কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাওবা ও পাপমোচনকারী কিছু আমল পর্ব – ৩


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

light-of-hope1

 সংকলন: মো: আব্দুল কাদের | সম্পাদক: আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪

তওবাতুন নাসূহ-এর আবশ্যকতা

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তওবাতুন নাসূহ বা পরিশুদ্ধ তওবা প্রতিটি গোনাহগারের উপর ফরয। এটি আল্লাহর হক আদায়ে উদাসীনতার দরুনই তিনি এই নির্দেশ করেন। পাপরাশিকে নেকীতে রূপান্তরিত হবার ওয়াদা এবং কল্যাণ ও বিজয়স্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ করানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। উক্ত কথার উদ্দেশ্য এই যে, ব্যাপক তওবা সকল মুসলিমের জন্যই সাব্যস্ত। সকল গোনাহের জন্যও তওবা জরুরী -যেগুলো করতে আল্লাহ নিষেধ করেন, যেগুলো পরিহার ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে না। আল্লাহ বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمۡ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَيُدۡخِلَكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي  مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ ﴾ [التحريم: ٨]

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা কর- আন্তরিক তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত।”[1]

আয়াতের মর্ম হলো, তোমরা তওবা করো, কেননা তোমরা ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নও। আল্লাহ প্রদত্ত ফরয-ওয়াজিব আদায়ে তোমাদের থেকে গাফিলতি হতেই পারে। সুতরাং কোনও অবস্থায়ই তওবা ছেড়ো না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যারা তওবা করেনা, তারা যালেম।’ এসব আয়াতই বলে দেয় যে, বান্দার তওবা করা ওয়াজিব।

তাওবার অন্যতম শর্ত হলো যদি মানুষের অধিকার লঙ্ঘন হয়, তবে মানুষের অধিকারগুলো ঠিক ঠিক দিয়ে দেওয়া। যার অধিকার নষ্ট করেছেন আপনার সে ভাইয়ের জন্য ইস্তেগফার করা, তার কেউ নিন্দা করলে তার গুণ গাওয়া। সুতরাং মানুষ দু’প্রকার; আত্মার প্রতি যুলুমকারী, তওবাকারী। যে তাওবা করে সে সফলকামী, আর যে গোনাহকরে সে ক্ষতিগ্রস্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: وان استغفروا ربكم “তোমাদের কৃত গোনাহ থেকে প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও।” ثم توبوا اليه “এরপর তার কাছে তওবা করো তোমাদের ভবিষ্যত কর্মসমূহের ব্যাপারে। যাতে ভবিষ্যতে তোমরা তার কাছে প্রত্যাবর্তিত হতে পারো।”

অনুরূপভাবে আবূ মুসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

««إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا»

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা রাত্রিবেলা তাঁর হস্ত প্রসারিত করেন যাতে দিবাভাগের গোনাহগুলোর তওবা কবুল করতে পারেন। ওদিকে দিনের বেলায় হস্ত প্রসারিত করেন যাতে রাতের গোনাহ তওবা গ্রহণ করতে পারেন।[2]

ওলামায়ে উম্মাহ তওবা ওয়াজিব হবার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন। ইমাম কুরতবী (রহ.) বলেন, সমগ্র মুমিনের জন্য তওবা করা ফরয।[3] ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী(রহ) বলেন, তওবা ফরয হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। কেননা পাপরাশি ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে এবং আল্লাহর রহমত থেকে দূরে রাখে। সুতরাং এ থেকে দ্রুত পলায়ন করা দরকার।

তাছাড়া মানুষ মাত্রই গোনাহে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা আছে। তাই মুসলিম ভাইগণ! গোনাহ-গোনাহই। একে ছোট, তুচ্ছ ও হেয় মনে করতে নেই।

গোনাহ সংক্রান্ত কিছু সতর্কবাণী

১. কোনো গোনাহকে তুচ্ছ ও হেয় করা থেকে সাবধান থাকুন।

কেননা গোনাহে ছগীরা যখন তওবা বিনে অনেকগুলো জমে যায় তখন তা ধ্বংস করে দেয়। হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

« إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّمَا مَثَلُ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ كَقَوْمٍ نَزَلُوا فِي بَطْنِ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، وَجَاءَ ذَا بِعُودٍ حَتَّى أَنْضَجُوا خُبْزَتَهُمْ، وَإِنَّ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ مَتَى يُؤْخَذْ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكْهُ».

‘সাবধান! গোনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা গোনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা ঠিক তেমন, যেমন কোনো কওম কোনো উপত্যকায় যাত্রাবিরতি করলো। এ সময় ছোট ছোট ভাগ হয়ে লোকেরা কাঠি নিয়ে আসল, ফলে তারা তাদের রুটি পাকাতে পারল। এমনিভাবে গোনাহকে যে তুচ্ছজ্ঞান করে এই গোনাহই এক সময় তাকে ধ্বংস করে ফেলবে।’[4]

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إياكم ومحقرات الذنوب فإنهن يجتمعن على الرجل حتى يهلكنه».

‘তোমরা গোনাহকে তুচ্ছ মনে করো না। কেননা এগুলো একত্রিত হয়ে মানবকে ধ্বংস করে দেয়।’ এ প্রসঙ্গে তিনি একটি সুন্দর উপমা টেনে বলেন:

«كرجل كان بأرض فلاة فحضر صنيع القوم فجعل الرجل يجىء بالعود والرجل يجىء بالعود حتى جمعوا من ذلك سوادًا وأججوا نارًا فأنضجوا ما قذفوا فيها»

‘যেমন এক ব্যক্তি কোনো খোলা প্রান্তরে রয়েছে। এ সময় দলের খাবার তৈরীকারী হাযির হলেন। তখন ওই লোক কিছু কাঠ নিয়ে এলো, আরেক লোক নিয়ে এলো আরও কিছু কাঠ। একসময় বিশাল কাঠের স্তুপ জমা হলো। লোকেরা আগুন ধরাল। অতঃপর সে আগুনে তারা তাদের খাবার নিক্ষেপ করল এবং সেটা দ্বারা খাবার পাকিয়ে নিল।[5] অতএব, তোমরা গোনাহর অপেক্ষায় থেকো না বরং গোনাহর প্রায়শ্চিত্ত নিয়ে ভাবো।

২. কোনো কোনো গোনাহকে মানুষ ছোট মনে করে অথচ আল্লাহর কাছে তা বড় হিসেবেই গণ্য।

কারণ; ছোট মনে করার দ্বারা মানুষ এতে খুব সহজেই লিপ্ত হয়ে পড়ে। কেননা তারা এমন গোনাহে অনেককেই লিপ্ত হতে দেখেছে, প্রকাশ্যে ওই গোনাহ করতে দেখেছে। নাউযুবিল্লাহ এগুলো সবই হয়েছে গোনাহকে ছোট মনে করার দরুন। ইমাম আহমদ প্রখ্যাত সাহাবী আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু- থেকে বর্ণনা করেন:

«إِنَّكُمْ لَتَعْمَلُونَ أَعْمَالًا لَهِيَ أَدَقُّ فِي أَعْيُنِكُمْ مِنَ الشَّعْرِ كُنَّا نَعُدُّهَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْمُوبِقَاتِ».

“নিশ্চয় তোমরা অচিরেই এমন আমল করবে যা তোমাদের চোখে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম ও হালকা মনে হবে অথচ রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুগে আমরা একে ধ্বংসাত্মক মনে করতাম।”[6]

কাজেই গোনাহকে তুচ্ছ মনে করা থেকে সতর্ক থাকুন। যদিও মানুষ একে ছোট/তুচ্ছ মনে করে তথাপিও আপনি এমনটা করা থেকে বিরত থাকুন।

আর এতে কোন সন্দেহ নাই যে, নানা কারণে ছোট গোনাহ বড় গোনাহে রূপ নেয়। তন্মধ্যে একটি হলো, গোনাহটি বার বার করা ও সর্বদা করতে থাকা। এজন্যই বলা হয়, ‘বারবার করলে সে গোনাহটি আর সগিরা থাকে না। এ থেকে ইস্তিগফার করলে কবিরা গোনাহ থাকে না।’ কাজেই একটি কবিরা গোনাহ যেভাবে অস্তিত্বে আসতে পারে সেভাবে অস্তিত্ব থেকে মুছেও যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, ওই গোনাহ অনুরূপ অন্য গোনাহ যেন না করা হয়। হ্যাঁ যদি গোনাহ করার ইচ্ছা জাগে (বাস্তবায়ন না করলে) তাহলে তা ক্ষমার্হ। লাগাতর সগিরা গোনাহ বান্দাকে ক্ষতি করে যেমন, ফোঁটা ফোঁটা পানি যদি পাথরের উপর পড়ে তাহলে তাতে প্রতিক্রিয়া হবে। পক্ষান্তরে যদি অনেক পানি এক সাথে পাথরে পড়ে তাহলেও তাতে ওই প্রতিক্রিয়া হবে না, যা হয় ফোঁটা ফোঁটা পানির বেলায়।

আর এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, বস্তুর পরিচিতি লাভ হয় বিপরীতমুখী বস্তু দ্বারা। কাজেই কবিরা গোনাহ আর এর তওবা দ্বারা অন্তর্লোক আলোকিত হওয়া খুবই ফলপ্রদ। কিন্তু সগিরা গোনাহ অন্তর্লোককে খুব তাড়াতাড়িই অধিক হারে ক্ষতিসাধন করতে পারে।

৩. প্রকাশে গোনাহ করা থেকে সতর্ক থাকা এবং বিগত দিনের কৃত গোনাহ মানুষের কাছে প্রকাশ না করা।

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষ্য:

«كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا المُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ المُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا، ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ، فَيَقُولَ: يَا فُلاَنُ، عَمِلْتُ البَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْه».

‘প্রকাশকারীর গোনাহ ছাড়া আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের সবাইকে মাফ করবেন। প্রকাশ করার এক ধরণ হচ্ছে, মানুষ রাতের বেলা কোনো গোনাহ করে বসল, আল্লাহ সেটাকে গোপন করেছে; কিন্তু সে নিজে সেটাকে প্রকাশ করার জন্য বলল, ‘হে অমুক! আমি রাতের বেলা এই এই গোনাহ করেছিলাম।’ অথচ এর মাধ্যমে আল্লাহ সেটা রাতে গোপন করেছে আর সে আল্লাহর গোপন করা বস্তুকে প্রকাশ করে দিয়েছে।’[7]

গোনাহ প্রকাশ করার কাজটি খারাপ হবার একটি কারণ এই যে, এর দ্বারা মানুষের সামনে গোনাহকে হালকা বানানো হয় এবং এতে সে নিজেও গোনাহকে হালকা জ্ঞান করে। এর দ্বারা গোনাহর বিকাশ ঘটে, অশ্লীলতার প্রসার পায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

 إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۚ وَٱللَّهُ يَعۡلَمُ وَأَنتُمۡ لَا تَعۡلَمُونَ  [النور: ١٩]

‘যারা ঈমানদারদের মাঝে ব্যভিচার প্রসার লাভ করা পছন্দ করে; তাদের জন্য ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন তোমরা জানো না।’[8]

অনেকে মনে করে নিজ অপরিচিত মহল বা দূর দরাজে কিংবা নিরিবিলি থাকলে গোনাহ করা যায়-এ ধারণাটি ঠিক নয়। যদি এমনটি হয়েও যায় তথাপি তা মানুষের কাছে প্রকাশ করা জায়েয নেই। নিজের গোনাহ নিজের মনেই লুকিয়ে রেখে সেটার জন্য তাওবাহ করাই হচ্ছে সঠিক কাজ। মানুষের সামনে সেটা কোনোভাবেই ঘোষণা করতে নেই।

অতএব গোনাহ প্রকাশ করা থেকে সাবধান হোন। মানুষের সামনে গোনাহ প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকুন। তবে আমরা প্রকাশ করি আর না করি আল্লাহ তা‘আলা সবই ভালো করে জানেন। তাই গোপনে তার কাছে তাওবা করা উচিত।

৪. তওবা করতে বিলম্ব প্রসঙ্গে  সতর্ক থাকা

কেননা আপনি জানেন না কবে মৃত্যুর ডাক এসে পড়বে। মৃত্যু খুবই নিকটতম একটি বিষয়। আচমকাই বিনা নোটিশে এসে পড়বে। মুখে মরণ গোঙানী শুরু হলে তওবা করে কোনও লাভ নেই। রূহ কণ্ঠনালীতে এসে পড়লে তওবা কিসের? আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ العَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ».

‘আল্লাহ তা‘আলা মরণগোঙানী শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবা কবুল করবেন।’[9]

অতএব আপনাকে দ্রুতই তওবার দিকে এগুতে হবে। এক্ষেত্রে কিছুতেই কাল বিলম্ব করা চলবে না। আল্লাহ তা‘আলা নিজেও বান্দাদেরকে দ্রুত তওবার প্রতি আহবান জানান। আল্লাহ বলেন:

 ﴿ وَأَنِيبُوٓاْ إِلَىٰ رَبِّكُمۡ وَأَسۡلِمُواْ لَهُۥ مِن قَبۡلِ أَن يَأۡتِيَكُمُ ٱلۡعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ ٥٤ ﴾ [الزمر: ٥٤]

‘আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত হও এবং তার কাছে নত হও, তাঁর আযাব আসার পূর্বেই যা এলে তোমাদের কোনও সাহায্য করা হবে না।’[10]

অর্থাৎ তওবাটি খুব তাড়াতাড়িই সেরে ফেল, নতুবা আযাব এল বলে।

৫. বারবার গোনাহ করা থেকে হুঁশিয়ারী

আল্লাহ বলেন:

﴿ وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَٰحِشَةً أَوۡ ظَلَمُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ ذَكَرُواْ ٱللَّهَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ لِذُنُوبِهِمۡ وَمَن يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ﴾ [ال عمران: ١٣٥]

‘তারা যখন কোনো অনৈতিক কাজ করে কিংবা তাদের আত্মার প্রতি যুলুম করে’ অর্থাৎ তারা ইস্তেগফারের উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতা করে। গোনাহর জন্য মাগফেরাত কামনা করে। গোনাহ মাটিচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গোনাহ গোপন রাখে এবং অনুতপ্ত হয়।

এর পরবর্তী আয়াতে বলা হচ্ছে:

﴿ وَلَمۡ يُصِرُّواْ عَلَىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُمۡ يَعۡلَمُون﴾ [ال عمران: ١٣٥]

“জেনে বুঝে তারা কৃতকর্মের পুনরাবৃত্তি করে না।”[11]

৬. সবাই যা করে তা না করা

মানুষ যখন অনেক জরুরী কাজ ছেড়ে দেয় এবং হারামে লিপ্ত হয় তখন তার মাঝে শয়তান বাসা বাঁধে। শয়তান নানাভাবে তাকে বুঝাতে থাকে যে, ‘দেখো! এটি করা তোমার জন্য ওয়াজিব নয়। ওটা হারাম নয়। কারণ এটা তো সবাই করে। এভাবে শয়তান ভেতরে ভেতরে রীতিমত যুদ্ধ করে। অর্থাৎ তার মনকে শরীয়াতবিরোধী কাজে উৎসাহ ও প্রেরণা যোগায়। শাস্তির ভয় থেকে উদাসীন করে তোলে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, অন্তরে কী আছে সে বিষয়ে আল্লাহই সবজান্তা। অতএব আপনার অন্তরকে শয়তানের অনুপ্রবেশ থেকে মুক্ত রাখুন।

৭. আল্লাহ প্রদত্ত বৈধ নেয়ামতের মোকাবেলায় ক্ষণস্থায়ী বা সাময়িক অবৈধ নেয়ামতের ধোঁকায় না পড়া

আপনার থেকে যদিও কখনো গোনাহ হয়ে যায় তথাপিও এটা মনে করবেন না যে, আপনি ভালো আছেন। এই অবস্থায় আপনার থাকাটায় আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«إِذَا رَأَيْتَ اللهَ يُعْطِي الْعَبْدَ مِنَ الدُّنْيَا عَلَى مَعَاصِيهِ مَا يُحِبُّ، فَإِنَّمَا هُوَ اسْتِدْرَاجٌ ».

‘যখন দেখবে আল্লাহ তা‘আলা কোন বান্দাকে দুনিয়া দান করেছেন তখন মনে করতে হবে এটি আল্লাহর ধারাবাহিকতার একটি পর্যায়ে।’[12]

কেননা আল্লাহর চিরন্তন নিয়ম যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসে উঠে এসেছে। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:

«إِنَّ اللَّهَ يُؤْتِي الْمَالَ مَنْ يُحِبُّ، وَمَنْ لَا يُحِبُّ، وَلَا يُؤْتِي الْإِيمَانَ إِلَّا مَنْ أَحَبَّ، فَإِذَا أَحَبَّ اللَّهُ عَبْدًا أَعْطَاهُ الْإِيمَانَ، فَمَنْ ضَنَّ بِالْمَالِ أَنْ يُنْفِقَهُ، وَهَابَ الْعَدُوَّ أَنْ يُجَاهِدَهُ، وَاللَّيْلَ أَنْ يُكَابِدَهُ ; فَلْيُكْثِرْ مِنْ قَوْلِ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَسُبْحَانَ اللَّهَِ».

‘আল্লাহ তা‘আলা যাকে ভালোবাসেন কিংবা নাই বাসেন; তাকে সম্পদ প্রদান করেন। কিন্তু প্রিয়জন ছাড়া কাউকে তিনি ঈমান প্রদান করেন না। যখন কোনো বান্দাকে আল্লাহ ভালোবাসেন তখন তাকে তিনি ঈমান প্রদান করেন। সুতরাং যে কেউ সম্পদ ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করে, শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করতে ভয় পায় এবং রাতে দাঁড়ানোতে কষ্ট বোধ করে, সে যেন বেশি বেশি করে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ ও সুবহানাল্লাহ’ পড়ে।’[13]

৮. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া

আল্লাহ বলেন:

﴿ قَالَ وَمَن يَقۡنَطُ مِن رَّحۡمَةِ رَبِّهِۦٓ إِلَّا ٱلضَّآلُّونَ ٥٦ ﴾ [الحجر: ٥٦]

‘বিভ্রান্তরাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়।’[14]

আল্লাহ আরো বলেন:

﴿ ۞قُلۡ يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ أَسۡرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًاۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ٥٣ ﴾ [الزمر: ٥٣]

‘বলে দিন! হে আল্লাহর বান্দারা, যারা তোমাদের আত্মার উপর যুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’[15]

এরপরও আল্লাহ তা‘আলা বান্দাকে দ্রুত তাঁর দিকে ধাবিত হতে হুঁশিয়ারী উচ্চারণপূর্বক বলেন:

﴿ وَأَنِيبُوٓاْ إِلَىٰ رَبِّكُمۡ وَأَسۡلِمُواْ لَهُۥ مِن قَبۡلِ أَن يَأۡتِيَكُمُ ٱلۡعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ ٥٤ ﴾ [الزمر: ٥٤]

‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমুখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও, তোমাদের কাছে আযাব আসার পূর্বে। এরপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।’[16]



[1] সূরা আত-তাহরীম: ৮।

[2] সহীহ মুসলিম: ২৭৪৭।

[3] আহকামুল কুরআন, দারুল কিতাবিল আরাবী, খ.৫, পৃ.৯০।

[4] মুসনাদ  আহমাদ ৫/৩৩১। সহীহুল জামে‘, নাসিরুদ্দিন আলবানী, আল মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় প্রকাশ, হাদীস নং: ২৬৮৬।

[5] মুসনাদে আহমাদ ১/৪০২; ৩৮১৮। সহীহুল জামে‘ হাদীস নং ২৬৬৭।

[6] মুসনাদে আহমাদ ৩/৩।

[7] বুখারী: ৬০৬৯; মুসলিম: ২৯৯০।

[8] সূরা আন-নূর: ১৯।

[9] তিরমিযী: ৩৫৩৭; ইবন মাজাহ: ৪২৫৩। নাসিরুদ্দিন আলবানী, সহীহুল জামে‘, হাদীস নং ৩১৯।

[10] সূরা আয-যুমার: ৪৫

[11] আলে ইমরান: ১৩৫।

[12] মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৫। সহীহুল জামে‘,নাসিরুদ্দিন আলবানী,আল মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় প্রকাশ, হাদীস নং: ৫৬১।

[13] মাজমা‘উদ যাওয়ায়েদ ১০/৯০।

[14] সূরা হিজর:৫৬।

[15] সূরা যুমার: ৫৩।

[16] সূরা যুমার: ৫৪।


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আরও পড়তে পারেন

কিছু প্রশ্ন? উত্তর আছে আপনার কাছে?

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

কার্যকর অধ্যনের ৫টি ফলপ্রসূ বৈশিষ্ট্য

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

Comments

  1. ASSALAMUWALAIKUM vai amake” masjider adob ” ei poster link dile valo hoto !

  2. ASSALAMUWALAIKUM vai amake” masjider adob ” ei poster link dile valo hoto !

  3. Hasan Uz-Zaman Talukdar

    আপনাদের এই দ্বীনি চেষ্টার জন্য আল্লাহ আপনারআপনাদের জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দিক। আমেন।

  4. Hasan Uz-Zaman Talukdar

    আপনাদের এই দ্বীনি চেষ্টার জন্য আল্লাহ আপনারআপনাদের জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দিক। আমেন।

  5. Hasan Uz-Zaman Talukdar

    আপনাদের এই দ্বীনি চেষ্টার জন্য আল্লাহ আপনারআপনাদের জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দিক। আমেন।

  6. Hasan Uz-Zaman Talukdar

    আপনাদের এই দ্বীনি চেষ্টার জন্য আল্লাহ আপনারআপনাদের জীবনের সব গুনাহ মাফ করে দিক। আমেন।

  7. শারমিন তাসমিনা

    Vai, apnara ki amake article mail korte vule jan? Age to mail paitam.

  8. জাযাকাল্লাহ্ খাইর।

  9. জাযাকাল্লাহ্ খাইর।

  10. জাযাকাল্লাহ্ খাইর।

  11. জাযাকাল্লাহ্ খাইর।

  12. প্রতিদিন বাংলায় আল কোরআন ও হাদিসের বানী পড়তে চাইলে নিচের পেজটিতে লাইক .শেয়ার ও টেগ করে ইসলাম প্রচারে অপনি ও আংশ নিন ধন্যবাদ >>>> http://www.facebook.com/Alquranandhadis [566463963372733:]

  13. Farzana Huq Turani

    Alhamdulillah

  14. SayedAmirSohel apnara jodi arabic er bangla tao niche bracket er moddhe dia diten tahole jara arabic ta temon valo porte parena tarao arbi ta pore duuaa ta shikhe nite parto…

  15. turag

  16. subhan Allah..

আপনার মন্তব্য লিখুন