কিভাবে নামাজের মাধূর্য আস্বাদন করা যায়? পর্ব ২০

5
108
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

আগের পর্বগুলোতে সুরা ফাতিহার আলোচনায় জেনেছি, কিভাবে বিশেষতঃ এই সুরাটির মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সাথে কথোপকথন করতে পারি, এবং আল্লাহ প্রতিটি আয়াতের সাথে সাথে কিভাবে জবাব দেন। এই সুরা আল্লাহর রুবুবিয়াতের (আল্লাহই সমস্ত সৃষ্টি জগতসমূহের রব) ঘোষণা দেয়, সাথে সাথে এটাও বর্ণনা করে যে আল্লাহর রুবুবিয়াতে রয়েছে তাঁর রহমত ও করুনার প্রাধান্য, যে কারনে সৃষ্টি জগতসমূহের রবের প্রশংসার পর পরই আমরা বলি –‘আর রহমানির রহীম’। কিয়ামত দিবসের মালিকত্বের বর্ণনার আগেই আমরা জানতে পারি যে তাঁর করুনা তাঁর ক্রোধের চেয়ে বেশী। অতঃপর আমরা জানতে পারি কেন আমাদেরকে এই করুনা করা হয় – যাতে আমরা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। এবং তাঁর ইবাদত করতেও আমরা তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। একারনে আমরা বলি –“শুধুমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি”

কাজেই আমরা যদি সাহায্য পেতে চাই, আমাদেরকে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।

পথপ্রদর্শন

এখন আমরা প্রকৃতপক্ষে দোয়া শুরু করছি। “আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের নয় যাদের প্রতি আপনার গজব বর্ষিত হয়েছে এবং তাদেরও নয় যারা পথভ্রষ্ট।” [সুরা ফাতিহা:৬-৭]

 ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, সুরা ফাতিহার এই দোয়াটিই হল সর্বশ্রেষ্ঠ, বিজ্ঞতম, এবং সবচেয়ে উপকারী দোয়া। আল্লাহ যদি আমাদের সরলতম পথ প্রদর্শন করেন, তিনি আমাদের তাঁর ইবাদত করতেও সাহায্য করেন।

 কেউ প্রশ্ন করতে পারে, ‘আমি যদি সঠিক পথেই থাকি তবে আবার কেন পথপ্রদর্শনের জন্য প্রার্থনা করব? আমি নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, কুরআন তেলাওয়াত করি- আল্লাহ তো নিশ্চয়ই আমাকে হেদায়াত করেছেনই।’ প্রথমত, হেদায়াতের সর্বোচ্চ পর্যায় হল মহানবী (সাঃ) এর সমান পর্যায়ে পৌছতে পারা, অথচ আমরা কেউই এমনকি সাহাবীদের পর্যায় পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হয়েছি বলেও দাবী করতে পারি না। একারনেই আমরা প্রার্থনা করি যাতে আল্লাহ আমাদের আরও বেশী করে হেদায়াত দান করেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর উপর নির্ভরতা ও তাঁর সামনে আমাদের বিনয়াবনত অবস্থার উপর হেদায়াত প্রাপ্তি নির্ভর করে, এবং আল্লাহর কাছে আরও হেয়াদায়াতের জন্য প্রার্থনাও সেটাই সাক্ষী দেয়। আমরা যদি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাই না করি, তবে আমরা কি করে দাবী করতে পারি যে আমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছি? মহানবী (সা:) বলেন: ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হন’ [সুনান ইবনে মাজাহ:৩৮২৭ ই:ফা:]

ইবনে কাইয়্যিম বলেছেন, আমরা আল্লাহর কাছে যে সরল পথ প্রদর্শনের জন্য প্রার্থনা করি তাতে দুইটি বিষয় রয়েছে, ইলম এবং আমল, আবার এই দুটোই বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ। কোন বান্দার সমস্ত বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান না থাকতে পারে, যেমন কি করা উচিত, কোনটা পরিত্যাগ করা উচিত, কিসে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন, কিসে অসন্তুষ্ট হবেন। বান্দার অজ্ঞতার পরিমান তার জ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশী হতে পারে। কাজেই, আমরা আল্লাহর কাছে যখন পথ প্রদর্শনের বা হেদায়াতের প্রার্থনা করছি, তখন আল্লাহর কাছে আমাদের জ্ঞানের বৃদ্ধির জন্যও প্রার্থনা করছি। আবার অনেক সময়, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আমরা কিছু আমল করতে পারি আবার অনেক কিছুই করতে পারি না। যেমন আমরা জানি, আমাদের হজ্জ করতে যাওয়া উচিত, কিন্তু আমাদের অনেকেরই সাধ্য থাকে না। আবার, অনেক সময় আমাদের জ্ঞান আর সাধ্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের নফসের বা প্রবৃত্তির কারনে অনেক আমল আমরা করতে পারি না। যেমন আমরা কিয়াম-উল-লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজের অপরিসীম ফজীলতের কথা জানি, কিন্তু আলস্যের কারনে অনেকেই এই নামাজ পড়ার উদ্যোগ নিতে বা ঘুম থেকে উঠতে পারি না। আমরা যখন আল্লাহর কাছে হেদায়াত চাই, তখন এই প্রার্থনাও করি যেন আল্লাহ আমাদের অন্তর বা নফসকেও সংশোধন করে দেন।

 আবার, এমনও হতে পারে যে আমাদের জ্ঞান, সাধ্য, সৎ আমল করার সদিচ্ছা সবই আছে, কিন্তু তারপরও হয়তো আমরা সত্যিকার ভাবে আন্তরিক হতে পারছি না। হয়তো আমাদের নিয়ত পুরপুরি খাঁটি নয়। আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করার অর্থ এটাও প্রার্থনা করা যেন তিনি আমাদের আন্তরিক হওয়ার তৌফিক দেন। কারণ আমলে অন্তর উপস্থিত থাকা আমাদের সঠিক পথে অটল থাকতে সাহায্য করে। আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করার অর্থ এটাও প্রার্থনা করা যেন আমরা মহানবী (সাঃ) এর সুন্নাহ পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারি, এবং এতে দৃঢ় ও অটল থাকতে পারি।

সীরাতুল মুসতাকিমঃ সরলতম পথ

আনাস ইবনে মালিক (রা:) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন যে রাসুল (সাঃ) কি কিয়ামত দি বসে উনার হয়ে সুপারিশ করবেন কিনা। উত্তরে নবীজী (সাঃ) বললেন, ‘করব’। তখন আনাস (রাঃ) আবার প্রশ্ন করলেন, আমি আপনাকে ঐ দিন কোথায় খুঁজে পাব? উত্তরে রাসুল (সাঃ) বললেন, ‘আমাকে যখন তোমার প্রয়োজন হবে, আমাকে পুলসীরাতের কাছে খুঁজবে’। আনাস (রাঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন, আর যদি সেখানে খুঁজে না পাই? মহানবী (সাঃ) বললেন- ‘তখন আমাকে মীযানের (দাঁড়িপাল্লার) কাছে খুঁজবে’। আনাস (রাঃ) আবার প্রশ্ন করলেন, মীযানের কাছেও যদি না পাই তবে আপনাকে কোথায় খুঁজে পাব? মহানবী (সাঃ) জবাবে বললেন:তখন আমাকে হাউয এর কাছে খুঁজবে। আমি তখন এই তিনটি জায়গা ছাড়া কোথাও যাবো না।” [তিরমিযী: ২৪৪২; আহমাদ: ১২৮২৫]

 কাজেই, রাসুল (সাঃ) এর কাছে সুপারিশ চাওয়ার প্রথম জায়গা হবে পুলসীরাত। পুলসীরাত হল জাহান্নামের উপর দিয়ে সেতু যার অপর প্রান্তে রয়েছে জান্নাত। এটি চুলের মত সরু এবং পিচ্ছিল একটি সেতু। আমরা কিভাবে এই সরু ও পিচ্ছিল পুলসীরাত পার হব? মানুষ তার আমল অনুযায়ী এই সেতু পার হবে।

রাসুল (সা:) বলেন: পুলসীরাত হল মারাত্মক পিচ্ছিল জায়গা, যার উপর লহার আংটা এবং বড় ও বাঁকা ফাটা থাকবে, যা দেখতে নাজদ এলাকার সা’দান গাছের কাঁটার মত। মুমিনগণ এ পুলসীরাতের উপর দিয়ে কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বাতাসের গতিতে, কেউ উড়ন্ত পাখির গতিতে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ উটের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ সহিহ সালামতে পার হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ  ক্ষতবিক্ষত দেহে পার হবে। আবার কোন হতভাগ্য আগুনে পতিত হবে। শেষ নাগাত মু’মিনরা দোযখ থেকে নাজাত পেয়ে যাবে। [মুসলিম: ৪৬২]

 ইবনে আল কাইয়্যিম বলেন– আল্লাহ এই দুনিয়াতে সরল পথ অবলম্বন করতে বলেছেন। যে এই দুনিয়াতে সরল পথে চলার জন্য হেদায়াত প্রাপ্ত হবে, পরবর্তী জীবনে সেই পুলসীরাত ও তার জন্য সহজ হবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা এই জীবনে সরল পথের উপর কতটুকু দৃঢ় থাকব তার উপর আমাদের আখেরাতের জীবনে সেই সীরাতে আমাদের অবস্থা নির্ভর করবে।

আমরা কি তাহলে এখন বুঝতে পারছি, যে দোয়াটি আমরা প্রতিদিন করছি তার গুরুত্ব কতখানি?

 আমীন

যখন আমরা সুরা ফাতিহার শেষে “আমীন” (হে আল্লাহ, কবুল কর) বলি, তখন তা আমাদের সমস্ত অন্তঃকরণ থেকে বলা উচিত। কারণ, এই সুরার সমস্ত অর্থ অনুধাবন করার পর, আমাদের অন্তরে গভীর অনুরক্তি ও সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত যেন আল্লাহ আমাদের এই প্রার্থনা কবুল করে নেন। আবার, আমাদের মন যদি আমাদের প্রার্থনার মধ্যে না থাকে, তাহলে সে দোয়ার জবাব আল্লাহ দিবেন না। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন-“আল্লাহর কাছে এই নিশ্চিত বিশ্বাস নিয়ে প্রার্থনা করবে যে আল্লাহ জবাব দিবেন, জেনে রেখ অবহেলার আর অমনোযোগী হৃদয়ের প্রার্থনার জবাব আল্লাহ দেন না।” [তিরমিযী]

ইবন আল কাইয়্যিম বলেছেন- যখন কেউ সুরা ফাতিহা পড়ে, সে যেন প্রতিটা আয়াত থেমে থেমে পড়ে, কারণ আল্লাহ প্রতিটি আয়াতের জবাব দিচ্ছেন। উম্মে সালামা (রাঃ) এর বর্ণনায় রাসুল (সাঃ) এমন করে থেমে থেমে পড়তেন।

আল্লাহ যেন আমাদের সরলতম পথে হেদায়াত দান করেন এবং আমাদের নামাজে আমাদের অন্তরকে সামিল রাখার তৌফিক দেন।

আমীন

অন্যান্য পর্ব গুলো এই লিংক থেকে  পড়ুনঃ

পর্ব ১পর্ব ২পর্ব ৩পর্ব ৪পর্ব ৫পর্ব ৬পর্ব ৭পর্ব ৮পর্ব ৯পর্ব ১০পর্ব ১১পর্ব ১২পর্ব ১৩পর্ব ১৪পর্ব ১৫পর্ব ১৬পর্ব ১৭পর্ব ১৮পর্ব ১৯পর্ব ২০পর্ব ২১পর্ব ২২পর্ব ২৩পর্ব ২৪পর্ব ২৫পর্ব ২৬পর্ব ২৭পর্ব ২৮

 

  

 

 

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]