সীরাহ কেন পড়া উচিৎ? রাসূল (সাঃ) – রাসূল (সাঃ) এর জীবনীর বৈশিষ্ট্যাবলী – তৃতীয় পর্ব

1
Print Friendly

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

প্রথম পর্ব দ্বিতীয় পর্ব তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্বপঞ্চম পর্ব শেষ পর্ব

প্রথমতঃ এটা সর্বজনবিদিত ও সুষ্ঠুভাবে লিপিবদ্ধ এবং এর কোনো অংশই অস্পষ্ট কিংবা গুপ্ত নয়। ইসলামিক মনীষীরা ইতিহাসের আদ্যোপান্ত জুড়ে পৃথকভাবে বিভিন্ন পুস্তকাবলীতে রাসূল(সাঃ) এর জীবনীর প্রতিটি দিক বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন যার ফলে প্রতিটি মুসলিম স্পষ্টতা ও বোধগম্যতার সাথে রাসূলুল্লাহর জীবনী পরমভাবে আমল করতে সক্ষম।

এর বিশদ ব্যাখ্যা পরবর্তীতে উল্লেখ করা হবে রাসূল(সাঃ) এর জীবনীর বিভিন্ন উৎস আলোচনা করার সময়।

একজনের জানা উচিত যে উর্দু (যেটাকে নতুন ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়) ভাষায় সংকলিত রাসূল(সাঃ) এর জীবনী সংবলিত বইয়ের সংখ্যা এক হাজার। ত্রয়োদশ শতাব্দীর একই সময়কাল ধরে বিভিন্ন ইউরোপিয়ান ভাষায় সংকলিত বইয়ের সংখ্যা তেরোশোর উর্ধ্বে।

দ্বিতীয়তঃ এর বিবরণী সত্যবাদিতা ও সততার সাথে বৈশিষ্টায়িত করা হয়েছে বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থের মত যেগুলোতে হাদীস উদ্ধৃতকারীদের উক্তিগুলো পুঙ্খানুপু্ঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তুলনা ও সত্যাসত্য নির্ধারণের মাধ্যমে সহীহ এবং দুর্বল শ্রেণীতে পৃথকীকৃত। একারণে, রাসূল (সাঃ) এর জীবনী মানবজাতির নিকট যথার্থভাবে বিবরণকৃত।

তৃতীয়তঃ তাঁর(সাঃ) এর দাওয়াত সমগ্র সৃষ্টির জন্য। রাসূল (সাঃ) এর জীবনী সমগ্র মানবজাতির জন্য উত্তম আদর্শস্বরূপ কারণ এতে আমজনতা ও সম্ভ্রান্তদের মধ্যে সমতা বিধান করা হয়েছে। এই জীবনী থেকে শিশু-প্রাপ্তবয়স্ক নির্বিশেষে সকলেই ফায়দা হাসিল করতে পারে কারণ সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট তাদের সকলেই সমান।

দাওয়াতের সর্বজনীনতা এবং এর ভিত্তিসমূহঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জাতির জন্য নবী-রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে আর আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য।’’

  • মানবজাতি সবসময়ই একজন আদর্শকে অনুসরণ করতে উন্মুখ এবং রাসূল (সাঃ) এর জীবনীর মত বিখ্যাত ও বোধগম্য জীবনী আর কোনো নবী বা খ্যাতনামা মানুষের নেই।
  • আল্লাহর অধিকার এবং মানুষের অধিকার-এই দুই মূলনীতির উপর যে ধর্ম প্রতিষ্ঠিত নয়, তা কখনোই মানবতাকে রক্ষা করতে পারে না এবং সৎকর্মশীলতা, অস্তিত্ব, সুখ ও সর্বোৎকৃষ্টতার দিকে পরিচালিত করতে পারে না।
  • পৃথিবীর ধর্মসমূহ প্রধানত দুইভাগে বিভক্তঃ বৌদ্ধধর্ম ও চীনা ধর্মসমূহ যেগুলো আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না, আর যেগুলো আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে কিন্তু আল্লাহর পরিচয় ও গুণাবলী বর্ণনা এবং কিভাবে তাঁর ইবাদত করতে হবে, সেই সম্পর্কে নির্দেশনা দেয় না এবং এই ধরনের বিশ্বাসের প্রতিমূর্তি প্রদানের কোনো উপায় বাতলায় না।

কিন্তু ইসলাম ধর্মে এবং রাসূল (সাঃ) এর জীবনীতে মানুষের অধিকার বিশেষ করে পারিবারিক জীবন ও সামাজিক সম্পর্ক এমনকি রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন এত বিশদভাবে চিত্রিত হয়েছে যা পৃথিবীর আর কোনো ধর্ম ঘাটলেও পাওয়া যাবে না।

চতুর্থতঃ রাসূল(সাঃ) এর জীবনীতে তাঁর আচার-ব্যবহারঃ

রাসূল(সাঃ) তাঁর জীবন সাহাবাদের সাথে কাটাননি, পক্ষান্তরে তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় ঘোরতর শত্রু মুশরিকদের সাথে কেটেছে। এমনকি তাঁর জীবনের শেষ দিকেও ইহুদি মুনাফিক প্রতিবেশীরা তাঁর ব্যবহারে দুর্বলতা কিংবা সততা নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করতে পারে নি যদিও তারা এর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। মক্কার লোকেরা তাঁকে বাজে উপাধি দিত, কিন্তু রাসূলের নিদারুণ দুর্দশা আনার জন্য তাদের অকাতরে সম্পদ ব্যয় সত্ত্বেও তাঁকে মানহানি কিংবা অপবিত্রীকৃত করতে পারত না। সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ বলেনঃ “(হে রাসূল) আমি জানি, এ লোকগুলো যেসব কথাবার্তা বলে তা তোমাকে (বড়োই) পীড়া দেয়, কিন্তু তুমি কি জানো, এরা (এসব বলে শুধু)তোমাকেই মিথ্যা সাব্যস্ত করছে না; বরং যালেমরা(এর মাধ্যমে) আল্লাহ্ তাআলার আয়াতকেই অস্বীকার করছে।’’(সূরা আনআ’ম:৩৩)

বুখারী শরীফে বর্ণিত, ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন রাসূল (সাঃ) দাওয়াতের উদ্দেশ্যে সাফা পাহাড়ের উপর উঠে ডাক দিলেন “ও মক্কাবাসী, আমি যদি তোমাদের বলি এই পাহাড়ের অপর পাশে শত্রুবাহিনী রয়েছে যারা তোমাদের আক্রমণ করতে চায়, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বললঃ অবশ্যই বিশ্বাস করব, আমরা তোমাকে একজন সত্যবাদী এবং সৎ হিসেবেই জানি।”

পঞ্চমতঃ জীবনের সব দৃষ্টিকোণ থেকে এটার স্বচ্ছতা ও বোধগম্যতাঃ

রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) সাহাবাদের সাথে জীবনযাপন করেছেন ও নয়জন মহিলার সাথে বিবাহবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তিনি আদেশ করেছিলেন তাঁর কর্ম ও কথা সারা পৃথিবীর মানুষদের নিকট তুলে ধরতে, তিনি বলেছেনঃ “ আমি আল্লাহর কাছে দোআ করি যে ব্যক্তি আমার যে কোন হাদীস অবিকৃতভাবে বর্ণনা করে, তার মুখমন্ডল যেন সৌন্দর্যমন্ডিত ও উজ্জ্বল হয়।’’ তিনি আরো বলেছেনঃ “আমার হাদীস বর্ণনা কর যদিও তা একটিমাত্র আয়াত হয়।’’ তিনি কখনোই একা ভ্রমণ করেননি ও কখনোই লোকজন থেকে দূরে সরে থাকেন নি এবং তিনি(সাঃ) বলেছেনঃ “ একজন বক্তা অপেক্ষা সরাসরি শ্রবণকারী উপলব্ধি করার দিক দিয়ে অধিকতর উত্তমও হতে পারেন।” তাঁর সাহাবারা একসাথে কঠোর পরিশ্রম করে তাঁর(সাঃ) এর সব বিষয় আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তাঁদের কয়েকজন হাদীস বর্ণনা এবং অনুসরণের জন্য নিজেদের একান্তভাবে নিয়োজিত করেছিলেন যেমন- আস-সুফ্ফার অধিবাসীরা।

তাঁরা বর্ণনা করেছেন কিভাবে তিনি(সাঃ) উঠতেন ও বসতেন, ঘুমাতেন ও হাসতেন, সঠিক নিয়মে গোসল ও ওযূ করতেন, কিভাবে খাওয়া-দাওয়া করতেন এবং তাঁর প্রিয় খাবার কি ছিল। তাঁদের বর্ণনা এমন যে আপনার মনে হবে আপনি রাসূল (সাঃ) কে দেখতে পাচ্ছেন ঠিক যেমনটি সাহাবারা তাঁর(সাঃ) মাথার সাদা চুল ও দাড়ি সম্বর্কে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সাঃ) জীবনী সম্বলিত বই-পুস্তকে শুধু একবার নজর বুলালে যে কেউই আশ্চার্যান্বিত হবে এর সুস্পষ্ট বোধগম্যতা ও খুটিনাটি বিবরণ দেখে।

ষষ্ঠতঃ সারাংশ এবং সাধারণ বিবৃতির দিক দিয়ে এটি মানুষের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়নি, তাই এটি বিস্ময়কর কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়, এবং দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এটি অবিশ্বাস্য কোনো পৌরাণিক কাহিনীর উপর নির্ভর করে নি; বরং সহজে বোধগম্য, আমলযোগ্য ও অনুসরণযোগ্য।

চলবে….


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

1 মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here