কি বীজ বপন করছেন সে ব্যাপারে সতর্ক হোন


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

ভাষান্তর : জহিরুল কাইয়ূম । সম্পাদনা : আব্‌দ আল-আহাদ

plant-a-seed

সম্রাট ক্রমশ বৃদ্ধ হয়ে পড়ছেন। তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর একজন উত্তরসূরী দরকার। নিজের কোনো সহকারী বা সন্তানকে বাছাই না করে তিনি আলাদা কিছু করার কথা ভাবছেন। তাই তিনি একদিন রাজ্যের সকল তরুণদের একসঙ্গে ডেকে পাঠালেন। সবাইকে বললেন, “রাজ্যের শাসনকার্য থেকে সরে যাওয়ার সময় হয়েছে আমার। কাজেই নতুন একজন সম্রাট নির্বাচন করারও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমি তোমাদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনীত করবো।”

সম্রাটের কথা শুনে তরুণরা সব হতবাক! কিন্তু সম্রাট বলতে থাকলেন, “আজকে আমি প্রত্যেককে একটি করে বীজ দেবো। এক বিশেষ ধরণের বীজ। আমি চাই, সবাই বীজটি বপন করে, তাতে সেচ দেবে এবং বীজ থেকে যা উৎপন্ন হয়, তা-ই নিয়ে আজ থেকে একবছর পর আবার এখানে ফিরে আসবে। তোমাদের চারাগাছগুলোর মধ্য থেকে আমি যার চারাটিকে পছন্দ করব, সেই হবে পরবর্তী সম্রাট!”

সেদিন আবদুল্লাহ নামে একটি ছেলে সেখানে উপস্থিত ছিল। অন্যদের মতো সেও একটি বীজ পেলো। বাড়ি গিয়ে সে তার মাকে অতি উৎসাহের সাথে পুরো ঘটনাটি খুলে বলল। সব শুনে ছেলেকে মা একটি টব এবং বীজ বপনের জন্য মাটি দিয়ে সাহায্য করলেন। আবদুল্লাহ তার বীজটি বপন করে যত্নের সাথে পানি দিয়ে পরিচর্যা করতে লাগল। প্রতিদিন টবে পানি দিয়ে সে আগ্রহভরে দেখে কোনো চারা গজিয়েছে কিনা। প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর, অন্যান্য তরুণদেরকে তাদের বীজ থেকে গজানো চারা নিয়ে কথা বলতে শোনা গেল।

আবদুল্লাহ তার বপন করা বীজটি বারবার দেখতে থাকল। কিন্তু চারা গজানোর কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এমনি করে ৩ সপ্তাহ, ৪ সপ্তাহ, ৫ সপ্তাহ পেরিয়ে গেল। কোনোকিছুই দৃষ্টিগোচর হলো না। ততদিনে অন্যরা তাদের চারাগাছ নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছে । অথচ আবদুল্লার বীজ থেকে কোনো চারাই গজায়নি তখনও। ফলে আবদুল্লার মধ্যে একটা ব্যর্থতাবোধ দেখা দিলো। ছয়মাস পেরিয়ে গেলেও লিংয়ের বীজ থেকে কোনো চারা গজালো না। সে বুঝতে পারল বীজটাকে সে নষ্টই করেছে।

সবার চারাগাছ বড় হয়ে গেল কিন্তু আবদুল্লার চারাগাছের কোন খবর নেই। আবদুল্লাহ তার বন্ধুদের কিছু বলল না। শুধু অপেক্ষায় থাকল কখন তার বীজটি থেকে চারা জন্মাবে।

দেখতে দেখতে একটি বছর পেরিয়ে গেল। রাজ্যের সকল তরুণরা তাদের চারা নিয়ে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হলো। আবদুল্লাহ তার মাকে বলল, সে খালি টব নিয়ে যাবে না। সততার সাথে বাস্তবতাকে স্বীকার করতে গিয়ে তার অনেক কষ্ট হলো। তবুও ঘটনার প্রতি সৎ থেকে মায়ের কথা অনুযায়ী খালি টব নিয়েই সে রাজ দরবারে উপস্থিত হলো। উপস্থিত হয়ে আবদুল্লাহ অন্য তরুণদের হরেক রংয়ের চারাগাছ দেখে সে বিস্মিত হলো। আকার এবং আকৃতিতেও চারাগুলো বেশ বাহারি আর চমৎকার দেখাচ্ছিল। আবদুল্লাহ দরবারের মেঝেতে খালি টব রাখতেই অন্যরা হাসিতে ফেটে পড়ল। কয়েকজন তার প্রতি সমবেদনা দেখাতে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, “আরে, চেষ্টা তো আর কম করনি!”

সম্রাট আসলেন, তরুণদের স্বাগত জানালেন এবং কক্ষ পরিদর্শন করলেন। আবদুল্লাহ কেবল পেছনে লুকানোর চেষ্টা করলো। “তোমরা কি চমৎকার চারাগাছ এবং ফুল ফলিয়েছ!” সম্রাট বললেন, “আজ তোমাদের একজনকে পরবর্তী সম্রাট হিসেবে নিয়োগ দেবো।” হঠাৎ করে সম্রাট কক্ষের পেছনে আবদুল্লাহ-কে খালি একটা টবসহ লক্ষ্য করলেন। তাকে সামনে নিয়ে আসার জন্য সম্রাট প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন। আবদুল্লাহ ভয় পেয়ে গেল এবং ভাবল, “সম্রাট জেনে গেছে আমি ব্যর্থ। আমাকে আজ হয়তো মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হবে!”

আবদুল্লাহ সামনে আসার পর সম্রাট তার নাম জানতে চাইলেন । সে জবাব দিলো, “আমার নাম আবদুল্লাহ।” তরুণরা সবাই হাসতে লাগল এবং তাকে নিয়ে মজা করতে লাগল। সম্রাট সবাইকে শান্ত হতে বললেন। তিনি আবদুল্লাহর দিকে তাকিয়ে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন, “তোমাদের নতুন সম্রাটকে দেখে নাও! তার নাম আবদুল্লাহ।” আবদুল্লার কোনোকিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না। চারাগাছ তো দূরের কথা, তার বীজটি  অঙ্কুরিতই হয়নি। সে কীভাবে নতুন সম্রাট হবে? সম্রাট বলেই গেলেন, “আজ থেকে একবছর আগে এখানে উপস্থিত সবাইকে একটি করে বীজ দিয়েছিলাম। আমি তোমাদেরকে বীজটি বপন করে, পানি দিতে বলেছিলাম এবং একবছর পর আমার কাছে নিয়ে আসতে বলেছিলাম। আসলে আমি তোমাদের সবাইকে গরম পানিতে সিদ্ধ করা বীজ দিয়েছিলাম যেগুলো থেকে চারা গজানো সম্ভব ছিল না। আবদুল্লাহ ব্যতীত তোমরা সবাই আমাকে দেখানোর জন্য চারা, গাছ এবং ফুল নিয়ে এসেছ। যখন বুঝতে পেরেছ যে, বীজটি গজাবে না, তখন তোমরা আমার দেওয়া বীজটির বদলে অন্যকোনো বীজ বপন করেছিলে। একমাত্র আবদুল্লাহ হচ্ছে সেই তরুণ যে সততা ও সাহসের সাথে আমার দেওয়া সেই বীজসহ খালি টব নিয়ে  উপস্থিত হয়েছে। অতএব, সেই হবে নতুন সম্রাট!”

যদি সততা বপন করেন, ফলবে বিশ্বাস।

যদি সদ্‌গুণ বপন করেন, জুটবে বন্ধু।

যদি বিনয় বপন করেন, ফলবে মহত্ত্ব।

যদি অধ্যবসায় বপন করেন, আসবে বিজয়।

যদি বিবেচনাবোধ বপন করেন, ফলবে সম্প্রীতি।

যদি কঠোর পরিশ্রম বপন করেন, ফলবে সাফল্য।

যদি ক্ষমাশীলতা বপন করেন, ফলবে মীমাংসা।

যদি স্পষ্টবাদীতা বপন করেন, জন্ম নেবে অন্তরঙ্গতা।

যদি ধৈর্য বপন করেন, ফলবে উন্নতি।

যদি আস্থা-বিশ্বাস বপন করেন, সম্ভব হবে অলৌকিক কিছু।

পক্ষান্তরে,

যদি অসততা বপন করেন, ফলবে অবিশ্বাস।

যদি স্বার্থপরতা বপন করেন, ফলবে সঙ্গীহীনতা।

যদি অহংকার বপন করেন, জুটবে ধ্বংস।

যদি পরশ্রীকাতরতা বপন করেন, জন্ম নেবে সমস্যা।

যদি অলসতা বপন করেন, ফলবে স্থবিরতা।

যদি তিক্ততা বপন করেন, ফলবে জনবিচ্ছিন্নতা।

যদি লোভ বপন করেন, ফলবে কেবলই ক্ষতি।

যদি পরচর্চা বপন করেন, জন্ম নেবে শত্রু।

যদি দুশ্চিন্তা বপন করেন, ফলবে কপালের ভাঁজ।

যদি পাপ বপন করেন, ফলবে অপরাধ।

তাই যা বপন করছেন, সে ব্যাপারে সতর্ক হোন। কারন আজকে যা বপন করবেন তা-ই নির্ধারণ করবে আপনার আগামীর অর্জন। আজকের ছেটানো বীজ আপনার আগামীর জীবনকে হয় ভালো নয়তো আরও মন্দের দিকে নিয়ে যাবে — এই জীবন হতে পারে আপনার নিজের কিংবা আপনার ভবিষ্যৎ বংশধরের। হ্যাঁ, কোনো একদিন, কোনো না কোনো একভাবে আপনাকে আপনার বীজের ফসল ভোগ করতেই হবে। আপনি আজকে যে ইচ্ছা বা পছন্দ বপন করেছেন, আজকে আপনার যা করতে ভালো লাগে, তার মূল্য আপনাকেই পরিশোধ করতে হবে — করতেই হবে।।


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

আপনার মন্তব্য লিখুন