কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাওবা ও পাপমোচনকারী কিছু আমল পর্ব – ৪

0
1053
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪

তওবার শর্তাবলী

ওলামায়ে কেরাম কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীসের আলোকে তওবার শর্তাদি বর্ণনা করেন। কেননা তওবা নিছক মুখে উচ্চারণের মত বিষয় নয় বরং এর থেকে এমন আমল বিকাশ হবার বিষয় যা তওবাকারীর সত্যতার উপর ইঙ্গিতবহ। গোনাহটি যদি আল্লাহ ও বান্দার মাঝে হয় অর্থাৎ হাক্কুল্লাহ বিষয়ক হয়; তাহলে এখানে তিনটি শর্ত প্রণিধানযোগ্য:

  • গোনাহটি মূলোৎপাটিত করতে হবে।
  • কৃত গোনাহটির প্রতি অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে।
  • এই পরিপক্ক সংকল্প করা যে, ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কাজ করব না।

উপরোক্ত তিনটি শর্তের যদি কোনও একটি শর্ত ছুটে যায় তাহলে তওবা শুদ্ধ হয়নি বলে মনে করতে হবে।

  • পক্ষান্তরে যদি গোনাহটি হাক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত হয় তখন এক্ষেত্রে ৪টি শর্ত লক্ষণীয়। উপরিউক্ত তিনটি তো আছে। অপরটি হল, কোনো ভাইয়ের মাল হলে তা আদায় করে দিতে হবে। যদি অপরকে অপবাদ দেয়া হয়, আর এ জন্য দণ্ড আসে (হদ্দে কযফ) তাহলে তার সেই অপবাদ দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে কিংবা তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। পরচর্চাজনিত গোনাহ হলে তাকে বলে মাফ চেয়ে নিবে। আর এ সকল গোনাহ থেকে তওবা করে নিবে।
  • তওবা নিছক আল্লাহর উদ্দেশ্যেই হতে হবে। এ কথা মনে রাখতে হবে, ‘তওবাটি হতে হবে নিছক আল্লাহকে রাযী-খুশি করানোর উদ্দেশ্যে- ভিন্ন কোনও উদ্দেশ্যে নয় । যেমনটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা খালিছ আমল কিংবা তাকে উদ্দেশ্য করা আমল ছাড়া কিছুই কবুল করেন না।” [1]

তওবার নেপথ্যে কিছু নির্ধারিত ও স্থিতিশীল কাজ

১) তওবাসহ যাবতীয় কাজকর্মে নিয়ত খালেস করা। কেননা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহ তা‘আলা খালেস আমল কিংবা তাকে উদ্দেশ্য করা আমল ছাড়া কিছুই কবুল করেন না।” [2]

২) তওবাকারী তওবার পরও যথাসম্ভব স্থিতিশীলভাবে আমালে সালিহা করে যাবে। সর্বদা সৎকর্মের প্রাধান্য দেবে ও অসৎকর্ম পরিহার করবে। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় সৎকর্ম অসৎকর্মকে বিদূরিত করে।” [3]

আল্লাহর নবী মু‘আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-কে ইয়ামেনে প্রেরণকালে নসিহতস্বরূপ বলেছিলেন: ‘হে মু‘আয! যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, একটা গোনাহর কাজ করে ফেললে সঙ্গে সঙ্গে একটা নেক কাজ করে ফেলো। তাহলে তা ওই কৃত গোনাহকে মোচন করে দেবে। মানুষের স্রষ্টার সাথে সদাচার কর।’

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: ‘প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই লোক, যে সর্বদা এমনসব সৎকাজ করে যা তার মোচন করে ফেলে।’

৩) গোনাহর অনিষ্টতা উপলব্ধি, এর দ্বারা দুনিয়া আখিরাতের ক্ষতি অনুধাবন করা।

৪) যেখানে গোনাহ-চর্চা হয়, সেখান থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলা, যাতে ওইস্থানে গোনাহে লিপ্ত হবার সমূহ সম্ভাবনাটুকুও না থাকে।

৫) গোনাহর উপকরণটি তছনছ করে ফেলা, যেমন: মাদক ও খেলাধুলার সরঞ্জামাদি ভেঙ্গে ফেলা।

৬) নিজের আত্মিক উন্নতি সাধনকল্পে কোনও আলেমের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। কোনো দুষ্ট বন্ধুর সংমিশ্রণে না যাওয়া।

৭) কুরআন-হাদীসে বর্ণিত পাপীদের আযাব-গযবে ফেলা ভীতিকর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা।

৮) দ্রুত আগুয়ান শাস্তিসমূহ স্মরণ করা। যেমন আল্লাহ বলেন: “তোমরা প্রভুর দিকে ধাবিত হও এবং আজ্ঞাবহ হও আযাব আসার পূর্বেই, যখন তোমাদের কোনও সাহায্য করা হবে না।[4]

৯) সর্বদা আল্লাহর যিকর করতে থাকা। শয়তানকে দমন করার মহৌষধ হল যিকরুল্লাহ।

তওবার উপকারিতা

তওবা গুনাহ বিদূরক: আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “গোনাহ থেকে তওবাকারীর কোন গোনাহই থাকে না।” [5]

গুনাহকে নেকীতে রূপান্তরকারী: আল্লাহ বলেন:  “কিন্তু যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও আমলে সালিহা করে, এদের সকল পাপরাশি নেকীতে রূপান্তর করে দেন আল্লাহ তা‘আলা। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।[6]

তওবাকারীর হৃদয়কে পরিচ্ছন্ন করে দেয়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “বান্দা যখন কোন গোনাহর কাজ করে তখন তার অন্তরে এক ধরনের কালো দাগ পড়ে যায়। যদি ইস্তেগফার করে তাহলে এই দাগ দূরীভূত করে  তার অন্তর সূচালু, ধারালো ও পরিশীলিত হবে। আর এই দাগের কথা কুরআনেই আছে, খবরদার! তাদের অন্তরে দাগ রয়েছে যা তারা কামাই করেছে।[7]

তওবা সুখী সুন্দর জীবনের গ্যারান্টি: আল্লাহ বলেন: “আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অনন্তর তারই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং তিনি অধিক আমলকারীকে বেশি করে দেবেন।[8]

তওবা রিযিক ও শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যম: আল্লাহ তা‘আলা নূহ আলাইহিস সালামের ভাষায় বিধৃত করেন: “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র ধারায় বৃষ্টির নহর ছেড়ে দিবেন। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বাড়িয়ে দেবেন তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।[9]

তওবা দুনিয়া-আখিরাতের কামিয়াবী অর্জনের মাধ্যম: অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন: “যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও আমলে সালিহ করে, আশা করা যায় তার সফলকাম তারা হবে।[10]

অপর এক আয়াতে আছে: “পক্ষান্তরে যারা তওবা করবে, ঈমান আনবে ও আমলে সালিহ করবে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, কোন প্রকার যুলম করা হবে না।[11]

গোনাহ ও পাপের অপকারিতা: ইবনু কায়্যিম আল-জওযিয়্যাহ (রহ) তার প্রণীত ‘আদ-দা ওয়াদ দাওয়া’ পুস্তকে বর্ণনা করেন, গুনাহর ক্ষতি অনেক। নিম্নে এর কয়েকটি বর্ণনা করা হলো।

  1. জ্ঞান থেকে বঞ্চনা
  2. ইবাদত/আনুগত্য থেকে বঞ্চনা
  3. নেক কাজের কম সৌভাগ্য হওয়া
  4. গোনাহকারীর মর্যাদা লোপ পাওয়া
  5. মন থেকে হায়া লজ্জা দূর হওয়া
  6. বরকত চলে যাওয়া।
  7. বক্ষ সংকুচিত হওয়া
  8. অন্তরে মোহর পড়া
  9. অপদস্ততা নেমে আসা
  10. অশুভ পরিণতি হওয়া
  11. আখেরাতে আযাবের সম্মুখীন হওয়া

কীভাবে তওবা করব

তওবার পরের প্রথম কাজ হল, যে গোনাহটির জন্য তওবা করছি, তা সবার আগে ছেড়ে দেওয়া। কেউ যেন একথা মনে না করে যে, সামান্য কিছু গোনাহই ছেড়ে দিই। এক্ষেত্রে সকল গোনাহ পরিহার করাই উত্তম। এরপর আপনি সংকল্প করবেন যে, এই গোনাহ আর করবেন না। কৃত গোনাহর প্রতি অনুতপ্ত হবেন। ভবিষ্যতে এতে লিপ্ত হবার কোন সুযোগ রাখবেন না। এরপর পূর্ণক্রমে সৎকর্মে লেগে যাবেন।

উত্তম হয় যদি আরো একটি কাজ করেন যে, পূর্ণ উযু করে দু‘রাকাত নামায আদায় করেন। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কোনো লোক গোনাহ করে যদি ওযু করে দু’রাকাত নামায পড়ে ইস্তেগফার করে তাহলে তার গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।[12]

পরে তিনি এই আয়াত তেলওয়াত করেন: “তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের ওপর যুলুম করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ্ ছাড়া কেউ পাপ ক্ষমা করবেন না। তারা নিজেদের কৃতর্কমের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে না এবং জেনে শুনে তাই করতে থাকে না।[13]

অধিক যিকির আযকর ও ইস্তেগফার এবং আমালে সালিহ করা উচিত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন: সৎকর্ম অসৎকর্মকে বিদুরিত করে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একটি বদ কাজ করলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি নেক কাজ  করে ফেল। তাহলে কৃত গোনাহটি বিদুরিত হবে। কুরআনে বর্ণিত পাপী ও পাপ আযাব গযবের আয়াতগুলো ভেবে চিন্তে গভীর মনোযোগের সাথে পড়তে হবে।

পাপ মোচনকারী কিছু আমল

আমরা এতক্ষণ তওবা বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। এক্ষণে পাপ মোচনকারী কিছু আমলের কথা বলব। যা কুরআন ও সুন্নাহ নিঃসৃত। যেমন:

সুন্দর ও যথাযথভাবে ওযু করা ও মসসিদে যাওয়া: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমি তোমাদের কী এমন আমলের কথা বলব না, যদ্দারা গোনাহ মাফ হয়ে মর্যাদা বৃদ্ধি হবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কেন নয় বলুন হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি বললেন, কঠিন অবস্থায় সুন্দর রূপে উযু করা, ঘন ঘন মসজিদে যাওয়া, এক নামাযের পর আরেক নামাযের অপেক্ষায় থাকা। এটাই হচ্ছে সীমানাপ্রহরা, এটাই সীমানাপ্রহরা, এই হচ্ছে তোমাদের জন্য সীমানাপ্রহরা।[14]

অপর এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ বলেন: “রাতে আমার প্রভু আমার কাছে সবেচে সুন্দর অবয়বে এসে বললেন, হে মুহাম্মদ! জানেন, উর্ধালোকে কী বিষয়ে বাদানুবাদ চলছে? বললাম, হ্যাঁ, জানি। কাফ্ফারা ও মর্যাদা বৃদ্ধি নিয়ে, জামাতে নামায পড়ার পদক্ষেপ নিয়ে, কঠিন সময়ে সুন্দররূপে উযু করা নিয়ে এবং এক নামাযের পর আরেক নামাযের জন্য অপেক্ষা বিষয়ে। যে এগুলো সংরক্ষণ করবে সে কল্যাণে থাকবে ও কল্যাণের সাথে মারা যাবে । আর তার গোনাহ মায়ের জন্ম দেওয়া দিনের মত নিষ্পাপ হবে।[15]

আরাফা ও আশুরার দিন রোযা রাখা: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আরাফাহ দিনের রোযা, আমি মনে করি আল্লাহ তা‘আলা এর দ্বারা এক বছর আগের ও এক বছর পেছনের গোনাহ মাফ করে দেবেন। আর আশুরার রোযা, আমি মনে করি আল্লাহ তা‘আলা এক বছর পেছনের গোনাহ মাফ করে দেন।[16]

রমযানের কিয়ামুল লাইল: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে লোক ঈমান ও ছাওয়াবের নিয়তে রমজানে কিয়ামুল লাইল করবে তার পেছনের সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।[17]

কবুল হজ্জ: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে লোক হজ্জ করল কিন্তু অশ্লীল বাক্যব্যয় ও নাফরমানি করল না। মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ট দিনের ন্যায় সে নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফিরবে।[18]

তিনি আরো বলেন: “কবুল হজ্জের বিনিময় জান্নাত ছাড়া কিছু নয়।[19]

কৃত গোনাহর মোকাবেলায় নেক কাজ করা: আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় নেক কাজগুলো গোনাহকে বিদূরিত করে দেয়।[20]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামান প্রেরণ কালে ওসিয়াত করে বললেন: “যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, কখনো অসৎকাজ করে ফেললে তৎক্ষণাৎ একটি নেক করা করে ফেল, তাহলে ওই অসৎ কাজটি আমলনামা থেকে মুছে যাবে। মানুষের সাথে সদাচারের সাথে মেলামেশা কর।[21]

সালাম ও সুন্দর কথা বিনিময়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “সালাম ও উত্তম বাক্য বিনিময় হচ্ছে মাগফেরাত বা ক্ষমা অবধারিত করার অন্যতম মাধ্যম।[22]

ঋণগ্রস্তকে সময় দেওয়া: আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “জনৈক ব্যবসায়ী মানুষের কাছে ঋণ দিত, যখনই সে কোনো ঋণদাতাকে অভাবগ্রস্ত দেখত তখনই তার লোকদের বলত, তাকে একটু সুযোগ দাও। হয়ত আল্লাহ আমাদের গোনাহ মাফ করবেন। পরে আল্লাহ তা‘আলা তার গোনাহ মাফ করেছিলেন।[23]

পাঁচ ওয়াক্ত নামায, জুমআ ও রমযানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুমআ থেকে আরেক জুমআ, এক রমজান থেকে আরেক রমজানের মাঝে কবিরা গোনাহ পরিহার করলে এর মধ্যকার সকল গোনাহর কাফ্ফারা হয়ে যায়।[24]

সালাতের ওজু করা: হাদীসে এসেছে, ‘উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি সকলকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উযু করে দেখাচ্ছিলেন। উযু শেষে তিনি বললেন: “আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এই উযুর মত উযু করে দু‘রাকাত নামায পড়বে যে সালাতের মাঝে নিজের বিষয়ের কোনও কথা বলবে না; তার পেছনের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে।[25]

যিকর-আযকার গোনাহ বিদূরক: সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে লোক মুয়াযযিনের আযান শুনে বলে, আমিও সাক্ষ্য দিই এক আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই আর মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি রব হিসেবে আল্লাহকে, নবী হিসেবে মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এবং দীন হিসেবে ইসলামের উপর সন্তুষ্ট আছি; তাহলে তার সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।[26]

মু‘আয ইবনে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যে লোক খাবার শেষে এই দোআ: “আলহামদুলিল্লাহি আত‘আমানী হাযাত ত্বায়ামা। ওয়া রাযাকানিহি মিন গায়রি হাওলিম মিন্নি ওয়ালা কুওয়াতা”, পড়বে, তার পেছনের সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” [27]

পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়: বুখারী ও মুসলিমে আছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আচ্ছা! যদি তোমাদের কারো ঘরের সামনে একটি নদী থাকে আর তোমাদের কেউ যদি সে নদীতে দৈনিক পাঁচবার গোসল করে তাহলে তার শরীরে কোনও ময়লা থাকতে পারে কী? তারা বললেন; না, কোনও ময়লা থাকতে পারে না। তিনি বলেন যে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযকে এর সাথে তুলনা করে নাও। এর দ্বারা আল্লাহ গোনাহ ধুয়ে দেন।[28]

নামাযে হেটে যাওয়া: আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: “কারণ যে কেউ সুন্দররূপে ওযু করে এরপর মসজিদের উদ্দেশ্যে বেরোয়; উদ্দ্যেশ্য নামায পড়া, তাহলে তাকে কদমে কদমে নেকী দেওয়া হয় এবং কদমে কদমে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়।[29]

বেশী বেশী সিজদা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:.”তুমি বেশী বেশী সিজদা করবে, কেননা তোমার প্রতিটি সিজদায় আল্লাহ তা‘আলা মর্যাদা বৃদ্ধি এবং গোনাহ মাফ করবেন।[30] এটি মূলত আল্লাহর কালাম: واسجد واقترب ‘এবং সিজদা কর ও নিকটবর্তী হও’ এর নেপথ্য নির্দেশ।

যার আমীন বলা ফেরেশতাদের আমিনের সাথে মিলে যাবে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ইমাম গাইরিল মাগদূবী আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বাল্লীন বললে: “তোমরা আমীন বল। যার আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে মিলে যাবে তার পেছনের সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।[31]

কিয়ামুল লাইল: আবু উমামা বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বলেন: “তোমরা কিয়ামুল লাইল করবে, কেননা এটি তোমাদের পূর্ববর্তী সালেহীনের প্রতীক এবং এটি তোমাদের প্রভুর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, গোনাহ বিদূরক ও পাপ নিরোধক।[32]

আল্লাহর রাহে সংগ্রাম করে শহীদ হওয়া: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “ঋণ ছাড়া শহীদের সকল গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।[33]

আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ তা‘আলা মু‘মিনদের জান-মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।[34]

লাগাতার হজ্জ ও ওমরা করে যাওয়া: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তোমরা লাগাতার হজ্জ-ওমরা করে যাও। কেননা এর অনুসরণ দ্বারা দারিদ্র্য ও গোনাহ মাফ হয়। যেভাবে কামারের হাঁপর লোহার মরিচা দূর করে।[35]

সাদাকাহ: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “যদি তোমরা প্রকাশে দান-খয়রাত কর, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি খয়রাত গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের কিছু গোনাহ দূর করে দিবেন। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের কাজ-কর্মের খুব খবর রাখেন।[36]

রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “সাদাকাহ ঠিক সেভাবে গোনাকে দূর করে যেভাবে পানি আগুনকে নির্বাপিত করে।[37]

দণ্ডবিধান বাস্তবায়ন: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনও কাজ বান্দা করে ফেরার পর যদি তার উপর দণ্ড প্রয়োগ করা হয় তাহলে তা তার গোনাহর কাফ্ফারা হয়ে যায়।[38]

আল্লাহর নৈকট্যের আশায় যিকরের মজলিসে গমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কোন সম্প্রদায় যখন আল্লাহকে রাজি-খুশী করার উদ্দেশ্যে যিকরের জন্য জমায়েত হয় তখন আকাশ থেকে জনৈক ঘোষণাকারী ঘোষণা করেন যে, তোমরা সকলে (প্রভুর) ক্ষমা নিয়ে প্রত্যাবর্তন করো আর তোমাদের সকল গোনাহ নেকীতে পরিণত করে দেওয়া হয়েছে।[39]

উপসংহার

আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। বান্দার প্রতি রহমদিল। সুতরাং তাঁর দরবারে আমাদের বিনম্রচিত্তে ইস্তেগফারের উদ্দেশ্যে নত হওয়া দরকার। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার, গোনাহ যত দীর্ঘ হবে ততই শেকড় মজবুত হবে। যেমন: কেউ একটি গাছ উপড়াতে গিয়েও উপড়াল না বরং ফেলে রাখল, ভাবল পরের বছর উপড়ালেও চলবে কিন্তু পরের বছর এর শেকড় আরো মজবুত হল আর লোকটার শক্তিও কমে গেল, সুতরাং সে কি করে গাছ উপড়াবে? গোনাহকে ফেলে রাখলে পরিণতি এই-ই হয়। তাই আমাদের আজই এবং এখনই তওবা করা দরকার।

পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩ | পর্ব ৪


[1] সুনানে নাসাঈ: ৩১৪০। সহীহুল জামে‘,নাসিরুদ্দিন আলবানী, আল মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় প্রকাশ, হাদীস নং: ৮৫৬।
[2] প্রাগুক্ত।
[3] সূরা হুদ: ১১৪।
[4] সূরা যুমার: ৫৪।
[5] ইবন মাজাহ: ৪২৫০।
[6] সূরা ফোরকান: ৬৯।
[7] জামে তিরমিযি ,খ ৫,পৃ ৪৩৪, হাদীস নং ৩৩৩৪।
[8] সূরা হুদ:৩।
[9] সূরা নূহ: ১০-১২।
[10] সূরা কাসাস-৬৭।
[11] সূরা মারয়াম: ৬০।
[12] জামে‘ তিরমিযি,খ ,পৃ.৪০৬। আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন।
[13] সূরা আলে-ইমরান: ১৩৫।
[14] সহীহ তারগীব তারহীব, নাসিরুদ্দিন আলবানী, মাকতাবাতুল মা‘আরিফ (রিয়াদ-১৯৮৮) ৩য় মুদ্রণ, হাদীস নং:১৮৫।
[15] প্রাগুক্ত: হাদীস নং ১৮৭।
[16] জামে তিরমিযি ,খ ৩,পৃ:১১৫ ও ১১৭
[17] সহীহ বুখারী ,খ:১,পৃ ১৬,হাদীস নং৩৭।
[18] সহীহ বুখারী ,খ:২,পৃ ১৩৩, হাদীস নং১৫২১।
[19] সহীহ বুখারী, ফতহুল বারী, ৩/৩৮২।
[20] সূরা হুদ-১১৪।
[21] তিরমিযি,খ ৪,পৃ: ৩৫৫।
[22] আলবানী, সিলসিলাহ (রিয়াদ:মাকতাবাতুল মা‘আরিফ:১৯৯২) ১ম প্রকাশ,হাদীস নং ১০৩৫।
[23] সহীহ বুখারী,খ ৩,পৃ:৫৮,হাদীস নং: ২০৭৮।
[24] সহীহ মুসলিম,শরহে নববী, খ.৩, পৃ.১২০।
[25] বুখারী: ১৫৯; মুসলিম: ২২৬।
[26] সহীহ মুসলিম, শরহে নববী প্রাগুক্ত, খ.৪, পৃ.৩০৯।
[27] সহীহ মুসলিম, শরহে নববী, প্রাগুক্ত।
[28] সহীহ বুখারী, ফতহুল বারী, খ.২, পৃ.১১।
[29] সহীহ বুখারী,ফতহুল বারী,খ.২, পৃ.৩১।
[30] শরহে মুসলিম,ইমাম নববী, খ.৪,পৃ.৪৫১।
[31] সহীহ বুখারী,ফতহুল বারী, খ.২, পৃ.২৬৬।
[32] এরওয়াউল গালীল,আলবানী, খ.২, পৃ.৩৩।
[33] সহীহ মুসলিম, শরহে ইমাম নববী, খ.১৩,পৃ.৩৩।
[34] সুরা তাওবাহ: ১১১।
[35] সুনানে ইবনে মাজাহ ,খ:২, পৃ:৯৬৪, হাদীস নং: ২৮৮৭।
[36] সূরা আল বাকারা: ২৭১।
[37] জামে তিরমিযি খ-২,পৃ-৫১২, হাদীস নং: ১৬৪।
[38] মুসতাদরাকে হাকেম, খ.৪, পৃ.১৪২।
[39] মুসনাদে আহমাদ, খ-৩,পৃ. ১৪২।

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here