আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস

1
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

42

লেখক : সানাউল্লাহ নজির আহমদ

আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস

আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদেরকে অঢেল অনুকম্পায় ঢেকে রেখেছেন। জলে-স্থলে, তাদের শরীর ও পরিপার্শ্বে তথা সমগ্র পৃথিবীতে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অসংখ্য নেয়ামত ছড়িয়ে দিয়েছেন তদের কল্যাণে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ তোমরা কি দেখ না আল্লাহ তাআলা নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের অধীনস্ত করে দিয়েছেন , তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। [সূরা লুকমান:২০] মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃ যা তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি থেকেই তোমাদেরকে তিনি দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নেয়ামত হিসেব করে দেখ, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। [সূরা ইব্রাহীম :৩৪]

তবে বান্দার উপর সবচেয়ে বড় নিয়ামত, নবী-রসূল প্রেরণ করা, কিতাব অবতীর্ণ করা ও ইসলামের হিদায়াত দান করা। এ নিয়ামতের দাবি হল -আল্লাহ তায়ালার প্রাপ্য হক-অধিকার বিষয়ে সম্যক জ্ঞানার্জন ও যথাযথভাবে তা প্রয়োগের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া। আল্লাহ তা‌আলার গুরুত্বপূর্ণ হক সমূহের একটি হল ঈমান যা মন্থিত হবে হৃদয়ের গভীরে এবং অভিব্যক্তি খোঁজে পাবে বাহ্যিক আচরণে।

আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান চারটি বিষয়কে অর্ন্তভুক্ত করে-

প্রথমত: আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বে বিশ্বাস — আল্লাহ আছেন, ছিলেন, থাকবেন। হৃদয়ের গভীরে কঠিনভাবে এ-বিশ্বাস পোষণ করার নামই আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস। এ-বিশ্বাস কোনো অলীক ধারণা প্রসূত নয় বরং এর পক্ষে রয়েছে অসংখ্য দলীল। উদাহরণত আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিজগৎ, ও এতে সক্রিয় নিখুঁত পরিচালনা পদ্ধতি আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব নির্দেশক একটি বড় প্রমাণ। স্রষ্টা ছাড়া কোন কিছুই নিজেকে অস্তিত্বে আনতে পারে না। কেননা অস্তিত্বের পূর্বে প্রতিটি জিনিসই থাকে অবিদ্যমান। আর অবিদ্যমান জিনিসের পক্ষে সৃষ্টি করা কল্পনাতীত ব্যাপার। আকস্মিকভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্বে আসাটাও অসম্ভব। কারণ সংগঠিত প্রতিটি বস্তু বা সম্পাদিত প্রতিটি কাজের একজন সংগঠক-সম্পাদনকারী থাকা জরুরি। সুতরাং এ-মহাবিশ্ব, ও এতে বিরাজমান বস্তুসামগ্রী স্বসৃষ্ট কোনো বিষয় হতে পারে না।

অকস্মাৎ তৈরি হয়েও অস্তিত্বে আসেনি এগুলো। আসা সম্ভব নয়। তাই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও পরিচালনার পেছনে একজন সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক রয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত পরিস্কার। সৃষ্টিজগৎ তার সমগ্র বিশালতা নিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রমাণ ঘোষণা করছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। স্রষ্টার অস্তিত্ব একটি অমোঘ বাস্তবতা। আর যা বাস্তব তা অস্বীকার করাই হল প্রবঞ্চনা। তাই মহাবিশ্বের কঠিন বাস্তবতার নিরেখেই আমরা আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বাধ্য।

দ্বিতীয়ত: রুবুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান —

অর্থাৎ সৃষ্টি, সৃষ্টির মালিকানা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। তিনিই পরিচালক-প্রতিপালক। তিনি একাই আদেশ-নির্দেশের অধিপতি।(শুনে রাখো, সৃষ্টি ও আদেশ একমাত্র তাঁরই কাজ) [আল আরাফ:৫৪] মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃ ইনিই আল্লাহ! তোমাদের পালনকর্তা, সাম্রাজ্য তারই। তার পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আটিরও মালিক নয়। [সূরাফাতের:১৩] আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতকে অস্বীকার করেছে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে । তবে এমন অনেকেই আছে যারা জেদ ধরে অহঙ্কারবশত, নিজের কথায় আস্থা না রেখেও আল্লাহ তাআলার রুবুবিয়্যাতকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। যেমন- ফেরআউন তার সম্প্রদায়কে বলেছন- আমিই তোমাদের সেরা পালনকর্তা। [সূরা নাযেআত:৩৮]

মহান আল্লাহ বলেছেন, হে পরিষদবর্গ, আমি জানি না যে আমি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য আছে।) [আল কাসাস:৩৮] ফেরআউন নিজের উপর আস্থা নিয়ে কথাগুলো বলেনি, কারণ আল্লাহ তাআলা সূরা আন-নামলে বলেছেন, তারা অহংকারের বশবর্তী হয়ে নিদর্শনাবলী প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। [আন নামল:১৪] মূসা আ. ফেরআউনকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, তুমি জান যে, আসমান ও জমিনের পালনকর্তাই এসব নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ প্রমাণ স্বরূপ নাযিল করেছেন। হে ফেরআউন, আমার ধারণা তুমি ধ্বংস হতে চলেছে [বনী ইসরাঈল:১০২] এর দ্বারা প্রমাণিত হল, মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার উলুহিয়্যাতের ব্যাপারে অংশীবাদী বিশ্বাস পোষণ করা সত্ত্বেও রুবুবিয়্যাতকে স্বীকার করে নিত নির্দ্বিধায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন- বলন! পৃথিবী ও এতে যারা আছে, তারা কার? যদি তোমরা জান, তবে বল। তারা বলবে, সবই আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না? বলুন! সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? তারা বলবে, আল্লাহ । বলুন! তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? বলুন! তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না। তারা বলবে আল্লাহর। বলুন! তাহলে কোথা থেকে তোমারেকে যাদু করা হচ্ছে?  [মুমেনূন:৮৪-৮৯]

মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃ আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহ। [সূরা যুখরুফ: ৯] অন্যত্র মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে ? তবে অবশ্যই তারা বলবে আল্লাহ।  [আদ দুখান:৮৭]

তৃতীয়ত: আল্লাহ তাআলার উলুহিয়্যাতের প্রতি বিশ্বাস

অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহ তাআলাই সত্যিকারার্থে প্রভু। বিনয় ও মহব্বত সমন্বিত ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া অন্য কেউইবাদতের উপযুক্ত নয়, হতে পারে না।মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ আর তোমাদের ইলাহ অদ্বিতীয় ইলাহ। তিনি ভিন্ন অন্য কোনো উপাস্য নেই । তিনি করুণাময়, দয়ালু।  [ আল বাক্বারা:১৬৩] মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃ পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ ? তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের ইবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছ। আল্লাহ এদের ব্যাপারে কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। [ইউসুফ:৩৯-৪০]

প্রভুত্ব একমাত্র আল্লাহ তাআলার। এবাদতের পাত্র একমাত্র তিনিই। প্রভুত্বের ক্ষেত্রে যারা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার হিসেবে সাব্যস্ত করে তাদের ধারণা ভুল, অবাস্তব। যারা এ ভুল ধারণায় আরোপিত, অত্যন্ত জোরালো যুক্তিতে খন্ডন করা হয়েছে তাদের বিশ্বাস পবিত্র কোরআনের নানা জায়গায়। কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা হল-

১. মুশরিকরা যেসব বিষয়কে প্রভু মনে করে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, প্রভুত্বের কোনো বৈশিষ্ট্যই তাদের মধ্যে নেই। পবিত্র কুরআনে বিশ্লিষ্ট আকারে এ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছে। যুক্তিগুলোর সারকথা হল, আল্লাহ ভিন্ন অন্যসব উপাস্য সৃষ্টির ক্ষমতা রাখেনা। কারও ইষ্ট-অনিষ্টের ক্ষমতা এদের নেই। রক্ষা অথবা ধ্বংস কোনো কিছুরই ক্ষমতা এদের নেই। এরা জীবন-মৃত্যুর মালিক নয়। আসমান-জমিনের কোন জিনিসের মালিক এরা নয় এবং এতে তাদের আদৌ কোনো অংশীদারিত্ব নেই। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ তারা আল্লাহ ব্যতীত অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না বরং তারাই সৃষ্ট, নিজেদের কল্যাণ-অকল্যাণ এর মালিক তারা নয়। জীবন, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মালিক এরা নয়।  [আল ফুরকান-৩] মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃতারা কি এমন কাউকে শরীক সাব্যস্ত করে যে একটি বস্তুও সৃষ্টি করেনি বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর তারা না তাদের সাহায্য করতে পারে, না নিজের সাহায্য করতে পারে। [আল আরাফ:১৯১-১৯২]

২. মুশরিকরা বিশ্বাস করত, আল্লাহ তাআলাই প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা, তাঁর হাতেই সমস্ত জিনিসের মালিকানা, তিনি রক্ষা করেন এবং তাঁর অধিকারের বলয় থেকে কেউ পালাতে পারে না। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেনঃ তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে ? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। [আদ্ দুখান:৮৭] মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃআপনি জিজ্ঞাসা করুন, কে রুযি দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও জমিন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন? এবং কেই-বা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্মসম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! আপনি বলুন, তার পরেও তোমরা ভয় করছ না? [ইউনুস:৩১] অংশীবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধদের নিজেদের দেয়া স্বাক্ষীর ভিত্তিতেই তাদের উপর জরুরি হয়ে পড়ে যে একমাত্র আল্লাহকেই তারা প্রভু হিসেবে মানবে। একমাত্র তাঁরই ইবাদতে নিজেদেরকে আরোপিত করবে। নিছক ধারণাজাত প্রভু ও ইলাহের ইবাদত থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে আনবে যারা নিজেদেরই কোনো কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক নয়।

চর্তুথত:আল্লাহ তায়ালার নাম ও সিফাতের প্রতি বিশ্বাস

আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব ও এককতায় বিশ্বাসের পাশাপাশি তার সমস্ত নাম ও সিফাত (গুণমঞ্জরি) এর প্রতি বিশ্বাস সমান গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ সুন্নায় আল্লাহ তাআলার যেসব নাম ও সিফাতের কথা এসেছে সে সবের প্রতি বিশ্বাস ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই মর্মে নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো অপব্যাখ্যা, নিষ্ক্রিয়করণ, আকৃতি ও উপমা প্রদান ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে কঠিনভাবে । ইরশাদ হয়েছে- আর আল্লাহর আছে সব উত্তম নাম। কাজেই সেগুলো দিয়েই তাঁকে ডাকো। আর তাদেরকে বর্জন করো, যারা তার নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে। [আল আরাফ-১৮০] অন্যত্র মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেছেনঃ কিছুই তার অনুরূপ নয়। তিনি সর্বশ্রোতা , সর্বদ্রষ্টা । [আশ শুরা:১১]

ওয়েব গ্রন্থনা : আবুল কালাম আযাদ আনোয়ার / সার্বিক যত্ন : আবহাছ এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ সোসাইটি, বাংলাদেশ।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

1 মন্তব্য

  1. […] যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে তারাই ক্বিয়ামতে সফলকাম হবে। পক্ষান্তরে যারা ক্বিয়ামতকে মিথ্যা ভাববে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহকে অবিশ্বাস করবে, তারা ক্বিয়ামতে কোপানলে পতিত হবে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সকল বান্দাকে সঠিকভাবে ক্বিয়ামতের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। […]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.