দ্বীনের প্রতি বিদ্রূপ ও তার পবিত্রতাহানি করার হুকুম


প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখক: সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান | অনুবাদক: মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী
12

দ্বীনের প্রতি বিদ্রূপকারী মুরতাদ হয়ে যায় এবং পুরোপুরি দ্বীন ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ  لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ 

‘বলুন (মুহাম্মাদ), তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর নিদর্শনাবলীর সাথে এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? ছল-ছুতা দেখিয়ো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফুরী করেছ।’ [১]

এ আয়াত প্রমাণ বহন করে যে, আল্লাহর সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা কুফুরী, রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রূপ কুফুরী। অতএব যে ব্যক্তি এ বিষয়গুলোর কোন একটির প্রতি বিদ্রূপ করে, সে সবগুলোর প্রতি বিদ্রূপকারী হিসাবে গণ্য হবে। আর সে যুগের মুনাফেকদের পক্ষ থেকে যা ঘটেছিল তা এই যে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাগণের প্রতি বিদ্রূপ করত। তখনই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়। অতএব এ বিষয়গুলোর প্রতি বিদ্রূপ করা একটি অন্যটির সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। সুতরাং যারা আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি ঠাট্টা করে এবং আল্লাহ তাআলা ব্যতীত মৃত লোকদের কাছে দোয়া করাকে বড় মনে করে, যখন তাদেরকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করা হয় এবং শিরক থেকে নিষেধ করা হয়, তখন তারা তৎ প্রতি বিদ্রূপ করতে থাকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذَا رَأَوْكَ إِنْ يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَذَا الَّذِي بَعَثَ اللَّهُ رَسُولًا  إِنْ كَادَ لَيُضِلُّنَا عَنْ آَلِهَتِنَا لَوْلَا أَنْ صَبَرْنَا عَلَيْهَا  الفرقان

‘তারা যখন আপনাকে দেখে তখন আপনাকে কেবল বিদ্রূপের পাত্ররূপে গ্রহণ করে এবং বলে এই কি সে – যাকে আল্লাহ রাসূল করে প্রেরণ করেছেন? সে তো আমাদেরকে আমাদের উপাস্যদের কাছ থেকে দূরে সরিয়েই দিত, যদি আমরা তাদেরকে আঁকড়ে ধরে না থাকতাম।’ [২]

তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাদেরকে শিরক থেকে নিষেধ করেছিলেন, তারা তাঁকে বিদ্রূপ করতে থাকে। প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত মুশরিকগণ নবীগণের দোষত্রুটি বর্ণনা করে আসছে এবং যখনই তাঁরা তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন তাঁদেরকে তারা নির্বোধ, ভ্রষ্ট ও পাগল বলে অভিহিত করে। কেননা তাদের অন্তরে রয়েছে শিরকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। অনুরূপভাবে দেখা যায় – মুশরিকদের সাথে যাদের সাদৃশ্য রয়েছে, যখনই তারা কাউকে তাওহীদের প্রতি আহ্বান করতে দেখে, নিজেদের অন্তরে শিরক থাকায় তারা তৎ পতি বিদ্রূপ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ 

আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমনও রয়েছে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদেরকে তাঁর সমক স্থির করে। আল্লাহকে ভালোবাসার মতই তারা তাদেরকে ভাল-বাসে। [৩]

অতএব কেউ যদি আল্লাহকে ভালোবাসার ন্যায় সৃষ্টি জগতের কোন কিছুকে ভালোবেসে থাকে, তাহলে সে হবে মুশরিক। আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে ভালোবাসা এবং আল্লাহর সাথে কাউকে ভালোবাসা এত দু ভয়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা উচিত। এজন্য যারা কবর ও মাজারকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে তাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা আল্লাহর একত্ববাদ ও ইবাদতের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে থাকে এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তারা শাফায়াতকারী রূপে গ্রহণ করেছে, তাদের প্রতি খুবই সম্মান প্রদর্শন করে। তাদের যে কেউ আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম খেতে পারে কিন্তু স্বীয় পীর ও শায়খের নামে মিথ্যা কসম খাওয়ার সাহস কারো নাই। এদের অনেকেই মনে করে যে, পীর ও শায়খের কাছে সাহায্য চাওয়া – চাই তা তার কবরে পাশে হোক কিংবা অন্য কোথাও – প্রত্যুষে মসজিদে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়ার চেয়েও তাদের জন্য বেশি উপকারী। যারা তাদের পথ ছেড়ে তাওহীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাদের প্রতি তারা উপহাস করে। তাদের অনেকেই মসজিদ ভেঙে দরগাহ বানায়। এসব কিছুই আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি উপহাস এবং শিরকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বই আর কিছু নয়। [৪] কবরপন্থীদের মধ্যে আজকাল এ ধরনের ঘটনা প্রচুর ঘটে থাকে।
ঠাট্টা-বিদ্রূপ দু’ভাগে বিভক্ত:

এক. স্পষ্ট বিদ্রূপ 

তা এমন বিদ্রূপ যে ব্যাপারে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন তাদের এমন কথা বলা যে, ‘‘আমাদের এ সকল ক্বারীদের ন্যায় এত বেশি পেটুক, এত বড় মিথ্যাবাদী ও যুদ্ধের সময় এত ভীরু লোক আমরা দেখি নাই।’’ কিংবা অনুরূপ আরো কোন কথা যা বিদ্রূপকারীরা সাধারণত বলে থাকে। যেমন কারো এমন কথা যে, ‘‘তোমাদের এই ধর্ম পঞ্চম ধর্ম’’ অথবা বলা যে, ‘‘তোমাদের ধর্ম বানোয়াট’’।

একই ভাবে সৎকাজের আদেশ দাতা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী কাউকে দেখে উপহাসমূলক এমন কথা বলা যে,‘‘তোমাদের কাছে তো দ্বীনের লোকজন এসে গেছে’’। এ রকম আরো অসংখ্য কথাবার্তা যা গণনা করা কষ্টসাধ্য। এসব কথাবার্তা সে সব লোকদের কথার চেয়েও ভয়াবহ, যাদের ব্যাপারে আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল।

দুই: অস্পষ্ট বিদ্রূপ

এ হল এমন সমুদ্র সদৃশ যা কোন কূল-কিনারা নেই। যেমন চোখ টেপা, জিহ্বা বের করা, ঠোঁট উল্টানো, আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াতের সময় কিংবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পড়ার সময় অথবা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার সময় হাত দিয়ে ইশারা করা [৫] অনুরূপ ভাবে এ ধরনের কথাও বলা যে ‘‘মানব-রচিত আইন অনুযায়ী শাসন পরিচালনা মানুষের জন্য ইসলামী আইন অনুযায়ী শাসন পরিচালনার চেয়ে উত্তম’’ আর যারা তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে এবং কবর পূজা ও ব্যক্তিপূজাকে বাধা দিচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যে বলা যে, ‘‘এরা মৌলবাদী’’ অথবা ‘‘এরা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়’’ অথবা ‘‘ এরা ওহাবী’’ অথবা ‘‘এরা পঞ্চম মাজহাবের অনুসারী’’। এ ধরনের আরো অনেক অনেক কথাবার্তা রয়েছে যা প্রকারন্তরে দ্বীন ও দ্বীনদারদের প্রতি গালি এবং বিশুদ্ধ আক্বীদার প্রতি বিদ্রূপ হিসাবে পরিচিত। লা হাওলা ওয়া কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

এসব বিদ্রূপ ও উপহাসের মধ্যে রয়েছে সেই ব্যক্তির প্রতি বিদ্রূপ, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন সুন্নাহকে শক্ত ভাবে মেনে চলে। তারা দাঁড়ি রাখার প্রতি উপহাস করে বলে : দ্বীন-ধর্ম তো চুলের মধ্যে নেই, ইত্যাদি আরো নানারকম বিশ্রী কথা।

সমাপ্ত

[১] সূরা তাওবা, ৬৫-৬৬
[২] ফুরক্বান, ৪১-৪২
[৩] সূরা বাকারা, ১৬৫
[৪] ফাতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, ১৫তম খন্ড ৪৮-৪৯
[৫] মাজমুউত তাওহীদ, ৪০৯

 সূত্রঃ ইসলাম হাউজ


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

আরও পড়তে পারেন

রাসূল (সাঃ) এর কোন সুন্নাহের প্রতি ঠাট্টা বিদ্রুপের বিধান

Download article as PDF প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার …

পাঠকের মন্তব্য

Loading Facebook Comments ...