কুর’আন কিভাবে পড়বো ও বুঝবো – ৫

1
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

মূলঃ মেরিনার

[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

…………..পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়

আল্লাহ্ কুর’আন সম্বন্ধে কি বলেন

…………..পবিত্র কুর’আনকে আল্লাহ্ রূহ্ বা আত্মা বলে সম্বোধন করে বলেন,

وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا
“এভাবে আমি আমার আদেশের এক রূহ্ তোমার কাছে প্রেরণ করেছি…..”
(সূরা শূরা, ৪২:৫২)

এই আয়াতের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বিশিষ্ট ইসলামী ‘আলেম ড. সালিহ আল ফাওযান বলেছেন যে, রূহ্ হচ্ছে এমন একটা ব্যাপার যা হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার করে। যেমনভাবে শারীরিক হৃদপিণ্ডের জীবন সরাসরি এক রূহের সাথে সম্পৃক্ত, তেমনিভাবে আধ্যাত্মিক জীবনও তার প্রাণ স্পন্দনের জন্য সরাসরি একটি রূহের উপর নির্ভরশীল – আর সেই রূহ্ হচ্ছে পবিত্র কুর’আন। এই কুর’আনই হচ্ছে আধ্যাত্মিক হৃদয়ের প্রাণের উৎস। কারো হৃদয় যদি কুর’আন বিবর্জিত হয়, তাহলে সে হৃদয়ের আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে – পার্থিব বিচারে তা যতই জীবন্ত হোক না কেন।

মানুষের হৃদয় তখনই সত্যিকার জীবন লাভ করে, যখন তা কুর’আনের সাথে মিলিত হয়। কুর’আনের শিক্ষা থেকেই আমাদের হৃদয় তার প্রভুর পরিচয় লাভ করে এবং কিভাবে তাঁর উপাসনা করতে হবে সেই জ্ঞানও লাভ করে। এমতাবস্থায় আমাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ভালবাসা, আল্লাহর প্রতি ভয়, তাঁর প্রতি সম্ভ্রম ও তাঁর কাছে প্রত্যাশা দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটা সুস্থ হৃদয়ের জন্য এগুলো হচ্ছে অতি প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান। শারীরিক হৃদস্পন্দনের জন্য যেমন শারীরিক রূহ্ প্রয়োজন – তেমনি এই আধ্যাত্মিক হৃদয়ের স্পন্দনের জন্য কুর’আনের প্রয়োজন।

রূহ্ হরণের ফলে যে পার্থিব মৃত্যু ঘটে, তার সাথে কুর’আনের অনুপস্থিতিতে আধ্যাত্মিক হৃদয়ের মৃত্যুর তুলনা চলে না। শারীরিক মৃত্যু বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, দুষ্টলোক এবং এমনকি জন্তুজানোয়ার সবার বেলায় প্রযোজ্য – যা হচ্ছে এই পার্থিব জীবন থেকে বিদায়। আধ্যাত্মিক মৃত্যু হচ্ছে এমনই এক অভিজ্ঞতা, অবিশ্বাসীরা প্রতিনিয়ত যার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে এবং যার ফলশ্র“তিতে আখিরাতে চিরতরে তারা জাহান্নামের আগুনে পতিত হবে।

মুহাম্মাদ আল রাওয়ী বলেন যে, শরীর থেকে যখন শারীরিক রূহ্ বিচ্ছিন্ন হয়, তখন সবাই স্পষ্টতই তা বুঝতে পারে – মানুষজন সেই প্রাণহীন শরীরকে নিয়ে গিয়ে সমাহিত করে, কেননা রূহের তিরোধানের পরে সেই দেহ আর কোন কাজ করতে পারে না। বলা যায় সেই দেহ একরকম অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। অথচ, একজন মানুষের উপর যখন কুর’আনের আর কোন প্রভাব থাকে না, তখন সে অবস্থাটাকে সনাক্ত করতে মানুষ প্রায়ই ব্যর্থ হয়। যখন কারো জীবন থেকে কুর’আন স্বরূপ রূহ্ হারিয়ে যায়, জীবন ও আখিরাতের নিরিখে আলোচ্য ব্যক্তির কি ক্ষতি সাধিত হয়, তা তারা দেখে না। তার চারপাশের সকলের কাছে তাকে জীবিত মনে হলেও, ঐ রূহ্ ছাড়া সত্যিকার অর্থে সে আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে মৃত এক ব্যক্তিতে পরিণত হয়। সে মৃত, কেননা সে এমনকি তার জীবনের উদ্দেশ্য কি, তাও বুঝতে অক্ষম।সে এমন একটা জীবন যাপন করে, যে জীবন তার সঠিক গন্তব্যের দিকে পরিচালিত নয়। আর তাই এক্ষেত্রে তার শারীরিক মৃত্যু সংঘটিত হলেও আসলে কিছু আসে যায় না।

উপরে উদ্ধৃত আয়াতে এবং কুর’আনের অন্যান্য আয়াতেও আল্লাহ্ পবিত্র কুর’আনকে এক আলো (নূর) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। আল্লাহ্ বলেন,

وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِنْ أَمْرِنَا مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ
“এভাবে আমি আমার আদেশের এক রূহ্ তোমার কাছে প্রেরণ করেছি। কিতাব কি অথবা ঈমান কি তা তুমি জানতে না। কিন্তু আমি একে (এই কুর’আনকে) আলো বানিয়ে দিয়েছি, যা দ্বারা আমার দাসদের যাকে ইচ্ছা তাকে আমি দিক নির্দেশনা দিই। নিশ্চয়ই তুমি (মানবকুলকে) সঠিক পথের দিক-নির্দেশনা দাও।”
(সূরা শূরা, ৪২:৫২)

আলো কোন ব্যক্তিকে তার সামনের পথ দেখায়। আলো দিয়ে সে তার চলার পথের বিপজ্জনক বস্তুসমূহ এড়িয়ে চলে এবং সে তার জন্য সবচেয়ে লাভজনক রাস্তা অনুসরণ করে গন্তব্যের দিকে যায়। যাহোক, আল ফাওযান বলছেন যে, কুর’আন যে ধরনের ‘আলো’ বা ‘নূর’ – তা আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা যে আলো অনুভব করি, তার চেয়ে ভিন্ন। এটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক আলো। এ আলো দিয়ে আমরা পার্থিব ও ধর্মীয় জগতের কি কি আমাদের জন্য লাভজনক তা সনাক্ত করতে পারি। এ আলোর সাহায্যে কেউ সত্যি থেকে মিথ্যাকে আলাদা করতে পারবে এবং জান্নাতমুখী পথ অনুসরণ করতে পারবে।

এই আলো মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকীম বা সরল পথ এবং আল্লাহর দয়া ও করুণার পথ দেখায়। আমাদের এই প্রচেষ্টায় যেমন প্রায়ই এ প্রসঙ্গ আসতে থাকবে – লক্ষ্যণীয় যে, এই আলো কেবল তাদের জন্যই লাভজনক যারা সেটাকে অনুসরণ করবে। আল্লাহ্ বলেন :

يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا (174) فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَاعْتَصَمُوا بِهِ فَسَيُدْخِلُهُمْ فِي رَحْمَةٍ مِنْهُ وَفَضْلٍ وَيَهْدِيهِمْ إِلَيْهِ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا
“হে মানবকুল! অবশ্যই তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে তোমাদের কাছে নিশ্চিত প্রমাণ অবতীর্ণ হয়েছে এবং আমি তোমাদের জন্য এক স্পষ্ট আলো নাযিল করেছি (এই কুর’আন), তাই যারা আল্লাহয় বিশ্বাস করেছে এবং একে (এই কুর’আনকে) আঁকড়ে ধরেছে, তিনি তাদের তাঁর করুণা ও দয়ার আশ্রয় দেবেন এবং তাদের এক সরলপথের মাধ্যমে তাঁর দিকে নিয়ে যাবেন।”
(সূরা নিসা, ৪:১৭৪-১৭৫)

উপরের আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, বিশ্বাসীদের জীবনের সত্যিকার চাবিকাঠিই হচ্ছে কুর’আন। কুর’আন ছাড়া একজন মানুষ তাই আধ্যাত্মিক মৃত্যু ও অন্ধকারের মাঝে পতিত। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের যেভাবে তাঁর নাযিলকৃত পথ-নির্দেশনা দ্বারা আশীর্বাদ করেন, সে সম্বন্ধে তিনি বলছেন :

أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
“যে মৃত ছিল এবং যাকে আমি জীবন দিলাম ও এমন এক আলো দান করলাম যার সাহায্যে সে মানুষের মাঝে চলাচল করতে পারে, সে কি ঐ ব্যক্তির মত, যে গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে – যা থেকে সে কখনোই বেরিয়ে আসতে পারবে না? ..”
(সূরা আন্‘আম, ৬:১২২)

(চলবে ………….ইনশা’আল্লাহ্!)

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

1 মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.