মক্কার মুশরিকরা কেমন ছিল?


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

মক্কার মুশরিকদের যদি জিজ্ঞাসা করা হত, বলতো, তোমাদের কে সৃষ্টি করেছেন? এই আকাশ-জমিন কে সৃষ্টি করেছেন? আশ্রয় দেয়ার মালিক কে? কার হাতে সকল কিছুর কর্তৃত্ব? এই প্রশ্নগুলোর জবাবে তারা বলতো, আল্লাহ।

194

 

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ বল,তোমরা যদি জান তবে বলএ যমীন ও এতে যারা আছে তারা কার? অচিরেই তারা বলবেআল্লাহর । বল,তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না? বলকে সাত আসমানের রব এবং মহা আরশের রবতারা বলবে,আল্লাহ। বলতবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না? বলতিনি কে যার হাতে সকল কিছুর কর্তৃত্বযিনি আশ্রয় দান করেন এবং যাঁর ওপর কোন আশ্রয়দাতা নেই? যদি তোমরা জান। তারা বলবেআল্লাহ। বলতবুও কীভাবে তোমরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছ? [সূরা মুমিনূনঃ ৮৪-৮৯]
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেনঃ আর তুমি যদি জিজ্ঞাসা কর,আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেনতারা অবশ্যই বলবেমহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই কেবল এগুলো সৃষ্টি করেছেন। [সূরা যুখরফঃ ৯]

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেনঃ অর্থঃ আর তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করকে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেতারা অবশ্যই বলবেআল্লাহ। তবু তারা কীভাবে বিমুখ হয়? [সূরা যুখরফঃ ৮৭]

অর্থাৎ আয়াতগুলোর অর্থ পর্যালোচনা করলে আমরা পাইঃ সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্ব হিসেবে আল্লাহ তা’আলাকে মেনে নেয়ার পরও এই মুশরিকরা কিন্তু মুসলিম হতে পারে নি! বিষয়টি ভেবে দেখার দাবী রাখে।

 

নিম্নে কিছু পয়েন্ট আলোচনা করা হল যে কারণে মুশরিকগণ মুসলিম হতে পারেন নি।

১. আল্লাহ তাআলার রবুবিয়াতের স্বীকৃতি প্রদান কিন্তু উলুহিয়াতে অস্বীকৃতি করাঃ
সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল – এই বিষয়গুলো তাওহীদুর রবুবিয়াতের সাথে সম্পৃক্ত। মক্কার মুশরিকরা তাওহীদুল উলুহিয়া তথা সকল প্রকার ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যে এই বিষয়টিতে অস্বীকার করে তারা নানা রকম রসম-রেওয়াজের মাধ্যমে তাদের ইবাদতগুলো সম্পাদন করতো। তারা যুক্তি প্রদর্শন করতো এই নানা রকম রসম-রেওয়াজ, মূর্তিপূজাতাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য করে দিবে অথচ এই বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা কোন দলীল নাযিল করেন নি। যার ফলশ্রুতিতে মক্কার মুশরিকগণ মুসলিম হতে পারেনি।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেঃ জেনে রেখ,আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলেআমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদাত করি যেতারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।[সূরা যুমারঃ ৩]
আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন,আল্লাহর নিকট দোয়া চাইতে সুন্নাহ বহির্ভূত মাধ্যম গ্রহণ যেমনঃ মূর্তির ইবাদত করা ছিল মক্কার মুশরিকদে রীতি। আর এর আধুনিক ভার্সন হচ্ছে মৃত ব্যক্তির নিকট দোয়া করা, মাজারে যেয়ে দান করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের মাধ্যম গ্রহণ করা, পীর তথা বিভিন্ন দরবার এর তরীকা গ্রহণ করা। বিভিন্ন মতবাদ এর অনুসরণ করা।।
২. আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নাযিলকৃত উপদেশ গ্রহণ করতে অস্বীকার করাঃ
মানব জাতিকে একত্ববাদের পথে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যে আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। আর শেষ নবী ও রাসূল হচ্ছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ তথা কুরআন এবং সুন্নাহ(কর্মনীতি,কর্মপদ্ধতী) নাযিল করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদের নাযিলকৃত ‘যিকর’ তথা ‘উপদেশ’ অনুযায়ী ইবাদত সম্পাদন করার জন্যে আহবান জানালেন তখন তারা তা অস্বীকার করেছিল। বরং নিজেদের বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষদের নিকট থেকে যে পদ্ধতী তারা হাতে পেয়েছে তাই নিয়ে তারা সন্তুষ্ট ছিল, উপদেশ গ্রহণ করতে সম্মত হয়নি। নিজস্ব যুক্তি-পদ্ধতী ও ঐতিহ্য অনুযায়ী ইবাদত করা তাদের কে মুসলিম বানাতে পারে নি যদিও তারা আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল হিসেবে মেনে নিয়েছিল। কারণ, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিল কর্তৃক ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ বিনা শর্তে মেনে নেয়া এবং তা মানার ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শর্তহীন আনুগত্য করা হচ্ছে একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
ইরশাদ হচ্ছেঃ বলযদি তোমরা আল্লাহকে(সত্যিই) ভালবাসতাহলে আমার অনুসরণ কর(অর্থাৎইসলামের একত্ববাদ গ্রহণ কর,কুরআন এবং সুন্নাহর অনুসরণর কর)আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীলপরম দয়ালু [সূরা ইমরানঃ ৩১]

৩. তাকওয়া অবলম্বন না করাঃ
মানুষ যখন ইসলামের একত্ববাদ মেনে নিবে,কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসরণ করবে তখন তার মাঝে তাকওয়ার গুণাবলী পরিস্ফুটিত হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সে তাগুত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে কুরআন ও সুন্নাহ’র অনুসরণ করবে। সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করবে। মুসলিম হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্তই হচ্ছে তাগুতকে অস্বীকার করা আর সংক্ষিপ্ত আকারে তাগুত হচ্ছে তাই যা শয়তানের পথ, যা ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ এর বিপরীত। একজন তাকওয়া অবলম্বনকারী শুধু নিজেই বাঁচবে না বরং সেই সাথে তার পরিবার, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরকেও তাকওয়া অবলম্বনকারী হওয়ার আহবান জানাবে। মক্কার মুশরিকগণ আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করে তাদের কর্ম সম্পাদন করে নি, আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিল কৃত কুরআন-সুন্নাহ মেনে নেয়নি,অনুসরণ করে নি যার ফলশ্রুতিতেতারা মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

৪. সত্য সামনে প্রকাশিত হওয়ার পরও তা অস্বীকার করাঃ
আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল হিসেবে মেনে নেয়া। এরপর যখন সামনে আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নাযিলকৃত ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ তথা কুরআন-সুন্নাহ সামনে দলীল এবং উপযুক্ত প্রমাণ সহকারে উপস্থিত হয় আর সেই সাথে সে এটাও বুঝতে পারে যে এ ‘যিকর’ বা ‘উপদেশ’ তথা কুরআন-সুন্নাহ(কর্মনীতি, কর্মপদ্ধতী) আল্লাহর নিকট থেকে এসেছেকিন্তু তবুও তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করা। নাযিলকৃত ‘যিকর’ গ্রহণ করতে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করতে গড়িমসি করা,মোহাচ্ছন্ন ভাব প্রদর্শন করা, ‘যিকর’ এর বিপরীত কর্মনীতি-কর্মপদ্ধতী অনুসরণ করা মক্কার মুশরিকদের কর্মনীতি। যার কারণে মক্কার মুশরিকগণ মুসলিম হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।

আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ তার চাইতে বড় যালেম আর কে হতে পারে যে ব্যক্তিকে তার মালিকের আয়াতসমূহ দ্বারা নসীহত করা হয়অতপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়অবশ্যই আমি নাফরমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিবো [সূরা আস-সাজদাঃ২২]
সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, আশ্রয়দাতা, সকল কিছুর একমাত্র কর্তৃত্বশীল হিসেবে আল্লাহ তা’আলাকে মেনে নেয়ার পরও তা মক্কার মুশরিকদের মুসলিম বানাতে পারেনি তাই আমাদের মুসলমান ভাইদের ভেবে দেখার আহবান জানাই এবং সেই সাথে কুরআন-সুন্নাহ’র অনুসরণ করার আহবান জানাই। আল্লাহ তা’আলার নিকট আশ্রয় চাইছি বিভ্রান্ত হওয়া থেকে, পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে এবং সত্য সামনে প্রকাশ্য দিবালোকের মত প্রকাশিত হওয়ার পরও যেন আমরা তা গ্রহণ করা থেকে বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করি। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের হক বুঝার সুমতি দান কর এবং আমাদের হিদায়াতের পথে প্রতিষ্ঠিত রাখ, আমীন।


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...

আপনার মন্তব্য লিখুন