মূলঃ মেরিনার

[মূল লেখা: Jamaal al-Din M. Zarabozo-র]

…………..পূর্বে প্রকাশিত লেখার ধারাবাহিকতায়:

কুর’আন সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহর (সা.) বক্তব্য

রাসূল (সা.) – যাঁর কাছে কুর’আনের বাণী সরাসরি নাযিল হয় এবং যিনি সেই অনুযায়ী তাঁর জীবন যাপন করে গেছেন – তিনিও আমাদের কুর’আনের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলে গেছেন। নীচে, আমরা তাই তাঁর সেসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দৃষ্টি-খুলে-দেয়া বক্তব্যের একটা ক্ষুদ্র অংশ আপনাদের/পাঠকের অবগতির জন্য তুলে দিচ্ছি।

রাসূল (সা.) এ ব্যাপারটা স্পষ্ট করে গেছেন যে, এই কুর’আন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিরাট আশীর্বাদ ও অলৌকিক নিদর্শন। নিম্নলিখিত হাদীসে, রাসূল (সা.) পূর্ববর্তী নবীদের আল্লাহর তরফ থেকে দেয়া অলৌকিক নিদর্শনসমূহ নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্যান্য নবীদের দ্বারা প্রদর্শিত অলৌকিক ব্যাপারসমূহ যদিও নিঃসন্দেহে মর্যাদাপূর্ণ ছিল, তবুও সেগুলোর সঙ্গে রাসূল (সা.)-এঁর সাথে সর্বদা বিরাজমান এই অলৌকিক নিদর্শনের কোন তুলনা হতে পারে না – এমনকি মূসা (আ.)-কে যে লাঠি দেয়া হয়েছিল – অথবা ঈসা (আ.)-কে মৃতকে জীবিত করার বা অন্ধকে দৃষ্টিদানের যে অলৌকিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল – সেগুলোকেও, কুর’আনের আঙ্গিকে নবী মুহাম্মাদ (সা.) যা লাভ করেছেন, তার সাথে তুলনা করা যায় না। আর এ জন্যই কিয়ামতের দিন, নবীদের মাঝে তাঁর নিজের অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে, এ ধরনের আশা করার পেছনে রাসূল (সা.)-এঁর যথাযথ কারণ ছিল। রাসূল (সা) বলেন :
“নবীদের মাঝে এমন কেউ ছিলেন না যাঁকে এমন কিছু না দেয়া হয়েছে, যা দেখে লোকে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে। কিন্তু আমাকে কেবল এক ওহী দান করা হয়েছে, যা আল্লাহ্ আমার কাছে প্রেরণ করেছেন। তাই আমি আশা করি পুনরুত্থান দিবসে অন্য নবীদের চেয়ে আমার অনুসারীদের সংখ্যা বেশি হবে।” (বুখারী)

আল-কুর’আন অর্থাৎ আল্লাহর কথা ও বাণীর এই সংকলনের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে খানিকটা আলোকপাত করে, আরেকটি হাদীস রয়েছে যেখানে রাসূল (সা.) বলেন :
“সকল বাণীর উপর আল্লাহর বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে তাঁর সৃষ্টির উপর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের মতই ।”
(আত-তিরমিযী, আদ-দারিমী)

কেউ যখন এরকম করে কুর’আনের শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃতি অনুধাবন করতে পারবে, তখন সে নিশ্চয়ই তার সময়কে এই বাণী পড়ার কাজে নিয়োগ করতে পারবে। এবং একে অবজ্ঞা করতে পারবে না অথবা, দিক নির্দেশনার জন্য অন্য কোন উৎসের দিকে ফিরে তাকানোরও প্রয়োজন হবে না তার । রাসূল (সা.) কুর’আন সম্বন্ধে আরো বলেছেন :
“তোমাদের জন্য সুসংবাদ! নিশ্চয়ই এই কুর’আনের এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে রয়েছে এবং অপর প্রান্ত তোমাদের হাতে। এর সাথে লেগে থাক, তাহলে তোমরা কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না এবং তার পরে তোমরা কখনো বিপথগামীও হবে না।” (আত-তাবারানী – আলবানীর মতে হাদীসটি সহীহ)

অপর একটি হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন :
“হে লোকসকল, নিশ্চিতই আমি কেবলি একজন মানুষ এবং অচিরেই আমার প্রভুর কাছ থেকে একজন বার্তাবাহক আমার কাছে আসতে পারেন এবং আমি তার ডাকে সাড়া দেব (অর্থাৎ মৃত্যুবরণ করবো)। আমি তোমাদের জন্য দুটি গুরুভার বস্তু রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। যার মাঝে রয়েছে দিক নির্দেশনা ও আলো। যে এর সাথে লেগে থাকবে এবং এর অনুসরণ করবে সে সঠিক পথের উপর থাকবে। যে এর সাথে লেগে থাকতে ব্যর্থ হবে সে বিপথগামী হবে। সুতরাং আল্লাহর কিতাবকে গ্রহণ কর এবং এর সাথে লেগে থাক। …” (আহমাদ)

আরেকটি হাদীসে রাসূল (সা.) বলেন :
“ ‘নিশ্চিত এই মানবজাতির মাঝে, আল্লাহর বিশেষ জনগোষ্ঠী রয়েছে।’ তারা জিজ্ঞেস করলো, ‘হে আল্লাহর রাসূল, তারা কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তারা হচ্ছে কুর’আনের জনগোষ্ঠী। তারা হচ্ছে আল্লাহর জনগোষ্ঠী এবং বিশেষভাবে তাঁর।’ ” (আহমাদ, ইবনে মাজা, নাসাঈ – আলবানীর মতে সহীহ)

রাসূল (সা.) আরো বলেছেন :
“তোমাদের মাঝে সেই সর্বশ্রেষ্ঠ যে কুর’আন শিখে ও অন্যদের শিক্ষা দেয়।” (বুখারী)

কুর’আন সম্বন্ধে তিনি আরো বলেছেন :
“জ্ঞান আহরণের জন্য যে কেউ যখন কোন পথ অনুসরণ করবে, আল্লাহ্ সেজন্য, তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেবেন। এমন কোন জনসমষ্টি নেই, যারা আল্লাহর ঘরগুলির কোন একটিতে সমবেত হয়ে নিজেদের মাঝে কুর’আন পাঠ করে ও অধ্যয়ন করে, অথচ তাদের উপর প্রশান্তি নেমে আসে না, রহমত নেমে আসে না, ফেরেশতারা তাদের পাশে আসে না এবং আল্লাহ্, তাঁর কাছে উপস্থিতদের কাছে তাদের নাম উল্লেখ করেন না। কর্মফলের বিচারে যে পিছিয়ে পড়বে, বংশপরিচয়ের উৎকৃষ্টতা তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।” (মুসলিম)

আরেকটি বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন :
“কুর’আন তিলাওয়াতকারী মুমিনের উদাহরণ হচ্ছে সেই লেবুর মত যা স্বাদে ও গন্ধে উত্তম এবং সে, যে কুর’আন তিলাওয়াত করে না তার অবস্থা হচ্ছে ঐ খেজুরের মত যা স্বাদে উত্তম কিন্তু যার কোন গন্ধ নেই এবং যে মুনাফিক কুর’আন তিলাওয়াত করে, তার উদাহরণ হচ্ছে রাইহানা বৃক্ষের মত যার সুগন্ধ রয়েছে, কিন্তু স্বাদে যা তিক্ত। আর সেই মুনাফিক যে কুর’আন তিলাওয়াত করে না, তার উদাহরণ হচ্ছে হানযালাহ্, যা স্বাদে তিক্ত এবং যার কোন গন্ধও নেই।” (বুখারী)

এই হাদীসে কুর’আনের মাহাত্ম্য ও উন্নত প্রকৃতি প্রকাশিত হয় – যা একজন মুনাফিকের মুখে উচ্চারিত হলেও তার সুগন্ধ পারিপার্শ্বিকতায় ছড়িয়ে পড়ে।

সবশেষে আমরা আরেকটি হাদীস উদ্ধৃত করবো যেখানে আল্লাহ কিতাবের গুরুত্ব যথাযথরূপে প্রকাশিত হয়েছে। এই হাদীসে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন :
“পবিত্র কুর’আন হয় তোমার পক্ষে অথবা তোমার বিপক্ষে সুপারিশ করে।” (মুসলিম)

এখানে আল্লাহর রাসূল (সা.) স্পষ্টত বলছেন যে, কুর’আন হয় কারো পক্ষে অথবা তার বিপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ হবে। এখানে কোন নিরপেক্ষ অবস্থান নেই। যে কাউকে দুটো দলের একটির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। এই বক্তব্য পবিত্র কুর’আনে আল্লাহর নিম্নলিখিত বক্তব্যের সদৃশ :

“এবং আমরা এই কুর’আন নাযিল করেছি যা বিশ্বাসীদের জন্য শিফা ও রহমত। আর জালিমদের জন্য এটা তাদের ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না।” (সূরা ইসরা, ১৭:৮২)