আকাশে বাতাসে ভালবাসা

2
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

অনুবাদঃ আবদ্‌ আল-আহাদ | প্রকাশনায়ঃ কুরআনের আলো ওয়েবসাইট

137

ভাবখানা এমন যেন ভালোবাসা যেন আকাশে বাতাসে উড়ে বেড়ায়– ভালোবাসার এই ফেব্রুয়ারী মাসে বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্ততঃ ওটাই যেন বোঝাতে চাই। মনের মানুষটির কাছে ভালোবাসার কথাটা যখন খুশি তখনই বলা যায় এবং সেটাই বরং ভাল। কিন্তু ভ্যালেনটাইন্স ডে দিনটা আসে বছরে মাত্র একবার। এ দিনটাতেও যদি কম সে কম একবার আই লাভ ইউনা বলেন তো হৃদয়হীন খেতাবটা পাওয়ার ঝুকি আপনার এক্কেবারে শতভাগ। আর তাই, ফুল আর চকলেট দোকানীদের জন্য ফেব্রুয়ারী মাসটা বলতে গেলে একটা ঈদের মাস।

কিন্তু আমাদের এই সস্তা বানিজ্যিক আবেগের মাঝেও আমরা আমাদের ভালবাসার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে না ভেবে পারিনা; না ভেবে কোন উপায় থাকেনা। আর যখনই সেই প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে ভাবতে যাই, তখনই সম্মুখীন হই কিছু মৌলিক প্রশ্নের যেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

আমারই এক বান্ধবীর বলা কিছু কথা নিয়ে ভাবতে ভাবতে তেমনি কিছু প্রশ্নের উদয় হল মনে। সে আসলে আমাকে বলছিল তার ভালবাসার মানুষটিকে কাছে পেলে তার কেমন লাগে। তার কথায়ঃ

“তাকে কাছে পেলে সামনে দিয়ে কে এলো গেল তা আর চোখে ধরে না।”

বান্ধবীর কথাটি নিয়ে যতই ভাবছিলাম, ততই আমি যেন ঘোরের মধ্যে আঁটকে যাচ্ছিলাম, আর ততই নিজের ভেতর একধরনের বিস্ময় বোধ তৈরি হচ্ছিল।

মানুষ হিসেবে আমাদেরকে এমনভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে যে, আমার পারস্পারিক ভালবাসা এবং প্রীতির জালে জড়িয়ে পড়ি। আর এই বিষয়টি আমাদের মানবীয় সত্ত্বারই একটি অংশ বৈকি। প্রিয়জনটিকে কাছে পাওয়ায় যদি চোখের সামনে কে এলো গেল তা ধরা না পড়ে, তাহলে প্রতিদিন পাঁচবার যখন আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ স্বরূপ সালাতে প্রবেশ করি তখন আমাদের কেমন মনে হওয়া উচিৎ!!! আমার তো প্রশ্ন জাগে, সারা জীবনে কয়বার (একবারও কি হয়েছে এমনটি?) এমনটি ঘটেছে যে, সালাতে আমার মহাপরাক্রমশালী প্রতিপালক, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের সামনে দাঁড়ালে সারা দুনিয়ার কথা আমি এক্কেবারে ভুলে যাই!!! প্রকৃতঅর্থে, আমরা কয়জন এই দাবি করতে পারব যে, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের প্রতি আমার যে ভালবাসা তা পৃথিবীর অন্য যে কোন কারোর প্রতি আমার ভালবাসার থেকে বেশী?

আমরা প্রায় মনে করে থাকি যে, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন আমাদেরকে শুধু দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন; কিন্তু আসলে তা ঠিক নয়। তিনি সুখের মধ্য দিয়েও আমাদের পরীক্ষা নেন। তিনি আমাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ প্রদানের মাধ্যমেও পরীক্ষা করে থাকেন। আমরা যা কিছু ভালবাসি সে সকল বস্তুর মাধ্যমেও তিনি আমাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। আর উক্ত পরীক্ষাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা ব্যর্থ হয়ে থাকি। আমরা ব্যর্থ হয়ে থাকি কারণ হল, আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন যখনই আমাদেরকে অনুগ্রহ করে কিছু দান করেন তখনই আমরা বুঝতে ভুল করে  তাঁকে বাদ দিয়ে তাঁর অনুগ্রহকে পূজা করা শুরু করি। তিনি না হয়ে তাঁর দেয়া সাফল্যই তখন মুখ্য বিষয় হয়ে উঠে আমাদের কাছে।

আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন যখন আমাদের ধন-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত দিয়ে অনুগ্রহ করেন তখন আমরা তাঁকে ভুলে গিয়ে তাঁর দেয়া  ধন-সম্পদ, অর্থ-বিত্তের পূজা করা শুরু করি। আমরা ভুলেই যাই যে, ধন-সম্পদ, অর্থ-বিত্ত ইত্যাদি নিজে থেকে আসেনি; আল্লাহ্‌ অনুগ্রহ করে আমাদেরকে এগুলো দিয়েছেন বলেই আমরা এসবের ক্ষণস্থায়ী মালিক হয়েছি মাত্র। অন্য ব্যবসায় টাকা খোয়া যাওয়ার ভয় আছে তাই সেই টাকা দিয়ে মদের ব্যবসা শুরু করি। নয়তবা কোন সুদী ব্যাংকে টাকা রেখে ব্যবসায়ীক ক্ষতির ঝুকি থেকে নিরাপদ থাকতে চাই। চাই বোকার মতই বলি আর ভাগ্যের পরিহাসই বলি- আমরা কিন্তু মাল রক্ষার জন্য মালের আসল মালিকেরই বিরুদ্ধাচারন করে ফেলি।

অনুগ্রহ করে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন যখন জীবনে একজন উত্তম সঙ্গী/সঙ্গিনী জুটিয়ে দেন, তখন আমরা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের কথা ভুলে গিয়ে সেই সঙ্গী/সঙ্গিনীকে এমন ভালবাসতে শুরু করি যেমনটি ভালবাসা উচিৎ ছিল আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন’কে। ভালবাসার সেই প্রিয় মানুষটিকে নিয়েই তখন মনের মধ্যে গড়ে উঠে এক নতুন জগত। নিজের সমস্ত আবেগ-অনুভুতি, চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি আবর্তিত হয় সেই ভালবাসার মানুষটিকে কেন্দ্র করে। ভালবাসার মানুষটি যদি স্বামী/স্ত্রী না হয়ে বিবাহ বিবর্জিত সম্পর্কের কেউ হয় তাহলে তাকে কাছে পাওয়ার জন্য আমরা হারাম কর্মেও লিপ্ত হতে দ্বিধা বোধ করিনা। আর সেই মানুষটি কোন কারনে আমাদের ছেড়ে চলে গেলে তাকে নিয়ে মনের মাঝে ভালবাসার সাজানো বাগানে ঝড় বয়ে গিয়ে সবকিছুকে লন্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়; হৃদয়খানা দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যায়। কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমার অনুগ্রহদানকারীকে আমাদের মালিক হিসেবে গ্রহণ না করে খোদ অনুগ্রহটিকেই আমদের মালিক বানিয়ে ফেলেছি!!

এই ধরনের মানুষদের সম্পর্কে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের বক্তব্য হলঃ

এবং মানবমণ্ডলীর মধ্যে এমন কিছুলোক আছে- যারা আল্লাহ্‌র মোকাবেলায় অন্যকে সমকক্ষ স্থির করে, আল্লাহ্‌কে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবেসে থাকে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে-আল্লাহ্‌র প্রতি তাদের ভালবাসা দৃঢ়তর… [সূরা বাকারাহ্‌; ২:১৬৫]

আমাদেরকে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন; তারপরও আমরা আমাদের প্রতি তাঁর দেয়া অসংখ্য অগণিত অনুগ্রহকে দেখেও না দেখে দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখি। আর তাই আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন আমাদের সতর্ক করতে গিয়ে বলেনঃ

হে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তুমি তাদেরকে বলে দাওঃ যদি তোমাদের পিতৃবর্গ, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভ্রাতাগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোত্র, আর ঐ সব ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো, আর ঐ ব্যবসায় যাতে তোমারা মন্দা পড়বার আশংকা করছো এবং ঐ গৃহসমূহ যা তোমরা পছন্দ করছো, (যদি এসব) তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে এবং তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা প্রতিক্ষা করতে থাকো এই পর্যন্ত যে, আল্লাহ্‌ নিজের নির্দেশ পাঠিয়ে দেন, (অর্থাৎ, আযাব) আর আল্লাহ্‌ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না। [সূরা তাওবা; ৯:২৪]

 

এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং লক্ষ্যনীয় বিষয় হল এই যে, উপরিউক্ত আয়াতে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন যেসব জিনিসের তালিকা উল্লেখ করেছেন তার প্রত্যেকটিই হালাল এবং আমাদের কাছে প্রিয় বস্তু যেগুলোকে ভালবাসাও বৈধ। তার চেয়েও বড় কথা হল, উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রত্যেকটিই আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের একেকটি নিদর্শন বা নে’য়ামাত।

তবে একদিকে আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন যেমন বলেনঃ

এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য হতে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদেরকে যাতে তোমরা তাদের নিকট শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পারিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে এতে অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে। [সূরা রূম; ৩০:২১]

আবার অপরদিকে তিনি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেনঃ

 হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু…[সূরা তাগাবুন; ৬৪:১৪]

উক্ত আয়াতে যে সতর্কবাণী উচ্চারন করা হয়েছে তা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

 

এখানে স্বামী/স্ত্রী  এবং সন্তান-সন্ততিদের কথা উল্লেখ করার কারণ হল আমাদের প্রতি আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের দেয়া অনুগ্রহসমূহের মধ্যে তারা অন্যতম যাদেরকে আমরা অসম্ভব রকমের ভালোবেসে থাকি। এবং পরীক্ষা হবে সেখানেই যেখানে ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর। তাই, যদি মনে হয় গাঁদির গাঁদি শুভেচ্ছা পত্র আর লাল গোলাপ দিয়ে সেই ভালবাসার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যাবে, তো তাই হোক। কারণ পরীক্ষার মোক্ষম সময় তো এটাই!!

কারণ, আর যা-ই হোক, ভালবাসা আকাশে বাতাসেই উড়ছে!!

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

2 মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.