ইসলামে ‘তাকওয়া’র স্বরূপ ও সমাজ জীবনে এর প্রভাব~ পর্ব~ ২


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লিখেছেনঃ ড. মোঃ ছানাউল্লাহ    ।    ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার

পর্ব~ ১ | পর্ব~ ২ | পর্ব~ ৩

172

এখানে আরও তিনটি আয়াত উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেখানে হারাম কাজের বিবরণ দিয়ে তা অনুধাবন করতে, স্মরণ করতে সর্বোপরি তা থেকে মুক্ত থাকতে বলা হয়েছে।

আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, “হে নবী ! আপনি বলুন, এসো, আমি তোমাদেরকে ঐ সব বিষয় পাঠ করে শুনাই, যেগুলো তোমাদের প্রভূ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন। সেগুলো হল, আলল্লাহর সাথে অংশীদার করবে না, পিতা-মাতার সাথে সদয় ব্যবহার করবে অর্থাৎ তাদের অবাধ্য হবে না, নিজেদের সন্তানদেরকে দারিদ্রের কারণে হত্যা করবে না, আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে আহার দেই। অশ্লীলতার কাছেও যাবে না, তা প্রকাশ্যেই হোক বা গোপেনে; যাকে হত্যা করা আল্লাহ্ হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করবে না; কিন্তু ন্যায়ভাবে। তিনি তোমাদরকে এ নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর-বুঝতে পার। ইয়াতিমরা বয়ো:প্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত উত্তম পন্থা ব্যতীত তাদের সম্পদের কাছেও যাবে না। ন্যায়ের সাথে ওজন ও মাপ পূর্ণ করবে কম-বেশী করবেনা। আমি কাউকে সাধ্যাতীত দায়িত্ব চাপিয়ে দেই না। আর যখন তোমরা কথা বলবে-বিচার করবে-হুকুম দিবে, তখন সুবিচার করবে যদিও সে আত্মীয় হয়। আল্লাহ্‌র অঙ্গীকার পূর্ণ করবে-কখনও তা ভঙ্গ করবে না। তিনি তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। আর অবশ্যই এটি আমার সঠিক পথ। অতএব তোমরা এ পথ অনুসরণ করবে ,মেনে চলবে এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করবে না; তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর (আল্লাহর) পথ থেকে বিচ্চিন্ন করে দিবে। তিনি তোমদেরকে এ নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন কর-সংযত হও।[56]

ওজনে ও মাপে ক্রটি করাকে কুরআনে ‘তাতফীফ’ বলা হয়েছে। বলা হয়েছে,

“ধ্বংস অনিবার্য তাতফীফকারীদের জন্য; যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয় তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় বা ওজন করে দেয় তখন কম করে দেয়।[57]

‘তাতফীফ’ শুধু ওজন করার সময় কম-বেশী করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,; বরং অন্যের প্রাপ্যে ক্রটি করাও ‘তাতফীফ’ এর অন্তুর্ভূক্ত। ইমাম মালেক (র) তাঁর মুআত্তা গ্রন্থে হযরত ওমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তিকে নামাজের আরকানে (নামাজের মধ্যে রুকু-সিজদাসহ অবশ্য পালনীয় বিষয়সমূহে) ক্রটি করতে দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি তাতফীফ করেছ’ অর্থাৎ যথার্থরূপে নামায আদায় করনি।

এ ঘটনা বর্ণনা করে ইমাম মালেক (র) বলেন, প্রাপ্য পুরোপুরি আদায় করা ও ক্রটি করা প্রত্যেক বিষয়ের মধ্যেই হয়ে থাকে শুধু ওজন ও মাপের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ নয়।’ এতে বুঝা যায় যে, যে ব্যক্তি নিজের দায়িত্ব কর্তব্য পূর্ণাঙ্গভাবে আদায় করে না, নির্ধারিত সময়ে কাজ না করে অযথা সময় নষ্ট করে বা অফিসের সময় অপচয় করে বা কাজে ফাঁকি দেয়, ক্রটি করে, সে-ও উপরিউক্ত আয়াতে বর্ণিত শাস্তির অন্তর্ভূক্ত হবে। সে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হোক বা সাধারণ কর্মচারী হোক, দিনমজুর হোক বা কোটিপতি হোক কিংবা ধর্মীয় কোন প্রতিষ্ঠানের কাজে নিয়োজিত হোক না কেন [58]।

এছাড়া কবীরা গুনাহ হিসাবে নির্ধারিত জঘন্য অপরধসমূহ থেকেও মুত্তাকীগণ অবশ্যই দূরে থাকেন। “ ইবনু ওমর (রা) থেকে কবীরা গুনাহর সংখ্যা সাতটি বলে বর্ণনা রয়েছে। সেগুলো হল,

[১] আল্লাহ্‌র সাথে শরীক করা,  [২] মু’মিন ব্যক্তিকে হত্যা করা,  [৩] সতি-সাধ্বী নারীকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া, [৪] যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা,  [৫] ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা,  [৬] মুসলিম পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, [৭] হেরেম শরীফে ইলহাদ-কুফরী করা।  এর সাথে আবূ হুরায়রা (রা) ‘সুদ’-কে অন্তর্ভূক্ত করেন।

আলী (রা) চুরি ও মদ্যপানকে কবীরা গুনাহ হিসাবে সংযোজন করেছেন। মুসলিম পন্ডিতগণের কেউ কেউ ব্যভিচার, লাওয়াতাত-পায়ূকাম, যাদু, মিথ্যা সাক্ষ্য দান, মিথ্যা শপথ করা, হাইজ্যাক-ডাকাতি ও পরনিন্দা-পরচর্চাকেও কবীরা গুণাহের অন্তুর্ভূক্ত করেছেন। এ দু’টি তথা কবীরা ও সগীরা গুনাহ তুলনামূলকভাবে নির্নয় করার মত বিষয়। সুতরাং প্রত্যেকটি গুনাহ তার নীচের তুলনায় কবীরা এবং তার উপরের সগীরা বলে সাব্যস্ত হবে।[59]”     বাহ্যিক লজ্জা নিবারণ দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও গরম-ঠাণ্ডা থেকে মুক্ত থাকার জন্য যেমন পোশাক-পরিচ্ছদের প্রয়োজন তেমনি মানুষের সুকুমার বৃত্তি ও চরিত্রের সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য তাকওয়া প্রয়োজন। তাকওয়ার পোশাক সকল কুপ্রবৃত্তি ও দুষ্কৃতি থেকে মানুষকে সর্বোতভাবে রক্ষা করে। আর এ কারণেই এটিকে বাহ্যিক পোশাকের চেয়ে উওম পোশাক বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে,

“আর তাকওয়ার পোশাকই হল শ্রেষ্ঠ-উত্তম।[60]

তাকওয়ার পোশাকের ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন আল রাযী (র) বেলন,

“তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে ইবনু আব্বাস (রা)-এর মতে সৎকর্ম, উরওয়া ইবনু যুবাইর (রা)-এর মতে মহান আল্লাহর ভয়, হাসান (রা)-এর মতে লজ্জা, ক্বাতাদাহ ও সুদ্দী (র)-এর মতে ঈমান, ইবনু যায়েদের মতে যুদ্ধের পোশাক, যা দিয়ে শক্রর আঘাত থেকে বাঁচা যায়। শেষোক্ত মতটি আবূ মুসলিম (র) গ্রহণ করেছেন। অথবা তাকওয়ার পোশাক হচ্ছে হচ্ছে হজ্জের পোশাক এবং বিনয়ের পোশাক। যেমন পশম বা তুলা দিয়ে তৈরি মোটা পোমাক। এটি জুবাইর (র) গ্রহন করেছেন।[61]

এখানে ইবনু আব্বাস (রা)-এর ব্যাখ্যাটি বেশি যুক্তিযুক্ত ও গ্রতিয়মান হয় [62]

জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র)ও ‘তাকওয়ার পোশাক’-এর ব্যাখ্যা ‘সৎকর্ম, যা তোমাদেরকে দোযখের শাস্তি থেকে রক্ষা করবে’ বলে ব্যক্ত করেছেন [63]

অর্থাৎ দেহের সুরক্ষা ও সৌন্দর্যের জন্য যেমন বাহ্যিক পোশাক পরিচ্ছদের ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন, তেমনি মানুষের কর্মকান্ডের শুদ্ধতা, আচার-আচরনের যথার্থতা ও মাধুর্য রক্ষায় তাকওয়ার অনুশীলন অপরিহার্য।

তাকওয়া ও মুত্তাকী শব্দের বিপরীতে পবিত্র কুরআনে যেসব শব্দের ব্যবহার রয়েছে সেগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলেও তাকওয়ার স্বরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাকওয়া শব্দের বিপরীতে ব্যবহৃত শব্দগুলো হলো:   (ক) কুফর: ‘কুফর’ অর্থ হচ্ছে আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা, তাঁকে স্বীকার না করা; কুরআন ও হাদীসের অকাট্য প্রমাণ দ্বারা যেসব বিষয় বিশ্বাস করা ও পালন করা ফরয-অবশ্য পালনীয়রূপে নির্ধারিত, এর যে কোন একটি বা সবগুলোকে অবিশ্বাস ও অস্বীকার করাকে কুফর বল হয়। আর অবিশ্বাসী ও অস্বীকারকারীদেরকে ‘কাফির’ বলা হয়। কাফির ও মুত্তাকী উভয়ের পরিণীত উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

“কাফিরদেরকে জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে…. এর বিপরীতে বলা হয়েছে ‘যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত-তাকওয়া অবলম্বনে জীবন যাপন করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হব।[64]

(খ) উদ্‌ওয়ান: এর অর্থ হল সীমালঙ্ঘন, বাড়াবাড়ী , সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না।[65]

(গ) ফুজূরফুজ্জার’: অন্যায়, অনাচার, পাপাচার ও দুষ্কর্মকে ‘ফুজুর’ বলা হয় এবং এসব অন্যায়ে লিপ্ত ব্যক্তিকে ‘ফুজ্জার’ বলা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“অতপর তাকে (নফ্সকে) অসৎকর্ম (ফুজুর) ও সৎকর্মের (তাকওয়া) জ্ঞান দান করেছেন। ” “ আমি কি মুত্তাকীগণকে অপরাধীদের সমান গণ্য করব?”[66]

(ঘ) বাখিল’: ‘বাখিলা’ শব্দটি বখীল থেকে ক্রিয়াবাচক শব্দ। এর অর্থ কৃপণ। আল্লাহর দেয়া সম্পদে ইসলাম নির্ধারিত মানুষের অধিকার তথা যাকাতসহ অন্যান্য প্রাপ্য যে ঠিকমত আদায় করে না, তাকে বখীল বা কৃপণ বলা হয়। যারা মুত্তাকী তারা যথাযথভাবে সম্পদ ব্যয় করে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,

“সুতরাং কেউ দান করলে, মুত্তাকী হলে এবং যা উত্তম তা গ্রহণ কররে আমি তার জন্য সুগম করে দেব সহজ পথ। আর কেউ কার্পন্য করলে, নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করলে এবং যা উত্তম তা বর্জন করলে, তার জন্য আমি সুগম করে দিব কঠোর পরিণামের পথ [67]

(ঙ) আমক্বা’: আমক্বা’ অর্থ বদনসীব বা হতভাগ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“এতে (লেলিহান অগ্নিতে) প্রবেশ করবে সে-ই, যে নিতান্ত হতভাগ্য-যে অস্বীকার করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়; আর সেখান থেকে অনেক দুরে রাখা হবে পরম মুত্তাকীকে-যে স্বীয় সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য।[68]

(চ) মুজরিম’: ‘মুজরিম’ অর্থ পাপী বা অপরাধী। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

“যে দিন দয়াময়ের নিকট মুত্তাকীগণকে সম্মাণিত মেহমানরূপে সমবেত করব এবং অপরাধীদেরকে তৃঞ্চাতুর অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাব।[69]

(ছ) যালিম’: ‘যালিম’ অর্থ অত্যাচারী বা নির্যাতনকারী। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

“পরে আমি মুত্তাকীগণকে উদ্দার করব এবং যালিমদেরকে সেখানে নতজানু অবস্থায় রেখে দিব।[70]

মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টিতে তাকওয়া ও মুত্তাকী

[১] আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) বলেন,

“তাকওয়া হচ্ছে পাপ কাজে জড়িয়ে থাকাকে ছেড়ে দেয়া এবং সৎকাজে প্রতারিত হওয়াকে ছেড়ে দেয়া [71]।”

কুরআনের বাণীঃ

“হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের প্রভূর ইবাদত কর, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার [72]।”

এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আল্লামা কাযী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী (র) বেলন,

“এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর পথের পথিকদের সর্বশেষ স্তর। আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে কেবল আল্লাহমুখী হয়ে জীবন যাপন করা এবং ইবাদতকারী যেন তার ইবাদত দ্বারা প্রতারিত না হয়; বরং সে ভয় ও আশা নিয়ে ইবাদত করবে।

যেমন আল্লাহ্ তা’আলা অন্যত্র বলেছেন,

“তারা তাদের প্রভূর ইবাদত করে ভয়ে ভয়ে ও আশায় আশায়। তারা তাঁর রহমতের প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে [73]।”

[২] উমর ইব্‌নু আবদুল আযীয (র) বলেন,

“আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা ছেড়ে দেয়া এবং তিনি যা ফরয করেছেন তা আদায় করার নাম হচ্ছে তাকওয়া [74]”।

[৩] আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) মুত্তাকীদের পরিচয় দিয়ে বলেন,

“যারা মহান আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে এমন সব কর্মকাণ্ড ছেড়ে দিয়ে, যেগুলোর হারাম হওয়া সম্পর্কিত বিধান আল্লাহর দেয়া হেদায়েত তথা কুরআন ও হাদীস থেকে তারা জানে এবং অনুসরণের জন্য মহনবী (সা) যা নিয়ে এসেছেন তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হয়ে আল্লাহ্‌র রহমত কামনা করে [75]।”

তিনি আরো বলেন,

“যে ব্যক্তি নিজেকে শিরক, কবীরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে, তাকে মুত্তাকী বলা হয়।[76]

[৪] কালবী (র.) বলেন,

“যারা গুনাহে কবীরা তথা বড় ধরনের অপবাদ থেকে বেঁচে থাকে, তারা হল মুত্তাকী [77]।”

[৫] হাসান (র.) বলেন,

“আল্লাহ্‌র ওপর আল্লাহ ব্যতীত কাউকে গ্রহণ না করা এবং সবকিছু তাঁর হাতে ন্যস্ত বলে জানা-এটিই হচ্ছে তাকওয়া।“ তিনি আরও বলেন, “হারামের ভয়ে বহু হালালও যতক্ষণ মুত্তাকীগণ বর্জন করে চলেন ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকীদের মাঝে তাকওয়া বিদ্যমান থাকে।[78]

আল্লাহ্‌র বাণীঃ

“লিলমুত্তাকীন [79]”–এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, “মুত্তাকী হচ্ছে তারা, যারা তাদের প্রতি যা হারাম করা হয়েছে তা থেকে দূরে থাকে এবং তাদের ওপর যা ফরয করা হয়েছে তা পালন করে [80]।”

[৬] ইবরাহীম ইব্‌নু আদহাম (র.) বলেন,

“সৃষ্টিজগত তোমার যবানে-কথায় কোন ক্রটি পাবে না, ফেরেশতাগণ তোমার কাজ-কর্মে ক্রটি পাবে না এবং আরশের অধিপতি আল্লাহ্ তোমার গোপনীয়তায় কোন ক্রটি পাবে না-এমন অবস্থার নাম তাকওয়া।[81]

[৭] ওয়াকেদী (র.) বলেন,

“তাকওয়া হচ্ছে সত্যের জন্য তোমার মনকে সজ্জিতকরণ, যেমন তোমার বাহ্যিক অবস্থাকে চরিত্রের জন্য সাজিয়ে থাক [82]।”

[৮] আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুবারক (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

“যদি কোন ব্যক্তি পরিহারযোগ্য একটি বিষয়েও সে করে তাহলে সে ব্যক্তি মুত্তাকীদের অন্তর্ভূক্ত হবে না [83]

[৯] আবূ দারদা (রা.) বলেন,

“সম্পূর্ণ তাকওয়া হল বান্দা আল্লাহকে ভয় করবে (করণীয় বিষয়) ত্যাগ করতে গিয়ে কিছু হালালও বর্জন করবে এই ভয়ে যেন তাকে হারামে পড়তে না হয়; আর যেন সামন্য হালাল বর্জন যেন হারাম এবং হালালের মাঝখানে পর্দা-দেয়াল হয়ে যায়।[84]”

[১০] সুফইয়ান সাওরী (র.) বলেন,

“যে বিষয়ে তোমর মনে সন্দেহ হয়, তা পরত্যাগ করার চেয়ে তাকওয়ার সহজ পথ আমার জানা নেই।[85]” সুতরাং সন্দেহপূর্ণ যে কোন কাজ থেকে বিরত থাকা এবং সবসময় নিজের নফসের হিসাব গ্রহণ করা হল তাকওয়া।

[১১] শাহর ইব্‌নু হাউশার (র) বলেন,

“মুত্তাকী হচ্ছেন তিনি, যিনি এমন বিষয়-আশায়ও বর্জন করেন, যাতে কোন ক্ষতি নেই এই ভয়ে যাতে ক্ষতি আছে তা থেকে যেন বেঁচে থাক যায়।[86]

[১২] আতিয়া আল সাআদী (রা.) বলেন,

“মুমিন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকী বলে গণ্য হয় না যতক্ষণ না সে এমন বিষয়ও পরিত্যাগ নাকরে যা ক্ষতির কারণ হতে পারে।[87]

[১৩] ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার উবাই ইব্‌নু কা’ব (রা)-কে বললেন,

“আপনি তাকওয়া সম্পর্কে আমাকে বলুন। জবাবে তিনি বললেন, ‘আপনি কি কখনও কন্টকাকীর্ণ পথ দিয়ে চলেছেন? ওমর (রা) বলেছেন, কাপড় চোপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি। কা’ব (রা) বললেন, ওটাই তো তাকওয়া [88]।”

বস্তত: বিবেকের সার্বক্ষণিক সচেতনতা ও সতর্কতা, চেতনা ও অনুভূতির স্বচ্ছতা, নিরবচ্ছিন্ন সাবধানতা, জীবন পথের কন্টকসমূহ থেকে আ্ত্মরক্ষার প্রবণতা, অব্যাহত ভীতি-এ সবেরই নাম তাকওয়া। জীবন পথের কন্টকসমূহ হচ্ছে প্রবৃত্তির কুৎসিত কামনা, বাসনা ও প্ররোচনা। অন্যায় লোভ-লালসা, মোহ, ভয়-ভীতি ও শংকা, আশা পূরণে সক্ষম নয় এমন কারো কাছে মিথ্যা আশা পোষণ করা, ক্ষতি বা উপকার সাধনে সক্ষম নয় এমন কারো মিথ্যা ভয়ে আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি [89]

[১৪] আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা) বলেন,

“তাকওয়া হচ্ছে নিজেকে অন্য যে কারোর তুলনায় উত্তম মনে না করা [90]।”

এ কথার অর্থ এ নয় যে, একজন মানুষ নিজেকে হীন, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট ও অবহেলিত মনে করবে; বরং এ কথার প্রকৃত মর্ম হচ্ছে, আল্লাহ্‌র নির্দেশ পালন তথা ব্যক্তি জীবন থেকে রাষ্টীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামের যে বিধি-নিষেধ রয়েছে তা মানার ক্ষেত্রে সে ইবলিসের মত এ কথা বলবে না যে, “আমি তার [আদম (আ)] চেয়ে উত্তম-শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন [91]।”  অর্থাৎ সে অহংকারী হবে না।

[১৫] কোন কোন মুফাসসির বলেন,

“তাকওয়া হচ্ছে মহানবী (সা) এর অনুসরণ করা। কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ তা’আলার বাণী ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদল ও ইহসান…. এর নির্দেশ দিয়েছেন’ এই বাণীতে তাকওয়ার সমাবেশ রয়েছে [92]।”

চলবে…………………………

 

[56]. আল কুরআন, ৬ : ১৫১-১৫৩। [57]. আল কুরআন, ৮৩ : ১-৩। [58]. মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ) অনুবাদ, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, তাফসীর মাআরেফুল কোরআন, মদীনা মোনাওয়ারাহ, খাদেমুল হারামাইন বাদশাহ ফাহদ কোরআন মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪১৩ হি. পৃ. ১৯১। [59]. শায়খ হাফেজ আহমদ ওরফে মোল্লাজিউন রাহ , (মৃ. ১১৩০ হি.), নূরুল আনওয়ার ফী শারহিল মানার, ঢাকা, এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১৩৮৭/১৯৬৮, পৃ. ২৬৬। [60]. আল কুরআন, ৭ : ২৬। [61]. সাইয়েদ মাহমূদ আলুসী (মৃত্যু ১২৭ হি,), রুহুল মা’আনী ফী তাফসীরি কুরআনিল আযীমি ওয়া আল সাবয়িল মাছানী, বৈরুত, আল মাকতাবা আল তিজারিয়্যাহ মুসতাফা আহমদ আর বায, দার আল ফিকহ্‌, ১৪১৪/১৯৯৮, খণ্ড ৫, পৃ. ১৫৪। [62]. The best clothing and ornament we could have comes from righteousness, which covers the nakedness of sin, and adorns us with virtues, (the holy Quran-English tronslation of the meanings and commentary. Saudi Arabia : King Fahd Holy Quran printing complex- 1411 H.), p. 403.. [63]. জালালুদ্দীন আল সুয়ূতী, তাফসীর জালালাইন, প্রাগুক্ত, ১,পৃ. ১৩১। [64]. আল কুরআন, ৩৯ : ৭১-৭৩। [65]. আল কুরআন, ৫ : ২। [66]. আল কুরআন, ৩৮ :২৮। [67]. আল কুরআন, ৯২ : ৫-১০। [68]. আল কুরআন, ৯২ : ১৫-১৮। [69]. আল কুরআন, ১৯ : ৮৫-৮৬। [70]. আল কুরআন, ১৯ : ৭২।   [71]. ইমাম ফখরুদ্দীন আল রাযী, বৈরুত, দার ইহইয়াউত তুরাছ আল আরাবী, ১৯৯৭, খণ্ড-১, পৃ. ২৬৮। [72]. আল কুরআন, ২: ২১। [73]. কাযী নাসিরুদ্দীন আল-বায়যাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১। [74]. আবু মুহাম্মদ আল হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বগবী (মৃ. ৫১০ হি.), মা’আলিমুত তানযীল ফিত তাফসীর ওয়াত তাবীল, বৈরুত, দার আল ফিক্‌র, ১৯৮৫, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫। [75]. আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন জারীর আল তাবারী (মৃ. ৩১০ হি.) জামিউল বায়ান ‘আন তাবীলি আয়িল কুরআন, বৈরুত দার আল ফিক্‌র, তা.বি. খণ্ড ১. পৃ.১৪৭। আদ্দুররুল মানসুর ফী আল তাফসীর আল মাছুর, প্রাগুক্ত, প. ৬০। [76]. সম্পদনা পরিষদ সম্পাদিত, দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম,ঢাকা ইফাবা, পৃ. ৬৯৫। [77]. আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন জারীর আল তাবারী (মৃ. ৩১০ হি.) জামিউল বায়ান ‘আন তাবীলি আয়িল কুরআন, বৈরুত দার আল ফিক্‌র, তা.বি. খণ্ড ১. পৃ.১৪৭। [78]. আবদুর রহমান জালালুদ্দীন আল সুয়ূতী (র), আদ্দুররুল মানসুর ফী আল তাফসীর আল মাছুর, প্রাগুক্ত, প. ৬১। [79]. আল কুরআন, ২ : ২। [80].আবূ জাফর মুহাম্মদ ইবন জারীর আল তাবারী (মৃ. ৩১০ হি.) জামিউল বায়ান ‘আন তাবীলি আয়িল কুরআন, প্রাগুক্ত। [81]. ইমাম ফখরুদ্দীন আল রাযী, বৈরুত, দার ইহইয়াউত তুরাছ আল আরাবী, ১৯৯৭, খণ্ড-১, পৃ. ২৬৮। [82]. প্রাগুক্ত। [83]. আবদুর রহমান জালালুদ্দীন আল সুয়ূতী (র), আদ্দুররুল মানসুর ফী আল তাফসীর আল মাছুর, প্রাগুক্ত, প. ৬১। [84]. প্রাগুক্ত। [85]. আবদুল কাদের জিলানী (র), অনুবাদ-হাফেয মাওলানা আবদুল জলীল. গুনিয়াতুত তালেবীন, ঢাকা, ফেরদৌস পাবলিকেশন্‌স, তা.বি. খণ্ড ১, পৃ. ১৯০। [86]. আলাউদ্দীন আলী ইবন মুহাম্মদ আল বাগদাদী (মৃ. ৭২৫ হি.) লুবাতুত তাবীল ফী মা’আনিত তানযীল ওরফে তাফসীরে খাযেন, বৈরুত, দার আল ফিক্‌র, ১৩৯৯/১৯৭৯, খণ্ড ১, পৃ. ২৮। [87]. আবদুর রহমান জালালুদ্দীন আল সুয়ূতী (র), আদ্দুররুল মানসুর ফী আল তাফসীর আল মাছুর, বৈরুত, দার আল ফিক্‌র, ১৯৮৩, খণ্ড ১, প. ৬১। [88]. তাফসীর খাযেন, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৮; মা’আলিমুত তানযীল, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৫। [89]. সাইয়েদ কুতুব শহীদ, তাফসীর ফী যিলালিল কুরআন, অনুবাদ,-হাফেয মুনির উদ্দীন আহমদ, লণ্ডন, আল-কোরআন একাডেমি, ২০০৫, খণ্ড ১, পৃ. ৭২। [90]. আলাউদ্দীন আলী ইবন মুহাম্মদ আল বাগদাদী (মৃ. ৭২৫ হি.) লুবাতুত তাবীল ফী মা’আনিত তানযীল ওরফে তাফসীরে খাযেন, প্রাগুক্ত, আবু মুহাম্মদ হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বগবী (র), মা’আলিমুত তানযীল ফিত তাফসীর ওয়াত তাবীল, প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫। [91]. আল কুরআন, ৭ : ১২। [92]. আবু মুহাম্মদ হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বগবী (র) মা’আলিমুত তানযীল ফিত তাফসীর ওয়াত তাবীল, প্রাগুক্ত, খণ্ড ১, পৃ. ৩৫।


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আরও পড়তে পারেন

কিভাবে নামাজের মধুরতা আস্বাদন করা যায়? পর্ব ১

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

রমজান মাসের ৩০ আমল

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

Comments

  1. হেরেম শরীফ না হারাম শরীফ?

  2. মুযতাবা

    মসজিদুল হারাম ! এটা হেরেম না ! ওনেকেই এই ভুল করে থাকেন !

  3. আপনারাই হেরেম শরীফ লিখেছেন. তাই আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম.

  4. [৭] হেরেম শরীফে ইলহাদ-কুফরী করা। এর সাথে আবূ হুরায়রা (রা) ‘সুদ’-কে অন্তর্ভূক্ত করেন।

  5. আপনারাই হেরেম শরীফ লিখেছেন. তাই আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম| [৭] হেরেম শরীফে ইলহাদ-কুফরী করা। এর সাথে আবূ হুরায়রা (রা) ‘সুদ’-কে অন্তর্ভূক্ত করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন