কিভাবে নামাজের মাধূর্য আস্বাদন করা যায়? পর্ব ২৭


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

আমরা নামাজের শেষ প্রান্তে চলে এসেছি, আল্লাহর সাথে আমাদের সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে। আজকের পর্বে আলোচনা করব তাশাহুদ সম্পর্কে। দুই রাকা’আত নামাজের পর দ্বিতীয় সিজদার পর রাসুল (সাঃ) সোজা হয়ে বসতেন। তিন অথবা চার রাকা’আত বিশিষ্ট নামাজে(যোহর/আসর/মাগরিব/‘ইশার ফরজ নামাজে) দ্বিতীয় রাক’আতের পর তিনি (সাঃ) বাম পায়ের উপর বসে ডান পা খাড়া করে দিতেন এবং যখন শেষ রাকা’আতে বসতেন তখন বাম পা এগিয়ে দিয়ে ডান পা খাড়া করে নিতম্বের উপর বসতেন (সহীহ বুখারী ৭৯০; ইফা)।

বাম হাত বাম উরুর উপর, ডান হাত ডান হাঁটুর উপর রাখতেন (মুসলিম ১১৯৫; ইফা)।

অন্য এক বর্ণনায়, ডান হাত ডান উরুর উপর রাখতেন (মুসলিম ১১৯৬; ইফা)।

অপর এক বর্ণনায়, দুই হাত দুই হাঁটুর উপর রাখতেন (মুসলিম ১১৯৭; ইফা)।

এ সময় তিনি (সাঃ) শাহাদাত আঙ্গুল (তর্জনী) দিয়ে ইশারা করেতেন (মুসলিম ১১৯৫, ১১৯৬, ১১৯৭, ১১৯৮, ১১৯৯; ইফা) এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি মধ্যমার সাথে সংযুক্ত করতেন (মুসলিম ১১৯৬ ইফা)।

 তাশাহুদ

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বৈঠকের শুরুতে বলতেনঃ

 التحياتُ لله ، والصلوات والطيبات

 “আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াসসালাওাতি ওয়াত্তায়্যিবাতু…” অর্থাৎ, সকল মৌখিক, দৈহিক, আর্থিক ইবাদত আল্লাহর জন্য…। (সহীহ বুখারী ৭৯৩)

আমরা যখন এটি বলব তখন আমাদের সেই গুপ্তধন প্রয়োগ করতে হবে যার কথা আগেই বলা হয়েছে, যেমন এটা মনে করা যে সরাসরি আল্লাহ্‌র সাথে কথা বলা হচ্ছে। কাজেই চলুন আমরা যেই কথাগুলো উচ্চারন করছি তার অর্থ আরও গভীরভাবে জেনে নেই।

 আত-তাহিয়্যাতঃ আমরা ঘোষণা করি যে, শান্তি, রাজত্ব, এবং চিরন্তন আধিপত্যসহ যাবতীয় প্রশংসাসূচক বাক্য আল্লাহর জন্য। ইবনে আল উসাইমীন বলেন, এটি মহত্ব ও শ্রদ্ধা ব্যঞ্জক একটি শব্দ।

আস-সালাওাতঃ আমরা ঘোষণা করি যে, সমস্ত দুআ ও প্রার্থনা আল্লাহর কাছে।

আত-তায়্যিবাতঃ আমরা ঘোষণা করি যে, যা কিছু ভাল কর্ম বা আমল করা হয় তা আল্লাহরই জন্য।

একটি ভিন্ন জায়গায় গমন

উপরে উল্লেখিত কথা গুলো বলার পরে আমরা যা বলি, তা ভিন্ন একটি জায়গায় গিয়ে পৌঁছে যায়, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, আপনি কোথায় অবস্থান করছেন তার উপর নির্ভর করে। কোথায় সে জায়গা? 

এটা সেই জায়গা যেখানে সমস্ত সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) শায়িত আছেন; রহমতের শহর মদীনাতে। এই কথাগুলো যা আমরা প্রতিটি নামাজে উচ্চারন করি, তা তাঁর কাছে পৌঁছে যায়ঃ

 السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته

 “আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু”

যার অর্থ- নবীর উপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।

এই কথাগুলো যে নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর পৌঁছে যায় আমরা তা কিভাবে জানি? রাসুল (সাঃ) বলেছেন- ‘যে কেউই যখন আমার উপর সালাম পেশ করে, তখন আল্লাহ্‌ তা’য়ালা আমার রূহ ফেরত দেন এবং আমি সেই সালামের জবাব দেই।’ [আবু দাউদ ২০৩৭; ইফা]

 এখন আপনার ঘরের দরজাটির দিকে তাকান এবং কল্পনা করুন। কল্পনা করুন যে এই মুহূর্তে এই দরজা থেকে প্রিয় রাসুল (সাঃ) হেঁটে এসেছেন। কল্পনা করুন মাথায় পাগড়ি, গায়ে সাদা জোব্বা, উজ্জ্বল মুখ আর ঘন কালো দাঁড়ি, আর সেই অপূর্ব হাসি মুখে তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন। এখন আপনার সুযোগ এসেছে তাঁকে সালাম দেওয়ার; তাহলে এখন কিভাবে জানাবেন তাঁকে সালাম? কেমন হবে আপনার অনুভূতি?

 ভাবুন, সেই সাহাবাগণ (রাঃ) এর কথা যারা মদীনায় বাইরে দাঁড়িয়ে রাসুল (সাঃ) এর পৌঁছার অপেক্ষা করতেন। তাঁরা অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করতেন; প্রতিদিন আশায় আশায় একই জায়গায় এসে অপেক্ষা করতে থাকতেন। অবশেষে যখন তাঁর দেখা পেতেন, ভেবে দেখুন কেমন আনন্দ তাদেরকে বিভোর করে ফেলত, কিভাবে তাঁরা আনন্দে গেয়ে উঠতেন সেই গান যা আজও শিশুদেরকে শেখানো হয়- ‘তা-লা আল বাদরু ‘আলাইনা’, কেমন করে প্রত্যেক সাহাবীর মধ্যে হুড়োহুড়ি পরে যেত রাসুল (সাঃ) কে সালাম দেওয়ার জন্য! আমরা যদি সেসময় সেখানে থাকতে পারতাম!

তখন আপনার মধ্যে কেমন অনুভূতি কাজ করত? আমরা কখনও সেই সময়টিতে সেইখানে যেতে পারব না, কিন্তু অন্ততঃ এখন এই মুহূর্তে আমরা যে যেখানে আছি, আমাদেরকে বলা হয়েছে যে আমাদের সালামগুলো এইখান থেকেও তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং তিনি জবাব দেবেন। এই অপূর্ব সুযোগটিকে হাল্কাভাবে নেবেন না; বরং আসুন আমরা এই কথাগুলো আমাদের অন্তর থেকে বলি সেই গভীর ভালোবাসা নিয়ে বলি যেমনটি আমরা বলতাম যদি তিনি আমাদের সামনে থাকতেন।

আমাদের এবং সৎকর্মশীলদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক

আমরা এরপর বলিঃ

 السلام علينا وعلى عباد الله الصالحين

 “আসসালামু ‘আলাইনা ওয়া ‘আলা ‘ইবা-দিল্লাহিসস্ব-লিহীন”

 যার অর্থ- আমাদের এবং সৎকর্মশীলদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।

রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যখন কেউ এতটুকু পড়ে, তখন আসমান ও যমীনের আল্লাহর সমস্ত নেক বান্দাদের কাছে তা পৌঁছে যাবে। [সহীহ বুখারী ৫৮৮৯; ইফা]।

তারপর তিনি বলতেনঃ

 أشهد أن لا إله إلا الله ، وأشهد ان محمدا عبده ورسوله

“আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন-না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রসুলুহু”

অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ্‌ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন মাবুদ নেই, এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসুল।

তিন অথবা চার রাকা’আত বিশিষ্ট নামাজ হলে এর পর তিনি পরবর্তী রাকা’আতের জন্য উঠে দাঁড়াতেন।

আল্লাহ্‌ যেন আমাদের নামাজের প্রতিটি কাজের তাৎপর্য বুঝার ও অনুভব করার তৌফিক দান করেন। আমীন।

 

অন্যান্য পর্ব গুলো এই লিংক থেকে পড়ুন-

পর্ব ১পর্ব ২পর্ব ৩পর্ব ৪পর্ব ৫পর্ব ৬পর্ব ৭পর্ব ৮পর্ব ৯পর্ব ১০পর্ব ১১পর্ব ১২পর্ব ১৩পর্ব ১৪পর্ব ১৫পর্ব ১৬পর্ব ১৭পর্ব ১৮পর্ব ১৯পর্ব ২০পর্ব ২১পর্ব ২২পর্ব ২৩পর্ব ২৪পর্ব ২৫পর্ব ২৬পর্ব ২৭পর্ব ২৮


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আরও পড়তে পারেন

হজ্জের পরে কি করবেন?

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

জুম’আর আদব

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

Comments

  1. plzz mahilara ki vabe namaz porhbe she bapare ektu janaben ami ami e niye anek dushchintay achi ar hanafira mahilader namajer vinnotar bapare je dalil dey tar jabab tao janale ajibon kritoggo thakbo

আপনার মন্তব্য লিখুন