একজন ঈমানদার দা‘ঈর বর্জিত গুণাবলি পর্ব ৯

0
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

DawahMission_Gloucester_FB-01

লেখক:মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪| পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭| পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০

লোক দেখানোর জন্য আমল করা

রিয়া পরিচিতি

রিয়া (رياء) শব্দটি আরবী। আভিধানিক অর্থ প্রদর্শন, আত্মপ্রদর্শন, ভান, কপটতা, মুনাফিকী, ভণ্ডামী ইত্যাদি। পরিভাষায়, সমাজের সুনামের আশায় বা দুর্নামের ভয়ে যেসমস্ত নেক কাজ করা হয় তাকে রিয়া বলে।

রিয়ার হুকুম

রিয়া করা ইসলামী শরী‘য়াতে সম্পূর্ণরূপে হারাম। শিরক হলো দুই প্রকার। শিরকে আকবার তথা বড় শিরক। আর শিরকে আসগার তথা ছোট শিরক। আর এ রিয়া হলো ছোট শিরক। এ প্রসঙ্গে হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল ﷺ বলেছেন আমি তোমাদের জন্য ছোট শিরকেই বেশি ভয় করি। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন : ছোট শিরক কী? রাসূল ﷺ বললেন : সেটি হলো রিয়া। [103]

রিয়ার কারণসমূহ

রিয়ার একমাত্র কারণ হলো লোকের কাছে সম্মানী হওয়ার আকাক্সক্ষা। আর এ কারণেই মানুষের মনের মধ্যে রিয়ার উদ্ভব হয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কিছু কিছু লোক আছে যারা নেক আমল করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্

তা‘আলা বলেন :

أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ . فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ . وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ . فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ . الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ . الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ . وَيَمْنَعُونَ الْمَاعُونَ.

তুমি কি তাকে দেখেছ, যে হিসাব-প্রতিদানকে অস্বীকার করে? সে-ই ইয়াতীমকে কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেয়, আর মিসকীনকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজদের সালাতে অমনোযোগী, যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে এবং ছোট-খাট গৃহসামগ্রী দানে নিষেধ করে।[104]

রিয়ার আলামতসমূহ

সমাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় সুন্দর করে ইবাদাত করা, লোকদের সন্তুষ্টি করার জন্য আমল করা ও নির্জনে গাফলতী করা এবং নিজেকে জাহির করার জন্য কাজ করা।

রিয়ার পরিণাম

আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য ও আলামত হিসাবে বর্ণনা করে বলেন :

إِنَّ الْمُنَافِقِينَ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَإِذَا قَامُوا إِلَى الصَّلَاةِ قَامُوا كُسَالَى يُرَاءُونَ النَّاسَ وَلَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا . مُذَبْذَبِينَ بَيْنَ ذَلِكَ لَا إِلَى هَؤُلَاءِ وَلَا إِلَى هَؤُلَاءِ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ سَبِيلًا . يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُبِينًا . إِنَّ الْمُنَافِقِينَ فِي الدَّرْكِ الْأَسْفَلِ مِنَ النَّارِ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِيرًا . إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلَّهِ فَأُولَئِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا . مَا يَفْعَلُ اللَّهُ بِعَذَابِكُمْ إِنْ شَكَرْتُمْ وَآمَنْتُمْ وَكَانَ اللَّهُ شَاكِرًا عَلِيمًا.

নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দেয়। অথচ তিনি তাদের ধোঁকা (-এর জবাব) দান কারী। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, তারা লোকদেরকে দেখায় এবং তারা আল্লাহকে কমই স্মরণ করে। তারা এর মধ্যে দোদুল্যমান, না এদের দিকে আর না ওদের দিকে। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তুমি কখনো তার জন্য কোন পথ পাবে না। হে মু’মিনগণ, তোমরা মু’মিনগণ ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কি আল্লাহর জন্য তোমাদের বিপক্ষে কোন স্পষ্ট দলীল সাব্যস্ত করতে চাও? নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না। তবে যারা তাওবা করে নিজদেরকে শুধরে নেয়, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং আল্লাহর জন্য নিজদের দীনকে খালেস করে, তারা মু’মিনদের সাথে থাকবে। আর অচিরেই আল্লাহ মু’মিনদেরকে মহাপুরস্কার দান করবেন।” [105]

হাদীসের এক বর্ণনায় এসেছে, “ আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (ﷺ) বলেছেন : কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথমে তিন ব্যক্তির বিচার অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম ব্যক্তি আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছিল। তাকে হাজির করে তাকে দেয়া আল্লাহর নিয়ামতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সে সকল নিয়ামতের স্বীকৃতি দেবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে যে, তুমি এই সমস্ত নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ কী কাজ করেছ? সে বলবে : আমি তোমার জন্য লড়াই করে শহীদ হয়েছি। আল্লাহ বলবেন : “তুমি মিথ্যা বলেছ।

আসলে তোমাকে যাতে লোকে বীর বলে সেইজন্য লড়াই করেছিলে। লোকে তোমাকে তো বীর বলেছে।” অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার আদেশ দেয়া হবে। দ্বিতীয় ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেছিল। তাকে হাজির করে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে। সে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্বীকার করবে। অতঃপর জিজ্ঞেস করা হবে : তুমি এই বিপুল সম্পদ দ্বারা কী সৎ কাজ করেছো? সে বলবে : হে আল্লাহ! আমি তোমার পথে যেখানেই অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন দেখেছি, সেখানে অর্থ ব্যয়ে ইতস্তত করিনি। আল্লাহ বলবেন : তুমি মিথ্যা বলেছ। তুমি আমার পথে নয়, বরং লোকে যাতে তোমাকে দানশীল বলে প্রশংসা করে, সেই জন্য দান করেছো। লোকেরা তোমাকে তো দানশীল বলেছেই।”

অতঃপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তৃতীয় ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে ইসলামের জ্ঞান অর্জন করেছিল, অন্যকেও জ্ঞান বিতরণ করতো এবং কুরআন অধ্যয়ন করতো। তাকে হাজির করে তাকে প্রদত্ত আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে এবং সে তা স্বীকার করবে। জিজ্ঞেস করা হবে যে, তুমি এই ইসলামী জ্ঞান দ্বারা কী কাজ করেছ? সে বলবে : আমি ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেছি, জ্ঞান বিতরণও করেছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য আল কুরআন অধ্যয়ন করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যাবাদী। তুমি আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়, বরং লোকেরা যাতে তোমাকে ক্বারী বলে প্রশংসা করে, সেই জন্য অধ্যয়ন করেছো। অতঃপর তাকেও জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হবে। [106]

অপর এক হাদীসে এসেছে : “ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন : “যে ব্যক্তি মানুষকে শুনানোর জন্য সৎ কাজ করে, আল্লাহ তাকে শুনাবেন। আর যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য করে, আল্লাহ তাকে দেখাবেন।” [107]

ইমাম খাত্তাবী বলেন : এ হাদীসের মর্ম এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তোষের জন্য নয় বরং মানুষকে শুনানো ও দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তাকে এভাবে শাস্তি দেবেন যে, তার কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য ফাঁস করে দিয়ে কিয়ামতের দিন জনসমক্ষে অপমানিত করবেন।

ইবনে আবিদ্দুনিয়া বর্ণনা করেন যে, কিয়ামতের দিন রিয়াকারকে চারটি নাম ধরে ডেকে বলা হবে : ওহে রিয়াকার, ওহে ভন্ড, ওহে পাপিষ্ঠ, ওহে ক্ষতিগ্রস্ত। যাও, যাকে খুশী করার জন্য কাজ করেছিলে, তার কাছ থেকে তোমার পুরস্কার লও। আমার কাছে তোমার জন্য কিছুই নেই।

উল্লেখ্য যে, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্য না থাকলে অথবা মানুষকে সৎ কাজে উৎসাহিত করা উদ্দেশ্য থাকলে প্রকাশ্যে সৎ কাজ করা দোষের নয়। যেমন আল্লাহ বলেন : “যারা দিনে ও রাতে প্রকাশ্যে ও গোপনে অর্থ দান করে, তাদের প্রতিপালকের কাছে তাদের জন্য পুরষ্কার রয়েছে।”

আল্লাহ বলেন :

فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত কামনা করে তার সৎ কাজ করা উচিত এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে আর কাউকে শরীক করা উচিত নয়।” [108]

অর্থাৎ নিজের সৎ কাজ কাউকে দেখানোর উদ্দেশ্যে করা উচিত নয়।

রিয়া থেকে বাঁচার উপায়

সমাজের মধ্যে থাকা অবস্থায় সুন্দর করে ইবাদাত করা, লোকদের সন্তুষ্টি করার জন্য আমল করা ও নির্জনে গাফলতী করা এবং নিজেকে জাহির করার জন্য কাজ করা।

১. ইবাদাত করতে হবে একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।

২. কোন কাজে কখনও গাফিলতি না করা।

৩. মানুষকে সব সময় বড় মনে করে নিজেকে ছোট মনে করা।

৪. নিজেকেই সবার চেয়ে অধম মনে করা। ইত্যাদি।

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪| পর্ব ৫ | পর্ব ৬ | পর্ব ৭| পর্ব ৮ | পর্ব ৯ | পর্ব ১০


১০৩. আত-তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর, খণ্ড ৪, পৃ. ২৫৩, হাদীস নং-৪৩০২
১০৪. সূরা আল-মাউন, আয়াত : ১-৭
১০৫. সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১৪২-১৪৭
১০৬. মুসলিম, খণ্ড ৬, পৃ. ৪৭, হাদীস নং-৫০৩২
১০৭. মুসলিম, খণ্ড ৮, পৃ. ২২৩, হাদীস নং-৭৬৬৭
১০৮. সূরা কাহাফ : আয়াত ১১০

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.