সুস্বাগত মাহে রমযান

1
1176
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখক: আলী হাসান তৈয়ব  |  সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

বাড়িতে বিশেষ কোনো বিশেষ মেহমান আসার তারিখ থাকলে আমরা পূর্ব থেকেই নানা প্রস্তুতি নেই। ঘরদোর পরিষ্কার করি। বিছানাপত্র সাফ-সুতরো করি। পরিপাটি করি বাড়ির পরিবেশ। নিশ্চিত করি মেহমানের যথাযথ সম্মান ও সন্তুষ্টি রক্ষার সার্বিক ব্যবস্থা। তারপর অপেক্ষা করতে থাকি মেহমানকে সসম্মানে বরণ করে নেবার জন্য। আমাদের দুয়ারেও আজ কড়া নাড়ছে এক বিশেষ অতিথি। এমন অতিথি যার আগমনে সাড়া পড়ে যায় যমীনে ও আসমানে! আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায় সমগ্র সৃষ্টি জগতে!

আল্লাহর হাবীবের মুখেই শুনুন সে কথা: ‘যখন রমযানের প্রথম রাত্রি আগমন করে শয়তান এবং অবাধ্য জিনদের শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের সকল দরোজা বন্ধ করে দেয়া হয়; খোলা রাখা হয় না কোন দ্বার, জান্নাতের দুয়ারগুলো অর্গলমুক্ত করে দেয়া হয়; বদ্ধ রাখা হয় না কোন তোরণ। এদিকে একজন ঘোষক ঘোষণা করেন,‘হে পুণ্যের অনুগামী, অগ্রসর হও। হে মন্দ-পথযাত্রী থেমে যাও’।আবার অনেক ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আর এমনটি করা হয় রমযানের প্রতি রাতেই’।   [ তিরমীযী : ৬৮২; ইবনমাজা : ১৬৪২; ইবনহিব্বান : ৩৪৩৫সহীহুত-তিরমিযীতে শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই রমযান আসার পূর্ব থেকেই রমযানের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। শাবান মাসে অধিকহারে নফল রোযা পালনের মাধ্যমে তিনি রমযানে সিয়াম সাধনার আগাম প্রস্তুতি নিতেন।পূর্বানুশীলনকরতেন। তদুপরি তিনি সাহাবীদেরকে রমযানের শুভাগমনের সুসংবাদ দিতেন। তাঁদেরকে শোনাতেন রমযানের ফযীলতের কথা। তাঁরা যেন রমযানে ইবাদত-বন্দেগীতে বেশি করে আত্মনিয়োগ করতে পারেন। নেকী অর্জনে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে প্রত্যয়ী হন।

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গী-সাথীদের এ মর্মে সুসংবাদ শোনাতেন, ‘তোমাদের সমীপে রমযান মাস এসেছে। এটি এক মোবারক মাস। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর এ মাসের রোযা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দ্বার খোলা হয়। বন্ধ রাখা হয় জাহান্নামের দরোজা। শয়তানকে বাঁধা হয় শেকলে। এ মাসে একটি রজনী রয়েছে যা সহস্র মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে যেন যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল’।  [নাসায়ী : ২৪২৭; মুসনাদ আহমাদ : ৮৯৭৯; শুআবুল ঈমান : ৩৩২৪ শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ]

সুতরাং আমাদের কর্তব্য হল, এ মাস আসার আগেই এর যথার্থ মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। নীরবে এসে নীরবে চলে যাওয়ার আগেই এ মহান অতিথির যথাযথ সমাদর করা। এ মাস যেন আমাদের বিপক্ষে দলীল না হয়ে দাঁড়ায় সে জন্য প্রস্তুতি সম্মন্ন করা। কারণ মাসটি পেয়েও যে এর উপযুক্ত মূল্য দিল না, বেশি বেশি পুণ্য আহরণ করতে পারল না এবং জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের পরোয়ানা পেল না, সে বড় হতভাগ্য। সবচে’ভয়ংকর ব্যাপার হলো এমন ব্যক্তি আল্লাহর ফেরেশতা ও খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদ দু‘আর অধিকারী। কারণ এমন ব্যক্তির ওপর জিবরীল আলাইহিস সালাম লানত করেছেন আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে ‘আমীন’বলেছেন! কেননা হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা মিম্বরে আরোহণ করলেন।অতপর বললেন, আমীন, আমীন আমীন।জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, এটা আপনি কী করলেন? তিনি বললেন, জিবরীল আমাকে বললেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধুসরিত হোক যার সামনে রমযান প্রবেশ করলো অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না।আমি শুনে বললাম, আমীন (আল্লাহ কবূল করুন)।এরপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধুসরিত হোক যার সামনে আপনার কথা আলোচিত হয় তথাপি সে আপনার ওপর দরূদ পড়ে না।তখন আমি বললাম, আমীন (আল্লাহ কবূল করুন)।অতপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধুসরিত হোক যে তার পিতামাতা বা তাঁদের একজনকে পেল অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না।তখন আমি বললাম, আমীন (আল্লাহ কবূল করুন)।[বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ : ৬৪৬; শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। সহীহ ইবন খুযাইমাহ : ১৮৮৮; বাইহাকী : ৮২৮৭ ]

রমযানকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে সুন্নত হল, রমযানের চাঁদ দেখে নিম্নের দু‘আটি পাঠ করা।আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন চাঁদ দেখতেন, তখন তিনি বলতেন হে আল্লাহ আপনি একে আমাদের ওপর বরকত ও ঈমানের সঙ্গে এবং সুস্থতা ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন, তোমার এবং আমার রব হলেন আল্লাহ।  [তিরমিযী : ৩৪৫১, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন। মুসনাদ আহমদ : ১৩৯৭। সহীহ ইবন হিব্বান : ৮৮৮ ]

অতপর একে স্বাগত জানানোর সর্বোত্তম উপায়, রমযানকে সকল গুনাহ থেকে বিশেষ তাওবার সঙ্গে গ্রহণ করা। কারণ এটাতো তাওবারই মৌসুম। এ মাসে তাওবা না করলে তাওবা করবে কবে? অনুরূপভাবে রমযানকে স্বাগত জানানো ইবাদাতে দ্বিগুণ চেষ্টা, দান-সাদাকা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-ইস্তেগফার এবং অন্যান্য নেক আমল অধিক পরিমাণে করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। এবং এ দু‘আর মাধ্যমে- হে আল্লাহ, আমাদেরকে তোমার সন্তুষ্টি মত রোযা রাখার এবং তারাবীহ আদায় করার তাওফীক দাও।

তাই আসুন আমরা এ মহান অতিথিকে বরণ করে নিয়ে এ মাসের দিন-রাত্রিগুলো এমন আমালের মধ্য দিয়ে কাটানোর প্রস্তুতি নেই যা আমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার প্রিয় করে তুলবে। আমরা যেন সেসব লোকের দলে অন্তর্ভুক্ত না হই যারা রসনা তৃপ্তির রকমারি আয়োজন ও সালাত বরবাদ করার মাধ্যমে রমযানকে স্বাগত জানায়। আমরা যেন সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত না হই যারা রমযান পাওয়ার পরও আল্লাহর কাছে মাগফিরাত না পেয়ে নিজেকে আল্লাহর ফেরশতা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বদ দু‘আর যোগ্য বানায়।আল্লাহ তা‘আলা আমাদের কবুল করুন। আমীন।

ওয়েব সম্পাদনাঃ মুহাম্মাদ মাহমুদ ইবন গাফফার

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

1 মন্তব্য

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here