ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন – ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র

10
23
প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখক: খান শরীফুজ্জামান  | উৎসঃ দৈনিক ইত্তেফাক (পৃষ্ঠা ৯, তারিখ ১৬/০৯/১২)

পশ্চিমা ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ভ্রমরার ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন’ হুলের বিষে আবারও আক্রান্ত মুসলিম বিশ্ব। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বাপেক্ষা অনুকরণীয় আদর্শের মহামানব  হযরত মুহাম্মদ (স.) আবারও অবমাননার শিকার হলেন। এবার আর অবমাননার কার্টুন নয়, চলচিত্র সংস্করণ। যা তাদের উদারনৈতিক সমাজের মূল্যবোধের সাথে সংগতিপূর্ণ। পশ্চিমা সংস্কৃতির নোংরা প্রকাশ যেন, যেকোনো বিবেকবানের বিবেককে উপহাস করে।

সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে ‘ইনোসেন্স অব মুসলিমস’ নামের চলচ্চিত্র। যেখানে প্রচণ্ডভাবে বিদ্রূপ করা হয় হাজার বছর আগে প্রয়াত এ মহান নেতাকে। চলচ্চিত্রের পরিচালক নিজেকে স্যাম বাসিল নামে পরিচয় দেয়। যা তার ছদ্ম নাম হিসেবে জানা যায়। বাসিল গত ১১ সেপ্টেম্বর ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে সাক্ষাত্কারে ইসলাম ও মুহাম্মদ (স.) বিদ্বেষী নানা কথা বলে। বাসিল বলেন, “ ইসলাম হলো একটি ক্যান্সার। ইসলাম যে একটি ঘৃণ্য ধর্ম তা প্রমাণ করার জন্য চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছে… এটি কোনো ধর্মীয় মুভি নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মুভি।’’১(“Islam is a cancer. the film was made to depict Islam as a hateful religion….The movie is a political movie. It’s not a religious movie.”) বাসিল আরো বলেন, ‘চলচ্চিত্রটি তৈরি করতে ১০০ জন ইহুদি  মোট পাঁচ মিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়েছে।’  মুসলিমদের সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তির অবমাননার প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম বিশ্বে। লিবিয়ায় মার্কিন কনসুলেটে হামলায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফার স্টিভেন্সসহ আরো তিন মার্কিনী নিহত হয়। এ ঘটনা নিয়ে গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে মিসরের রাজধানী কায়রোতে ও তিউনিসিয়ায় এবং ইয়েমেনে মার্কিন দূতাবাসে হামলা ও ঘেরাওর ঘটনা ঘটেছে।

ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী সমাজের বিকৃত রুচির প্রকাশে মাঝে মাঝেই কেঁপে ওঠে বিশ্ববিবেক। আমাদের জেনে রাখা দরকার স্যাম বাসিলই এই প্রথম কোনো নির্মাতা নন যিনি মুহম্মদ (স.) কে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক নাটক করেছেন। এর আগে ১৮৮৯ সালে ফ্রেঞ্চ নাট্যকার হেনরি ডি বর্নিয়ার (Henri de Bornier) ম্যাহোম্মেট (Mahomet) নামের একটি ইসলাম বিরোধী নাটক রচনা করেন। তখন উসমানীয় খিলাফতকে ইউরোপের রুগ্ন মানুষ হিসেবে পশ্চিমারা ডাকত। একটি ফ্রেন্স জার্নালের মাধ্যমে পাওয়া এ সংবাদটি একটি তুর্কি সংবাদপত্রও প্রকাশ করে। কিন্তু “তত্কালীন মুসলিম বিশ্বের খলিফা সুলতান আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় এ ঘটনার এমন প্রচণ্ড প্রতিবাদ ফ্রান্সের কাছে জানিয়েছিলেন যে, ফ্রান্সের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী চার্লস ডি ফ্রেয়সিন্থ ১৮৯০ সালেই নাটকটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ফ্রান্সের বিদেশ মন্ত্রণালয়  প্যারিসে অবস্থানকারী তুর্কি এ্যাম্বাসেডর ইসেট পাশাকে মুসলিমদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান বজায় রাখার আশ্বাসও প্রদান করেন।”

কিন্তু আজকের মুসলিম বিশ্বের মুসলিমরা যেন বেওয়ারিশ এক ভেড়ার পাল। যাদের নেই কোনো অভিভাবক। নিরাপত্তা প্রদানকারী। যখন তখন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে আক্রান্ত হয় মুসলিমদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ভূমি। অবমাননা করা হয় নারী-শিশু-যুবক-বৃদ্ধদের। গ্রেফতার করে বিনা বিচারে পুরে রাখা হয় আবুগারিবের মতো নির্যাতন সেলে। আজ তুরস্ক আছে, আজ নেই কোনো উসমানীয় খিলাফত; নেই সুলতান আব্দুল হামিদ, নেই কোনো সালাহ উদ্দিন আয়্যুবি। যিনি এ উম্মাহকে ঢালস্বরূপ রক্ষা করবেন। রক্ষা করবেন আল-কোরআনের ও মুহাম্মদ (স.)-এর সম্মানকে।

যারা আছেন মুসলিমদের তথাকথিত নেতা তারা সকলেই নতজানু পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকান প্রভুর সামনে বলি দিয়ে চলেছেন মুসলিমদের সকল স্বার্থ। তারা কেউ মডারেট, কেউ লিবারেল বনে গেছেন। কিছু লোক জড় হয়ে আমেরিকান এ্যাম্বাসেডর বা আমেরিকানদের হত্যা করলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। মিশরের মুহম্মদ মুরসি, সৌদি আব্দুল্লাহ আল সৌদ, পাকিস্তানের জারদারি, তুরস্কের রেসেপ তাইপ এরদোগানদের উচিত এ ঘটনার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গুরুত্ব উপলব্ধি করা। তাঁদের মধ্যে দু-এক জন যে দায়সারা গোছের ‘লিপ সার্ভিস’ দিয়েছেন। তা মুহাম্মদ (স.) ও মুসলিমদের প্রতি আরো অপমানকর।

দু:খজনক, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিমদের নেতারা তো  এখনো একটি মৌখিক প্রতিবাদ উচ্চারণ করার মতো সাহসও দেখাতে পারেননি। মুসলিম বিশ্বের নেতাদের আমেরিকাকে সরাসরি হুঁশিয়ার করা উচিত- এমন ঘটনা যদি তারা স্থায়ীভাবে বন্ধ না করে, তবে তাদের সাথে কোনোরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা হবে না। সৌদি-মিশরের উচিত আমেরিকার কাছে একবিন্দু তেল রপ্তানি থেকেও নিজেদের বিরত রাখা। আর সারা বিশ্বের মুসলিমদের উচিত যে সকল বিশ্বাস যেমন- মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের মানুষ, যে সকল পাশবিক সংস্কৃতি বাজারজাত করে ও তাদের সমাজে চর্চা করে, সেগুলোকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করা। আর প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যুক্তির মাধ্যমে মুহাম্মদ (স.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব মানুষের কাছে তুলে ধরা।

 

লেখক: শিক্ষক (বি.আই.এস.সি) ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ক এম.ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Print Friendly, PDF & Email


'আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক'
প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে
আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]