বিদায় হজ্জ

3
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখক : আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. | সম্পাদানা : ইকবাল হোছাইন মাছুম

বিদায় হজ্জ

হজ্জাতুল-বিদা ও এর সময় নির্বাচনআল্লাহর ইচ্ছা পূর্ণ হল । উম্মাহর আত্মাসমূহ মূর্তিপূজার আবর্জনা ও জাহিলিয়াতের আদত-অভ্যাস থেকে পাক-পবিত্র হল এবং আলোকিত হল ঈমানি রৌশনিতে। তাদের দিলে প্রেম ও ভালবাসার স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হল। আল্লাহর ঘর পবিত্র কা’বা মূর্তি থেকে ও মূর্তির পূতি-গন্ধময় আবর্জনা থেকে মুক্ত ও পাক-সাফ হল। মুসলমানদের ভেতর (যারা বহু দিন হয় বায়তুল্লাহর হজ্জ ও যিয়ারত করেনি) হজ্জের প্রতি নবতর আগ্রহের সৃষ্টি হয় এবং প্রেম ও ভালবাসার পেয়ালা কেবল পূর্ণই হয়নি বরং উছলে পড়বার উপক্রম হয়। অপরদিকে বিচ্ছিন্ন হবার মুহূর্তও খুব কাছাকাছি ঘনিয়ে আসে। আর অবস্থার দাবিও হল যে, উম্মাহকে বিদায় সালাম জানাতে হবে। তখন আল্লাহ তাআলা তদীয় হাবীব নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (১০ম হি.) হজ্জের অনুমতি দিলেন। ইসলামে এটি ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ হজ্জ।

বিদায় হজ্জের দাওয়াতি, তাবলিগি ও তরবিয়তি গুরুত্ব

তিনি মদিনা থেকে এই উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন যে, বায়তুল্লাহর হজ্জ করবেন, মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হবেন, তাদের দীনের তালিম দেবেন, হজ্জের নিয়ম-কানুন শেখাবেন, সত্যের সাক্ষ্য প্রদান করবেন, আপন অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবেন, জাহিলিয়াতের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলবেন এবং পায়ের তলে দাফন করবেন। এই হজ্জ হাজারো ওয়াজ-নসিহত, হাজারো দরস ও তালিমের স্থলাভিষিক্ত ছিল। এটি ছিল একটি চলতি ও ভ্রাম্যমাণ মাদরাসা, একটি সক্রিয় ও গতিশীল মসজিদ এবং একটি চলন্ত ছাউনি যেখানে একজন মূর্খ-জাহিল, ইলম দ্বারা সজ্জিত হবে, গাফিল তার গাফলত থেকে সজাগ হবে, অলস চঞ্চল হবে, কমজোর শক্তিশালী ও বলবান হবে। রহমতের একটি মেঘ, সফরে ও বাড়ি-ঘরে অবস্থানরত সর্বাবস্থায় ও সর্বমূহূর্তে তাঁকে ছায়াদান করত। এ ছিল রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সাহচর্য, তাঁর স্নেহ ও ভালবাস, তাঁর প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বরূপী রহমতের মেঘ।

হজ্জাতুল-বিদা ঐতিহাসিক রেকর্ড

সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এর ন্যায় বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ বর্ণনাকারিগণ এই সফরে নাজুক থেকে নাজুকতর দিক এবং ক্ষুদ্র থেকে ক্ষদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনার এমন একটি রেকর্ড আমাদের জন্য সংরক্ষণ করে গেছেন যার নজীর না রাজা-বাদশাহ কিংবা আমীর-উমারার সফরনামাগুলোতে পাওয়া যাবে, আর না পাওয়া যাবে ওলামা ও মাশায়েখদের কাহিনীতে ।

বিদায় হজ্জের সাধারণ পর্যালোচনা

আমরা এই হজ্জ সফরের সংক্ষিপ্তসার এখানে পেশ করছি যাকে ‘হজ্জাতুল-বিদা’ হজ্জাতুল-বালাগ ও হজ্জাতু’ত-তামাম’ নামে স্মরণ করা হয় থাকে। আসলে এগুলোরই সমাহার ছিল এই হজ্জ, বরং এসবের চাইতেও ভিন্ন কিছু। এ সফরে তাঁর সঙ্গে এক লক্ষের বেশি সাহাবি শরিক ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে হজ্জ করলেন

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের সংকল্প করলেন এবং দশম হিজরির জিলক্বদ মাসে লোকদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি এবার হজ্জে যাচ্ছেন। এতদশ্রবণে লোকেরা তাঁর সঙ্গে হজ্জ গমনের আশায় প্রস্তুতি শুরু করে দেয়।

এই খবর মদিনার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেসব এলাকার লোকেরাও দলে দলে মদিনায় এসে উপস্থিত হয়। পথিমধ্যে এত বিপুল সংখ্যক লোক কাফেলায় শামিল হয় যে, এর সংখ্যা নিরূপণও কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। এ ছিল যেন এক মানব সমুদ্র! সামনে পিছনে ডানে বামে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু মানুষ আর মানুষ তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তিনি মদিনা থেকে ২৫ জিলক্বদ রোজ শনিবার জোহর বাদ রওয়ানা হন। [ইবনে হাজর, ফাতহুল বারী,৮/১০৪; সীরাত ইবনে হিশাম ৪/২৭২] প্রথমে জোহরের চার রাক’আত সালাত আদায় করেন। এর পূর্বে একটি খুতবা দেন এবং এতে এহরামের ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহের বর্ণনা দেন। এরপর তালবিয়া পাঠ করতে করতে রওয়ানা হন। “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লা কা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়া নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক লা শারিকা”
অর্থঃ আমি হাজির হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত!আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি হাজির। আপনার কোন অংশীদার নেই।নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার।আপনার কোন অংশীদার নেই। (সহীহ মুসলিমঃ ৭/২৮০৩)

বিশাল জনসমুদ্র এই তালবিয়া কখনো সংক্ষেপে, কখনো বা কমিয়ে বাড়িয়ে বলছিল। কিন্তু এতে তিনি কাউকে কিছু বলেননি! তালবিয়া পাঠের সিলসিলা তিনি অব্যাহত রাখেন। অতঃপর ‘আরাজ নামক স্থানে পৌছে ছাউনি ফেলেন। এ সময় তাঁর সওয়ারি ও আবূ বকর রা.- এর সাওয়ারি একই ছিল।

অঃপর তিনি সামনে অগ্রসর হলেন এবং আবওয়া নামক স্থানে পৌছলেন। সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে উসফন ও সারিফ উপত্যকায় পৌছান। অঃপর সেখান থেকে যাত্রা করে “জি-তুওয়া” নামক স্থানে মনজিল করলেন এবং শনিবার রাত সেখানে অতিবাহিত করেন। সেদিন ছিল জিল-হজ্জ মাসের ৪ তারিখ। ফজরের সালাত সেখানেই আদায় করেন। ঐদিনই তিনি গোসল করেন এবং মক্কাভিমুখে রওয়ানা হন। তিনি দিনের বেলা উচ্চভূমি দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। সেখান দিয়ে হারাম শরিফে প্রবেশ করেন। এ সময় ছিল চাশতের ওয়াক্ত। বাইতুল্লাহর ওপর চোখ পড়তেই তিনি বলেন: “হে আল্লাহ! তোমার  এই ঘরের সম্মান ও মর্যদা, তা’জিম ও তাকরিম এবং ভীতিকর প্রভাব বৃদ্ধি করে দাও”। (আত-তাবারানিঃ৭৮২;বাইহাকি ৫/৭৩)স্বীয় হাত বুলন্দ করতেন, তাকবির বলতেন এবং ইরশাদ করতেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময় শান্তিপ্রদাতা আর তোমার পক্ষ থেকেই শান্তি এসে থাকে। হে আমাদের রব! আমাদের শান্তির সাথে বাচিয়ে রাখ।”

যখন হারাম শরিফে প্রবেশ করলেন তখন সর্বপ্রথম কা’বা শরিফের দিকে ফিরলেন। হাজরে আসওয়াদ সামনাসামনি হতেই তিনি কোনরূপ বাধা-প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই তাতে চুমু খেলেন (সূত্রঃ সহীহ মুসলিমঃ ২৯১২) এরপর তাওয়াফের উদ্দেশ্যে ডান দিকে ফিরলেন। এ সময় বায়তুল্লাহ তাঁর বাম দিকে ছিল। এই তাওয়াফের প্রথম তিন চক্রে রমল করেন (সহীহ মুসলিমঃ২৮৯৩) অর্থাৎ ছোট ছোট কদম ফেলে দ্রুত গতিতে চলছিলেন। চাদর এক কাঁধের উপর ফেলে রেখেছিলেন, আর অপর কাঁধ ছিল খালি এভাবে ইজতিবা করেছিলেন। তিনি যখন হাজরে আসওয়াদ অতিক্রম করছিলেন তখন সেদিকে ইশারা করে আপন ছড়ির সাহায্যে ইসতিলাম করছিলেন। তাওয়াফ শেষ হতেই মাকামে ইবরাহীমের পেছনে গেলেন এবং এরপর এখানে দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন। সালাত সমাপনান্তে পুনরায় হজরে আসওয়াদের নিকট গমন করলেন এবং তাতে চুমু খেলেন। এরপর সাফা পর্বতের দিকে সম্মুখস্থ দরজা হয়ে চললেন। কাছাকাছি হতেই বললেন, “সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা বাকারাঃ ১৫৮) এরপর তিনি তাতে আরোহণ করলেন। এমনকি ততদূর অবধি আরোহণ করলেন যেখান থেকে বায়তুল্লাহ দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। অতঃপর কিবলার দিকে ফিরে আল্লাহ তাআলার একত্ব ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিলেন, বললেন, “আল্লাহ ভিন্ন কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁর আর সকল হামদ তথা প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ ভিন্ন কোন মাবুদ নেই, তিনি এক তাঁর কোনো শরিক নেই, তিনি তাঁর ওয়াদা পালন করেছেন, আপন বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং সমস্ত দল ও উপদলকে একা পর্যুদস্ত করেছেন”। (সহীহ মুসলিমঃ ১২১৮, আবু দাঊদঃ ১৯০৫, তিরমিজীঃ ৮৬২)

মক্কায় তিনি ৪/৫ দিন (শনি, রবি, সোম, মঙ্গল ও বুধবার এই কয়দিন) অবস্থান করেন। বৃহস্পতিবার বেলা উঠতেই সকল মুসলমানকে নিয়ে মিনায় গমন করেন। জোহর ও আসর সালাত তিনি এখানেই আদায় করেন এবং এখানেই রাত্রি যাপন করেন। এদিন ছিল বৃহস্পতিবার দিবাগত জুমু’আর রাত্রি। সূর্য উঠতেই তিনি আরাফাতের দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি দেখতে পেলেন যে, নামিরায় তাঁর জন্য তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। অনন্তর তিনি এখানেই অবতরণ করলেন। বেলা ঢলে পড়তেই উটনি “কাসওয়া”-কে প্রস্তুত করার হুকুম দিলেন। অতঃপর সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে ‘আরাফাত প্রান্তরের মাঝখানে মনজিল করেন এবং আপন সওয়ারি পৃষ্ঠে থেকেই এক ওজস্বিনী ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি ইসলামের বুনিয়াদসমূহ খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেন। এবং শিরক ও মূর্খতার বুনিয়াদ ধ্বংস করে দেন। এই ভাষণে তিনি সেই সব হারাম বস্তুকে হারাম বলে ঘোষণা করেন যেগুলো হারাম হওয়ার ব্যাপারে দুনিয়ার তাবত ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠী ঐকমত্য পোষণ করে। আর তা ছিল, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, ধন-সম্পদ ছিনাতই করা, নারীর সতীত্ব-সম্ভ্রম নষ্ট করা। জাহিলিয়াতের তাবৎ বিষয়াদি ও প্রচলিত কাজগুলো আপন কদমতলে দাফন করেন। জাহিলিয়াত আমলের সূদ তিনি সমূলে খতম করেন এবং একে বিলকুল বাতিল বলে অভিহিত করেন। তিনি মহিলাদের সঙ্গে উত্তম আচার-আচরণের উপদেশ দেন এবং তাদের যে সমস্ত অধিকার রয়েছে, অধিকন্তু তাদের জিম্মায় যেসব অধিকার রয়েছে, তার বিশ্লেষণ করেন এবং বলেন যে, নিয়ম মুতাবিক আহার, পোশাক ও খোরপোশ তাদের অধিকার।

উম্মতকে তিনি আল্লাহর কিতাবের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকার ওসিয়ত করেন এবং বলেন, যতদিন তোমরা এর সঙ্গে নিজেদের ভালভাবে আঁকড়ে রাখবে ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তিনি তাদেরকে সতর্ক করেন যে, তাদেরকে কাল কিয়ামতের দিন তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তাদেরকে এর জওয়াব দিতে হবে। এ সময় তিনি উপস্থিত সকলকে জিজ্ঞেস করেন, তখন তারা তাঁর সম্পর্কে কি বলবে এবং কি সাক্ষ্য দেবে? সকলেই সমস্বরে বললেনঃ আমরা সাক্ষ্য দেব যে, আপনি পয়গামে হক এতটুকু কম-বেশি না করে ঠিক ঠিক পৌঁছে দিয়েছেন, আপন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কল্যাণ কামনার হকও আদায় করেছেন। এতদশ্রবণে তিনি আসমানের দিকে আঙুল উঠালেন এবং তিনবার আল্লাহ তাআলাকে এ বিষয়ে সাক্ষী বানালেন। এরপর তাদেরকে হুকুম দিলেন যে, যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিত লোকদেরকে এ কথাগুলো যেন পৌঁছেদেয়। এ সময় সূরা মায়েদার এই আয়াতটি নাজিল হয়, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে পছন্দ করলাম ইসলামকে।” (সূরা মায়েদা :৩) (সূত্রঃ সহীহ বুখারী ১৬২৩, ১৬২৬, ৬৩৬১; সহীহ মুসলিমঃ ৯৮; তিরমিজী ১৬২৮, ২০৪৬, ২০৮৫; মুসনাদে আহমাদ ১৯৭৭৪)

খুতবা শেষ হতেই বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আজান দেয়ার হুকুম দিলেন। তিনি আজান দিলেন। এরপর তিনি জোহরের সালাত দুই রাকাত আদায় করলেন। ঠিক সেভাবে আসরেরও দু’রাকাতই পড়লেন। দিনটা ছিল জুমুআর দিন। সালাত শেষ হতেই সওয়ারিতে আরোহণ করলেন এবং সেই উকূফের  জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালেন যেখানে তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে দু’আ করেছিলেন (জায়গাটি আজ অবধি আরাফাতে বিখ্যাত ও চিহ্নিত) । এখানে এসে তিনি তাঁর উটের উপর বসলেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত দু’আ ও মুনাজাত, মহান আল্লাহ সমীপে কান্নাকাটি, আপন দুর্বলতা ও অসহায়ত্বের বিনীত প্রকাশের মাঝেই মশগুল থাকলেন। দু’আ রত আবস্থায় তিনি তাঁর হাত উপরের দিকে তুলতেন যেমন কোনো ভিক্ষুক-প্রার্থী ও অসহায় মিসকিন এক টুকরো রুটি যাঞ্ছা করছে। দু’আ ছিল নিম্নরূপ,“হে আল্লাহ! তুমি আমার কথা শুনে থাক এবং আমার জায়গাও তুমি দেখ। আমার গোপন ও প্রকাশ্য সব তুমি জান। তোমার কাছে আমার কোনো কিছু প্রচ্ছন্ন বা লুক্কায়িত নেই, থাকতে পারে না। আমি বিপদগ্রস্ত, মুখাপেক্ষী, ফরিয়াদী, আশ্রয়প্রার্থী, অসহায় আপন গুনাহর স্বীকৃতি প্রদান করছি, মেনে নিচ্ছি আমার সকল অপরাধ। তোমার কাছে চাইছি যেভাবে চায় ভীত-শংকিত বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি, তেমনিভাবে চাইছি যেমন অবনত শিরে চায় কেউ। আর তার চোখ দিয়ে ঝরতে থাকে অশ্রুরাশি আর সমগ্র দেহমন দিয়ে যে তোমার দরবারে কাতর প্রার্থনা জানায় আর তোমার সামনে নাক ঘষতে থাকে। প্রভু হে! তোমার সকাশে দু’আ কামনায় আমাকে ব্যর্থকাম কর না এবং আমার অনুকূলে তুমি বড়ই মেহেরবান ও দয়ালু হিসাবে ধরা দাও। ওহে সর্বোত্তম প্রার্থনা পূরণকারী ও সর্বোত্তম সর্বপ্রদাতা প্রভু!”(তিরমিজীঃ৩৫২)

সূর্যাস্তের পর তিনি আরাফাত থেকে রওয়ানা হলেন এবং উসামা বিন যায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিজের পেছনে বসিয়ে নিলেন। তিনি দৃঢ় প্রশান্ত চিত্তে ও ভাবগম্ভীর মর্যদা সহকারে সম্মুখে অগ্রসর হলেন। উটনীর রশি তিনি এভাবে গুছিয়ে নিয়েছিলেন যে, মনে হচ্ছিল তাঁর মস্তক বুঝি উটনীর কুঁজ স্পর্শ করবে। তিনি বলে চলছিলেন, লোক সকল! নিরাপদ প্রশান্তির সঙ্গে চল। গোটা রাস্তা তিনি তালবিয়া পাঠ করছিলেন যতক্ষণ না মুযদালিফা গিয়ে পৌঁছেন- এ ধারা অব্যাহত থাকে । মুযদালিফায় পৌঁছেই সাহাবি বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আজান দিতে বললেন। আজান দেয়া হল। তিনি দাড়িয়ে গেলেন এবং উট বসানো ও সামান নামানোর আগেই মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। লোকেরা সামান নামালে তিনি সালাতুল-ইশা আদায় করলেন, এরপর তিনি আরাম করবার জন্য শুয়ে পড়লেন এবং ফজর অবধি ঘুমালেন।

আওয়াল ওয়াকতে সালাতুল-ফজর আদায় করলেন। এরপর সওয়ারির পৃষ্ঠে আরোহণ করলেন এবং মাশ’আরুল-হারাম-এ আসলেন ও কেবলা-মুখি হয়ে দু’আ ও মনিতিভরা কান্না, তাকবির-তাহলিল ও জিকর-এ মশগুল হলেন। পূর্ব আকাশ ফর্সা হয়ে যাওয়া অবধি তিনি এতে মশগুল রইলেন। এ ছিল সূর্যোদয়ের পূর্বের অবস্থা। অতঃপর তিনি মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হন। ফযল বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এ সময় তাঁর উটনীর পৃষ্ঠে তাঁর পশ্চাতে উপবিষ্ট ছিলেন। তিনি বরাবরের মতই তালবিয়া পাঠ করছিলেন। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিলেন, জামরায়ে আকাবায় নিক্ষেপের জন্য সাতটি পাথর কুড়িয়ে নাও। ওয়াদিয়ে  মুহাসসারের মাঝামাঝি পৌঁছতেই তিনি তাঁর উটনীর গতি বাড়িয়ে দিলেন এবং তা আরও দ্রুত করলেন। কেননা এটি সেই জায়গা যেখানে হস্তি বাহিনীর উপর আল্লাহর আজাব নাজিল হয়েছিল। এভাবে তিনি মিনায় পৌঁছলেন এবং সেখান থেকে জামারাতুল-আকাবায় তাশরিফ রাখলেন এবং সাওয়ারিতে আরোহণপূর্বক সূর্যোদয়ের পর জামারায় পাথর নিক্ষেপ করেন এবং তালবিয়া পাঠ বন্ধ করেন।

এরপর মিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তিনি একটি বাগ্মিতাপূর্ণ খুতবা দান করেন। এতে কুরবানির দিনের সম্মান ও মর্যদা সম্পর্কে সকলকে অবহিত করেন এবং আল্লাহ তাআলার নিকট এই দিনিটির যে বিশেষ মর্যদা কয়েছে তা বর্ণনা করেন।

অপরাপর সমস্ত শহরের উপর মক্কার যে শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য রয়েছে তাও উল্লেখ করেন এবং যে আল্লাহর কিতাব (কোরআনুল কারীম) এর আলোকে তাদের নেতৃত্ব দেবে তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য তাদের উপর ওয়াজিব বলে বর্ণনা করেন। এরপর তিনি উপস্থিত লোকদেরকে তাঁর থেকে হজ্জ ও কোরবানির মাসলা-মাসায়েল ও নিয়ম-কানুন জেনে নিতে বললেন। তিনি লোকদেরকে এও বললেন, দেখ! আমার পর তোমরা কাফিরে পরিণত হয়ে যেও না, তাদের মত পরস্পরের গলা কাটতে লেগে যেও না। তিনি আরও নির্দেশ দেন, কথাগুলো অপর লোকদের পৌঁছে দেবে। খুতবায় তিনি এও ইরশাদ করেনঃ“আপন প্রতিপালকের ইবাদত কর, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় কর, (রমযান) মাসের সিয়াম পালন কর, শাসন-কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তির নির্দেশ পালন কর, (আর) তোমাদের প্রতিপালকের জান্নাতে প্রবেশ কর”।

সে সময় তিনি লোকদের সামনে বিদায় কথাও বলেন এবং এ জন্যই এই হজ্জের নাম “হজ্জাতুল-বিদা” বা বিদায় হজ্জ।

অতঃপর তিনি মিনায় কোরবানির স্থালে পৌঁছেন এবং তেষট্টিটি উট স্বহস্তে কোরবানি করেন। যতগুলো উট তিনি কোরবানি দিয়েছিলেন হিসাব করে দেখা যায় তত বছরই তিনি হায়াত পেয়েছিলেন। এরপর তিনি ক্ষ্যান্ত হন এবং প্রিয় সাহাবি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন ১০০ পূরণ হওয়ার যতগুলো বাকী ছিল তা পূরণ করার নির্দেশ দিলেন। কোরবানি সম্পূর্ণ হতেই ক্ষৌরকার ডেকে পাঠান, মস্তক মুন্ডন করেন এবং মুন্ডিত কেশ নিকটস্থ লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেন। এরপর তিনি মক্কায় রওয়ানা হন। তাওয়াফে ইফাদা আদায় করেন যাকে তাওয়াফে যিয়ারাতও বলা হয়। অতঃপর যমযম কূপের নিকট গমন করেন এবং দাঁড়িয়ে পানি পান করেন। এরপর ঐদিনই মিনায় ফিরে আসেন এবং সেখানে রাত্রি যাপন করেন।

দ্বিতীয় (পর) দিন সূর্য পশ্চিমাকাশে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকেন। সূর্য ঢলে গেলেই সাওয়ারি থেকে অবতরণ করেন, পাথর নিক্ষেপের জন্য গমন করেন এবং জামরা-ই ঊলা থেকে পাথর নিক্ষেপ শুরু করেন, এরপর জামরা-ই উস্তা অতঃপর জামারায়ে আকাবায় সমাপ্ত করেন। মিনায় তিনি দুইটি খুতবা দেন। তন্মধ্যে একটি দেন কোরবানির দিন যার কথা আমরা একটু আগেই উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয়টি কোরবানির পরদিন।

এখানে তিনি যাত্রা বিরতি করেন এবং আয়্যামু’ত-তাশরীক-এর তিন দিনই পাথর নিক্ষেপ করেন। অতঃপর তিনি মক্কা যাত্রা করেন, শেষ রাত্রে বিদায়ী তাওয়াফ সমাপ্ত করেন, লোকজনকে তৈরি হওয়ার নির্দেশ দেন এবং মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

পথে গাদীরে খুম  নামক স্থানে পৌছে তিনি একটি খুতবা  প্রদান করেন এবং তাতে প্রিয় সাহাবি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মর্যাদা ও ফজিলত বর্ণনা করেন। এ সময় তিনি বলেনঃ “আমি যার প্রিয়, আলীও তার প্রিয় হওয়া উচিত। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালবাসবে তুমিও তাকে ভালবাস আর যে তার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে তুমিও তার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ কর”। (তিরমিজীঃ ৩৭১৩, ইবনে মাজাহঃ ১২১)

জুল-হুলায়ফা এসে রাত্রি যাপন করেন। সওয়াদ-ই মদিনার প্রতি দৃষ্টিপাত হতেই তিনি তিনবার তকবীর বলেন এবং পাঠ করেনঃ “আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো সত্য ইলাহ নেই ; তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই; রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসাও তার আর তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আমরা প্রত্যাবর্তন করছি তওবারত, অনুগত, সিজদারত, আমাদের প্রভু প্রতিপালকের দরবারে প্রশংসারত অবস্থায়। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা সত্যে পরিণত করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, সমস্ত দল-উপদলকে এককভাবে পরাজিত করেছেন”।(মুত্তাফিকুন আলাইহি; রিয়াদুস সালেহীনঃ ৮/৯৭৭)  তিনি দিনের বেলায় মদিনা তায়্যিবায় প্রবেশ করেন।

বিদায় হজ্জে রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খুতবা

এখানে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরাফাত ময়দানে প্রদত্ত খুতবার পূর্ণ অংশ পেশ করছি, ঠিক তেমনি আয়্যামু’ত-তাশরীকের মধ্যবর্তীতে তাঁর প্রদত্ত খুতবাও উদ্ধৃত করছি। কেননা এই দুইটি অমূল্য খুতবা সীমাহীন গুরুত্ববহ উপদেশে পরিপূর্ণ এবং অনেক ফলদায়ক। এই খুতবাগুলো ইমাম বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী, ইমাম আহমাদ প্রত্যেকেই তাঁদের হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

আরাফার খুতবা

“তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ধন-সম্পদ তেমনি পবিত্র ও সম্মানিত যেমন পবিত্র ও সম্মানিত তোমাদের এই দিন, তোমাদের এই মাস ও তোমাদের এই শহর। মনে রেখ, জাহিলি যুগের সকল কিছুই আমার পদতলে রাখা হল এবং সাবধান! শুনে রেখো, জাহিলি যুগের অন্যায় রক্তপাতের প্রতিশোধের বিষয়টিও রহিত করা হলো। সর্বপ্রথম আমি আমার আত্মীয় ইবনে রবিআ ইবনে হারিস হত্যার প্রতিশোধের বিষয়টি রহিত ঘোষণা করছি। তাকে বনি সা’দ গোত্রে স্তন্য পানের জন্য পাঠানো হয়েছিল। হুযায়ল গোত্রের লোকেরা তাকে সেখানে হত্যা করেছিল। সবশেষে তিনি বললেন, জাহিলি যুগের প্রচলিত সুদের সমস্ত কারবার রহিত করা হলো। সর্ব প্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবন ‘আবদিল-মুত্তালিবের সুদি কারবারটি বাতিল ঘোষণা করছি। কেননা এর সবটাই বাতিল। নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের সতীত্ব-সম্ভ্রমকে আল্লাহর কালিমার বিনিময়ে তোমাদের জন্য হালাল করেছ। আর তোমাদের ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, কোন লোককে যেন তোমাদের শয্যায় আসতে না দেয় যাকে তোমরা অপসন্দ কর। তারা যদি তা করে তবে তোমরা তাদেরকে প্রহার করবে, তবে এমনভাবে যেন তার চিহ্ন বাইরে ফুটে না ওঠে। আর তাদের ব্যাপারে তোমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল, তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে তাদের খোরপোশের ব্যবস্থা করবে। আর আমি তোমাদের কাছে একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি তা মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে থাক তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না । আর তা হল আল্লাহর কিতাব । তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে জিজ্ঞাসা করা হবে সেদিন তোমরা তার কি জওয়াব দেবে? সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) সমস্বরে উত্তর দিলেনঃ আমরা বলব, আপনি আল্লাহর পয়গাম আমাদেরকে পৌছে দিয়েছেন, আপন দায়িত্ব পালন করেছেন এবং উম্মাহকে উপদেশ দিয়েছেন। অতঃপর তিনি আসমানের দিকে শাহাদাত আঙ্গুলি উচিয়ে তিনিবার বললেনঃ হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক”।

আইয়ামে তাশরীক-এর মধ্যবর্তীতে যে খুতবা দিয়েছিলেন তার বক্তব্য ছিল নিম্নরূপঃ

“লোক সকল! তোমরা কি জান কোন মাস, কোন দিন এবং কোন শহরে আছ তোমরা ? জবাবে লোকেরা বলল, সম্মানিত দিনে, সম্মানিত শহরে এবং সম্মানিত মাসে আমরা আছি। তিনি বললেন, তোমাদের রক্ত, তোমাদের ধন-সম্পদ তোমাদের সম্মান, সম্মানিত যেমন সম্মানিত আজকের এই দিন, এই মাস ও এই শহর। অতঃপর বললেন, আমার কথা শোন যাতে তোমরা সহিহ-শুদ্ধ জীবন যাপন করতে পার। সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না। সাবধান! তোমরা জুলুম করবে না। খবরদার! তোমরা জুলুম করবে না। আর কোন মুসলমানের ধন-সম্পত্তি থেকে তার সম্মতি ব্যতিরেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। সর্বপ্রকার রক্ত, সব ধরনের ধন-সম্পদ, যা জাহিলি যুগ থেকে চলে আসছে- তা কিয়ামত পর্যন্ত বাতিল ঘোষিত হল। সর্ব প্রথম যে রক্ত (প্রতিশোধ হিসাবে) বাতিল ঘোষিত হচ্ছে তা রবীআ ইবনুল-হরিস ইবন আবদিল-মুত্তালিবের রক্ত, সে বনী লায়স-এ প্রতিপালিত হয়েছিল এবং হুযায়ল গোত্রের লোকেরা হত্যা করেছিল। জাহিলি যুগের সর্ব প্রকার সুদ রহিত করা হল এবং আল্লাহ তাআলার ফয়সালা এই যে, সর্ব পথম যেই সুদ রহিত করা হবে তা হবে আব্বাস ইবন আব্দুল-মুত্তালিবের সুদ। তবে তোমরা তোমাদের মূলধন ফিরে পাবে। এ ব্যাপারে তোমরা নিজেরা অত্যাচারিত হবে না আর তোমারা কারো উপর জুলুম করবে না। আদিতে তিনি যখন আসমান জমিন সৃষ্টি করেছিলেন, কালের আবর্তন-বিবর্তনে আজ সেখানেই এসে পৌঁছেছে।

এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেনঃ “আল্লাহর নিকট গণনার মাস হিসাবে বার মাস, সেদিন থেকে যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ কর্তৃত নির্ধারিত সময় হিসাবে; এর  মধ্যে চারটি মাস পরম সম্মানিত। আর এটাই আল্লাহর সুস্পষ্ট দীন বা জীবন-বিধান। অতএব, তোমরা এই মাসগুলোতে (অন্যায় হত্যাকান্ডে জাড়িত হয়ে) নিজেদের উপর জুলুম করো না”। [সূরা তাওবা : ৩৬]

আর হ্যাঁ, আমার পর আমার অবর্তমানে তোমরা পরস্পর মারামারি করে কাফির হয়ে যেও না। মনে রেখো! শয়তান এ বিষয়ে নিরাশ হয়ে গেছে যে, যারা সালাত আদায় করে তারা কোনোদিন তার পূজারী হবে না । তবে হ্যাঁ সে তোমাদের বিভিন্ন রকমের চক্রান্তে উস্কানি দেবে। নারীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। কেননা তারা তোমাদের তত্ত্বাবধনে আছে। তারা নিজেদের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে কিছু করতে সক্ষম নয়। তোমাদের উপর তাদের অধিকর রয়েছে এবং তাদের উপরও তোমাদের অধিকার রয়েছে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হল, তারা আপন স্বামী ছাড়া তাদের শয্যায় কাউকে প্রবেশাধিকার দেবে না এবং তোমাদের অপছন্দীয় কাউকে তোমাদের ঘরে প্রবেশের অনুমতি দেবে না। যদি তাদের থেকে অবাধ্যতার আশংকা কর তাহলে তাদেরকে উপদেশ দাও, বুঝাও এবং তাদেরকে শয্যায় পরিত্যাগ কর, পৃথক করে দাও এবং তাদের হাল্কাভাবে প্রহার কর; আর তাদের ন্যাসঙ্গতভাবে খোরপোশ প্রদান কর। এ তাদের প্রাপ্য অধিকার। কেননা তোমরা তাদেরকে আল্লাহর নামে তাঁর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ এবং আল্লাহর নামে তাদের সতীত্ব-সম্পদ নিজেদের জন্য বৈধ করেছ। মনে রেখো, কারো কাছে অপর কারোর আমানত রক্ষিত থাকলে সে যেন আমানতকারীর নিকট তা প্রত্যর্পন করে। এতদূর বলার পর তিনি আপন হস্তদ্বয় প্রসারিত করলেন এবং বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে পয়গাম পৌছে দিয়েছি? আমি কি পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি? অতঃপর যারা এখানে উপস্থিত আছ তারা যেন অনুপস্থিত লোকদের কাছে তা পৌঁছে দেয়। কেননা এমন অনেক অনুপস্থিত লোক আছে যারা উপস্থিত শ্রোতাদের তুলনায় অধিকতর ভাগ্যবান হয়ে থাকে”।
(সহীহ বুখারী ১৬২৩, ১৬২৬, ৬৩৬১; সহীহ মুসলিমঃ ৯৮; তিরমিজী ১৬২৮, ২০৪৬, ২০৮৫; মুসনাদে আহমাদ ১৯৭৭৪)

সমাপ্ত

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

3 মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.