quraneralo.com/virtue-of-lowering-the-gaze/#comments Wed, 10 Apr 2013 04:00:56 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=4059 myosotis

ভাষান্তর : হামিদা মুবাশ্বেরা | সম্পাদনাআব্‌দ আল-আহাদ

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন,

(হে নবী) আপনি  মু'মিন পুরুষদের বলুন, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের  লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহ্‌  সম্যক অবহিত

(সূরা আন-নূর; ২৪ : ৩০)

অতএব, আল্লাহ্‌ পবিত্রতা ও আত্মিক উন্নয়নকে দৃষ্টি সংযত রাখার এবং লজ্জাস্থান হিফাযত করার প্রতিদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ নিষিদ্ধ বস্তু থেকে নিজের দৃষ্টি সংযত করার ফলে তিনটি উপকার হয় যেগুলো ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যন্ত মূল্যবান।

প্রথমত : ঈমানের মধুরতা আস্বাদন করা

যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র ভয়ে দৃষ্টি সংযত রাখে, তার কাছে ঈমানের সুমিষ্ট মাধুর্য এবং তা থেকে পাওয়া আনন্দ, নিষিদ্ধ বস্তু দেখে পাওয়া আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি মনোহর। বস্তুত, “কেউ যদি আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য কোনোকিছু পরিত্যাগ করে, তবে আল্লাহ্‌ আরও উত্তম কিছুর দ্বারা সেটির প্রতিস্থাপন করেন।”

প্রবৃত্তি হলো নিষিদ্ধকাজে প্রলুব্ধকারী এবং সুন্দর অবয়ব দেখতে ভালোবাসে। আর চোখ হলো হৃদয়ের দিশারী। হৃদয় তার দিশারীকে কোথায় কি আছে, তা খুঁজে দেখার দায়িত্ব দিয়ে বলে, ‘যাও! দেখো, কোথায় কী আছে।’ চোখ যখন সুন্দর কোনো দৃশ্যের খবর দেয়, হৃদয়ে তখন তা পাওয়ার জন্য ভালোবাসার শিহরণ এবং আকাঙ্ক্ষা জাগে। হৃদয় এবং চোখের এই অভ্যন্তরীণ দোলাচল উভয়কেই অনবরত ক্লান্ত করে থাকে। যেমনটি বলা হয়েছে :

চোখকে যেদিন দিশারী বানিয়ে করালে সন্ধান

তোমার চোখের লক্ষ্যবস্তু তোমায় করল হয়রান,

এমন কিছু দেখেলে যাতে ছিল না নিয়ন্ত্রণ,

আংশিকও নয়, নয় পুরোপুরিও;

বরং তোমার জন্য উত্তম ছিল ধৈর্যধারণ।

 কাজেই দৃষ্টিকে যখন কোনোকিছু দেখা এবং নিরীক্ষণ করা থেকে সংযত রাখা হয়, হৃদয়ও তখন নিরর্থক অনুসন্ধান আর কামনার মতো ক্লান্তিকর কাজ থেকে বিশ্রাম পায়।

যে ব্যক্তি নিজের দৃষ্টিকে অবাধে বিচরণের সুযোগ দেবেন, তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে অবিরাম ক্ষতি এবং নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার মাঝে আবিষ্কার করবেন। কারণ দৃষ্টিপাত থেকেই ভালোবাসার (মুহাব্বাহ্‌) জন্ম হয়, যার সূচনা হয় চোখ যা দেখেছে তার প্রতি মোহাবিষ্ট ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ার মাধ্যমে। এই ভালোবাসা ক্রমেই আকুল আকাঙ্ক্ষায় (সাবাবাহ্‌) পরিণত হয়, যার দ্বারা হৃদয় তার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি অসংশোধনীয় মাত্রায় মোহাবিষ্ট এবং নির্ভরশীল হয়ে যায়। এর মাত্রা বেড়ে ‘আসক্তি’র (গারামাহ্‌) রূপ নেয়। এই আসক্তি এমন এক শক্তি যা আসক্ত ব্যক্তির পেছনে তেমনিভাবে লেগে থাকে, যেভাবে কোনো পাওয়াদার ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণীর পেছনে লেগে থাকে। এই আসক্তি আরও বাড়তে থাকে এবং ‘প্রেমাসক্তি’র (ইশ্‌ক) রূপ নেয় যা সকল প্রকার সীমা ছাড়িয়ে যায়। সবশেষে এর মাত্রা বেড়ে ‘প্রেমোন্মাদনা’র (শাগাফা) জন্ম হয় যা হৃদয়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশকেও বেষ্টন করে ফেলে। এই প্রেমোন্মাদনা ক্রমেই ‘আনুগত্যের ভালোবাসা’য় (তাতাইয়্যুমা) রূপ নেয়। তাতাইয়্যুমা’র অর্থই হলো ইবাদত। যখন বলা হয়, ‘তাইয়্যামা আল্লাহ্‌’, তখন তার অর্থ দাঁড়ায়, ‘সে আল্লাহ্‌র ইবাদত করেছে।’

 

এভাবেই হৃদয় এমন কিছুর উপাসনা করা শুরু করে, যার উপাসনা করা সমীচীন নয়। আর এসব কিছুর পেছনে একমাত্র কারণ একটি নিষিদ্ধ দৃষ্টিপাত। যে হৃদয় পূর্বে ছিল মনিব, তা এখন শিকলাবদ্ধ; যা ছিল মুক্ত ও স্বাধীন, তা এখন কারারুদ্ধ। এই হৃদয় চোখের দ্বারা নির্যাতিত এবং চোখের আছে অভিযোগ করলে, চোখ এখন বলে : ‘আমি তোমার দিশারী এবং আজ্ঞাবাহক। প্রথমে তুমিই আমাকে পাঠিয়েছিলে।’ এখানে যাকিছু বলা হলো, তার সবই এমন সব হৃদয়ের জন্যই সত্য, যেসব হৃদয় আল্লাহ্‌র প্রতি ভালোবাসা ও একনিষ্ঠতাকে পরিত্যাগ করেছে। কারণ ভালোবাসার জন্য হৃদয়ের এমনকিছু চায়, যার প্রতি হৃদয় নিজেকে নিবেদিত রাখতে পারে। সে কারণেই, হৃদয় যখন শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে ভালোবাসে না এবং শুধু তাঁকেই উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করে না, তখন নিশ্চিতভাবে সে অন্যকিছুর উপাসনায় লিপ্ত থাকে। আল্লাহ্‌ ইউসুফ (আ) সম্পর্কে বলেন :

এভাবেই যাতে আমি তার থেকে অনিষ্ট অশ্লীলতা দুর করে দেই। নিশ্চয়ই সে আমার নিষ্ঠাবান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত

(সূরা ইউসূফ; ১২ : ২৪)

আযীযের স্ত্রী একজন বিবাহতা নারী হওয়া সত্ত্বেও তার হৃদয়ে প্রেমাসক্তি প্রবেশ করেছিল। কারণ সে ছিল মুশরিকা। অন্যদিকে, ইউসুফ (আ) যুবক, অবিবাহিত এবং চাকর হওয়া সত্ত্বেও সেই অপকর্ম থেকে তাঁকে রক্ষা করা হয়েছিল। কারণ তিনি ছিলেন আল্লাহ্‌র একনিষ্ঠ গোলাম।

দ্বিতীয়ত : আলোকিত হৃদয়, স্বচ্ছ উপলব্ধিবোধ এবং তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি

ইবনু সুজা‘আ আল-কিরমানি বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজের বাহ্যিক অবয়বকে সুন্নাহ্‌র আদলে এবং অভ্যন্তরীণ সত্ত্বাকে সর্বদা আল্লাহ্‌র চিন্তা-গবেষণা এবং তাঁর সচেতনতার আলোকে গড়ে তোলে, নিজের আত্মাকে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা থেকে এবং নিষিদ্ধ বস্তু থেকে দৃষ্টিকে সংযত রাখে, সর্বদা হালাল রুজি ভক্ষণ করে, সেইব্যক্তির উপলব্ধি এবং অন্তর্দৃষ্টি কখনোই ভুল হবে না।”

আল্লাহ্‌ লূতের (আ) সম্প্রদায়কে কীভাবে শাস্তি দিয়েছিলেন, সে কথা উল্লেখ করে বলেছেন :

“নিশ্চয়ই এতে ‘মুতাওয়াস্‌সিমীন’দের (স্বচ্ছ উপলব্ধিবোধ এবং তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন) জন্য রয়েছে নিদর্শনমালা

(সূরা আল হিজ্‌র; ১৫:৭৫)

মুতাওয়াস্‌সিমীন হলেন তারাই যারা স্বচ্ছ উপলব্ধিবোধ এবং তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন। তারা হারাম বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না এবং অশ্লীল কর্ম সম্পাদন করা থেকে বিরত থাকেন।

দৃষ্টি সংযত করা সম্পর্কিত আয়াতের পরবর্তী আয়াতেই আল্লাহ্‌ বলেছেন:

আল্লাহ্‌ আসমানসমুহ যমীনের নূ।...” (সূরা আন-নূর; ২৪:৩৫)

এর কারণ হলো, কর্ম যেমন, কর্মের প্রতিদানও তেমন হয়। অতএব, যে কেউ আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য নিষিদ্ধ বস্তু থেকে দৃষ্টিকে সংযত রাখবে, আল্লাহ্‌, আযযা ওয়া জাল্লা, সেইব্যক্তির জন্য নিষিদ্ধ বস্তুকে অনুরূপ অথচ তার চেয়ে অধিক উত্তম বস্তু দ্বারা প্রতিস্থাপন করবেন। তাই বান্দা যেহেতু তার চোখের আলোকে নিষিদ্ধ বস্তুর উপর পড়তে দেয়নি, আল্লাহ্‌ সেই বান্দার দৃষ্টি এবং অন্তরের আলোকে অনুগ্রহ দান করেন। ফলে ব্যক্তি সেইসব বিষয় বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন, দৃষ্টি সংযত না করলে যেগুলো বুঝা এবং উপলব্ধি করা তার জন্য সম্ভব হতো না।

ব্যক্তি নিজের মধ্যে এই বিষয়টি আক্ষরিক অর্থেই উপলব্ধি করতে পারেন। কারণ হৃদয় একটা আয়নার মতো এবং পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো সেই আয়নার উপর মরিচার মতো। এই আয়না যখন সচ্ছ এবং পরিষ্কার থাকে, তখন তাতে বাস্তবতার (হাকাইক) আক্ষরিক প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু যদি তাতে মরিচা পড়ে থাকে, তাহলে তাতে সুষম প্রতিফলন তৈরি হয় না। ফলে হৃদয়ে অনুমান এবং সন্দেহ নির্ভর জ্ঞান ও অভিব্যক্তির উন্মেষ ঘটবে।

তৃতীয়ত : হৃদয় হবে শক্তিশালী, দৃঢ় এবং সাহসী

 

দৃষ্টির আলোর জন্য আল্লাহ্‌ যেভাবে চোখকে সুস্পষ্ট প্রমাণের সহায়ক শক্তি দিয়েছেন, হৃদয়ের দৃঢ়তার জন্যও তিনি হৃদয়কে সহায়ক শক্তি দান করবেন। এভাবে হৃদয়ে দুধরণের উপাদনের সমন্বয় ঘটবে। ফলে হৃদয় থেকে শয়তান বিতাড়িত হবে। হাদীসে উল্লেখ আছে, “কেউ যদি নিজের পাশবিক প্রবৃত্তির বিরোধিতা করে, ভয়ে শয়তান তার ছায়া থেকেও পালিয়ে বেড়ায়।”

একারণেই যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে নিজের মাঝে গ্লানিময় আত্মাকে খুঁজে পায় — যে আত্মা দুর্বল, শক্তিহীন, ঘৃণার যোগ্য। বস্তুত, যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌কে মান্য করেন, আল্লাহ্‌ তার জন্য উচ্চমর্যাদা নির্ধারণ করেন। আর তাঁকে অমান্যকারীর জন্য আল্লাহ্‌ লাঞ্ছনা নির্ধারণ করেন:

“আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত  হয়ো না, আর তোমরা বিজয়ী হবে, যদি মু’মিন হয়ে থাকো

(সূরা আল–ইমরান; ৩:১৩৯)

“কেউ যদি সম্মান চায় (তবে তা যেন আল্লাহ্‌র কাছেই চায়), কেননা সকল সম্মান আল্লাহ্‌রই।”

(সূরা ফাতির; ৩৫:১০)

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র (আয্‌যা ওয়া জাল্লা) চেয়ে অবাধ্যতা এবং পাপকর্মকেই বেশি প্রাধান্য দেবে, আল্লাহ্‌ সেই বিরুদ্ধাচরণকারীকে লাঞ্ছিত করবেন। সালাফদের অনেকেই বলেছেন, “সম্মানের খোঁজে মানুষ রাজাদের দ্বারে যায়। অথচ আল্লাহ্‌র আনুগত্য ছাড়া কোনো সম্মান নেই।” কারণ যারা আল্লাহ্‌র আনুগত্য করে, তারা আল্লাহ্‌কে নিজেদের বন্ধু এবং রক্ষাকারী হিসেবে গ্রহণ করে। আর যারা আল্লাহ্‌কে তাদের রব এবং পৃষ্ঠপোষক হিসেবে গ্রহণ করে, আল্লাহ্‌ কখনোই তাদেরকে অসম্মানিত করেন না। একটি দো‘আ কুনূতে এ কথাগুলোই বলা হয়েছে: “যাকে আপনি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন, সে অপমানিত হয় না আর যাকে আপনি শত্রু হিসেবে গ্রহণ করেন, সে সম্মানিত হয় না।”

(সূত্র : শায়েখ ইবনুল কায়্যিম, আল-মুন্‌তাকা মিন ইক্‌হাসাতুল লুফ্‌হান ফী মাসায়্যিদ আশ-শায়তান, পৃষ্ঠা ১০২-১০৫। পরিমার্জন : আলি হাসান।)

]]>
http://www.quraneralo.com/virtue-of-lowering-the-gaze/feed/ 2
বই – নারীদের পবিত্রতার জরুরি বিধান http://www.quraneralo.com/narider-pobitrota/ http://www.quraneralo.com/narider-pobitrota/#comments Sat, 09 Feb 2013 04:19:16 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3939

লেখকঃ আবু আহমাদ সাইফুদ্দীন বেলাল

সংক্ষিপ্ত বর্ণনাঃ নবী [সাঃ]-এর বাণী:  “নারীরা পুরুষদের অর্ধেক।” [আবু দাঊদ ও তিরমিযী] নবী [সাঃ] আরো বলেন: “পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।” [মুসলিম] এ হচ্ছে বাহ্যিক শারীরিক পবিত্রা। আর বাকি অর্ধেক পবিত্রা হলো আত্মিক তথা ভিতরের পবিত্রা। এ হাদীস দু’টিকে সামনে রেখে আমরা কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবসমূহ হতে নারীদের জন্য “নারীদের পবিত্রতা ও পরিছন্নতার বিধান”এই ছোট বইটি বিশেষভাবে উপহার দিচ্ছি।

আশা করি মুসলিম নারী সমাজ এ থেকে তাঁদের কাঙ্খিত বিশেষ জরুরি বিধানসমূহ খুবই সহজে উপলদ্ধি করে আমল করতে পারবেন।

Download from QuranerAlo Server

Download from MediaFire

 

]]>
http://www.quraneralo.com/narider-pobitrota/feed/ 0
বিক্রয়ের জন্য নহে! http://www.quraneralo.com/not-for-sale/ http://www.quraneralo.com/not-for-sale/#comments Thu, 17 Jan 2013 04:15:19 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=2897 লেখিকাঃ রেহনুমা বিনত আনিস

আমার ক্যানাডিয়ান নওমুসলিমা ছাত্রী আয়শা- বয়স ১৯, পরীর মত সুন্দরী, সৌন্দর্য নিয়ে পড়াশোনা করছে। আমার কাছে আরবী পড়া শেখার পাশাপাশি ইসলাম সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য জেনে নেয়।

ওর সাথে পরিচয় এই রামাদানে। সেদিন ইফতার পার্টি ছিল, রাতে কিয়ামুল লাইল। ইফতারের পর আমরা পাশাপাশি নামাজে দাড়ালাম। সামনে, পেছনে, পাশে এত মহিলা এবং বাচ্চারা গিজ গিজ করছে যে নামাজে মনোযোগ ধরে রাখা যুদ্ধসম কঠিন ব্যাপার। লক্ষ্য করলাম এর মাঝেই সে একমনে স্রষ্টার সাথে বাক্যালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ময়দানের মধ্যে সে যেন একাই দাঁড়িয়ে! জানতে পারলাম পাঁচ ওয়াক্তের পাশাপাশি সে এমন অনেক এক্সট্রা নামাজ পড়ে যার নামও অনেক জন্মগত মুসলিমের অজানা।

ইসলামের প্রতি ওর আগ্রহ আমাকে চমৎকৃত করল। সে ইসলাম গ্রহণ করেছে দু’বছর। কিন্তু সে ইসলামকে গ্রহণ করেছে আন্তরিকভাবে, ফলে সে এর সবটুকুই পালন করার জন্য আগ্রহী এবং যত্নশীল। দেখলাম সে এর মাঝেই ভারী সুন্দর বোরকা এবং স্কার্ফের কালেকশন করে নিয়েছে। ওর পোশাক আশাক থেকে সবকিছুতে রুচিশীলতার বহিঃপ্রকাশ। তবে এর সবটুকুই ইসলামের দৃষ্টিতে যতটুকু গ্রহণযোগ্য সে বিবেচনা মাথায় রেখে। যেমন যেখানে ক্যানাডায় নেইল পলিশ ছাড়া কোন স্টাইলিশ মেয়ের দেখা পাওয়া অস্বাভাবিক, ওর হাতে পায়ে কোথাও নেইল পলিশ নেই। স্কার্ফ বা ওড়না যখন যাই পরে কোনটিতেই একটি চুলও কোনদিন বেরিয়ে থাকতে দেখিনি।

 

রাতে কুর’আনের আলোচনার সময় বাংলায় আলোচনা হওয়ায় বেচারী বুঝতে পারছিলোনা। আমি তখন ওর আগ্রহ দেখে কিছু অংশ মুখে এবং কিছু অংশ লিখে বুঝিয়ে দিতে লাগলাম। সে কৃতজ্ঞচিত্তে সব শুষে নিতে লাগল এবং মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে সঠিকভাবে বুঝে নিল। যখন আলোচনা শেষে নামাজ শুরু হবে সে এসে আমাকে বলল, "আমি কি আপনার পাশে দাঁড়াতে পারি? তাহলে আমি আপনাকে দেখে আমার posture গুলো ঠিক হচ্ছে কি’না ঠিক করে নিতে পারব"।

আমি তো হতবাক! অনেক সময় অনেক আত্মীয় বন্ধুবান্ধবকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিশেষ করে রুকু এবং সিজদায় posture এর ভুলের ব্যাপারে বলতে গিয়ে তাদের বিরাগভাজন হয়েছি। আর সে কি’না বলে নামাজ সঠিকভাবে পড়ার জন্য posture ঝালাই করে নেবে! ওর আগ্রহ আবারও আমাকে চমৎকৃত করল।

এর পর থেকে কুর’আনের লিঙ্ক নেয়া থেকে শুরু করে ভ্রূ তোলার মাসয়ালা পর্যন্ত নানান বিষয়ে ওর সাথে আলাপ হয়েছে। ভাল লেগেছে যে সে কোন বিষয়ে জানার সাথে সাথে তাকে গ্রহণ করেছে, কুতর্কের আশ্রয় নেয়নি। অথচ এতটা স্বতঃস্ফুর্তভাবে ইসলামের সকল হুকুম আহকামকে আঁকড়ে ধরার আগ্রহ আমি অনেক ইসলাম জানা মানুষের মাঝেও দেখিনি!

ক’দিন আগে নতুন করে ওর ইসলামের বোধ এবং অনুভূতির পরিচয় পেয়ে আবারও মুগ্ধ হলাম। ক্যানাডার একটি বৃহৎ ফ্যাশন হাউজ একটি ফ্যাশন শোর আয়োজন করছে। একপর্বে সমাপ্য শোটিতে মডেলিং করার জন্য ওকে ৪০,০০০ ক্যানাডিয়ান ডলার অফার করা হয়। সে স্রেফ না করে দেয় এই বলে, "আমার ধর্ম আমাকে নিজেকে পুঁজি করার অনুমতি দেয়না"। শুনে এত ভাল লাগল! মনে হল এই মেয়েটি খানিকটা দেরীতে ইসলামকে খুঁজে পেয়েছে, কিন্তু সেই তো পেয়েছে এর আসল আস্বাদ! দোকানে, লাইব্রেরীতে, মসজিদে ওর মত এমন আরো অনেক নওমুসলিমা বোনকে দেখে পুলকিত হই, আশা জাগে আগামী দিনে ইসলামের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত নিয়ে।

আবার ভয় হয় আমরা যারা জন্মগতভাবে একে পেয়েও হেলায় হারিয়েছি তারা বুঝি আবার অপ্রয়োজনীয় এবং অপাংক্তেয় হয়ে পড়ি!

*****************
( মূল লেখাটি এখানে )

]]>
http://www.quraneralo.com/not-for-sale/feed/ 18
৭ টি গোপন কথা যা আপনার স্বামী কখনও মুখে বলবেন না http://www.quraneralo.com/7-secrets-of-husband/ http://www.quraneralo.com/7-secrets-of-husband/#comments Mon, 14 Jan 2013 05:27:49 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3882 অনুবাদ ও প্রকাশনায়ঃ কুরআনের আলো

56

কখনও কি এমন মনে হয়েছে যে - কত ভাল হত যদি আপনি আপনার স্বামীর মন পড়তে পারতেন? পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে স্বামী স্ত্রীর খোলাখুলি আলোচনা করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু আমাদের মতো অনেক মুসলমান প্রধান দেশেই এক অজানা কারণে পুরুষরা অনুভূতি প্রকাশে নিশ্চুপ ও উদাসীন হওয়া শিখতে শিখতে বড় হয়। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামীরা কিছু কিছু ব্যাপার তাদের স্ত্রীদের সাথে আলোচনা করতে অনীহা বোধ করেন। সমস্যার একটি কারণ এটাও যে, অনেক সময় তাদের চিন্তাগুলোকে সঠিক বাক্যে রূপ দেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের জন্য এরচেয়েও কঠিন কাজ হল অনুভূতিগুলোকে শব্দে রূপ দেওয়া।

কাজেই, বহু স্বামী স্ত্রী তাদের বিবাহিত জীবন একরকম যোগাযোগহীনতার মধ্যেই পার করতে থাকেন; কোনদিনও হয়তো জানতেও পারেন না তার সঙ্গীটি আসলেই কি ভাবেন। এই লেখাটিতে মুসলিম বোনদের জন্য তাদের স্বামীদের এমন কিছু দিক সংক্ষেপে তুলে ধরা হল যা সাধারণত তারা কিভাবে বলবেন বুঝে উঠতে পারেন না, অথবা বলতেও চান না।

১) সব কিছুর ঊর্ধ্বে, আপনার স্বামী আপনার শ্রদ্ধা পেতে চান

নারীরা এটা জানতে চান যে তাদের স্বামীরা তাদের ভালবাসেন; আর পুরুষরা জানতে চান যে তাদের স্ত্রীরা তাদের শ্রদ্ধা করেন। নারীদের এটা বোঝা খুবই দরকার যে পুরুষদের জন্য ‘শ্রদ্ধা’র গুরুত্ব কতখানি। একজন মুসলমান পুরুষ শৈশব থেকে এটা শিখতে শিখতেই বড় হয় যে, পুরুষদেরকেই প্রধানত সংসারের খাদ্য সংস্থানের এবং যাবতীয় ভালমন্দের দায়িত্ব নিতে হয়। একটু কল্পনা করে দেখুন, যে পুরুষ তার সাধ্যমতন যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, সেই সংসারে স্ত্রীর কাছেই যদি সে কোন শ্রদ্ধা না পায়, তাহলে তা একজন পুরুষের জন্য কতখানি হতাশাজনক হতে পারে। একজন স্ত্রী যদি ঘোষণা করে বেড়ায় যে সে তার স্বামীকে অনেক ভালবাসে, কিন্তু শ্রদ্ধা করেনা; তাহলে সে স্বামীর মন থেকে খুব শীঘ্রই স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা শেষ হয়ে যাবে।

কুরআনের এই আয়াত থেকে আমরা উপরল্লিখিত কথাগুলোই পাই, যেখানে আল্লাহ্‌ তা’য়ালা বলেন-

“পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল, যেহেতু আল্লাহ্‌ তাদের মধ্যে একের উপর অপরকে প্রাধান্য দান করেছেন এবং জন্যও যে, তারা স্বীয় ধন-সম্পদ হতে ব্যায় করে থাকে; সুতরাং যে সমস্ত নারী পুণ্যবতী তারা আনুগত্য করে, আল্লাহ্‌র সংরক্ষিত (ইজ্জত আব্রু ও অন্যান্য) প্রচ্ছন্ন বিষয় সংরক্ষণ করে;...” [সুরা আল- ইমরানঃ ৩৪]

২) আপনার স্বামী আপনার কাছে বিশ্বস্ততা আশা করেন

শ্রদ্ধার সাথে বিশ্বস্ততার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আপনার সম্পর্ক ভেঙ্গে দিতে এই একটি ধারণাই সবচেয়ে দ্রুত কাজ করতে পারে যে আপনার সঙ্গীটি অবিশ্বস্ত; এই সংশয় যে - আপনার সঙ্গী আপনাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। না, এখানে বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে কথা হচ্ছে না। বিবাহিত জীবনের বিশ্বস্ততার কথা বললে এ চিন্তাটিই সাধারণত মানুষের মনে আগে আসে। এখানে যে বিশ্বস্ততার কথা বলা হচ্ছে তা হল, এই বিশ্বাস থাকা যে- যে মানুষটিকে আপনি সারাজীবনের জন্য বেঁছে নিয়েছেন সে ওই সময়ও আপনার পাশে থাকবে যখন আপনার তাকে প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী।
যদিও বেশীরভাগ পুরুষই কখনও মুখে স্বীকার করবে না, তবুও বাস্তব সত্য হল এই যে, একজন পুরুষের তার স্ত্রীর সঙ্গ এবং সমর্থন গভীরভাবে প্রয়োজন। আর এমন একজন স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা খুবই কষ্টকর যে কঠিন সময়গুলোতে পাশে থাকে না। আপনি যদি ক্রমাগত তাকে ডিভোর্স বা সম্পর্কচ্ছেদের ভীতিতে রাখেন, আপনি ধরেই রাখতে পারেন যে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক খুব তাড়াতাড়িই দুর্বল হয়ে ভেঙ্গে যাবে।

আপনার স্বামী এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চান যে, আপনি সেই সব সময়গুলোতে তার পাশে থাকবেন যদিঃ

● তিনি নতুন কিছু (নতুন চাকরি বা ব্যবসা আরম্ভ) করতে যেয়ে বিফল হন।
● তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং অর্থসঙ্কটে পড়ে যান।
● তার সুনাম নষ্ট হয়ে যায় অথবা তার সম্মান আক্রমণের সম্মুখীন হয়।

আল্লাহ্‌ এবং তাঁর রসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আনুগত্যের পরই অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশী আপনার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে। আপনি আপনার স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনিও আপনার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন।

৩) তিনি আপনার কাছে থেকে আরও বেশী বেশী শারীরিক তৃপ্তি কামনা করেন

স্পর্শকাতর এই প্রসঙ্গটি খোলাখুলিই উত্থাপন করছি। কোন কোন নারীরা হয়তো এজন্য পুরুষদেরকে ‘সংকীর্ণমনা’, ‘পশুসম’, ‘শরীরসর্বস্ব’ ইত্যাদি আখ্যা দিতে পারেন; কিন্তু এটা চরম বাস্তবতা। পুরুষরা গভীরভাবে শারীরিক তৃপ্তি কামনা করেন, সত্যি সত্যিই কামনা করেন।
কাজেই যখন আপনি তাকে এসব অজুহাত দেখান-
● “আমার মাথা ব্যাথা করছে”
● “আমার ভাল লাগছে না”
● “কিছুদিন অপেক্ষা করলে হয় না? এখন আমার ‘মুড’ নেই”

জেনে রাখুন, আপনার স্বামী আপনার উপর কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েই ঘুমাতে যাবেন, যদিও তিনি সেটা প্রকাশ নাও করতে পারেন। আর এমনটি যদি প্রায়শই করতে থাকেন, তিনি আপনার উপর অসন্তুষ্ট হতে থাকবেন। এবং এই অসন্তুষ্টির কারণে আপনার স্বামী ছোট খাটো বিষয়েও অহেতুক তিক্ত আচরণ করতে পারেন এবং আপনার প্রতি তার ভালবাসাতেও ঘাটতি হতে পারে।
কাজেই ইসলাম সম্মত কোন কারণ (যেমন- হায়েজ, নেফাস, ফরজ রোযা ইত্যাদি) ছাড়া অন্য কোন অজুহাত দেখানোর আগে এই হাদিসটি স্মরণে রাখবেনঃ
রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন-

‘যদি কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে তার সাথে একই বিছানায় শোওয়ার জন্য ডাকে, আর তার স্ত্রী অস্বীকার করে, তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা ওই মহিলার উপর লা’নত বর্ষণ করতে থাকে’। [সহীহ বুখারীঃ ৪৮১৪; ইফা]

৪) তিনি অন্য নারীদের সম্পর্কে ভাবেন

থামুন, এটুকু পড়েই উত্তেজিত হবেন না। বুঝিয়ে বলছি। সব পুরুষই অন্য নারীদের সম্পর্কে ভাবেন।
তার অর্থ এই নয় যে তিনি আপনার সাথে প্রতারণা করবেন।
তার অর্থ এই নয় যে তিনি দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবছেন।
তার অর্থ এই নয় যে তিনি অন্য কোন নারীকে নিয়ে নানা রকম ‘অনৈতিক’ কল্পনা করছেন।

তার অর্থ এই যে, প্রত্যেক স্বাভাবিক পুরুষই জীবনের কোন না কোন সময়ে অন্য নারীর কথা চিন্তা করেন। তাই এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে, পুরুষদের ব্যাপারে ভ্রান্ত আর শিশুসুলভ ধারণা বাদ দিয়ে বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করুন।
এই ধরণের সমস্যা মোকাবেলার জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হচ্ছে এই উপদেশগুলো কার্যকর করাঃ

• স্বামীকে শ্রদ্ধা করুন
• স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকুন
• স্বামী যখনই চাইবেন তখনই তাকে শারিরীক ভালোবাসা দিন

তার মানে এসব করলেই কি আপনার স্বামী অন্য নারীর ব্যপারে আর কখনও চিন্তা করবেন না? না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু এর ফলে তার অন্তরে আপনার প্রতি ভালোবাসা ও মূল্য অনেক বেড়ে যাবে এবং অন্য নারীর কাছে শ্রদ্ধাবোধ, আনুগত্য, শারিরীক তৃপ্তি ইত্যাদি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কমে যাবে।

৫) তিনি আপনাকে খুশী দেখতে চান

আপনার কি মনে হয়, কেন পুরুষরা টাকা উপার্জনের জন্য এত পরিশ্রম করেন?
আপনার কি মনে হয়, কেন পুরুষরা চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসার ঝুকি নিতেও প্রস্তুত হন?
আপনার কি মনে হয়, কেন পুরুষরা নারীদের জন্য উপহার কিনে আনেন?
কারণ, অন্তরের গভীর থেকেই তারা শুধু স্ত্রীদেরকে খুশী দেখতে চান।

কখনও কখনও হয়তো তারা অনেক কিছুই ভজঘট পাকিয়ে ফেলেন, বিভিন্ন বার্ষিকী, দিন তারিখ বেমালুম ভুলে যান। কিন্তু তারা তা কখনওই ইচ্ছা করে ভুলে যান না বা অবহেলা করেন না, কারণ তারা জানেন এধরনের বিষয়গুলো মনে রাখতে পারলে তাদের স্ত্রীরা খুশী হতেন।

কাজেই যখন আপনার স্বামী আপনার জন্য কোন উপহার নিয়ে আসেন, তা সানন্দে গ্রহন করুন, তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং সেই উপহার বেশী বেশী ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। তিনি যদি কোন গহনা বা পোশাক কিনে আনেন, তা আলমারিতে তুলে না রেখে আপনার স্বামীর সামনে পরে থাকুন। তিনি যদি কোন প্রসাধনী কিনে আনেন, তা দিয়ে নিজেকে শুধুমাত্র স্বামীর জন্য সাজান। অন্যের বাড়ীতে দাওয়াত, অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে এগুলো ব্যবহার করে অন্যদেরকে না দেখিয়ে ঘরে আপনার স্বামীর জন্য সাজুন। তিনি যদি কোন মোবাইল ফোন কিনে আনেন, তা ব্যবহার করুন।

এবং তিনি যদি কোন ভুল করে ফেলেন, তা সাথে সাথে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করবেন না। কারণ তাহলে তিনি ভাবা শুরু করবেন যে, তিনি আপনার জন্য যা কিছু করেন আপানার কাছে সেগুলোর কোন শ্রদ্ধা বা মুল্য নেই।

৬) একজন ভালো মুসলিম হতে তাকে উৎসাহিত করুন

পৃথিবীতে কেউ নিখুঁত নয়। হতে পারে আপনার স্বামী আলেম নন। হতে পারে তিনি পৃথিবীর সেরা মুসলিম নন। আপনি তাকে আরও ভালো হতে উৎসাহ দিতে পারেন; কিন্তু তাকে জোর করতে পারেন না। তিনি যাতে আরও ভালভাবে দ্বীন চর্চা করতে পারেন এজন্য আপনি কিছু ছোট ছোট কাজ করতে পারেন-

● ফজরের সালাতের জন্য তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার প্রস্তাব দিন।
● মসজিদে যেয়ে সালাত আদায় করার জন্য উৎসাহ দিন।
● দাঁড়ি রাখলে তাকে কত ভাল দেখায়/দেখাবে তার প্রশংসা করুন।

এই কথাগুলো খুব সুচিন্তিত ভাবে, নরম স্বরে, পরামর্শের মত করে বলুন; আদেশ বা উপদেশের সুরে নয়। কারণ বেশী উপদেশ শুনতে কেউ পছন্দ করেন না। যদি আপনি এই কাজগুলো সঠিক ভাবে করতে পারেন, তাহলে আপনি দুইভাবে লাভবান হবেন-
প্রথমত একজন নেককার স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারার সৌভাগ্য;
দ্বিতীয়ত আপনার স্বামীকে নেক কাজে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আখিরাতের পুরস্কার।

আল্লাহ্‌ তা’য়ালা সূরা আসর এ কালের শপথ নিয়ে এ ধরনের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্তদের দল থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করেছেন-

‘কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎ আমল করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয়, ধৈর্যধারণে পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে।’ [সূরা আসরঃ ৩]

৭) তিনি আপনাকে ভালবাসেন, যদিও তা সবসময় প্রকাশ করেন না।

জানি, এই কথাটা একবাক্যে বিশ্বাস করা কষ্টকর; কিন্তু এটাই সত্য (সাধারণত।) পুরুষরা সাধারণত মনের আবেগ অনুভূতি প্রকাশে ততটা দক্ষ নন (খেলাধুলা বা রাজনীতির প্রসঙ্গে হলে অবশ্য ভিন্ন কথা)। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ এই কথাটা পুরুষরা তাদের স্ত্রীদেরকে খুব কমই বলে থাকেন। কেউই নিখুঁত নয়। আর মানব ইতিহাসের সবচেয়ে আদর্শ ব্যক্তিত্ব মহানবী (সাঃ) এর চরিত্রের সাথে আপনার স্বামীকে সবসময় তুলনা করলে তেমন উপকৃত হবেন না। যদিও সবারই উচিৎ তাঁর আদর্শ পুরোপুরি অনুসরণ করা, কিন্তু যে কোন মানুষই তার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকুই করার চেষ্টা করেন। তবে মহানবী (সাঃ) এর তাঁর স্ত্রীদের প্রতি যেমন আচরণ করতেন, ঠিক সেরকমটি করা কোন পুরুষের পক্ষে বাস্তবিকই কঠিন। একইভাবে, কোন পুরুষেরও তার স্ত্রীর আচরণের সাথে আয়েশা (রাঃ) বা রাসুল (সাঃ) এর অন্যান্য স্ত্রীদের আচরণের তুলনা করাও ঠিক হবে না।

আপনার ধারণা অনুযায়ী রাসুল (সাঃ) তাঁর স্ত্রীদের সাথে যেমন আচরণ করতেন, তেমনটি আপনার স্বামী করতে না পারলেই তার অর্থ এই নয় যে তিনি আপনাকে ভালবাসেন না। তার অর্থ এই যে, তিনি একজন সাধারণ মানুষ। এটা আপনার খেয়াল রাখা জরুরী।

● তিনি যদি আপনার ভালো মন্দের দিকে সাধ্যমতো খেয়াল রাখেন;
● তিনি যদি আপনার উপর অত্যাচার না করেন অথবা আপনাকে উপেক্ষা না করেন;
● তিনি যদি আপনার সমস্যা সমাধানের বা অসুবিধা দূর করার জন্য তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেন;

তাহলে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করতে পারেন যে তিনি আপনাকে ভালবাসেন, সত্যিই ভালবাসেন।

এই লিঙ্কে পড়ুন ৭ টি গোপন কথা যা আপনার স্ত্রী কখনও মুখে বলবেন না

শুধুমাত্র বাস্তব জীবনে ইসলাম চর্চাকারী অবিবাহিত মুসলিম ছেলেমেয়েদেরকে আল্লাহ্‌ভীরু জীবন সঙ্গী/সঙ্গিনী খুঁজে পেতে সহায়তা করাই “পিওর ম্যাট্রিমনি” ওয়েবসাইটের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন  - http://www.quraneralo.com/purematrimony/

]]>
http://www.quraneralo.com/7-secrets-of-husband/feed/ 2
কিছু বোরকা পরা বোনের আচরনের জন্য বোরকাকে দায়ী করা যাবে না http://www.quraneralo.com/borkha-ke-dosh-diben-na/ http://www.quraneralo.com/borkha-ke-dosh-diben-na/#comments Thu, 06 Dec 2012 05:10:30 +0000 QuranerAlo.com Editor http://www.quraneralo.com/?p=3824 লিখেছেনঃ আলী হাসান তৈয়ব

78

 বাংলাদেশে পর্দা করেন কিংবা বোরকা পরেন এমন নারীর সংখ্যা নগন্য নয়। মুসলিম নারীদের অনেকেই আলহামদুলিল্লাহ পর্দা করেন। দেশের যে কোনো প্রান্তে গেলেই অহরহ চোখে পড়ে বোরকা পরা নারী। সন্দেহ নেই বোরকা পরা নারীকে অন্য যে কোনো পোশাক পরিহিত নারীর চেয়ে শালীন ও সমীহযোগ্য দেখায়। তাদের দেখলে কেবল অসুস্থ মানসিকতার লোকরা ছাড়া সবাই মনে মনে শ্রদ্ধা বোধ করেন। মুসলিম সমাজে পথে-ঘাটে তাদের সম্মান দেখানো হয়। গাড়িতে সিট না পেলে বেপরোয়া তরুণরাও তাদের জন্য নিজের আসন ছেড়ে দেয়। যারা সত্যিকার পর্দা করেন রাস্তা-ঘাটে তাদের পিছু লাগে না বখাটে যুবকরাও। এটিই বাংলাদেশের স্বাভাবিক চিত্র।

তবে বাংলাদেশের এই স্বাভাবিক চিত্রের উল্টোপিঠও আজকাল দেখা যাচ্ছে। এ যুগের বোরকা পরা মেয়েদের পেছনেও ইদানীং বখাটে ছেলেরা ঘুরঘুর করছে। বোরকা হেফাযতের কারণ হওয়ার পরও অনেক বোরকাবৃতা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। গৃহবধূ থেকে নিয়ে স্কুল-কলেজ এমনকি মাদরাসার ছাত্রীরাও সাম্প্রতিককালে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন। তারাও আজকাল খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে আসলে স্বতন্ত্রভাবে ভাবা দরকার। আমি এ বিষয় নিয়ে অল্প-বিস্তর ভেবেছি। কিছু পয়েন্ট ও কারণও নোট করেছি। সেসবের আলোকে সংক্ষেপে বিষয়টি আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

বিশ্বব্যাপী ইসলামের পর্দা বিধানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, দেশীয় মিডিয়াগুলোয় বোরকাকে নেতিবাচকভাবে বিরামহীন উপস্থাপন, সর্বোপরি কিছু বোরকাধারীর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ হেতু দিনদিন বোরকার প্রতি এক শ্রেণীর মানুষের বিরূপ মনোভাব গড়ে উঠছে। মিডিয়ার বিষয়টি বাদ দিলে তথাকথিত এই বোরকাওয়ালীদের আচরণই মূলত দায়ী সম্প্রতি একটি শ্রেণীর বোরকাবিরোধী কটু বাক্য উচ্চারণে অভ্যস্তকরণে। এদের কারণে অনেক সময় প্রকৃত পর্দাশীল নারীদেরও দুষ্টু লোকের অশিষ্ট মন্তব্য হজম করতে হয়। নিজের মতো বোরকা পরা একটি মেয়েকে নষ্টামি করতে দেখে কে না লজ্জায় অধোবদন হন। মানুষের সামনে আড়ষ্ট হয়ে ভেতরে হায় হায় করেন।

মনে পড়ে ছাত্র জীবনে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে গিয়ে প্রথম বোরকাওয়ালী কিছু নারীর প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ দেখি। সেটি আমাকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দেয়। তারপর ক্রমশ এ চিত্র নিয়মিত চোখে পড়তে লাগে। এখন শহরের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বলতেই এমন কিছু ব্যাপার সেখানে ডালভাত। ঢাকার নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের হোটেল রেস্তোরায় অশ্লীল পোশাক পরা মেয়েদের মতো, বোরকা পরা অনেক শালীন পোশাকধারীকেও দেখা যায় বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে অবলীলায় আড্ডা দিতে। রিকশার হুড ফেলে বেগানা পুরুষের সঙ্গে স্বামীর মতো করে গা ঘেষে বিচরণ করতে। ঢাকার টাউন সার্ভিস বাসগুলোয় অন্য তরুণ-তরুণীদের তো বটেই বোরকা পরা কোনো মেয়েকে পেছনের সিটে বসে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে খুনসুটি করতে দেখলে আর কষ্টের অন্ত থাকে না। মুসলিম মেয়েদের আঁটশাট পোশাক আর অশ্লীলতার নির্লজ্জ প্রদর্শনীর জ্বালায় যখন পথে বেরুনো দায় তখন এই গুটিকয় বোরকাধারীর এসব আচরণ আরও অসহ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এদের কারণে অনেকে বোরকাকে খেলো মনে করতে শুরু করছেন।

কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে কিংবা শহরের কোনো পার্ক বা রেস্টুরেন্টে গেলে আপনারও চোখে পড়বে বোকরাবৃতা মেয়েদের অসংলগ্ন আচরণ। শহরের রাস্তাগুলোয়ও দেখবেন  ব্রীড়াহীন কিছু করতে। যানবাহন আর পার্কে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত বাপের টাকায় পড়তে আসা ছাত্রীদের দেখবেন  বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে পতিজ্ঞানে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। সত্যিকার পর্দাকারীণী এবং ইসলাম অন্তপ্রাণ বলতেই তাদের এসব অভব্য, ইসলামী শিষ্টাচার বহির্ভূত কর্মকাণ্ড দেখে বিস্মিত ও ব্যথিত হন। তাদের নিয়ে যখন মানুষ বিরূপ মন্তব্য করে তখন নিলাজ তারা হয়তো শুনতে পান না কিংবা শুনলেও তাদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না; কিন্তু ইসলামপ্রেমী অন্য যারা এসব খারাপ মন্তব্য করতে শোনেন, তারা ঠিকই বিব্রত বোধ করেন। প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হন।

কাউকে দেখা যায় বোরকা পরেছেন তো তার মুখ খোলা। উপরন্তু মুখমণ্ডলে মেকাপ আর রংয়ের ছড়াছড়ি। ঠোঁটে কড়া লিপস্টিকের দৃষ্টিকটু কারুকাজ। আরেক শ্রেণীর নারীদের দেখা যায় জিন্স প্যান্ট আর টাইট গেঞ্জি পরেন, কিন্তু মাথা আবৃত রাখেন ফ্যাশনেবল স্কার্ফ দিয়ে। শরীরের গঠন তাতে কেবল সুদৃশ্যমানই হয়ে ওঠে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরুষকে আর দশজন বেপর্দা নারীর চেয়ে বরং বেশিই আকর্ষণ করে। আরেকটি শ্রেণী আছে যারা বোরকা পরেন; মুখও ঢাকেন ঠিক, কিন্তু সে বোরকা আর স্কার্ফ এতোটাই পাতলা যে তাতে আবৃত দেহের আকার-আকৃতি অক্লেশেই পুরুষের লোলুপ দৃষ্টিতে টেনে নেয়।

এদিকে বিস্ময়কর হলেও মুসলিম দেশের নারীদের এখন অহরহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গণে আসতে দেখা যাচ্ছে। ক্রিকেট, ফুটবল, সাঁতার ও দৌড় থেকে নিয়ে ক্রীড়া কোনো আঙ্গনই আজ মুসলিম মেয়েদের সামনে অগম্য মনে হচ্ছে না। ইরান-ইরাক ও সৌদি নারীরা বিশ্ব অলিম্পিকসহ সব আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরে পর্দার (?) সঙ্গে অংশ নিয়ে মিডিয়ার বদৌলতে সবার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন। বুঝি না পৃথিবীর যে কোনো দেশ বা যে কোনো ধর্মের লোকেরা কোনো খেলা আবিষ্কার করলেই তাতে মুসলিম নারীকে অংশ নিতে হবে তা কেন ভাবা হচ্ছে?! খবরের কাগজে প্রায়শই বিশেষ স্কার্ফ পরা আর গায়ের সঙ্গে গভীরভাবে লেপ্টে থাকা পোশাকে ইরানের প্রমিলা ক্রীড়াবিদদের ছবি ছাপা হয়। কী অদ্ভুত প্রবণতা! আরে আপনি যদি পর্দাই করবেন তবে কেন লাখো-সহস্র দর্শকের সামনে নিজের দেহ প্রদর্শনীমূলক ক্রীড়ায় অংশ নিতে হবে?!

আরও হাস্যকর ব্যাপার হলো, মুসলিম বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগও কোনো কোনো আরব দেশে করা হয়। যে প্রতিযোগিতা কেবলই নারীর দেহকে পূঁজি করে বাণিজ্যিক ফায়দা লোটার মতবলে আয়োজিত তাতে কেন অংশ নিতে হবে। দেশের গৌরব তো নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি ও পরোপকারী মানসিকতা দিয়েই বাড়ানো যায়, নারীকে ব্যবসার পণ্য বানিয়ে কেন দেশের গৌরব (?) বাড়াতে হবে?

অনেক মা-বোনকে দেখা যায়, বোরকা পরে কিংবা মাথায় হিজাব লাগিয়ে নিজের মেয়েকে অর্ধনগ্ন পোশাকে লাক্স ফটো সুন্দরী কিংবা ক্লোজ আপ ওয়ানের মতো নাচ, গান কিংবা সুন্দরী বিচিত্র দেহ প্রদর্শনীমূলক প্রতিযোগিতায় নিয়ে যান। আর এসব প্রতিযোগিতায় নিজের মেয়েকে খেতাবধারী বানাতে ছোটবেলা থেকেই নিয়ে যান গান বা নাচের স্কুলে। মুসলিম হিসেবে শুদ্ধভাবে কুরআন শেখার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে সন্তানকে তা শেখাতে যারা যত্নশীল নন, বিস্ময়করভাবে তারাই কি-না দুদিনের যশ-খ্যাতি কামাতে নাচ-গানে এত আন্তরিক!

আমরা রোজ সমাজের অশান্তি ও অপরাধগুলো নিয়ে সমালোচনা করি, চিন্তা ও টেনশন করি, নিজেদের সন্তান কোনো দুর্ঘটনার শিকার হোক, অপক্ক বয়সে না বুঝে কোনো খারাপ ছেলের খপ্পরে পড়ুক, বখাটের হাতে ধর্ষিতা বা লাঞ্ছিতা হোক কেউ তা চাই না। কিন্তু মেয়েদের পোশাক, উচ্ছৃংখল আচরণ আর অতি আড়ম্বরপূর্ণ পদচারণ যে এসব ডেকে আনে গুরুত্ব দিয়ে তা ভাবি না। সাহস করে সে সত্য উচ্চারণ করি না। তাই বদলায় না আমাদের ভাগ্যও। থামে না নির্যাতিতার কান্না। বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে ধর্ষণ আর নির্যাতনের। যার জেরে ঘটে অসহায় মেয়েদের আত্মহত্যা আর আত্মাহুতির ঘটনা।

হ্যা, যারা বোরকা পরা সেসব নারীর সমালোচনা না করে বোরকাকে সমালোচনায় বিদ্ধ করেন, তাদেরও একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিত, কিছু দুষ্ট প্রকৃতির নারী তাদের অপকর্ম নির্বিঘ্নে সম্পাদনের জন্য বোরকা ব্যবহার করেন। আবাসিক বোর্ডিং কিংবা ছিনতাই বা চুরি-ডাকাতির ক্ষেত্রেও এর আশ্রয় নেয় অনেক দুষ্ট লোক। হতভাগা কিছু নারী পরীক্ষায় নকলের জন্যও বোরকাকে কলংকিত করেন। এদের বিচার তো আল্লাহই করবেন। এ জন্য বোরকাকে দোষারোপ করা বা ধর্মদ্রোহীদের ভাষায় বোরকাবৃতাদের দোষ খুঁজে বেড়ানো আর যাই হোক কোনো ঈমানদারির পরিচয় হতে পারে না। এদের অপকর্মকে যদি কেউ বোরকা না পরার যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেন তবে তিনি অজ্ঞতা কিংবা ধর্মদ্রোহিতার পরিচয় দেবেন। কিছু লোকের অপকর্মের ভার কখনো কোনো শ্রেণীর ওপর চাপানো সুবিবেচনা হতে পারে না।

আরেকটি বিষয়, সারা পৃথিবীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদের মিডিয়াগুলোও তো বর্ণবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। রোজ পেপারে গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণবাদী ঘটনার বিবরণে একে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তথাপি তারা আবার কিভাবে বর্ণবাদী আচরণ করে ইসলাম অনুশীলনকারীদের প্রতি? সন্দেহ নাই, ইসলামী পোশাকের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও এক ধরনের বর্ণবাদী মানসিকতার পরিচায়ক।

উল্টো যুক্তি দিয়ে বলা যায়, তারা নিজেরা যে (সাধারণ) পোশাক পরেন, দুনিয়ার সব অপরাধী আর সন্ত্রাসী বদমাইশই তো সে পোশাকে শোভিত হন, তাই বলে কি প্যান্ট-শার্ট পরা দেখলেই তাকে কেউ বলতে পারে সন্ত্রাসী, দুষ্কৃতিকারী? বিশ্ব সন্ত্রাসী আমেরিকা আর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ফুলপ্যান্ট আর টি শার্ট বা কোর্ট-টাই পরেন বলে আমি কি এ পোশাকে কাউকে দেখলেই বলতে পারি এই বুশ, এই শ্যারন, এই নেতানিয়াহু? কখনো না। তাহলে বোরকা পরা কোনো নারীকে কিংবা অপরাধ সংগঠনের জন্যই বোরকা পরা পুরুষকে কাব্যাঘাত না করে কেন মুণ্ডুপাত করা হবে বোরকার? এ এক অন্যায়ই বটে।

তবে বোরকা পরা বোনদেরও মনে রাখতে হবে, ইসলামবিরোধী মিডিয়াগুলো সব সময় এসব খারাপ দৃষ্টান্ত লুফে নেয়। তারা টুপি-দাড়ি বা বোরকা পরা মানুষের কোনো দোষ পেলে দায়ী ব্যক্তির অপরাধের সমালোচনা না করে এই পোশাকের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে যায়। আসলে এই ছুতোয় তারা নিজেদের ইসলাম না মানার কুবাসনা চরিতার্থ করে। নিজের ধর্মহীনতাকে জায়েয করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।

আমরা যেমন সমাজ থেকে এই অন্যায় অভিযোগ ও সমালোচনার মূলোৎপাটন চাই, তেমন বোরকা পরা নারীদের কাছেও কামনা করি দায়িত্বশীল আচরণ। বোরকাবৃতারা কিছুতেই নিজের মর্যাদা ও সম্মানের কথা ভুলতে পারেন না। তাদের জানতে হবে কোন কাজটি তাদের সম্মানের সঙ্গে যায় আর কোনটি যায় না। শুধু সামাজিকতা রক্ষায় কিংবা বাবা-মার পীড়াপীড়িতে নয়, সকল নারীকে বোরকা পরতে তথা পর্দা করতে হবে আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে জেনে এবং বিধানটিকে বুঝে। বুঝতে হবে বোরকা নয় আল্লাহর নির্দেশ পর্দা রক্ষা করা। আপাদমস্তক নিজেকে ঢেকে ফেলা এবং বেগানা পুরুষের সংশ্রব থেকে যথাসাধ্য দূরত্ব বজায় রাখা। পরিবারের নিরাপদ ছায়াই নারীর ঠিকানা। এর বাইরে যাবেন কেবল প্রয়োজনে। এর অন্যথা হলেই বিপত্তি।

এ পর্যায়ে এসে কেউ অবশ্যই প্রশ্ন তুলতে পারেন ইসলামী পর্দা তথা খাস শরঈ‘ পর্দা বলতে কী বুঝায়? পর্দার অর্থই কী বোরকা পরা নাকি আরও কিছু করণীয় আছে? আর মুখ সতর তথা আবরণীয় কি-না। মুখ না ঢাকলে কি পর্দা হবে না ইত্যাদি প্রশ্ন। এ বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মাঝেমধ্যেই বিতর্ক তুলতে যাচ্ছে ইদানীং। আসলে এ বিষয়টি স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। তাই স্বতন্ত্র নিবন্ধেই বিষয়টি আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। আগ্রহীরা আমার এ বিষয়ে স্বতন্ত্র নিবন্ধ পড়ে দেখতে পারেন।

এ জন্য অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তানকে আর সব শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের মৌলিক শিক্ষাও দিতে হবে। পর্দা এবং ইসলামের শিষ্টাচার শেখাতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। পাশাপাশি তাদের জন্য পরিবারে নিশ্চিত করতে হবে ইসলামী অনুশাসন এবং সঠিক গৃহশিক্ষার। নিজের কষ্টে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কলিজার টুকরো মেয়েকে বিধর্মী পোশাক কিংবা পুরুষদের বেশ কিনে দেবেন না। সন্তানকে বানাবেন না আল্লাহর রাসূলের অভিশাপের ভাগিদার। দায়িত্বশীল হিসেবে নিজেকেও বানাবেন না অপরাধী। বিচার দিবসে ন্যায়পরায়ণ আল্লাহর দরবারের আসামী।  আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার এবং মানার তাওফীক দান করুন। আমাদের মেয়েদের বানান নবীপত্নী ‘আয়েশা, খাদিজা ও প্রিয়তম তনয়া ফাতেমার (রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না) অনুসারী। আমীন। ইয়া রাব্বাল আলামীন।

]]>
http://www.quraneralo.com/borkha-ke-dosh-diben-na/feed/ 15
জান্নাতে নারীরা কেমন থাকবে? http://www.quraneralo.com/womans-in-jannah/ http://www.quraneralo.com/womans-in-jannah/#comments Thu, 08 Nov 2012 03:45:52 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=3755 লেখক : সুলাইমান ইবন সালেহ আল-খারাশী   |   অনুবাদ : আলী হাসান তৈয়ব

79

জান্নাতে নারীদের অবস্থা কী হবে, জান্নাতে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে- এ ব্যাপারে প্রায়শই আমাকে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। তাই ভাবলাম সঠিক প্রমাণ ও আলেমদের অভিমতের আলোকে এমন কয়েকটি পয়েন্ট একত্রিত করে দেই যা থেকে তারা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণায় উপনীত হতে পারবেন। চলুন আল্লাহর ওপর ভরসা করে শুরু করা যাক:

ফায়দা¬ ১

আমাদের উচিত হবে নারীরা জান্নাতে তাদের জন্য অপেক্ষমান নেকী ও নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তাদেরকে হতোদ্যম না করা। কারণ, মানব প্রকৃতি তার আগামী ও ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে পছন্দ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সাহাবা রাদিআল্লাহু আনহুমের জান্নাত ও জান্নাতের নেয়ামত সংক্রান্ত এ ধরনের প্রশ্ন শুনে অপছন্দ করেন নি। যেমন তাঁরা জিজ্ঞেস করেছেন। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

‘আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, জান্নাত সম্পর্কে আমাদের ধারণা দিন। কী দিয়ে জান্নাত নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন, ‘তার দেয়ালের একটি করে ইট সোনা দিয়ে এবং আরেকটি ইট রুপা দিয়ে নির্মিত। তার সিমেন্ট হলো উন্নত মৃগনাভী, তার প্লাস্টার ইয়াকূত ও মোতি এবং তার মাটি ওয়ারছ (নামের সুগন্ধি) ও জাফরান। যারা এতে প্রবেশ করবে তারা অমর হবে; কখনো মারা যাবে না। সুখী হবে; অসুখী হবে না। তাদের যৌবন শীর্ণ হবে না। আর তাদের কাপড় ছিন্নভিন্ন করা হবে না।’ [মুসনাদ আহমদ : ৯৭৪৪; মুসনাদ দারেমী : ২৮৬৩]

 

আরেকবার তাঁরা জিজ্ঞেস করেন, যেমনটি বর্ণিত হয়েছে আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে, তিনি বলেন,

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিজ্ঞেস করা হলো, জান্নাতে আমরা কি আমাদের স্ত্রীদের কাছে পৌঁছতে পারব? তিনি বললেন, ‘কোনো কোনো ব্যক্তি (জান্নাতে) দিনে একশত জন কুমারীর কাছে পৌঁছবে।’ [তাবরানী, আল-মু‘জামুল কাবীর : ১৩০৫]

 

ফায়দা¬ ২

মানব মন বলতেই- চাই তা নর বা নারী হোক- জান্নাত ও জান্নাতের মনোরম নেয়ামতসমূহের আলোচনা শুনতেই তা আগ্রহী ও প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। নেক আমল বাদ দিয়ে কেবল স্বপ্ন বিলাস না হলে তা উত্তম বৈ কি। কারণ আল্লাহ তা‘আলা মু‘মিনদের উদ্দেশে বলেন,

‘আর এটিই জান্নাত, নিজেদের আমলের ফলস্বরূপ তোমাদেরকে এর অধিকারী করা হয়েছে।’ [সূরা আয্-যুখরুফ, আয়াত : ৭২]

তাই দেখা যায় সাহাবায়ে কিরাম রাদিআল্লাহু আনহুম জান্নাতের বিবরণ শুনে নিজেদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর আমলের মাধ্যমে সেগুলোকে কার্যে পরিণত করেছেন।

 

ফায়দা¬ ৩

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ {সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩}

 

এ আয়াত থেকে অনুধাবিত হয় যে জান্নাতকে প্রস্তুত করা হয়েছে মুক্তাকীদের জন্য। জান্নাত ও জান্নাতের নেয়ামতসমূহ নারী বাদে কেবল পুরুষদের জন্য নয়। বরং তা উভয় শ্রেণীর মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে দ্ব্যর্থহীন করে আল্লাহ সুবহানুহু ওয়া তা‘আলা বলেন,

‘আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরবীচির আবরণ পরিমাণ যুলমও করা হবে না।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১২৪}

 

ফায়দা¬ ৪

নারীদের কর্তব্য হবে জান্নাতে প্রবেশের বিস্তারিত তথ্যানুসন্ধান আর এ সংক্রান্ত অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের তুবড়ি না ছুটানো। যেমন : জান্নাতে তাদের কী করা হবে, তারা কোথায় থাকবে ইত্যাকার প্রশ্ন। ভাবখানা এমন যে সে যেন কোনো জীবননাশা মরুতে পা রাখতে যাচ্ছে !

তার জন্য এ কথা জানাই যথেষ্ট হওয়া উচিত যে শুধু জান্নাতে প্রবেশের বদৌলতেই তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তাবৎ দুঃখ ও গ্লানী দূর হয়ে যাবে। সেসব রূপান্তরিত হবে অপার্থিব সৌভাগ্য এবং অনন্ত শান্তিতে। জান্নাত সম্পর্কে আল্লাহর এ বিবরণই তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে, যেখানে তিনি ইরশাদ করেন :

‘সেখানে তাদেরকে ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না।’ {সূরা আল-হিজর, আয়াত : ৪৮}

 

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,

‘স্বর্ণখচিত থালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, সেখানে মন যা চায় আর যাতে চোখ তৃপ্ত হয় তা-ই থাকবে এবং সেখানে তোমরা হবে স্থায়ী।’ {সূরা আয্-যুখরুফ, আয়াত : ৭১}

 

এসবের আগে তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে জান্নাতের অধিবাসীদের সম্পর্কে আল্লাহর এই বাণী, যেখানে তিনি বলেন :

‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য।’ {সূরা আল-মায়িদা, আয়াত : ১১৯}

ফায়দা¬ ৫

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেখানেই জান্নাতের নেয়ামতরাজির আলোচনা করেন, যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য পদের সুখাদ্য, অনির্বচনীয় সুন্দর দৃশ্যাবলি, সুরম্য সব আবাস এবং অনিন্দ্য বস্ত্রসামগ্রী, তার সবই নারী-পুরুষ উভয় শ্রেণীর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। পূর্বে উল্লেখিত নিয়ামতসম্ভার সবাই ভোগ করবে জান্নাতে।

বাকি থাকে কেবল এই প্রশ্ন, আল্লাহ তো পুরুষদেরকে ডাগর চোখ বিশিষ্ট হূর ও অপরূপা নারীদের কথা বলে জান্নাতের প্রতি আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত করেছেন। অথচ নারীদের প্রলুব্ধকর এমন কিছু বলেন নি। নারীরা সাধারণ এরই কারণ জানতে চান। এর জবাবে আমি বলি :

[১] প্রথমত আল্লাহর এই বাণীটি আমাদের মাথায় রাখতে হবে:

‘তিনি যা করেন সে ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা যাবে না; বরং তাদেরকেই প্রশ্ন করা হবে।’ {সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত : ২৩}

তবে শরী‘আতের সুনির্দিষ্ট উদ্ধৃতি এবং ইসলামের মূলনীতির আলোকে এর হিকমত ও তাৎপর্য অনুধাবনের মানসিকতায় কোনো দোষ নেই।

 

[২] এটা সুবিদিত যে নারী প্রকৃতি বলতেই লজ্জার ভূষণে শোভিত। এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সে নেয়ামতের বর্ণনা দিয়ে জান্নাতের প্রতি লালায়িত করেন নি যা তাদেরকে লজ্জায় আরক্ত করে।

 

[৩] এটাও সুবিদিত যে নরের প্রতি নারীর আকর্ষণ ঠিক তেমন নয় যেমন নারীর প্রতি নরের আকর্ষণ। তাই দেখা যায় আল্লাহ জান্নাতে নারীর কথা বলে পুরুষদের আগ্রহী করেছেন যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীকেও সপ্রমাণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘আমার পরে আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে ক্ষতিকর আর কিছু রেখে যাই নি।’ [বুখারী : ৫০৯৬; মুসলিম : ৭১২২]

পক্ষান্তরে পুরুষের প্রতি আকর্ষণের চেয়েও নারীদের আকর্ষণ বেশি অলংকার ও পোশাকের সৌন্দর্যের প্রতি। কারণ এটি তাদের সহজাত প্রকৃতি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘আর যে অলংকারে লালিত পালিত হয়......।’ {সূরা আয্-যুখরুফ, আয়াত : ১৮}

 

[৪] শায়খ উসাইমীন [রহ] বলেন, আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীদের কথা উল্লেখ করেছেন স্বামীদের জন্য। কারণ, স্বামীই হলন স্ত্রীর কামনাকারী এবং তার প্রতি মোহিত। এ জন্যই জান্নাতে পুরুষদের জন্য স্ত্রীদের কথা বলা হয়েছে আর নারীদের জন্য স্বামীদের ব্যাপারে নিরবতা অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু এর দাবী কিন্তু এই নয় যে তাদের স্বামী থাকবে না। বরং তাদের জন্যও আদম সন্তানদের মধ্য থেকে স্বামী থাকবে।

ফায়দা¬ ৬

দুনিয়ায় নারীদের অবস্থা নিম্নোক্ত প্রকারগুলোর বাইরে নয় :

  • ১- হয়তো সে বিয়ের আগেই মারা যাবে।
  • ২- কিংবা সে মারা যাবে তালাকের পর অন্য কারো সাথে বিয়ের আগে।
  • ৩- কিংবা সে বিবাহিতা কিন্তু –আল্লাহ রক্ষা করুন- তার স্বামী তার সঙ্গে জান্নাতে যাবে না।
  • ৪- কিংবা সে তার বিয়ের পরে মারা যায়।
  • ৫- কিংবা তার স্বামী মারা গেল আর সে আমৃত্যু বিয়ে ছাড়াই রইল।
  • ৬- কিংবা তার স্বামী মারা গেল। তারপর সে অন্য কাউকে বিয়ে করল।

 

দুনিয়াতে নারীদের এ কয়টি ধরনই হতে পারে। আর এসবের প্রত্যেকটির জন্যই জান্নাতে স্বতন্ত্র অবস্থা রয়েছে :

{১} যে নারী বিয়ের আগে মারা গেছেন আল্লাহ তাকে জান্নাতে দুনিয়ার কোনো পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। কারণ আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘কিয়ামতের দিন যে দলটি সর্বপ্রথম জন্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল; আর তৎপরবর্তী দলের চেহারা হবে আসমানে মুক্তার ন্যায় ঝলমলে নক্ষত্র সদৃশ উজ্জ্বল। তাদের প্রত্যেকের থাকবে দু’জন করে স্ত্রী, যাদের গোশতের ওপর দিয়েই তাদের পায়ের গোছার ভেতরস্থ মজ্জা দেখা যাবে। আর জান্নাতে কোনো অবিবাহিত থাকবে না।’ [মুসলিম : ৭৩২৫]

 

শায়খ উসাইমীন বলেন, যদি ইহকালে মহিলার বিয়ে না হয়ে থাকে তবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে দেবেন যা দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যাবে। কারণ, জান্নাতের নেয়ামত ও সুখসম্ভার শুধু পুরুষদের জন্য নয়। বরং তা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য বরাদ্দ। আর জান্নাতের নিয়ামতসমূহের একটি এই বিয়ে।

 

{২} তালাক প্রাপ্ত হয়ে আর বিয়ে না করে মারা যাওয়া মহিলার অবস্থাও হবে অনুরূপ।

{৩} একই অবস্থা ওই নারীর, যার স্বামী জান্নাতে প্রবেশ করেন নি। শায়খ উসাইমীন বলেন, ‘মহিলা যদি জান্নাতবাসী হন আর তিনি বিয়ে না করেন কিংবা তাঁর স্বামী জান্নাতী না হন, সে ক্ষেত্রে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করলে সেখানে অনেক পুরুষ দেখতে পাবেন যারা বিয়ে করেন নি।’ অর্থাৎ তাদের কেউ তাকে বিয়ে করবেন।

{৪} আর যে নারী বিয়ের পর মারা গেছেন জান্নাতে তিনি সেই স্বামীরই হবেন যার কাছ থেকে ইহলোক ত্যাগ করেছেন।

{৫} যে নারীর স্বামী মারা যাবে আর তিনি পরবর্তীতে আমৃত্যু বিয়ে না করবেন, জান্নাতে তিনি এ স্বামীর সঙ্গেই থাকবেন।

{৬} যে মহিলার স্বামী মারা যায় আর তিনি তার পরে অন্য কাউকে বিয়ে করেন, তাহলে তিনি যত বিয়েই করুন না কেন জান্নাতে সর্বশেষ স্বামীর সঙ্গী হবেন। কারণ, আবূ দারদা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘মহিলা তার সর্বশেষ স্বামীর জন্যই থাকবে।’ [জামে‘ ছাগীর : ৬৬৯১; আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদীস আস-সাহীহা : ৩/২৭৫]

 

হুযায়ফা রাদিআল্লাহু আনহু তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন,

‘যদি তোমাকে এ বিষয় খুশী করে যে তুমি জান্নাতে আমার স্ত্রী হিসেবে থাকবে তবে আমার পর আর বিয়ে করো না। কেননা জান্নাতে নারী তার সর্বশেষ দুনিয়ার স্বামীর সঙ্গে থাকবেন। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীদের জন্য অন্য কারো সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে জড়ানো হারাম করা হয়েছে। কেননা তাঁরা জান্নাতে তাঁরই স্ত্রী হিসেবে থাকবেন।’ [বাইহাকী, আস-সুনান আল-কুবরা : ১৩৮০৩]

 

মাস’আলা : কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেন, জানাযার দু‘আয় এসেছে আমরা যেমনটি বলে থাকি,

‘আর তার স্বামীর পরিবর্তে তাকে আরও উত্তম স্বামী দান করুন’। এর আলোকে তিনি যদি বিবাহিতা হন তাহলে আমরা কিভাবে তার জন্য এ দু‘আ করি? কারণ আমরা জানি, দুনিয়াতে তার স্বামী যিনি হবেন জান্নাতে তিনিই তার স্বামী থাকবেন? আর যদি তার বিয়ে না হয় তবে তার স্বামী কোথায়?

 

শায়খ ইবন উসাইমীনের ভাষায় এর জবাব :

যদি মহিলা বিবাহিতা না হন তবে দু‘আর উদ্দেশ্য হবে ‘তার জন্য বরাদ্দ পুরুষ’। আর যদি বিবাহিতা হন তবে তার জন্য আরও উত্তম স্বামীর উদ্দেশ্য হবে ‘দুনিয়ার স্বামীর চেয়ে গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যে উত্তম স্বামী’। কারণ, বদল দুই ধরনের।এক হলো সত্তার বদল। যেমন কেউ ছাগলের বিনিময়ে উট কিনল। দুই হলো গুণের বদল। যেমন আপনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যক্তির কুফরকে ঈমানে বদলে দিয়েছেন। এখানে কিন্তু ব্যক্তি একইজন। পরিবর্তন কেবল তার বৈশিষ্ট্যে। আল্লাহ তা‘আলার বাণীতেও আমরা দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। ইরশাদ হচ্ছে : 

‘যেদিন এ যমীন ভিন্ন যমীনে রূপান্তরিত হবে এবং আসমানসমূহও। আর তারা পরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে হাযির হবে।’ {সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ৪৮}

আয়াতে উল্লেখিত যমীন বা ভূমি কিন্তু একই থাকবে। তবে তা কেবল প্রলম্বিত হয়ে যাবে। তেমনি আসমানও থাকবে সেটিই কিন্তু তা বিদীর্ণ হয়ে যাবে।

ফায়দা¬ ৭

আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার ঈদের সালাতে খুতবায় নারীদের উদ্দেশে বলেন,

‘হে নারী সম্প্রদায়, তোমরা বেশি বেশি সদকা করো। কেননা, আমি জাহান্নামের অধিবাসী বেশি তোমাদের দেখেছি।’ মহিলারা বললেন, কেন হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ‘তোমরা অধিকহারে অভিশাপ দাও এবং স্বামীর অকৃজ্ঞতা দেখাও। বুদ্ধিমান পুরুষকে নির্বুদ্ধি বানাতে অল্প বুদ্ধি ও খাটো দীনদারির আর কাউকে তোমাদের চেয়ে অধিক পটু দেখিনি।’ তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের জ্ঞান ও দীনদারির ঘাটতি কী? তিনি বললেন, ‘মহিলাদের সাক্ষী কি পুরুষদের সাক্ষীর অর্ধেক নয়?’ তাঁরা বললেন, জী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘এটিই তাদের জ্ঞানের অল্পতা। যখন তাদের মাসিক শুরু হয় তখন কি তারা সালাত ও সাওম (রোজা) বাদ দেয় না?’ তাঁরা বললেন, জী, হ্যাঁ। তিনি বললেন, ‘এটিই তাদের দীনদারিতে স্বল্পতা।’ [বুখারী : ৩০৪]

 

আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, ইমরান ইবন হুসাইন রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

‘জান্নাতের সবচে কম অধিবাসী হবে নারী।’ [মুসলিম : ৭১১৮; মুসনাদ আহমদ : ১৯৮৫০]

 

অন্যদিকে আরেক সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে জান্নাতে দুনিয়াবাসীর স্ত্রী হবে তার দুনিয়ার স্ত্রী থেকে দু’জন।

 

যেমন ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার কাছে আমর নাকেদ ও ইয়াকূব ইবন ইবরাহীম দাওরাকী ইবন উলাইয়া থেকে বর্ণনা করেন, আর শব্দগুলো ইয়াকূবের। উভয়ে বলেন, আমাদের কাছে ইসমাঈল ইবন উলাইয়া বর্ণনা করেন,

আমাদেরকে আইয়ূব মুহাম্মদ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, জান্নাতে পুরুষ না নারীর সংখ্যা বেশি হবে তা নিয়ে তারা পরস্পর গর্ব বা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, আবুল কাসেম (রাসূলুল্লাহ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেন নি, ‘কিয়ামতের দিন যে দলটি সর্বপ্রথম জন্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল; আর তৎপরবর্তী দলের চেহারা হবে আসমানে মুক্তার ন্যায় ঝলমলে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল। তাদের প্রত্যেকের থাকবে দু’জন করে স্ত্রী যাদের গোশতের ওপর দিয়েই তাদের পায়ের গোছার ভেতরস্থ মজ্জা দেখা যাবে। আর জান্নাতে কোনো অবিবাহিত থাকবে না।’ [মুসলিম : ৭৩২৫]

 

ইমাম মুসলিম রহ. আরও বলেন, আমার কাছে ইবন আবী উমর বর্ণনা করেন, তাঁর কাছে সুফইয়ান আর সুফইয়ান ইবন সীরীন থেকে বর্ণনা করেন, পুরুষ ও নারীদের মধ্যে কারা বেশি জান্নাতী হবে এ নিয়ে নারী ও পুরুষদের মধ্যে তর্ক শুরু হলো। তারা আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলেন। তিনি তাঁদের উদ্দেশে বললেন, আবুল কাসেম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,..। অতপর তিনি ইবন উয়াইনা বর্ণিত (পূর্বোক্ত) বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেন।

 

 এ কারণে আলিমগণ এই হাদীসগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে নানা মত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ নারীরা কি অধিকাংশে জান্নাতে নাকি জাহান্নামে যাবে? জান্নাতে নারীর সংখ্যা বেশি হবে না জাহান্নামে?

কোনো কোনো আলিম বলেছেন, নারীরা অধিকাংশ জান্নাতবাসী হবে। আবার জাহান্নামের অধিবাসীর অধিকাংশও হবে নারী। কেননা কাযী ‘ইয়ায রহ. বলেন, আদম সন্তানের মধ্যে অধিকাংশই নারী।

অনেকে বলেছেন,পূর্বোক্ত হাদীসগুলোর ভিত্তিতে বুঝা যায়, জাহান্নামের অধিবাসীদের সিংহভাগহই হবেন নারী। তেমনি ‘ডাগর চোখবিশিষ্ট হূর’দের যোগ করলে জান্নাতের অধিকাংশ অধিবাসীও হবেন নারী।

অন্য আরেকদল আলিম বলেছেন, হ্যাঁ শুরুতে নারীরাই হবেন জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। পরবর্তীতে মুসলিম নারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর জান্নাতে তারাই হবেন সংখ্যাগুরু।

 

‘হে নারী সম্প্রদায়, তোমরা বেশি বেশি সদকা করো। কেননা, আমি তোমাদের বেশি জাহান্নামের অধিবাসী দেখেছি।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণীর ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী রহ. বলেন,

‘হতে পারে জাহান্নামে নারীদের সংখ্যা বেশি হবার বিষয়টি তারা জান্নাতে প্রবেশের আগের কথা। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলনেওয়ালা সবাই সুপারিশ লাভ ও আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির পর জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করলে জান্নাতে নারীর সংখ্যাই হবে বেশি।’

 

সারকথা, নারীদের প্রত্যাশা ও আত্মবিশ্বাস রাখা উচিত যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবেন না।

 

ফায়দা¬ ৮

নারীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আল্লাহ তাঁদের যৌবন ফিরিয়ে দেবেন। আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

একবার এক আনছারী বৃদ্ধা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কাছে দু‘আ করেন তিনি যেন আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘জান্নাতে তো কোনো বৃদ্ধ মানুষ প্রবেশ করবে না।’ এ কথা শুনে বৃদ্ধা বড় কষ্ট পেলেন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ যখন তাদের (বৃদ্ধদের) জান্নাতে দাখিল করাবেন, তিনি তাদের কুমারীতে রূপান্তরিত করে দেবেন।’ [তাবরানী, আল-মু‘জামুল ওয়াছিত : ৫৫৪৫]

 

ফায়দা¬ ৯

কোনো কোনো সাহাবীর উক্তি থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর ইবাদতের অনুপাতে দুনিয়ার স্ত্রীগণ জান্নাতে ডাগরচোখা হূরদের চেয়েও দেখতে অনেক সুন্দরী হবে।

ফায়দা¬ ১০

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, জান্নাতে প্রত্যেক অধিবাসীর জন্য অন্যের স্ত্রীদের কাছে ঘেঁষাও নিষিদ্ধ থাকবে।

শেষ কথা হলো, হে নারী সম্প্রদায়, এ জান্নাতকে আপনাদের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে যেমন একে সুসজ্জিত করা হয়েছে পুরুষদের জন্য। আল্লাহ বলেন,

‘নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে বাগ-বাগিচা ও ঝর্ণাধারার মধ্যে। যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতির নিকটে।’ {সূরা আল-কামার, আয়াত : ৫৫}

অতএব হেলায় সুযোগ হারাবেন না। কারণ, এ নশ্বর জীবন আর কয় দিনের? এটা তো দেখতে দেখতেই বয়ে যাবে। আর এরপর অবশিষ্ট থাকবে কেবল অনন্ত জীবন। সুতরাং জান্নাতের চিরস্থায়ী বাসিন্দা হবার চেষ্টা করুন। আর জেনে রাখুন, অতিরিক্ত কল্পনা ও প্রত্যাশা নয়; জান্নাতের মোহরানা হলো ঈমান ও নেক আমল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীটি সর্বদা মনে রাখবেন। তিনি বলেন,

‘যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, রমযানের সিয়াম পালন করে, আপন সতীত্ব রক্ষা করে এবং স্বামীর আনুগত্য করে, তাকে বলা হবে, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে জান্নাতে প্রবেশ কর।’ [মুসনাদ আহমাদ : ১৬৬১]

আপনাদেরকে সকল বিশৃঙ্খলাকারী ও বিনাশকারীদের আহ্বান সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। যারা চায় আপনাদের ক্ষতি করতে। আপনাদের অশ্লীল বানাতে। যাদের লক্ষ্য জান্নাতের নিয়ামত লাভে ধন্য হওয়া থেকে আপনাদের বিচ্যুত করা। এসব তথাকথিত স্বাধীন নারী ও পুরুষ, লেখক-লেখিকা এবং টিভি চ্যানেলের লোকদের চাকচিক্য ও শ্লোগানে প্রতারিত হবেন না। কারণ তারা হলো আল্লাহ যেমন বলেন,

‘তারা কামনা করে, যদি তোমরা কুফরী করতে যেভাবে তারা কুফরী করেছে। অতঃপর তোমরা সমান হয়ে যেতে।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ৮৯}

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন মুসলিম নারীদেরকে জান্নাতুন নাঈম দানে কামিয়াব করুন। আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াতের পথের পথিক ও পথিকৃত বানিয়ে দেন এবং তাদের কাছ থেকে নারীর শত্রু ও ধ্বংসকারী নারী ও পুরুষ শয়তানকে দূরে সরিয়ে দেন। সবশেষে আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মদ, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর ওপর শান্তি বর্ষণ করুন। আমীন।

 

ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবন গাফফার

 

]]>
http://www.quraneralo.com/womans-in-jannah/feed/ 11
প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা একান্ত কর্তব্য-১ http://www.quraneralo.com/every-muslim-must-know/ http://www.quraneralo.com/every-muslim-must-know/#comments Tue, 09 Oct 2012 00:28:58 +0000 QuranerAlo Editor http://www.quraneralo.com/?p=1593

পর্ব - ১

  • সংকলন : আব্দুল্লাহ আল কারআবী
  • অনুবাদক : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
  • সম্পাদক : মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী
  • প্রকাশনায় : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

তিনটি মূলনীতি

যা জানা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর একান্ত কর্তব্য
মূলনীতিগুলো হলো : প্রত্যেকে

  • ১) রব বা পালন কর্তা সম্পর্কে জানা।
  • ২) দীন সম্পর্কে জানা।
  • ৩) নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানা।

রব কে জানার পদ্ধতি :

যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব বা পালনকর্তা কে?

তখন উত্তরে বলবে: আমার রব হলেন আল্লাহ, যিনি আমাকে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতকে তার অনুগ্রহে লালন করছেন, তিনিই আমার একমাত্র উপাস্য, তিনি ব্যতীত আমার অপর কোন মা’বুদ বা উপাস্য নেই।

দ্বীন জানার পদ্ধতি:

যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার  

দ্বীনকী?

উত্তরে বল : আমার দীন হলো ইসলাম, যার মানে— আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নিয়ে সম্পূর্ণভাবে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা, তাঁর নির্দেশ অনুসরণের মাধ্যমে স্বীকার করা, এবং আল্লাহর ইবাদতে অন্য কিছুর অংশীদারিত্ব করা থেকে মুক্ত থাকা এবং যারা তা করে, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানার পদ্ধতি:

যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয় তোমার নবী কে?

উত্তরে বল, তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যার পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং দাদার নাম আবদুল মোত্তালিব, প্রপিতামহের নাম হাশিম। আর হাশিম কোরাইশ গোত্রের, কোরাইশগণ আরব— যারা ইব্রাহিম আলাইহিস্‌সালামের পুত্র ইসমাইল আলাইহিস্‌সালামের বংশধর।

দ্বীন এর বুনিয়াদ বা ভিত্তি

দ্বীন এর বুনিয়াদ বা ভিত্তি দুটি বিষয়ের উপর :

  • এক : আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক না করে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের নির্দেশ দেয়া, এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করা, যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা, এবং যারা তা ত্যাগ করে তাদেরকে কাফির মনে করা।
  • দুই : আল্লাহর ইবাদাতে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা থেকে সাবধান করা, এ ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করা, এবং যারা তাঁর সাথে শির্ক করে তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা এবং যারা শির্ক করবে তাদেরকে কাফির মনে করা।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (কালেমা তাইয়েবা) মেনে চলার শর্তাবলী

  • এক : কালেমা তাইয়েবার অর্থ জানা।
    অর্থাৎ এ কালেমার দুটো অংশ রয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে জানা।
    সে দুটো অংশ হলো:

    • কোন হক মা’বুদ নেই
    • আল্লাহ ছাড়া (অর্থাৎ তিনিই শুধু মা’বুদ)
  • দুই : কালেমা তাইয়েবার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ সর্ব-প্রকার সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকা।
  • তিন : কালেমার উপর এমন একাগ্রতা ও নিষ্ঠা রাখা, যা সর্বপ্রকার শিরকের পরিপন্থী।
  • চার : কালেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা, যাতে কোন প্রকার মিথ্যা বা কপটতা না থাকে।
  • পাঁচ : এ কালেমার প্রতি ভালবাসা পোষণ এবং কালেমার অর্থকে মনে প্রাণে মেনে নেয়া ও তাতে খুশী হওয়া।
  • ছয় : এই কালেমার অর্পিত দায়িত্ব সমূহ মেনে নেয়া অর্থাৎ এই কালেমা কর্তৃক আরোপিত ওয়াজিব কাজসমূহ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই সন্তুষ্টির নিমিত্তে সমাধা করা।
  • সাত : মনে-প্রাণে এই কালেমাকে গ্রহণ করা যাতে কখনো বিরোধিতা করা না হয়।

কালেমা তাইয়েবার যে সমস্ত শর্ত বর্ণিত হলো, তার সমর্থনে কোরআন ও হাদিস থেকে দলিল প্রমাণাদি:

প্রথম শর্ত:

কালেমার অর্থ জানা। এর দলিল :
আল্লাহর বাণী:

فَاعْلَمْ أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ

“জেনে রাখুন নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা‘বুদ নেই।” [সূরা মুহাম্মাদ: ১৯]।

আল্লাহ আরও বলেন:

إِلَّا مَنْ شَهِدَ بِالْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

“তবে যারা হক (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) এর সাক্ষ্য দিবে এমনভাবে যে, তারা তা জেনে শুনেই দিচ্ছে অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।” [সূরা আয-যুখরুফ: ৮৬]

এখানে জেনে শুনে সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হলো তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে তাদের অন্তর তা সম্যকভাবে জানে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মারা যায় যে সে জানে আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই সে জান্নাতে যাবে।”

দ্বিতীয় শর্ত :

কালেমার উপর বিশ্বাসী হওয়া। এর প্রমাণাদি:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“নিশ্চয়ই মুমিন ওরাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর এতে কোন সন্দেহ-সংশয়ে পড়ে নি এবং তাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী।” [সুরা আল-হুজুরাত: ১৫]

এ আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান যথাযথভাবে হওয়ার জন্য সন্দেহ-সংশয়মুক্ত হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, অর্থাৎ তারা সন্দেহ করে নি। কিন্তু যে সন্দেহ করবে সে মুনাফিক, ভণ্ড (কপট বিশ্বাসী)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ বা উপাস্য নেই, আর আমি আল্লাহর রাসূল। যে বান্দা এ দুটো বিষয়ে সন্দেহ-সংশয়মুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”

আর এক বর্ণনায় এসেছে :

“কোন ব্যক্তি এ দুটি নিয়ে সন্দেহহীন অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে জান্নাতে যাওয়ার পথে তার কোন বাধা থাকবে না।”

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে অপর এক হাদিসের বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছিলেন:

“তুমি এ বাগানের পিছনে এমন যাকেই পাও, যে মনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস এর সাথে এ-সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ নেই— তাকেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবে।”

তৃতীয় শর্ত :

এ কালেমাকে ইখলাস বা নিষ্ঠা সহকারে স্বীকার করা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“তবে জেনে রাখ দ্বীন খালেস সহকারে বা নিষ্ঠা সহকারে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই।” [সূরা আয্‌-যুমার: ৩]

আল্লাহ আরও বলেন:

“তাদেরকে এ নির্দেশই শুধু প্রদান করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের দীনকে আল্লাহর জন্যই খালেস করে সম্পূর্ণরূপে একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়ে তাঁরই ইবাদাত করবে।” [সূরা আল-বাইয়েনাহ: ৫]

হাদিস শরিফে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তিই বেশি সৌভাগ্যবান হবে যে অন্তর থেকে একনিষ্ঠভাবে বলেছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার উপাস্য নেই।”

অপর এক সহিহ হাদিসে সাহাবি উত্‌বান ইব্‌ন মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

“যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে لا إله إلا الله বা আল্লাহ ছাড়া হক কোন মা’বুদ নেই বলেছে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।”

ইমাম নাসায়ি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “দিন-রাত্রির যিক্‌র” নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মনের নিষ্ঠা সহকারে এবং মুখে সত্য জেনে নিম্নোক্ত কলেমাসমূাহ বলবে আল্লাহ সেগুলোর জন্য আকাশকে বিদীর্ণ করবেন যাতে তার দ্বারা জমিনের মাঝে কে এই কালেমাগুলি বলেছে তার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আর যার দিকে আল্লাহর নজর পড়বে তার প্রার্থিত ও কাঙ্ক্ষিত বস্তু তাকে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব। সে কালেমাগুলি হলো:

لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير

অর্থাৎ :

“শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া হক কোন মা’বুদ নেই, তার কোন শরিক বা অংশীদার নেই, তার জন্যই সমস্ত রাজত্ব বা একচ্ছত্র মালিকানা, তার জন্যই সমস্ত প্রশংসা আর তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান”।

চতুর্থ শর্ত :

কলেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আলিফ-লাম-মীম, মানুষ কি ধারণা করেছে যে, ঈমান এনেছি বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি যাতে আল্লাহর সাথে যারা সত্য বলেছে তাদেরকে স্পষ্ট করে দেন এবং যারা মিথ্যা বলেছে তাদেরকেও স্পষ্ট করে দেন।” [সূরা আল-আনকাবুত: ১-৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন :

“মানুষের মাঝে কেউ কেউ বলে আমরা আল্লাহ এবং পরকালের উপর ঈমান এনেছি, অথচ তারা ইমানদার নয়। তারা (তাদের ধারণামতে) আল্লাহ ও ইমানদারদের সাথে প্রতারণা করছে, অথচ (তারা জানে না) তারা কেবল তাদের আত্মাকেই প্রতারিত করছে কিন্তু তারা তা বুঝতেই পারছে না। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি, ফলে আল্লাহ সে ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর মিথ্যা বলার কারণে তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।” [সূরা আল-বাকারা: ৮-১০]

তেমনিভাবে হাদিস শরিফে মু‘আয ইব্‌ন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যেকোনো লোক মন থেকে সত্য জেনে এ-সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত হক কোন মা’বুদ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।”

পঞ্চম শর্ত :

এ কালেমাকে মনে প্রাণে ভালবাসা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

“কোনো কোনো লোক আল্লাহ ছাড়া তার অনেক সমকক্ষ ও অংশীদার গ্রহণ করে তাদেরকে আল্লাহর মত ভালবাসে, আর যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে অত্যন্ত বেশি ভালবাসে”। [সূরা আল-বাকারা: ১৬৫]

আল্লাহ আরও বলেন:

“হে ইমানদারগণ তোমাদের থেকে যদি কেহ তার দ্বীনকে পরিত্যাগ করে তবে আল্লাহ এমন এক গোষ্ঠীকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করে আনবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসেন, যারা মুমিনদের প্রতি নরম— দয়াপরবশ, কাফেরদের উপর কঠোরতা অবলম্বনকারী; তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না।” [সূরা আল মায়েদা: ৫৪]

তেমনিভাবে হাদিস শরিফে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যার মধ্যে তিনটি বস্তুর সমাহার ঘটেছে সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে: (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত বা ভালবাসা অন্য সব-কিছু থেকে বেশি হবে। (দুই) কোনো লোককে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসবে। (তিন) কুফরি থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেয়ার পর সে কুফরির দিকে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করবে।”

ষষ্ঠ শর্ত:

কালেমার হকসমূহ মনে প্রাণে মেনে নেয়া। এর দলীল:
আল্লাহর বাণী:

“আর তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে ফিরে যাও, এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো।” [সূরা আয্‌-যুমার: ৫৪]

আল্লাহ আরও বলেন:

“আর তারচেয়ে কার দ্বীন বেশী সুন্দর যে আল্লাহর জন্য নিজেকে সমর্পণ করেছে, এমতাবস্থায় যে, সে মুহসিন”, [সূরা আন্‌-নিসা: ১২৫] মুহসিন অর্থ: নেককার, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করেছে।

আরও বলেন:

“আর যে নিজেকে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করেছে আর সে মুহসিন”, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করেছে, “সে মজবুত রশিকে আঁকড়ে ধরেছে” [সূরা লুকমান: ২২] অর্থাৎ: لا إله إلا الله বা আল্লাহ ছাড়া কোন হক মাবুদ নেই এ কালেমাকেই সে গ্রহণ করেছে।
আরও বলেন: “তারা যা বলছে তা নয়, তোমার প্রভুর শপথ করে বলছি, তারা কক্ষনো ইমানদার হবে না যতক্ষণ আপনাকে তাদের মধ্যকার ঝগড়ার নিষ্পত্তিকারক (বিচারক) হিসাবে না মানবে, অতঃপর আপনার বিচার-ফয়সালা গ্রহণ করে নিতে তাদের অন্তরে কোন প্রকার অভিযোগ থাকবে না এবং তারা তা সম্পূর্ণ কায়মনোবাক্যে নির্দ্বিধায় মেনে নিবে।” [সূরা আন্‌-নিসা: ৬৫]

অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমাদের মাঝে কেউই ঐ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবেনা যতক্ষণ তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসারী হবে।” আর এটাই পূর্ণ আনুগত্য ও তার শেষ সীমা।

সপ্তম শর্ত:

কালেমাকে গ্রহণ করা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আর এমনিভাবে যখনই আপনার পূর্বে আমি কোন জনপদে ভয় প্রদর্শনকারী (রাসূল বা নবী) প্রেরণ করেছি তখনি তাদের মধ্যকার আয়েশি বিত্তশালী লোকেরা বলেছে: আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে একটি ব্যবস্থায় পেয়েছি, আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবো। (ভয় প্রদর্শনকারী) বলল: আমি যদি তোমাদের কাছে বাপ-দাদাদেরকে যার উপর পেয়েছ তার থেকে অধিক সঠিক বা বেশি হেদায়েত নিয়ে এসে থাকি তারপরও (তোমরা তোমাদের বাপ-দাদার অনুকরণ করবে)? তারা বলল: তোমরা যা নিয়ে এসেছ আমরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছি, ফলে আমি (আল্লাহ) তাদের থেকে (এ কুফরির) প্রতিশোধ নেই, সুতরাং আপনি মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম-ফল কেমন হয়েছে দেখে নিন।” [সূরা আয্‌-যুখরুফ: ২৩-২৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:

“নিশ্চয়ই তারা অযথা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত যখন তাদেরকে বলা হত যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা’বুদ নেই, এবং বলতো: আমরা কি পাগল কবির কথা শুনে আমাদের উপাস্য দেবতাগুলোকে ত্যাগ করবো?” [সূরা আস্‌-সাফ্‌ফাত: ৩৫-৩৭]

অনুরূপভাবে হাদিসে শরিফে আবু মুসা আশ‘আরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হচ্ছে এমন মুষলধারার বৃষ্টির মতো যা ভূমিতে এসে পড়েছে, ফলে এর কিছু অংশ এমন উর্বর পরিষ্কার ভূমিতে পড়েছে যে ভূমি পানি চুষে নিতে সক্ষম, ফলে তা পানি গ্রহণ করেছে এবং তা দ্বারা ফসল ও তৃণলতার উৎপত্তি হয়েছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে গর্তওয়ালা ভূমিতে (যা পানি আটকে রাখতে সক্ষম) সুতরাং তা পানি সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে আল্লাহ এর দ্বারা মানুষের উপকার করেছেন তারা তা পান করেছে, ভূমি সিক্ত করিয়েছে এবং ফসলাদি উৎপন্ন করতে পেরেছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে এমন অনুর্বর সমতল ভূমিতে যাতে পানি আটকে থাকে না, ফলে তাতে পানি আটকা পড়ে নি, ফসলও হয় নি। ঠিক এটাই হলো ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দীনকে বুঝতে পেরেছে এবং আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হতে পেরেছে, ফলে সে নিজে জেনেছে এবং অপরকে জানিয়েছে (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ভূমি) এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে এই হিদায়েত এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের দিকে মাথা উঁচু করে তাকায় নি, ফলে আল্লাহ যে হিদায়েত নিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন তা গ্রহণ করেনি। (তৃতীয় শ্রেণির ভূমি)।”

 

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা একান্ত কর্তব্য- ২

]]>
http://www.quraneralo.com/every-muslim-must-know/feed/ 7