কিভাবে নামাজের মাধূর্য আস্বাদন করা যায়? পর্ব ১৭

56
Print Friendly

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

আল ফাতিহার মাধুর্য

আমরা ১৫তম পর্বে আলোচনা করেছি “আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন” বলতে কি বুঝি। গত পর্বে  আমরা আলোচনা করেছি, সুরা ফাতিহা হল আমাদের আর আল্লাহ সুবহানা ওয়ালাতা‘য়ালার সাথে কথোপকথন। সম্ভবত নামাজে সুরা ফাতিহা তেলাওয়াতের সময়টিই সেই সময় যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি খুশুর প্রয়োজন, কারণ এ সময় আল্লাহ আমাদের জবাব দেন। কিন্তু সাধারণত সুরা ফাতিহা তেলাওয়াতের সময়ই আমাদের খুশু সবচেয়ে কম থাকে, কারণ এই সুরা আমরা বারংবার পড়তে পড়তে অভ্যাসে পরিনত করে ফেলেছি; এই অবস্থাটি পরিবর্তন করতে হবে।

আমরা যদি এই সুরার আয়াতের ক্রমের দিকে লক্ষ্য করি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারেঃ আল্লাহ কেন প্রথম আয়াত ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি সৃষ্টি জগতসমূহের রব’ এর পরপরই ‘আর রহমানির রহীম’ বা পরম করুনাময়, পরম দয়ালু এই আয়াতটি বললেন? ইবনে উথাইমীন বলেন – কারণ আল্লাহর রুবুবিয়াত বা প্রভুত্বের ভিত্তি হল মুলত করুনা বা দয়াময়তা। আমরা যখন পড়ি ‘আল্লাহ সকল সৃষ্টি জগতসমূহের রব’ তখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তিনি কেমন রব? আল্লাহ এই আয়াতে তারই উত্তর দিয়েছেনঃ

الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

 যিনি পরম করুনাময় ও অতিশয় দয়ালু (সুরা ফাতিহাঃ ২)

 পরম করুনাময়, পরম দয়ালু

সুরা ফাতিহা পড়েছেন এমন অনেকেই ‘আর রহমান’ ও ‘আর রহীম’ এর মধ্যে পার্থক্য জানেন না। এটা অনুবাদ করা হয় ‘পরম করুনাময় ও অতিশয় দয়ালু’। মিশরের একজন বিখ্যাত ইসলামিক আলোচক আমর খালেদ এই পার্থক্যটাকে এভাবে ব্যখ্যা করেছেনঃ

আল্লাহ যখন তাঁর সমস্ত সৃষ্টির উপর এই দুনিয়াতে দয়া বর্ষণ করেন তখন তিনি ‘আর রহমান’। আল্লাহ বলেনঃ

قُلْ مَن يَكْلَؤُكُم بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ مِنَ الرَّحْمَٰنِ ۗ بَلْ هُمْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِم مُّعْرِضُون

বলুনঃ রহমানথেকে কে তোমাদেরকে হেফাযত করবে রাত্রে ও দিনে। বরং তারা তাদের পালনকর্তার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।(সুরা আম্বিয়াঃ ৪২)

অপরদিকে ‘আর রহীম’ বলা হয় যখন আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমত বিশ্বাসীদের উপর বর্ষণ করেন। যেমনঃ খাদ্য, পানি ইত্যাদি রহমতসমূহ বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সবাইকেই করুনাময় আল্লাহ দিয়ে যাচ্ছেন; আবার রমজান মাসে বিশেষ ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ আতিশয় দয়ালু আল্লাহ শুধু বিশ্বাসীদেরই দিয়েছেন।

আর রাহমানির রাহীম এর পরপরই প্রতিফল দিবসের মালিক কেন? যদি উল্টোটা হত তাহলে আমাদের অন্তর ভীতিতে ভরে যেত। প্রথমে আমরা পড়ি আল্লাহই আমাদের রব, তারপরে তিনিই প্রতিফল দিবসে আমাদের বিচার করবেন। আমরা নিজ নিজ আমলের ব্যপারে ওয়াকিবহাল। কাজেই আমরা যদি বিচার দিবসের ভয়াবহতার আগে আমাদের রবের করুনার কথা জানতে পারি তবে ভয়ের মাঝেও আমাদের মনে আশার সঞ্চার হয়। পরম করুনাময় দয়ালু আল্লাহই প্রতিফল দিবসের মালিক।

করুনা

আমাদের উপর আল্লাহর করুনা আমরা সবসময় উপলব্ধি করতে সক্ষম হই না। চলুন নিচের ভিডিওটি দেখিঃ

দেখুন কিভাবে চিতাবাঘটি বেবুনের বাচ্চাটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে- সুবহানাল্লাহ! এই শিকারী জন্তুটি যদি এমন একটি প্রানীর উপর করুনা আর মমতায়

আচ্ছন্ন হতে পারে যেটি তার শিকার হতে পারত, তাহলে আমরা কি করে আল্লাহর নিজের ‘সৃষ্টির’ উপর তাঁর করুনার ব্যপারে সংশয় রাখতে পারি? আল্লাহর করুনা প্রসঙ্গে মহানবী (সাঃ) কি বলেছেন দেখুন-

ইবনে আবু মারিয়াম (র)…উমর ইবনে খাত্তাব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী(সাঃ) এর নিকট কিছু সংখ্যক বন্দী আসে। বন্দীদের মধ্যে একজন মহিলা ছিল (তার শিশু সন্তান হারিয়ে গিয়েছিল যদিও পরে তাকে খুঁজে পেয়েছিল)। সে বন্দীদের মধ্যে কোন শিশু পেলে তাকে ধরে কলে নিত এবং নিজের দুধ পান করাত। নবী (সাঃ) আমাদের বল্লেনঃ তোমরা কি মনে কর এ মহিলা তার সন্তানকে আগুনে ফেলে দিতে পারে? আমরা বললামঃ না ফেলার ক্ষমতা রাখলে সে কখনও ফেলবে না। তারপর তিনি বল্লেনঃ এ মহিলাটি তার সন্তানের উপর যতটুকু দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের উপর তদাপেক্ষা অধিক দয়ালু।” (সহীহ বুখারি ৯ম খণ্ডঃ ৫৫৭৩)

কাজেই কিয়ামতের দিন আল্লাহর ক্ষমা, ধৈর্য ও করুনার জন্য আমরা গভীরভাবে আশা রাখব। তারপরও আমাদের এর জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে এবং মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ বলেছেন-

وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِّمَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَىٰ

 আর যে তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে অতঃপর সৎপথে অটল থাকে, আমি তার প্রতি অবশ্যই ক্ষমাশীল। (সুরা ত্বা-হাঃ৮২)

আমরা কি আল্লাহর সেই বান্দাদের মধ্যে একজন হব না যা্দের উপর আল্লাহ তাঁর পরম করুনা বর্ষণ করবেন? আমরা তা ই আশা করি, ইনশাআল্লাহ। আর আমরা আসলেই যে তা চাই তার প্রমাণস্বরূপ সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা ও আমল করব।

সেই গোপন চাবিকাঠিটি মনে আছে তো? আল্লাহর সাথ। কথা বলুন। যখনই বলবেন আর রহমানির রহীম, মনে রাখবেন আল্লাহ জবাব দিচ্ছেন – ‘আমার বান্দা আমার গুনগান করলএটা মনে রেখে আপনার অন্তরকে নরম করুন যে আপনি তাঁর সাথে কথা বলছেন যিনি আপানারই উপর পরম করুনাময়।

 

আগের পর্ব গুলো এই লিংক থেকে  পড়ুনঃ

পর্ব ১পর্ব ২পর্ব ৩পর্ব ৪পর্ব ৫পর্ব ৬পর্ব ৭পর্ব ৮পর্ব ৯পর্ব ১০পর্ব ১১পর্ব ১২পর্ব ১৩পর্ব ১৪পর্ব ১৫পর্ব ১৬পর্ব ১৭পর্ব ১৮পর্ব ১৯পর্ব ২০পর্ব ২১পর্ব ২২পর্ব ২৩পর্ব ২৪পর্ব ২৫পর্ব ২৬পর্ব ২৭পর্ব ২৮


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

56 মন্তব্য

  1. Alhamdulillah, this is really helpful, Thank you brother, may Allah give you knowledge to write more, Ameen.

  2. আল্লাহর থেকে বড় জান্নে ওয়ালা কে আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here